হাম নিয়ে আতঙ্ক নয় হতে হবে সচেতন
রিফাত আমিন রিয়ন
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা অত্যন্ত দ্রুত সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কাশি বা হাঁচি দেয় তখন বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি তারা খুব সহজেই আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে আবারও হাম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম থেকে শহরে সব জায়গাতেই এই রোগ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনেকেই বিষয়টিকে নতুন কোনো মহামারির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। হাম নতুন নয়; এটি বহু পুরোনো, পরিচিত এবং সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি সংক্রামক রোগ। তবুও কেন এটি বারবার ফিরে আসে, তার কারণ রোগের শক্তির চেয়ে আমাদের দুর্বলতাই এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। সেই দুর্বলতা হলো সচেতনতার অভাব, টিকাদানে অনিয়ম এবং গুজবের বিস্তার। তাই আতঙ্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সচেতনতা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ৯-১০ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। অর্থাৎ, একজন রোগী যদি একটি টিকাবিহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকে, তবে খুব দ্রুত তা প্রাদুর্ভাবে রূপ নিতে পারে। এই কারণেই হামকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ-এর যৌথ বিশ্লেষণে এবং বাংলাদেশে গত কয়েক বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলেছে। ২০২৩ সালে প্রায় সাত হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল, তবে তখন পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর পেছনে ছিল নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্যখাতের সক্রিয়তা। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে কোভিড-পরবর্তী বাস্তবতায় টিকাদান কার্যক্রমে যে ব্যাঘাত ঘটে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিতে না পারার কারণে তাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর সেজন্য হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সেটাই প্রাথমিক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র তথ্য মতে, প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ছিল ২০২২ সালে ১ দশমিক ৪১, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৩ ও ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৭২। আর চলতি বছর সংক্রমণের হার প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় বর্তমানে প্রায় ১৬ দশমিক ৮, যা একটি দেশব্যাপী বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের দায়িত্বে নিয়োজিত সংগঠনটি। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; এটি আমাদের অবহেলার একটি বাস্তব প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
হামকে অনেকেই সাধারণ জ্বর বা শিশুদের স্বাভাবিক রোগ হিসেবে ধরে নেন। কিন্তু এটি একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা। বাস্তবে এই রোগ থেকে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, চোখের মারাত্মক সমস্যা, এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি এবং অনেক সময় এটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ফলে হামকে অবহেলা করা মানে একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আমন্ত্রণ জানানো। তবে হাম প্রতিরোধের উপায় আমাদের হাতেই রয়েছে এবং তা অত্যন্ত কার্যকর। টিকাই হলো এর সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর আওতায় পরিচালিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বিনামূল্যে হাম ও রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করলে প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যায়। তারপরও বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশু এই টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ কখনো অবহেলা, কখনো গুজব, আবার কখনো সচেতনতার অভাবে। এই টিকাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীই হাম ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হাম থেকে বাঁচার জন্য টিকা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলা। এসব ছোট ছোট অভ্যাস সংক্রমণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, প্রতিরোধ শুধু একটি পদক্ষেপ নয়, এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া।
হাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তাই এটি মোকাবেলায় সরকার, স্বাস্থ্যখাত, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করা। যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে তাদের শনাক্ত করা। এর সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ করা। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা ও আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আনা এবং প্রয়োজন হলে আইসোলেশন নিশ্চিত করাও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমান বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা যত উন্নতই হোক না কেন যদি মানুষ সচেতন না হয়, তাহলে প্রতিরোধযোগ্য রোগও আবার ফিরে আসতে পারে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকলেও ২০২৬ সালে রোগীর সংখ্যা ও হাসপাতালে ভর্তির হার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, সামান্য অবহেলাও কত দ্রুত বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ২৪১। আর হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৫১। আর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫ হাজার ৮০১ জন শিশু।
সবশেষে বলা যায়, হাম নিয়ে আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের রক্ষা করতে। টিকাদান নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং গুজব থেকে দূরে থাকা। এই তিনটি বিষয় যদি আমরা গুরুত্বসহকারে পালন করি তাহলে হামকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কারণ এই রোগ অজানা নয়, অজেয়ও নয়। এটি এমন একটি রোগ, যাকে আমরা চাইলে সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করতে পারি। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারকে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি শিশু আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
লেখক: শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন