মুক্তির লক্ষ্যে বাঙালির নানামুখী সংগ্রামের ধারা
লুৎফর রহমান
স্বাধীনতার চেতনা মানুষের জন্মগত। মানুষের ইতিহাস শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস। মানুষের আন্দোলন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক আন্দোলন। বিভিন্ন সময়ে দেশে-দেশে এসব আন্দোলন সংঘটিত হয়। ভারতবর্ষের মানুষের ইতিহাস এ ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না। বাংলার মানুষ মোঘল আমলে নিষ্ঠুর জমিদারি শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে মেহনতি মানুষ ও কৃষক সমাজ। তাদের বিদ্রোহ ইতিহাসে লাল হরফে লেখা আছে। মানুষ লড়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার-নির্যাতন-শোষণের বিরুদ্ধে। মোকাবেলা করেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। গড়ে তুলেছে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন। ১৯৫৫ সালে মুর্শিদাবাদ ও ভাগলপুর জেলায় শুরু হয় ঔপনিবেশিক ও জমিদারি শাসন-বিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ ছিলো স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজদের রাজস্ব ও কৃষি নীতির বিরুদ্ধে। এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব চার ভাই। তারপর ১৯৫৭ সালের ১০ মে সংঘটিত হয় সিপাহী বিদ্রোহ। পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের বিরুদ্ধে ঘটে সিপাহীদের এই বিদ্রোহ। একে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তীতে এ বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও দিল্লি অঞ্চলে। ইংরেজরা নির্মমভাবে দমন করে এ বিদ্রোহকে। বহু নিরপরাধ নরনারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করে দমন করা হয় এ গণঅভ্যুত্থানকে। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হয়ে শুরু হয় বৃটিশ সরকারের শাসন। এর পরের আন্দোলন নীলচাষীদের বিদ্রোহ। নীলচাষ লাভজনক না হওয়ায় কৃষকরা ১৯৫৯ সালে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। নীলচাষীদের ওপর হচ্ছিলো নির্মম নিপীড়ন। চাষীদের এই বিদ্রোহের ফলে ক্রমে নীলচাষ বন্ধ হয়ে যায়। এটি ছিলো একটা সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলন। এ আন্দোলন বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলো।
এসব আন্দোলনের পাশাপাশি গড়ে ওঠে উদীয়মান শ্রমিকশ্রেণির নতুন ধরনের আন্দোলন। যেমন, রেলশ্রমিকদের আন্দোলন, চা-বাগানের শ্রমিকদের আন্দোলন, কয়লাখনি-চটকল ও বস্ত্রকল শ্রমিকদের আন্দোলন। এছাড়া যারা অত্যাচারিত হচ্ছিলো এমন দলিতরাও আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো।
কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষদের এসব আন্দোলন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের একাংশের ওপর প্রভাব ফেলেছিলো, এছাড়া বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো ইউরোপীয় রেনেসাঁস বা পুনর্জাগরণ। ইউরোপে গির্জার ধর্মযাজকদের বাড়াবাড়ি জ্ঞানজগতের বিকাশ রুদ্ধ করে দিয়েছিলো। তাই পুনর্জাগরণের মনীষীরা মনুষ্যত্বের অবমাননার বিরুদ্ধে এবং স্বাধীন বিকাশের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এর প্রভাব পড়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায়টির ওপর। এছাড়া সারা দুনিয়ার গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রেরণা বাংলায় সঞ্চারিত হয়।
বাংলার এই নবজাগরণের ছাপ আমরা শিল্পে, সাহিত্যে, সংগীতে, সাংবাদিকতায়, প্রকাশনায়, সামাজিক সংগঠনে ও সমাজসংস্কার আন্দোলনে দেখতে পাই। এই নবজাগরণের প্রাণপুরুষদের একজন ছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো। তিনি ছিলেন কোলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিলো গতানুগতিকতামুক্ত, বিজ্ঞানভিত্তিক। তিনি নববঙ্গ দল গঠন করেছিলেন যা তাঁকে ভারতের জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। আমরা উল্লেখ করতে পারি শিবনাথ শাস্ত্রীর নাম। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, দার্শনিক, লেখক, অনুবাদক ও ঐতিহাসিক। তিনি ব্রাহ্মসমাজের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাধনাগ্রাম ও কিশোর মাসিক পত্রিকা ‘সখা’। আরো উল্লেখ করতে হয় রামতনু লাহিড়ীর কথা। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, বাঙালি সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাসংগঠক। এ তালিকায় গুরুত্বের সাথে উল্লেখিত হন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতকের একজন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও গদ্যকার। তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি জানা বিখ্যাত পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। নারীমুক্তির আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাস হয়ে আছে। তিনি ছিলেন বিধবাবিবাহের পক্ষে এবং বহুবিবাহের বিপক্ষে। তারপর আসে মাইকেল মধুসূদনের নাম। এই মহান কবি ও নাট্যকার ছিলেন সকল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একজন বলিষ্ঠ বিদ্রোহী এবং মানবতার পক্ষে লড়াকু সৈনিক। আসে দীনবন্ধু মিত্রের নাম। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার। বাংলাসাহিত্যে তিনিই সর্বপ্রথম সামাজিক নাটকের প্রবর্তন করেন। তার নাটকে নিপীড়িত মানুষের চিত্র ফুটে উঠেছে যা মেহনতি মানুষকে সংগঠিত হতে প্রেরণা জুগিয়েছিলো। এ কাতারে আসে অক্ষয় কুমার দত্তের নাম। তিনি ছিলেন বাঙালি সাংবাদিক, প্রবন্ধকার ও লেখক। বাংলা,সংস্কৃত, ও ফারসিসহ বিভিন্ন ভাষায় তার দক্ষতা ছিলো। তিনি তাঁর প্রবন্ধে সমসাময়িক সমাজ ও জীবন সম্পর্কে নির্ভিক মতামত তুলে ধরতেন যা মানুষকে প্রতিবাদী হতে প্রেরণা জোগাতো। আরো উল্লেখ করতে হয় কালিপ্রসন্ন সিংহের নাম। তিনি ছিলেন সংগঠক, সাংবাদিক, লেখক ও সমাজকর্মী। তাঁর গড়া সংগঠন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ বিধবাবিবাহ ও অন্যান্য সংস্কার আন্দোলনের মতবাদ প্রচার করতো। এবার উল্লেখ করতে হয় স্বামী বিবেকান্দের নাম। ভারতে পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা। ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। তারপর উল্লেখ করতে হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম। বঙ্কিমকে প্রথম আধুনিক বাংলা উপন্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পুরুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন আধুনিক চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ। উল্লেখ করতে হয় রাধানাথ শিকদারের নাম। তিনি ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ ও প্রথম স্বদেশি বিজ্ঞানী। জ্যোতির্বিজ্ঞান, জরিপবিজ্ঞান ও সাহিত্যে তার অবদান বাংলার পুনর্জাগরণে সাহায্য করেছিলো। তারপর আসে রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ। তিনি ছিলেন কবি। পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা তিনি তাঁর কাব্যে যুক্ত করেন। তিনি নানা ভাষায় লেখা কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেন। তাঁর কর্ম বাঙালির মনোজগতে প্রভাব ফেলেছিলো। এবার উল্লেখ করতে হয় মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের নাম। মহাকাব্যের ধারায় হেমচন্দ্রের বিশেষ অবদান হচ্ছে স্বদেশ প্রেমের উত্তেজনা সঞ্চার। আরো আসে কাঙ্গাল হরিনাথের কথা। তিনি ছিলেন বাউল গায়ক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী। তিনি কৃষকদের প্রতি মহাজন, জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর যার নাম উল্লেখ করতে হয় তিনি হচ্ছেন ফকির লালন শাহ্। লালন ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী কবি ও সংগীতজ্ঞ। তাঁর অজস্র গান এক মানবিক সমাজ রচনার আবেদন রাখে। তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক। এবার উল্লেখ করতে হয় দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর নামটি। তিনি ছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী, তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত লড়েছেন। এ তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে এই মহান কবির বিচরণ নেই। প্রগতিশীল মানবতাবাদী কবির সৃষ্টি বাঙালিকে তার সংস্কৃতিকে লালন করতে শেখায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। সর্বোপরি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা দেয়। উল্লেখ করতে হয় রামসুন্দর ত্রিবেদীর নামটি। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার একজন বিজ্ঞান লেখক। তাঁর প্রবন্ধগুলো বাঙালিকে বিজ্ঞানমনস্ক করেছিলো।
বাঙালির পুনর্জাগরণে উল্লেখিত মনীষীদের নানাদিক থেকে অবদানের পাশাপাশি তখন বাংলার জনগণের মধ্যে স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে। বিকাশ হয় জাতীয়তাবাদী চেতনার। ফলে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। ব্রিটিশ বিরোধী এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য থেকে বিশ শতকের শুরুর সময় সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার উদ্ভব হয়। যেমন- অনুশীলন ও যুগান্তর সমিতি। এদের উদ্দেশ্য ছিলো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ করা। আবার একই সময়ে বাংলাসহ সারা ভারতে শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে।
এই সময়টাতে রাশিয়ায় সংঘটিত হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তখন বিশ্বের নানা দেশের সশস্ত্র ধারার প্রবাসী বিপ্লবীরা সমাজতন্ত্রের দিকে আকৃষ্ট হন। ভারতবর্ষের বিপ্লবীরা তখন নিজেদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখ করতে হয় ডাঃ ভূপেন্দ্র দত্ত, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র নাথ রায় বা এমএন রায়, মুহাম্মদ শরীফ খান, মুহাম্মদ আলী, অবনী মুখার্জী, রতন সিং, বাবা সন্তোষ সিং ও মোহন সিং ভাখনা প্রমুখের নাম। ভারতীয় প্রবাসী বিপ্লবীরা বিপ্লবের দিনটিতে, ৭ নভেম্বর বিপ্লবকে স্বাগত জানিয়ে তারবার্তা পাঠিয়েছিলো, “---রুশ বিপ্লবের আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠ সংহতি জানিয়েই আমরা ঘোষণা করছি যে, ভারত ও রাশিয়ার মুক্তি আন্দোলন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুক্তি সংগ্রামের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।”
এভাবে বাংলায় উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শোষিত নিপীড়িত মেহনতি মানুষের নানামুখী সংগ্রামের ধারা থেকে কমিউনিস্ট পার্টির গোড়াপত্তন হয়।
লেখক : কলামিস্ট
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন