আত্মশক্তি বিকাশে উনিশ ও বিশ শতকের নারী লেখক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গোলাম কিবরিয়া পিনু : বিংশ শতাব্দীকে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার যুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এই শতাব্দীতে নারী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। সাম্প্রতিককালে নারীসমাজের সমস্যা, অধিকার ও তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি আরো সূক্ষ্ম ও বিস্তৃতভাবে পর্যালোচনা ও বিবেচনা করার লক্ষ্যে সমাজে প্রণোদনা সৃষ্টি হয়েছে। এরই পরিপূরক হিসেবে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, এম ফাতেমা খানম, নূরুন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদনী, সুফিয়া কামাল, জোবেদা খানম, নীলিমা ইব্রাহিম, দৌলতননেছা খাতুন, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ মুসলিম নারী কথাসাহিত্যিকের সাহিত্য-ভূমিকা, সৃজনশীলতা, জীবনচেতনা, আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও ভূমিকার বিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবরোধ, কুসংস্কার ও শিক্ষার অভাবের কারণে যুগ যুগ ধরে বাঙালি নারীসমাজ সন্তানের জন্ম ও তার লালন-পালন, পতিসেবা ও গৃহকর্মের মধ্যেই বৃত্তাবদ্ধ হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের আইন, সামাজিক বিধিনিষেধ, ধর্মীয় বিবেচনা ও অর্থনৈতিক কারণে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হয় তারা। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, দাসপ্রথা ও সতীত্ব ধারণার কবলে থাকার ফলে নারীর শৃঙ্খল আরো বেশি করে জোরালো থাকে। আঠারো শতক পর্যন্ত এ একরৈখিক ধারা বজায় থাকে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সতীদাহ প্রথা, বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও নারীর অধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে, এর ফলে নারী তার আত্মশক্তি খুঁজে পেতে থাকে। নারীশিক্ষার গুরুত্ব ও বিকাশ উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে দেখা যায়। এই সময় থেকে নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে থাকে। উনিশ শতক বাঙালি নারীজাগরণের যুগ। সামাজিক অত্যাচার, বিধিনিষেধ, প্রথা, পশ্চাৎপদতা যা নারীকে সীমায়িত করে রাখার শৃঙ্খল হিসেবে বিবেচিত হতো, সেসব শৃঙ্খল থেকে নারীকে মুক্ত করার জন্য এই সময়ে সমাজে ব্যাপক আলোচনা, উদ্যোগ ও আন্দোলন শুরু হয়। এর ফলে নারীর সামাজিক মর্যাদা ও জীবনের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়, অন্যদিকে নারী তার নতুন জীবনবোধ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও শক্তি অর্জন করে। আধুনিক চেতনা ও নানা সংস্কার নিয়ে হিন্দুসমাজে মহিলাদের জন্য সচেতন প্রয়াস উনিশ শতকে জোরালো হয়, তাতে হিন্দুসমাজের নারীদের কল্যাণ সাধিত হওয়ার পথ যেভাবে উন্মুক্ত হতে থাকে, সেই একইভাবে মুসলিম নারীদের পথ বিকশিত হতে দেখা যায়নি। এর পেছনে মুসলমানদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য শিক্ষা সম্পর্কে মনোভাব অনেকাংশে দায়ী। দেরি হলেও পরে রোকেয়া সাখাওয়াতের আবির্ভাব ও মুসলিম নারীর শিক্ষার পথ অনেকটা সুগম হওয়ায় মুসলিম নারীর মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি হয়। বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, উনিশ শতকে এসে গীতিকাব্য, মহাকাব্য, উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ইত্যাদি রচনার বিপুল প্রয়াস। এ প্রয়াসে পুরুষ সাহিত্যিকদের পাশাপাশি নারী লেখকদেরও ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। বিশ শতকে নারী নিজেদের সাহিত্য-প্রতিভার পরিচয়কে আরো উৎকর্ষতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে। নারী স্বমহিমায় জীবনীকার, প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক, কবি হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হয়। হিন্দু মহিলা লেখকদের পাশাপাশি মুসলিম