কমরেড এনামুল হক এক সংগ্রামী জীবনগাঁথা

অজিত কুমার মণ্ডল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে শোষণ-বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে কমরেড এনামুল হক সমগ্র জীবন লড়াই-সংগ্রামে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ১৯৫৮ সালের ১ মে রাজশাহী শহরে এক অসচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুবরণ করেন। একাডেমিক শিক্ষাবঞ্চিত কমরেড এনামুল মার্ক্সবাদী দর্শন, রাজনৈতি অর্থনীতি, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন, মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী পার্টির নীতি ও কৌশল গভীরভাবে আয়ত্ত করেছিলেন- যা গতানুগতিক একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিতরাই নয় শুধু, অল্পবিস্তর রাজনৈতিক পাঠ নেয়া আমাদের কাছেও ছিল বিস্ময়কর। দারিদ্র্যতা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তিনি প্রলোভন বা ভোগবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন এবং পার্টিকে সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দিয়ে অগ্রসর করেছেন। ১৯৯২ সালে পার্টি বিলোপবাদীদের খপ্পরে পড়লে পার্টির অস্তিত্ব রক্ষা করে আদর্শ সমুন্নত পার্টির লাল ঝান্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। কমরেড এনামুল হক তাঁর নিজস্ব স্টাইলে পার্টি ও গণসংগঠনের বক্তব্য উপস্থাপন করতেন- যা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং হৃদয়স্পর্শী হয়ে উঠতো। তার বক্তব্য খুবই সাদামাটা কিন্ত ধারালো হতো। একসময় গণক্লাস করা হতো। বিশেষতঃ আশির দশকে যখন শ্রমিক আন্দোলন ও ক্ষেতমজুর আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে তখন আন্দোলনে সম্পৃক্ত গণমানুষকে নিয়ে ২০/৩০ জনের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে গণক্লাস হতো। গণক্লাসের পর যারা পার্টি করতে আগ্রহ দেখাতো তাদের গণগ্রুপ/গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। সেই গণক্লাসের রাজশাহীর অপরিহার্য প্রশিক্ষক ছিলেন কমরেড এনামুল হক। অপরাপর প্রশিক্ষকদের বক্তব্য চলাকালীন শিক্ষার্থীরা নানা অজুহাতে বাইরে যেত, আসতো। কিন্ত কমরেড এনামুল বক্তব্য দিলে সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতো। মাথা নাড়াতো, আমরা তা অভিভূত হয়ে দেখতাম। অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৯টা, কোনো কোনো দিন ১০টা পর্যন্ত পার্টি অফিসে অবস্থান করতেন। প্রায়ই তাকে একাই বসে থাকতে দেখা যেত। পার্টি কমরেডদের ডেকে এনে কথা বলতেন। কেউ আসতো, কেউ কেউ আসতো না। না আসলে কষ্ট পেতেন, মাঝেমধ্যে বিক্ষুব্ধ হতেন। এই বিক্ষুদ্ধতা কোনো কোনো সময় তার ঘনিষ্ঠদের ওপর আছড়ে পড়তো। তাতে আমরা মনোকষ্টে ভুগতাম। কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরের আকুলতাকে বুঝবার বা ধরবার চেষ্টা প্রায়ই করতাম না। তাঁর ভেতরটা ছিল খুবই কোমল। যার কারণে তিনি বিক্ষুব্ধ কমরেডকে কাছে টেনে নিতে পারতেন। তার পরিবার প্রায়ই অশান্ত থাকতো। যার কারণে পার্টি অফিসে প্রথমে গম্ভীর দেখালেও অফিসে কর্মী সমর্থক পেলে উৎফুল্ল, উদ্বেলিত হয়ে উঠতেন। কমরেড এনামুল হক ১৯৭৩ সালে রাজশাহীর রেশমপট্টিতে অবস্থিত পদ্ম টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৬ বছর বয়সে ট্রেড ইয়নিয়ন কার্যক্রমে যুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে এই মিলে শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), রাজশাহী কমিটির সভাপতি হিসেবে এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকাকালীন বাংলাদেশ রেল শ্রমিক ইউনিয়ন, শাহমখদুম টেক্সটাইল শ্রমিক ইউনিয়ন, সিল্কো ইন্ডাস্ট্রিজ শ্রমিক ইউনিয়ন, পদ্মা টেক্সটাইল শ্রমিক ইউনিয়ন ও অ্যাডকো শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা ছিলেন। কমরেড এনামুল রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস্, আজিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরর, রাজশাহী রেশম কারখানা, রাজশাহী জুট মিলস্, রাজশাহী সুগার মিলস্, বিএডিসি, ব্যাংক, পিডিবি,ওয়াপদা ও হোটেল রেস্টুরেন্ট এর শ্রমিক কর্মচারীদের সাথে তাঁর নিবিড় ও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কমরেড এনামুল হক ১৯৭৪ সালে সিপিবির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৭৫ সালে সামরিক শাসনামলে গোপন অবস্থায় আত্মগোপনে থেকে চিঠি ও তথ্য আদান-প্রদানের মতো ঝুঁকিপুর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি ১৯৮১ সালে সিপিবি রাজশাহী জেলা কমিটিৎর সদস্য ও পরবর্তীতে পরপর তিনবার জেলা সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। সামরিক শাসক এরশাদের আমলে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর ৫ দফা দাবিতে গড়ে ওঠা তীব্র শ্রমিক আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে কারাবরণ করেন। তিনি ১৯৮১ সাল থেকে পার্টির সার্বক্ষণিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে দুইবার চীন সফর করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে বিশেষত মৃত্যুশয্যায় যখন শায়িত তখন কেউ গেলে হাত মেলাতেন আর সেই হাত ধরেই এক ঝটকায় মুষ্টিবদ্ধ হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেন, বলতেন- লাল ঝান্ডা শক্ত করে ধরবেন, কমরেড। মৃত্যুকালে স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। কমরেড এনামুল হক শারীরিকভাবে মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন, আছেন–শ্রমজীবী মানুষের মাঝে, তার শত সহস্র সারথীদের মাঝে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..