মহাকাশে চ্যাম্পিয়ন ভয়েজার-১

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এ বি এম সাইফুল ইসলাম গাজী: আজ থেকে ৩৬ বছর আগে ১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করেছিল মহাকাশযান ভয়েজার-১। এ মহাকাশযানটির যাত্রার শুরুর দিকে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন নাসার ৩০০ বিজ্ঞানী। এরপর ২০০৪ সালের আগেই এর গতিবিধির দায়িত্বে রাখা হয়েছে মাত্র ১০ জন বিজ্ঞানীকে। কারণ ভয়েজারের এখন আর কোনো বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি সৌরমণ্ডলের সব কটি গ্রহের তথ্য সংগ্রহের নির্ধারিত মিশনের দায়িত্ব পালন শেষে সৌরজগতের বাইরে চলে গেছে। ভয়েজার এখন মহাজগতের যে এলাকা দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তা সৌর প্রভাবমুক্ত। সেখানে গভীর মহাকাশের নিঃসীম অন্ধকারের শুরু। মূলত আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ ও বহিঃজগতের প্রাণের খোঁজে ভয়েজার-ওয়ানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতার স্বপ্নদ্রষ্টা কার্ল সাগানের পরিকল্পনায়। বিজ্ঞানীদের এক হিসাব মতে মহাকাশের ওই সুদূরের ৫-১০% আলোকিত আর ৯০-৯৫% জায়গা অন্ধকার। তাই বলা হচ্ছে, ভয়েজার-১ এখন চলছে মহাকাশের সেই নিঃসীম অন্ধকারের মধ্যে। ২০০৪ সালের তথ্যানুসারে ভয়েজার-১ ছিল সূর্য থেকে ১৪০০ কোটি কিলোমিটার দূরে। পক্ষান্তরে ভয়েজার-২ ছিল ১ হাজার ১০০ কোটি কিলোমিটার) দূরে, যাকে ভয়েজার-১-এর টুইনও বলা হয়। বিভিন্ন কারণে সূর্যের গায়ে সৃষ্টি হয় প্রতিক্রিয়া, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সৌরবায়ু। সৌরবায়ু প্রবাহিত হয় সূর্যপৃষ্ঠে বিস্ফোরণের ফলে। আর এই সৌর বিস্ফোরণের ফলে মহাকাশে নিঃসৃত হয় বিপুল পরিমাণে গ্যাস। ভয়েজার নভোযান সৌরপৃষ্ঠের বৃহত্তম বিস্ফোরণের তথ্য পাঠিয়েছিল ২০০৪ সালের এপ্রিলে। ওই বিস্ফোরণটি সূর্যে ঘটেছিল ২০০৩ সালের এপ্রিলে। ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়া ভয়েজার পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগেছিল ৩৬৫ দিন বা ১ বছর। বিশ্বের এক নাম্বার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ১৯৭৭ সালে এ মহাকাশযানটি পাঠিয়েছিল মাত্র ৫ বছরের মিশনে। কিন্তু তা ২৮ বছর পরে ২০০৫ সালে সৌরজগতের সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এ ২৮ বছরে ভয়েজার-ওয়ান ৯৩২ কোটি মাইল বা ১ হাজার ৫০০ কোটি কিলোমিটার মহাকাশীয় পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। প্রথমে বিজ্ঞানীরা এ পথে ভয়েজার-১-এর গতিবিধির ব্যাপারে শঙ্কিত ছিলেন। কেননা টারমিনেশন শক এমন একটি এলাকা যেখানে মহাজাগতিক বস্তুগুলো নাক্ষত্রিক গ্যাস এবং অন্যান্য কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে এটার গতি খুবই কমে যায়। এ এলাকায় বাধাবিপত্তি অনেক বেশি। এতে শঙ্কার কারণ সৃষ্টি হয়েছিল। এ টারমিনেশন শক এলাকার পরেই রয়েছে বিজ্ঞানীদের ভাষায় হিলিওসহেলথ অঞ্চল। বিজ্ঞানীদের আগো ধারণা মিথ্যা করে দিয়ে ভয়েজার-১ তার প্রবল বেগে টারমিনেশন এলাকা অতিক্রম করেছে। টারমিনেশন শক হলো আমাদের সৌজগতের বাইরের একটি বিশেষ মহাকাশীয় এলাকা, যেখানে প্রচণ্ড বেগে সূর্য থেকে ছুটে আসা কণিকাগুলোর গতি হঠাৎ করে থেমে যায়। এই ডিপ স্পেস হলো বিভিন্ন নক্ষত্রের মধ্যবর্তী এলাকা, যা গ্যাসে ভর্তি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, টারমিনেশন