মহিলা লেখকরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেননি। উনিশ শতকের গোড়াতেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিতার সূত্রপাত হয়। এই শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলা সাহিত্যের সব শাখায় স্ফূরণ হতে থাকে। কিন্তু মহিলাদের প্রতিভা বিকাশে পরিচর্যার অভাব ও প্রতিকূল পরিবেশ থেকেই যায়। এসব কারণেই আমাদের বাংলা সাহিত্য তো বটেই, ইংরেজি সাহিত্যেও মহিলা লেখকদের আবির্ভাব অনেক পরে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে। উনিশ শতকের আগের বাংলা সাহিত্য ছিল প্রথাগত ও পুরাবৃত্তিপ্রবণ। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণ সাহিত্য ছিল না। উনিশ শতকে এসে বাঙালি নারী কেবল শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারেই এগিয়ে আসেনি, শিক্ষা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে নারী লেখক হয়ে ওঠার শক্তি অর্জন করতে থাকে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নারী নিজেদের নামে লেখা প্রকাশে উদ্যোগী হয়। এর আগে নিজেদের নামে লেখা ছাপানোর বিষয় ছিল সংকোচ-বিহ্বলতায় অনুচ্চকিত। প্রথম বাঙালি নারী কবি কৃষ্ণকামিনী দাসী। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণকামিনীর কথা উল্লেখ করেছেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ। প্রথম মহিলা আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরী দেবীর (১৮০৯-১৯০০) ‘আমার জীবন’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। বাংলা ভাষায় রচিত এ গ্রন্থে মেয়েদের সে সময়কার জীবনধারার একটি দলিল উপস্থাপিত হয়েছে। রাসসুন্দরীর মতো গ্রন্থ প্রকাশ করতে পারেননি সে সময় হয়তো আর কেউ, কিন্তু উনিশ শতকের ষাট-সত্তরের দশকে মেয়েদের গদ্যের বেশ কিছু নমুনা পাওয়া যায় সাময়িকপত্রে, বিশেষত ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকায়। এছাড়া মহিলাদের লেখার সুযোগ করে দেয় ‘অবলাবান্ধব’ (১৮৬৯), ‘বঙ্গমহিলা’ (১৮৭৫), ‘ভারতী’ (১৮৭৭), ‘অন্তপুর’ ইত্যাদি পত্রিকা। প্রথম নারী নাট্যকার কামিনী সুন্দরী দেবী ‘উর্বশী’ নাটক লেখেন ১৮৫৬ সালে (মতান্তরে ১৮৬৬)। অনেকের মতে, প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক শিবসুন্দরী দেবী। তার ‘তারাবতী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৩ সালে (মতান্তরে ১৮৭৩)। এরপর বহু নারী লেখক সৃজনশীলতায় নিজেদের যুক্ত করেছেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দশম সন্তান ও চতুর্থ কন্যা স্বর্ণকুমারীর জন্ম আনুমানিক ১৮৫৫ সালে। তার ৭৭ বছরের জীবনে তিনি লিখেছেন অনেক উপন্যাস, গল্প, গীতিনাট্য, প্রবন্ধ, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ইত্যাদি। বঙ্গদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ সর্বত্র সমান অথবা একই সময়ে হয়নি। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যেই সেটা প্রথম দিকে সীমিত ছিল। মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ছিলেন অনেকটা পিছিয়ে। উনিশ শতকে মুসলিম নারী লেখকদের অস্তিত্বের বিষয়টি জোরালো হয়। ‘রূপজালাল’-এর লেখিকা ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪-১৯০৪) একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তক রচনার কৃতিত্ব দেখান। উনিশ শতকের শেষ পর্বে বেশ কিছু মুসলিম মহিলা কবি ও লেখিকার সন্ধান পাওয়া যায়। রোকেয়ার বেশ কিছু আগে উনিশ শতকের শেষ ভাগে খুলনার আজিজননেসা খাতুন (১৮৬৪-১৯৪০) লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পার্নেল ও গোল্ডস্মিথের হারমিট বাংলা ভাষায় ‘উদাসীন’ নামে অনুবাদ করেন। বিশ শতকে এসে বাঙালি নারীর লেখনী হয়েছে তীক্ষ্ণ ও পরিণত। এই শতকে পুরুষ লেখকদের পাশাপাশি নারী লেখকরা নিজেদের অবদানকে যোগ্যতার সঙ্গে সমুজ্জ্বল রাখতে সচেষ্ট হন। ১৯০২-০৩ সালে ছোটগল্প লেখক ও কবি হিসেবে অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্ত, নির্ঝরিণী ঘোষ, অমোদিনী ঘোষ, নিস্তরিণী