হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়ালো

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৫ জুন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৬১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯১টি শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫১৯ জনের। ১৫ মার্চ থেকে ৫ জুন পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৭৬ হাজার ৮৭৬ জন। নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৫০৩ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৬২ হাজার ২৩৭ রোগী, যাদের মধ্যে ৫৮ হাজার ১৫৪ জন ছাড়পত্র পেয়ে এরইমধ্যে বাড়ি ফিরেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করে, হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা কার্যত হামেই মৃত্যু। রোগ শনাক্তের সীমাবদ্ধতার কারণে নিশ্চিত হামে মৃত্যু বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর নজির নেই। মারা যাওয়া ৫০১ জনের মধ্যে ৮০ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। এই মৃত্যু শুরু হয়েছে এ বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকেই। এখনো মৃত্যু অব্যাহত আছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি অংশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অভিযোগ করে আসছে যে হাম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে হামে মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে হামে মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, করানো, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সবকিছু মিলে বাংলাদেশের খাদ্যে বিশেষ করে প্রোটিনের অভাবটা আমরা বেশি দেখতে পাচ্ছি। এর ফলে মায়েদের শরীরের পুষ্টি এবং মায়ের শরীর থেকে জন্ম নেওয়া শিশু, তারও পুষ্টি কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে এক সময় আমাদের দেশে মা জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এটি ৫৫ বা ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে অনেক শিশু জন্মের পরে মায়ের দুধ না খাওয়ার কারণে তাদের শরীরেও প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকছে। এসব মিলিয়ে ছয় মাসের কম বয়সের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। এদিকে, মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দায়ী করছেন ডা. মোশতাক হোসেন। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, আমাদের দেশে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এটা মাথাভারি ব্যবস্থা। সবাই শুধু স্পেশালাইজড হাসপাতাল বানাতে চায়। কিন্তু ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকার কথা তার কিছুই নেই। যেগুলো আছে সেগুলোতে কোন ফাংশন নেই। ফলে কিছু হলেই ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীদের লম্বা লাইন দিতে হয়। কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ঢাকা শহরের ওয়ার্ডে কোন চিকিৎসা কেন্দ্র নেই। পাশাপাশি করোনার পর আর্থিকভাবে আমাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। জীবন চালাতে আমাদের খাবারের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে। এতে ভয়াবহ পুষ্টি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে শিশু বা মায়ের ইমিউনিটি কমে যাচ্ছে। আর মৃত্যুহার বাড়ছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেটার কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হতো। এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে। মৃত্যুহার বাড়ার কারণ উদ্ঘাটনে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে (ডিআরইউ) ‘হামে শিশুমৃত্যু : জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ডিপিপিএইচের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কোনো রোগের বিস্তার যখন সময়, স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির বিবেচনায় অস্বাভাবিক হয়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেটাকে সামাল দিতে পারে না, সেটা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি। বর্তমানে হামের বিস্তার এই পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ডিপিপিএইচ মনে করছে। তাই সরকারের কাছে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার আহ্বান জানাচ্ছে সংগঠনটি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..