শক এলাকা পার হওয়ার বড় প্রমাণ হলো সূর্য থেকে আসা কণিকারাজির কারণে মহাকাশযানের চারদিকে চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি অনেক বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্কেত পাওয়া গেছে। আর গতি অনেক কমে গেছে। এ দুটো তথ্য প্রমাণ করে যানটি টারমিনেশন শক এলাকা পার হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর ডুনাল গ্রানেট বলেছেন, এই হোলিওহেলথ এলাকা পার হলেই যানটি সৌরজগৎ থেকে বের হয়ে যাবে। তবে ওই যানটি এখন দুটো নক্ষত্রের মাঝখানে চলমান রয়েছে। আমরা পৃথিবীতে যে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করি ওই এলাকার গ্যাস তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ গ্যাসের কারণে ওই মহাকাশযান থেকে অনেক মহাকাশীয় শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, আমরা ওই যান থেকে সম্ভবত ২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্য পাব। এরপর এর বিদ্যুৎশক্তিতে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে এটা পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে। আর সেখান থেকে পাঠানো সঙ্কেত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত আমরা সেই সিগন্যাল থেকে তথ্য উদ্ধার করতে পারব না। তবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ওই যানটা চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছায়, সেই দূরত্ব আর স্থানটা বলা যাচ্ছে না। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল ভয়েজার সৌর পরিবারের বাইরের দিকের গ্রহগুলোকে পর্যবেক্ষণ করবে। শেষ পর্যন্ত এটা সেখানেই থেমে থাকেনি। চলতেই থেকেছে দূর থেকে আরো মহাদূরে। তার গতিবেগ ক্রমাগত সামনের দিকে। তা এখন পৌঁছেছে এই পৃথিবী থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি মাইল বা প্রায় ২ হাজার কোটি কিলোমিটার দূরে, সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকা ৯টি গ্রহের সব কটিকে ছাড়িয়ে। এ মহাকাশযানটি এখন এতই দূরে চলে গেছে যে সেখান থেকে রেডিও সিগন্যাল পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে ১৭ ঘণ্টা। এই প্রথম মানুষের তৈরি কোনো মহাকাশযান সৌরজগতের বাইরে যেতে সক্ষম হয়েছে। সৌরজগতের বাইরে এই জগৎ হলো একটি তারা থেকে আরেকটি তারার মধ্যবর্তী দূরত্ব, যাকে বিজ্ঞানীদের ভাষায় বলা হয় ইন্টার স্টারস স্পেস। ঠাণ্ডা অন্ধকার মানব অভিজ্ঞতার বাইরের এক মহাকাশীয় জগৎ। ভয়েজার প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এটা প্রথম চাঁদে অবতরণের মতোই এক ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে আমরা এক তারা থেকে আরেক তারার মধ্যে কী আছে তা জানার সুযোগ পেলাম। এক নাম্বার কথা হলো আমরা সেখানে পৌঁছাতে পেরেছি। ৩৬ বছর আগে এটা যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন আমরা আশা করেছিলাম সেখানে একদিন পৌঁছাতে পারব। কিন্তু আমরা কেউ জানতাম না সূর্যের বুদবুদ থেকে সৃষ্ট আমাদের সৌরজগৎ কত বড়। ভয়েজার যানটি তা অতিক্রম করার মতো দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে কি না? এর তথ্যউপাত্ত থেকে এখন নিশ্চিত হওয়া গেছে এটা সৌরজগতের সীমা পার হয়ে গেছে। আসলে ভয়েজার সৌরজগৎ পার হয়ে গেছে ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট। কিছু দিন থেকেই ভয়েজারের সেন্সর থেকে সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছিল যে তার চারপাশের পরিবেশ বদলে গেছে। ২০১২ সালের নভেম্বর নাগাদ পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেছে, ভয়েজারের বাইরে প্রতি কিউবিক মিটারে প্রোটনের সংখ্যা হঠাৎ করেই ১০০ গুণ বেড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা আগেই ভেবেছিলেন এটা সৌরজগতের বাইরে গেলেই এর কম কিছু হতে পারে। এরপর বিজ্ঞানীরা কয়েব দফা হিসাব নিকাশ করে নিশ্চিত হলেন। ২০১২ সালের ২৫ আগস্টের দিকে ভয়েজার সৌরজগতের সীমা পার হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মহাকাশ গবেষণার ৫৫ বছরের মধ্যেই আমরা সৌরজগৎ পার হতে পেরেছি। ভয়েজারের চারদিকে এখন যে বস্তুকণা রয়েছে, তা সূর্য থেকে সৃষ্টি নয়। এগুলো সৃষ্টি হয়েছে আশপাশের তারা থেকে। সুপারনোভা বা বিস্ফোরিত তারার অবশিষ্ট বা অন্যান্য অংশ থেকে। বাস্তবিক অর্থেই ভয়েজার এখন অচেনা অজানা এক নতুন পরিবেশ ও জগতে রয়েছে। এর ছবি ও বার্তা চালু থাকবে যত দিন এর বিদ্যুৎপ্রবাহ চালু থাকবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে ১০ বছরের মধ্যেই তাও শেষ হয়ে যাবে। তখনো এই চ্যাম্পিয়ন মহাকাশযানটি চলতেই থাকবে ক্রমাগত সামনের দিকে। কিন্তু তখন আর পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ থাকেব না। এই চ্যাম্পিয়ন মহাকাশযানটির মধ্যে রাখা হয়েছে একটি গ্রামোফোনের সোনালি রেকর্ড, যার মধ্যে রাখা আছে এই মানবসভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন। প্রাণিজগতের বিভিন্ন রকমের শব্দ। যেমন মানুষের ছবি ও কথাবার্তা, বিভিন্ন দেশের গান, যন্ত্রসঙ্গীত, যানবাহনের শব্দ, বিভিন্ন প্রাণীর ডাক, কিছু সাঙ্কেতিক বার্তা ইত্যাদি। কার্ল সাগান এর গায়ে এঁকেছেন একধরনের সঙ্কেত। বিভিন্ন দেশের ভাষার নমুনা এতে আছে। আছে রক্তের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের মর্যাদা পাওয়া, বাংলা ভাষাও। উদ্দেশ্য হলো সৌরজগতের বাইরে অন্য কোথাও যদি প্রাণের অস্তিত্ব বা বুদ্ধিমান প্রাণীর কোনো সভ্যতা থেকে থাকে তারা যেন এই সোনালি রেকর্ড থেকে পৃথিবীর মানবসভ্যতা ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। আমেরিকান একজন বিজ্ঞান লেখক কার্ল সাগানসহ আরো ১০ জন বিজ্ঞানী এ রেকর্ডটি তৈরি করেছিলেন। এতে বিভিন্ন রকম শব্দ দিয়ে এ পৃথিবীর পরিবেশ ও চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ধরুন আমরা যদি পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো সভ্যতা বা গ্রহ থেকে কোনো রেডিও সঙ্কেত পাই, তাহলে আমরাও তো সেই অজানা গ্রহ ও তার অধিবাসীদের জীবন থেকে বিভিন্ন রকম শব্দ শুনতে চাইব। আমরা ঠিক এটাই করতে চেয়েছি। রেকর্ডটা এমনভাবে ওই যানের একটা বক্সে রাখা আছে, যাতে কোনোরকম কোনো রশ্মিতে এর কোনো ক্ষতি না হতে পারে। ব্রিটিশ বিজ্ঞান লেখক ক্রিস্ট ক্রাইলি বলেছেন, আমরা আমাদের গ্যালাক্সিতে অন্য কোনো প্রাণীর সভ্যতা আছে কি না তা জানার চেষ্টা করছি। এ রেকর্ডটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তা আগামী ১০০ কোটি বছর পর্যন্ত অক্ষয় বা ভালো থাকতে পারে। এমনও তো হতে পারে, কোনো কারণে মানবসভ্যতা বা এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। হতে পারে বিশাল বিস্ফোরণ। এটা তখন পৃথিবীর মানবসভ্যতার একমাত্র প্রমাণ হয়ে থাকবে- এই যে পৃথিবী বা সৌরজগতে একদিন মানুষ ও আদর্শ সভ্যতার বসবাস ছিল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..