দেবী, তরুলতা দত্ত প্রমুখ লিখতে শুরু করেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের আবির্ভাব ঘটে বাঙালি হিন্দু ও ব্রাহ্ম মহিলাদের সাহিত্য ক্ষেত্রে উজ্জ্বল অবস্থানের পটভূমিতে। এরপর অনুরূপা দেবী, অমোদিনী ঘোষ, নিরুপমা দেবী, ইন্দিরা দেবী, শৈলবালা ঘোষ, হেমনলিনী দেবী গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ ইত্যাদির লেখক হিসেবে স্বনামখ্যাত হয়েছেন। এরপর মুসলিম নারী লেখকদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যে নূরন্নেসা খাতুন, এম ফাতেমা খানম, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকী, শামসুন নাহার মাহমুদসহ অনেক মুসলিম নারী লেখকের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সীমারেখায় বহু মুসলিম নারী লেখকের ধারাবাহিক অবদানে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়, যা পরে আরো প্রসারিত হয়েছে। উনিশ ও বিশ শতকে মুসলিম লেখকদের সৃজনশীলতা আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে আরো বৈচিত্র্যময়, আরো সৃষ্টিশীল করে তোলে। বিশ শতকের প্রথম দিক থেকে কজন মুসলিম নারী লেখক তাদের সৃজনশীল সাহিত্যের মাধ্যমে শুধু কথাসাহিত্যের ভিত্তিমূল জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেননি, লেখক হিসেবে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার পথকে যুক্তিযুক্তভাবে তুলে ধরেছেন। এ ধারাবাহিকতায় পরে বহু মুসলিম নারী লেখক কথাসাহিত্য রচনায় এগিয়ে এসেছেন ও তাদের হাতে কথাসাহিত্য বহুমাত্রিকতা নিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। এর ফলে উপন্যাসের বিষয়, শিল্পচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, নারী হিসেবে পরিবার ও সমাজে অবস্থান, সমকালের স্বদেশ-সমাজ এবং ইতিহাসলোক নারী লেখকদের হাতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ১৯০৫ থেকে ’৭১-এর সময়কালে মুসলিম নারী লেখক কর্তৃক রচিত কথাসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম নারী লেখক হিসেবে রোকেয়া সাখাওয়াত, এম ফাতেমা খানম, নূরুন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদনী, সুফিয়া কামাল, জোবেদা খানম, নীলিমা ইব্রাহিম, দৌলতননেছা খাতুন, রাবেয়া খাতুনের কথাসাহিত্য আলাদা আলাদা জীবনবোধ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমুজ্জ্বল। এদের জীবন ও লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা গেছে। এরা একেকজন একেক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন কিন্তু নারী হিসেবে সামাজিক বাধা-বিপত্তি অতিক্রমের ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ে তারা একই ধরনের সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছেন। নারী লেখকদের মধ্যে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনের সঙ্গে এম ফাতেমা খানমের জীবনের ব্যবধান ও পটভূমি আলাদা, তেমনি নূরুন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনীর সঙ্গে বেগম সুফিয়া কামালের জীবন ও বেড়ে ওঠার পার্থক্য রয়েছে। জোবেদা খানম, নীলিমা ইব্রাহিম, দৌলতননেছা খাতুন ও রাবেয়া খাতুনের জীবন বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। বেগম রোকেয়া শিক্ষা বিস্তারের জন্য ভূমিকা রেখেছেন, সুফিয়া কামাল বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। দৌলতননেছা খাতুন প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। জোবেদা খানম ও দৌলতননেছা খাতুন স্ব-উদ্যোগে ও আপন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। নীলিমা ইব্রাহিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে নিজের আত্মবিকাশের পথ আরো সুগম করেছেন। কী শিক্ষায়, কী সামাজিক তৎপরতায়, কী ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রামে, কী সাহিত্য ভূমিকায় তারা সবাই অগ্রসর মুসলিম নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকা নিয়ে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর উজ্জ্বল