ধ্বংসস্তূপ, কান্না, পাল্টা হাঁক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ শুধু একটি ভবনকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়নি; এটি উন্মোচন করেছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নির্মম বাস্তবতা। আটতলা ভবনটি ধসে পড়ে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন। প্রায় এক হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন- তাদের প্রায় সবাই পোশাকশ্রমিক। এই বিপর্যয় ছিল না নিছক দুর্ঘটনা; এটি ছিল অবহেলা, লোভ এবং রাষ্ট্রীয় দায়হীনতার সম্মিলিত ফল। ফাটল ধরা ভবনে শ্রমিকদের জোর করে ঢোকানো হয়েছিল। মৃত্যুঝুঁকি জেনেও তারা কাজে গিয়েছিলেন- কারণ তাদের সামনে ছিল আরও বড় ভয়- না খেয়ে থাকার ভয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল সস্তা শ্রমের ওপর, বিশেষ করে পোশাকশিল্পে। কিন্তু এই শ্রমের প্রকৃত মূল্য শ্রমিক পায় না। বৈদেশিক মুদ্রা আসে, প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাড়ে, কিন্তু সেই আয়ের বড় অংশ চলে যায় বিদেশি ক্রেতা ও বহুজাতিক পুঁজির পকেটে। দেশে যা থাকে, তারও উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়ে যায় দুর্নীতি, লুটপাট ও নীতিহীনতার গহ্বরে। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রাপ্তি- লবডঙ্কা। একটির পর একটি অর্থনৈতিক দুর্যোগ, ভ্রান্ত নীতি, সাম্রাজ্যবাদকে তোষণ, আর সম্পদের অপচয়ে রাষ্ট্র ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। করোনা মহামারি, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট- সব মিলিয়ে অর্থনীতি আজ চাপে। কিন্তু এই চাপের সবচেয়ে বড় বোঝা বইছে শ্রমিক শ্রেণি। তাদের আয় স্থবির, ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী, জীবন অনিশ্চিত। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে শ্রমিক কোথায়? শ্রমিকের কাজের নিশ্চয়তা নেই, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত নয়। স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, সন্তানের শিক্ষা- এসব মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রেও তাদের জন্য কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বরং দেখা যায়, শ্রমিকরা যখন নিজেরা বিকল্প জীবিকার পথ খোঁজেন- রিকশা চালানো, হকারি করা- তখনও তারা উচ্ছেদের শিকার হয়। শহরকে ‘সুন্দর’ করার নামে তাদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়, কিন্তু পুনর্বাসনের কোনো বাস্তব উদ্যোগ থাকে না। উন্নয়নকে কংক্রিটে মাপা রাষ্ট্রের চোখে শ্রমিক যেন অচ্ছুৎ। রানা প্লাজার পর শোক প্রকাশ হয়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে, নানা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তন কতটুকু ঘটেছে? কর্মপরিবেশ কতটা নিরাপদ হয়েছে? ন্যায্য মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? বাস্তবতা হলো- শ্রমিকের কাছ থেকে নেওয়ার প্রবণতাই প্রাধান্য পেয়েছে। তার শ্রম নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। তার ভোট নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শোনা হয়নি। এমনকি তার ন্যূনতম আশ্রয়টুকুও অনিরাপদ রয়ে গেছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পরও হত্যা মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে মাত্র ১৪৫ জনের। অনুপস্থিত সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও বিচারপ্রক্রিয়া এগোয়নি প্রত্যাশিত গতিতে। বারবার নির্দেশনা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এই দীর্ঘসূত্রিতা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার প্রতিফলন। বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট- শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখলেও সবচেয়ে কম সুরক্ষা পায়। আর যখন তারা ন্যায্য দাবিতে পথে নামে, তখন তাদের মুখোমুখি হতে হয় দমন-পীড়নের। এই চিত্র বদলানো না গেলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় সংকট। অর্থনীতি টিকবে না, সামাজিক স্থিতি থাকবে না, রাষ্ট্রের ভিত হবে ‘দুরমুশ’। আর কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা চলবে না। শ্রমিকদেরই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজের রাজ কায়েম করতে হবে। প্রতি বছর মে দিবস এই ডাক-ই দিয়ে যাচ্ছে। দরকার কেবল শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য। ঐক্য আর সংগ্রাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..