
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধবিরতির যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, তার ঠিক আগমুহূর্তে একটি জরুরি ফোন যায় হোয়াইট হাউসে। ফোনটি করেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর একমাত্র উদ্বেগ ছিল- ওয়াশিংটন যেন তেহরানের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধবিরতির পথে না হাঁটে।
লেবাননে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান থামাবে না তাঁর দেশ। বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করে, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন তিনি।
তবে প্রশ্ন হলো, এই সংঘাত কি কেবল নেতানিয়াহুর ব্যক্তিজীবন বা তাঁর উগ্র সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ? বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত অভিজাত শ্রেণির কাছে ইরানের পরাজয় কেবল একটি সামরিক বিজয় নয়; বরং এটি তাদের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
গত কয়েক দশকে ইসরায়েল তার পথের অধিকাংশ বাধাই সরাতে পেরেছে, কিন্তু ইরান এখন পর্যন্ত অভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমা মিডিয়ায় গুঞ্জন রয়েছে, ইরানে সরাসরি যুদ্ধে টানতে ইসরায়েল ওয়াশিংটনকে ব্যাপক প্ররোচিত করছে। তবে তারা ইরানের পাল্টা সক্ষমতা ও অটল মনোভাবের কাছে হোঁচট খেয়েছে।
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ নামের জায়নবাদী এই রাজনৈতিক কৌশলের বিস্তার কেবল প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান নয়। কিংবা নীল নদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নেও সীমাবদ্ধ নয়।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর লক্ষ্য হলো নতুন নতুন ভূখণ্ড দখল করে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব আকাশছোঁয়া উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। গত কয়েক দশকে ইরানই ইসরায়েলের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রকল্পের মূলে রয়েছে সীমানা বিস্তার। কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করছে, তা মূলত একপ্রকার দখলদারির সম্প্রসারণ। ১৯৬৭ সালের ফিলিস্তিনের সীমানা এখন অনেকটা ইসরায়েলের অংশ হয়ে পড়েছে।
সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের এলাকাছাড়া করার এক সুদূরপ্রসারী নীলনকশা চলমান। ফিলিস্তিনিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েল এখন উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ- তিন দিকেই চোখ দিয়েছে।
১৯১৯ সালের বিশ্ব জায়নবাদী সংগঠনের মানচিত্র অনুযায়ী, বর্তমান লেবাননের দক্ষিণাংশ, সিরিয়ার গোলান মালভূমি, জর্ডান নদীর পূর্ব তীর এবং মিসরের সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশ তাদের লক্ষ্যবস্তু। গোলান মালভূমিকে ইসরায়েল এরই মধ্যে গ্রাস করে নিয়েছে, যা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ওপর ইসরায়েলি আধিপত্য আরও শক্তিশালী করেছে।
দক্ষিণ লেবানন ও লিটানি নদীর পানিসম্পদ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানের প্রধান কারণ। জর্ডানের উর্বর ভূখণ্ড এবং ইরাক ও ইরানের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় জর্ডান নদীর ওপর নিয়ন্ত্রণকেও ইসরায়েল অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে। ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ মানে কেবল কাঁটাতারের বেড়া বৃদ্ধি নয়, বরং এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যেকোনো প্রতিবেশীর সীমানায় অবাধে অনুপ্রবেশ ও অপারেশন চালাতে পারবে।
১৯৪৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর, ২০২৪-এ লেবাননে এবং সম্প্রতি সিরিয়ার অস্থিরতাকে পুঁজি করে ইসরায়েল যা করছে, তার মূল কথা হলো ‘একতরফা সামরিক ক্ষমতা প্রয়োগের বৈধতা’।
ইসরায়েল এখন তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে লোহিত সাগর হয়ে আফ্রিকার সোমালিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চায়। আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে আসা এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর ‘নরমালাইজেশন’ বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার পেছনেও রয়েছে সেই কৌশল।
তারা চায় এমন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তাবলয়, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোয় তাদের নিজস্ব বা যৌথ ঘাঁটি থাকবে। যার মাধ্যমে তারা প্রয়োজনে যেকোনো দেশে আগাম আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে। ঠিক যেমনটা তারা মিসরের সঙ্গে কাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে করে রেখেছে।
মাসখানেকের সরাসরি যুদ্ধে ইসরায়েলের যে ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে তা হলো, আমেরিকার প্রত্যক্ষ সাহায্য ছাড়া ইরানের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা তাদের নেই। ইরান নিজেকে শুধু রক্ষাই করেনি, বরং হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম তেলের রুট নিয়ন্ত্রণে রেখে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে। এটি ইসরায়েলের ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ তৈরির স্বপ্নকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রশাসনের এই বেপরোয়া পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় উল্টো ফল আসতে শুরু করেছে। ইসরায়েলের তথাকথিত মিত্রদেশগুলোর কৌশলেও বদল আসতে পারে। যে আঞ্চলিক প্রতিরোধের মুখোমুখি ইসরায়েল এখন হচ্ছে, তা কেবল ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিও নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপত্তি আসতে পারে ওয়াশিংটনের তরফ থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের জনমতের পাল্লা দিন দিন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঝুঁকছে। আগামীর নির্বাচনগুলোয় কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলবিরোধীরা জায়গা করে নিলে ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন আর জোরালো না-ও থাকতে পারে। আর তাই সেই দিন ঘনিয়ে আসার আগেই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরান যুদ্ধকে জিইয়ে রেখে নিজের বিপজ্জনক লক্ষ্য হাসিলের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম বলে, আধিপত্যবাদ ও বলপ্রয়োগ দীর্ঘস্থায়ী হয় না; বরং এটি শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের পতনের পথ প্রশস্ত করে।