প্রতিকৃতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। রোকেয়া সাখাওয়াত থেকে শুরু করে রাবেয়া খাতুন পর্যন্ত উল্লিখিত মুসলিম নারী লেখকের ধারাবাহিকতায় তাদের কথাসাহিত্যের বিষয়বস্তু, শিল্পরীতি ও জীবনবোধ বিভিন্ন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত। রোকেয়া সাখাওয়াতের ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাস যে সময় লেখা হয়, তাতে যে আঙ্গিক ব্যবহৃত হয়েছে, তা থেকে বহু বছর পরের লেখক রাবেয়া খাতুনের উপন্যাসের আঙ্গিক সম্পূর্ণ ভিন্ন শুধু নয়, বিষয়বস্তু ও জীবনবোধ আলাদা হয়েছে সময়কালের ব্যবধানের জন্য। এর ফলে মুসলিম নারী লেখকদের উপন্যাসের বিবর্তন, বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা গেছে। নূরুন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদনী ‘জানকী বাঈ’ নামক উপন্যাস লিখেছেন ঐতিহাসিক পটভূমিতে। বেগম সুফিয়া কামাল ‘কেয়ার কাঁটা’ গল্পগ্রন্থের গল্প লিখেছেন ব্যক্তিগত প্রেম, নর-নারীর ভালোবাসা নিয়ে গ্রাম-শহরের পটভূমিকায়। এম ফাতেমা খানমের ছোটগল্প রচিত হয়েছে পারিবারিক ও গার্হস্থ্য জীবনকে ঘিরে। জোবেদা খানমের আকাশের রং, বনমর্মর ও অনন্ত পিপাসা উপন্যাসে নর-নারীর সম্পর্ক, সংগ্রাম ও নীতিনিষ্ঠ ভূমিকার প্রেক্ষাপট রচনা হয়েছে। কখনো কখনো দার্শনিক জিজ্ঞাসাও উপন্যাসে উঁকি দিয়েছে। নীলিমা ইব্রাহিমের উপন্যাসে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের ঢাকা নগরীর পটভূমিতে শিক্ষিত উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও শিক্ষিত চাকরিজীবী পরিবারের দ্বন্দ্ব, সংকট ও মানবিকতা প্রকাশিত হয়েছে; বিশেষ করে শিক্ষিত ও শহরের নব্য চাকরিজীবী মহিলাদের জীবন-সংকট ও জীবনবোধ বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। দৌলতননেছা খাতুন তার ‘পথের পরশ’ উপন্যাসে রাজনৈতিক কর্মী, তাদের কর্মকাণ্ড ও বিশেষ ভূমিকাকে বিষয়বস্তু হিসেবে টেনে এনেছেন। রাবেয়া খাতুন গ্রামীণ জীবনের কথা যেমন উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন, তেমন ঢাকা নগরীর বিকাশের পটভূমিতে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের চালচিত্র তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে দেশভাগ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাও এসেছে। তাদের উপন্যাসে বিষয়বস্তু, চরিত্রচিত্রণ, নির্মাণশৈলী, ব্যক্তি ও সমাজের জীবনবোধ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সংযোজিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দী নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার যুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এই শতাব্দীতে নারী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। তারা লেখক হিসেবে সমাজে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এরই প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত মুসলিম মহিলা লেখকদের সৃজনশীলতায় তাদের কথাসাহিত্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সাম্প্রতিককালে নারীসমাজের সমস্যা, অধিকার ও তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি আরো সূক্ষè ও বিস্তৃতভাবে পর্যালোচনা ও বিবেচনা করার লক্ষ্যে সমাজে প্রণোদনা সৃষ্টি হয়েছে। এরই পরিপূরক হিসেবে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, এম ফাতেমা খানম, নূরুন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদনী, সুফিয়া কামাল, জোবেদা খানম, নীলিমা ইব্রাহিম, দৌলতননেছা খাতুন, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ মুসলিম নারী কথাসাহিত্যিকের সাহিত্য-ভূমিকা, সৃজনশীলতা, জীবনচেতনা, আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও ভূমিকার বিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। এ ছাড়া তাদের ব্যক্তিগত-সামাজিক জীবন ও কর্মের মধ্যে থেকে উত্তর প্রজন্মের নারীর আরো বিকশিত হওয়ার প্রেরণাসঞ্চারী উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..