ট্রাম্পে ফেনোমেনন : হেজেমোনির ধস ও বামপন্থার পুনর্নির্মাণের অন্বেষা
টিটো খন্দকার
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণগুলোকে যদি আমরা কেবল একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নার্সিসিস্ট ব্যক্তির খামখেয়ালিপনা, বাচনভঙ্গির অস্থিরতা কিংবা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কুৎসিত বিচ্যুতি হিসেবে বিচার করি, তাহলে ইতিহাসের গভীরতর সত্যটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ট্রাম্প কোনো আকস্মিক উল্কাপাত নন; তিনি বরং এক দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত ক্ষয়ের দৃশ্যমান রাজনৈতিক ইশতেহার। তিনি একটি যুগের পুঞ্জীভূত অস্বস্তি, সামাজিক বিভাজন এবং ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থার প্রতিচ্ছবি। তাকে বুঝতে হলে ব্যক্তির ‘ক্যারিশমা’র ঊর্ধ্বে উঠে সেই আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন, যা তার উত্থানকে অনিবার্য করে তুলেছে।
গত চার দশকে যুক্তরাষ্ট্রের উদর চিরে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা কেবল পরিসংখ্যানের রদবদল নয়; তা ছিল এক আমূল সামাজিক ডিসলোকেশন। উৎপাদনশীল অর্থনীতির পিঠ দেয়ালের দিকে ঠেলে দিয়ে জেঁকে বসেছে আর্থিক পুঁজির (ঋরহধহপরধষ ঈধঢ়রঃধষ) একাধিপত্য। শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ধুলোয় মিশেছে, আর বৈষম্য পৌঁছেছে এমন এক আদিম স্তরে, যেখানে গুটিকতক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়েছে অকল্পনীয় সম্পদ। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান- উভয় দলই কার্যত একই কর্পোরেট কাঠামোর সমার্থক হয়ে ওঠায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ধারণ করার মতো কোনো মৌলিক রাজনৈতিক ভাষা আর অবশিষ্ট ছিল না।
এই শূন্যস্থান পূরণের নামই ট্রাম্প। তিনি নিজেকে নির্মাণ করেছেন ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’-এর বাইরের এক বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর হিসেবে- এক তথাকথিত ত্রাতা, যিনি ‘বিস্মৃত’ মানুষের প্রতিনিধি। কিন্তু এই প্রতিনিধিত্ব যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। এখানে কার্ল মার্কসের ‘বনাপার্টিজম’ তত্ত্বের এক নতুন সংস্করণ আমরা দেখতে পাই- যেখানে একজন নেতা নিজেকে আপাতদৃষ্টিতে সকল শ্রেণির ঊর্ধ্বে উপস্থাপন করেন, কিন্তু প্রকারান্তরে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থারই পাহারাদারি করেন।
তবে ট্রাম্পের রাজনীতি লুই বোনাপার্টের চেয়েও জটিল। তিনি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নন, বরং ইতিহাসের এক নতুন রূপান্তর। বোনাপার্ট রাষ্ট্রযন্ত্রকে সরাসরি কবজা করেছিলেন, কিন্তু ট্রাম্পের শক্তি নিহিত রয়েছে ‘দৃশ্যমানতার’ ওপর–মিডিয়া ম্যানিপুলেশন, ভাষার উগ্রতা এবং নিরন্তর বিতর্কের মধ্য দিয়ে তিনি এক বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করেন। এখানে সত্য এবং অভিনয়ের সীমারেখা মুছে যায়। অ্যান্টোনিও গ্রামসির ভাষায় একে বলা যায় ‘হেজেমোনির সংকট’। পুরোনো শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের অধিকার হারায়, অথচ নতুন কোনো প্রগতিশীল বিকল্প তখনও গড়ে ওঠে না, তখনই এই ‘মর্বিড’ অন্তর্বর্তী সময়ে ট্রাম্পের মতো উদ্ভট চরিত্রদের আবির্ভাব ঘটে।
এই গভীর সংকটময় সন্ধিক্ষণে সেখানকার বামপন্থার ভূমিকা ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। ঐতিহাসিকভাবে বামপন্থার মূল শক্তি ছিল শ্রেণি সংগ্রাম-উৎপাদন ও শোষণের বিশ্বজনীন ভাষার ব্যবহারে। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই ফোকাস ক্রমশ সরে গিয়ে থিতু হয়েছে বিমূর্ত ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয় রাজনীতির ওপর। লিঙ্গ, বর্ণ বা জাতিগত প্রশ্নগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যখন এগুলো অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তখন বাম রাজনীতি হয়ে ওঠে খণ্ডিত ও বিভ্রান্ত।
একজন শ্রমিক যখন একদিকে শ্রেণিগতভাবে শোষিত হন, আর অন্যদিকে তার সাংস্কৃতিক পরিচয় দিয়ে তাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন তার সামগ্রিক অভিজ্ঞতা কোনো সুসংহত রাজনৈতিক রূপ পায় না। ডানপন্থা ঠিক এই ফাটলটিকেই ব্যবহার করে- ট্রাম্পের মতো নেতারা অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ হিসেবে পরিবেশন করেন এবং শ্রেণিগত ক্ষোভকে ডাইভার্ট করে দেন পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষের দিকে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্নতর হলেও মূল অসুখটি একই। এ দেশের বামপন্থাও দীর্ঘকাল ধরে সাংগঠনিক স্থবিরতা এবং তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। শহরকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আর তৃণমূলের শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে এক দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এখানেও পরিচয়বাদী রাজনীতির জোয়ার আমরা দেখতে পাচ্ছি, যা বৃহত্তর অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারছে না। ফলে নৈতিকভাবে সঠিক অবস্থান নিয়েও বামপন্থা জনগণের ‘কমন সেন্স’-এ জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তাহলে উত্তরণ কোথায়? উত্তরটি লুকিয়ে আছে শ্রেণি এবং পরিচয়ের সেই হারানো মেলবন্ধনের মধ্যে। এই দুটির মধ্যে কোনো দেওয়াল তোলা চলবে না। একজন মানুষ কেবল শ্রমিক নন, আবার কেবল তার জাতিগত বা লৈঙ্গিক পরিচয়ই তার শেষ কথা নয়। রাজনীতিকে হতে হবে এই বহুমাত্রিকতার ধারক।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য–১) বণ্টনমূলক ন্যায়বিচারের লড়াইকে সামাজিক সংহতি ও মর্যাদার প্রশ্নের সাথে যুক্ত করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে; ২) একাডেমিক জটিলতার বাইরে এসে এমন এক ভাষা (নতুন রাজনৈতিক ডিসকোর্স) নির্মাণ করা, যা মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের সাথে সরাসরি সংলাপ করতে পারে; ৩) কেবল প্রতিরোধের রাজনীতি নয়, বরং এক নতুন নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকল্প (হেজেমোনিক কাউন্টার) গড়ে তোলা, যা বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের বার্তা দেয়।
সবশেষে, ট্রাম্প পচনশীল পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই এক অশনিসংকেত- যব রং ঃযব ংুসঢ়ঃড়স ড়ভ ঃযব ৎড়ঃ! তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, যখন কোনো সমাজ তার অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে ভারসাম্য হারায়, তখন সেই শূন্যতা কোনো না কোনো ভয়ংকর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দিয়ে পূর্ণ হতে বাধ্য। ইতিহাস এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেই শূন্যতা কি আমরা হিংসা আর ঘৃণা দিয়ে পূর্ণ হতে দিয়ে মানবসভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনবো, নাকি এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আদি লড়াইটা জারি রেখে নতুন যুগোপযোগী বাম রাজনীতির জন্ম দেবো? ভবিষ্যৎ ইতিহাসের পাতা এখানে খোলা- তার পরবর্তী অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি, সেটি আমাদেরই কলমে এবং সংগ্রামে নির্ধারিত হোক।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন