রুশ বিপ্লব : শ্রেণি সংগ্রামের অনিবার্য আখ্যান
জাহানার আক্তারী :
ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন-ই পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার রূপকার। রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাস নতুনভাবে রচিত হয়েছে তাঁরই নেতৃত্বে। রাশিয়ায় জার রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব সমগ্র বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। আর এই রুশ বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে কয়েকটি ধাপে ধাপে।
ব্লাডি সানডে : ২২ জানুয়ারি ১৯০৫
২২ জানুয়ারি ১৯০৫ রুশ বিপ্লবের সূচনালগ্ন। মূলত এই দিনটিকে ইতিহাসে ‘ব্লাডি সানডে’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তখনকার শাসক জার নিকোলাসের বিরুদ্ধে সেদিন তরুণ ফাদার গাপনের নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জার সরকারের পেটোয়া বাহিনী। প্রকাশ্যে বিনা বিচারে গুলি চালায়। শত শত মানুষ গুলিতে নিহত হন। আতঙ্কে প্রাণ হারান আরও কয়েশ মানুষ। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভে হরতাল-অবরোধে স্থবির হয়ে যায় পুরো রাশিয়া।
এসময় রাজনীতিবিদ ও শ্রমিকেরা পার্লামেন্ট শাসনের দাবি জানায়, কৃষক শ্রেণির লোকেরা জমিদার থেকে জমি তাদের দখলে নিয়ে নেয়। সৈনিকেরা জনগণের সঙ্গে মিলে ঘোষণা দেয় বিদ্রোহের। নৌ-বাহিনীর একটি যুদ্ধ জাহাজের সৈনিকেরা জার শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইজেনস্টাইন ‘ব্যাটেলশপি পোটেমকিন’ নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। রাশিয়ার বিখ্যাত শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে শ্রমিকরা তাদের সংগঠন ‘সোভিয়েত’ গঠন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি, ন্যায্য মজুরি এবং অধিকার আদায়।
লেনিন-ই রুশ বিপ্লবের কর্ণধার
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন লেনিন। ১৮৮৭ সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সময় ছাত্রদের বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে। এসময় পুঁজিবাদ দ্রুত বিকাশ পাচ্ছিল। যান্ত্রিক প্রযুক্তি আর হাজার হাজার মজুর নিয়ে চালু হচ্ছিল কল-কারখানা। সে সময় জারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নারোদবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। নারোদবাদ হচ্ছে মেহনতিদের শ্রমমূল্য প্রতিষ্ঠার জন্য জার পুঁজিপতিদের হত্যা করা। জারের বিরুদ্ধে হলেও লেনিন নারোদবাদীদের বিরুদ্ধে ছিলেন সবসময়। তিনি হত্যাযজ্ঞ ও সন্ত্রাসকে কিছুতেই মানতে পারেননি। লেনিন সর্বদাই মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর ধারণা এবং তত্ত্বকে গুরুত্ব দিতেন। ১৮৮৯ সালে তিনি সামারায় যান এবং স্থানীয় মার্কসবাদীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।
১৮৮৯ সালে লেনিন সামারায় গিয়ে মার্কসবাদীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৮৯১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করে সামারাতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এরপর সেন্ট পিটার্সবার্গে এসে তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মার্কসবাদীদের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। এখানে স্ক্রুপস্কায়ার শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে সাম্যবাদ ও বিপ্লবী আদর্শ প্রচারে ব্রতী ছিলেন। এ সময় নারোদবাদীরা লেনিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাঠে নামে এবং তার নীতিকে ভিত্তিহীন বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রচারণা ও ব্যাখ্যা চালাতে শুরু করে। শুধু নারোদবাদীরাই নয়, তথাকথিত বৈধ মার্কসবাদীরাও তার বিপক্ষে মাঠে নামে। এই বৈধ মার্কসবাদীরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী। তারা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পত্রপত্রিকায় লিখত এবং মার্কসবাদকে বুর্জোয়াদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করত। লেনিন এই নারোদবাদী ও বৈধ মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষকে বোঝাতে থাকেন এবং বড় বড় কলকারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ‘বিপ্লবী মার্কসবাদী পার্টি’ গড়ে তোলার জন্য।
জার সরকার ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লেনিনকে তিন বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে। সেখানে থাকা লেনিনের পক্ষে সহজ ছিল না। বিশ্বযুদ্ধের সময় অষ্ট্রিয়া সরকার জার সরকারের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে লেনিনকে গ্রেফতার করে। তবে লেনিনের সমর্থকদের বিক্ষোভের কারণে দুই সপ্তাহ পর তিনি ছাড়া পেয়ে সুইজারল্যান্ড চলে যান। বিভিন্ন স্থানে গোপনে রাজনৈতিক কাজ করে প্রায় দশ বছর পর ১৯১৭ সালের ৩ এপ্রিল রাতে লেনিন রাশিয়ায় পৌঁছুতে সক্ষম হন। এর পর শুরু হয় বলশেভিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দান। এভাবেই লেনিনের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সোভিয়েত জনগণ যে বিরাট রূপান্তর সাধন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে মার্ক-লেনিনবাদের বিজয়। লেনিন ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বলশেভিক বিপ্লব
মার্কসবাদী রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে দুই ভাগে ভাগ হয়ে দুই উপদলে গঠিত হয়। একটি হলো বলশেভিক আর দ্বিতীয়টি মেনশেভিক। বলশেভিক পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিনিধিত্ব করে, মেনশেভিক সংখ্যালঘুতা। বলশেভিকদের নেতা হন ভ্লাদিমির লেনিন। বলশেভিক ১৯০৫ সাল নাগাদ একটি গণসংগঠনে পরিণত হয়। ৭ নভেম্বর ১৯১৭ সেন্ট পিটার্সবার্গে বলশেভিকদের নেতৃত্বে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় রাশিয়ায়। এই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানকে ‘বলশেভিক বিপ্লব’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। বলশেভিকদের হাত ধরেই পৃথিবীতে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া যুক্ত হয়। রাশিয়া যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়। তখন ওই যুদ্ধে সৈন্যদের পাশাপাশি জোরপূর্বক সাধারণ কৃষকদের সম্পৃক্ত করা হয়। যাদের ছিল না কোনো যুদ্ধ প্রশিক্ষণ। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে তখন জুতা, প্রয়োজনীয় খাবার ও অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে পাঠানো হয়। এর ফলে প্রচুর মানুষ নিহত হয়। তিন বছরে প্রায় ২০ লাখ রাশিয়ান সৈন্য নিহত এবং ৫০ লাখেরও বেশি আহত হয়। রাশিয়ার জনগণ এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির জন্য জারকে অভিযুক্ত করে। এর আগে রুশ-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ান বাহিনীর পরাজয়- দেশটির জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। সেই যুদ্ধে রাশিয়ার ৭০ হাজার সৈন্য নিহত হয়। যুদ্ধে পরাজয় রাশিয়ান শাসক শ্রেণিকে কিছুটা বিচলিত করেছিল। জার দ্বিতীয় নিকোলাস তাই যুদ্ধ পরবর্তী ১৯০৬ সালে সীমিত আকারে পার্লামেন্ট শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছিল। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিতে রাশিয়ার জনগণ আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল।
সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সূচনা
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের পৃথিবী-এক শতাব্দী পর এখন ২০১৭ এর পৃথিবী সম্পূর্ণ আলাদা। সাম্রাজ্যবাদের যুগ ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুটা। তখন পৃথিবীর কর্তৃত ছিল ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান, জাপান ও রুশ হাতে। বিশ্বের এক বিরাট অংশ এসব সাম্রাজ্যের অধীনে।
রুশ বিপ্লবের সূচনায় উপনিবেশবাদের অবসানের শুরু হয়। জার সাম্রাজ্যের পতনের পর। অর্ধশত বছরে পৃথিবীতে আর কোনো সাম্রাজ্য ছিল না বললেই চলে। রুশ বিপ্লবের ভিত্তি ছিল শ্রমিক কৃষক মৈত্রী। এই রণনীতিই পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক ও আধা-ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ব্যাপক কৃষক সমাজকে সমবেত করতে উদ্বুদ্ধ করে।
রুশ বিপ্লব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গণ অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। বিপ্লবী শক্তিগুলো বিশেষত বলশেভিক পার্টি জার রাজত্বের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। এ গণঅভ্যুত্থানই বিপ্লবে রূপ নেয়। যা ঘটে ১৯১৭ সালের শুরুতে। শুরুতে শ্রমিকদের হাত দিয়ে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বসাধারণ এই বিদ্রোহে অংশ নেয়। সবার সাথে একাত্মতা ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনীও জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। জার দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনায় রাশিয়া প্রথমবারের মত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়। অস্থায়ী সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়। এই সরকারের প্রধান হন প্রিন্স লভোব। পরবর্তী অস্থায়ী সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সমাজতন্ত্রী আইনজীবী আলেকজান্ডার কেরেনস্কি। লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টি পরবর্তীতে এই অস্থায়ী সরকারের বিপক্ষে আন্দোলনে নামে। জার্মানিতে আত্মগোপনে থাকা লেনিন এপ্রিলে রাশিয়ায় প্রবেশ করেন। তার আগমন উপলক্ষে রাশিয়ায় লেনিনের বিপক্ষ দলগুলো বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। লেনিন পুনরায় আত্মগোপন করেন ফিনল্যান্ডে। এর ভেতরেই জেনারেল কর্নিলভেল এর নেতৃত্বে ক্যু সংঘটিত হয়। এই ঘটনার পর যুদ্ধরত অনেক সৈনিক বলশেভিকদের পক্ষে অবস্থান নেয়। বিপ্লবী বলশেভিকরা ১৯১৭ এর ৭ নভেম্বর পেত্রোগাদ দখল করে নেয়। এটিই পরিচিতি পায় বলশেভিক বিপ্লব রুপে। বিপ্লবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভবনের দখল নেয়। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত রাশিয়ায় নব যুগের সূচনা করে এই বিপ্লব। এভাবেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসে ১৯২২ সালে গঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। পৃথিবীর সমস্ত বিপ্লবী স্বাধীনতাকামীরা এই বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে।
বলশেভিক বিপ্লবকে বলা হয়ে থাকে অক্টোবর বিপ্লব বা নভেম্বর, অথবা মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নামে। এই বিপ্লব রুশ বিপ্লবের একটি অংশ বিশেষ। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর এবং গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৭ নভেম্বর ১৯১৭ তারিখে এই বলশেভিক বিপ্লবের শুরু হয়েছিল। সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল এই বিপ্লব। বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল শ্রমিকশ্রেণি, যারা গরিব কৃষকদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। এই বিপ্লব রাশিয়াকে রাজনৈতিক অর্থে স্বাবলম্বী করে তুলেছিল। এ অঞ্চলের মেহনতি কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষ, যারা কিনা পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে, তারাই পুঁজিবাদী দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়েছিল এ সংগ্রামের ফলে। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় রুশ বুর্জোয়া শাসকদের শেষ ঘাঁটি উইন্টার প্যালেস কেঁপে ওঠে। অরোরা যুদ্ধজাহাজের গর্জনে শুরু হয় বিজয়ী আক্রমণ। পেত্রোগাদ সোভিয়েতের জরুরি অধিবেশনে লেনিন ঘটনার সারসংক্ষেপ জানান। এই বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক মহাবিপ্লব, একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রেণি সংগ্রামের নিয়মসিদ্ধ উপায়। ৮০০ বছরের জার সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে পত্তন ঘটে প্রথম সমাজতন্ত্র অভিমুখী রাষ্ট্রের।
সোভিয়েত ইউনিয়ন
সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয় রুশ বিপ্লবের পর ১৯২২ সালে। এটি একটি একদলীয় সাম্যবাদী রাষ্ট্র ছিল। ১৯৪৫ সালে ভেঙে যাবার আগ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি ছিল। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে রুশ সাম্রাজ্যের উত্থানের বিপ্লব কমিউনিস্ট বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। যার ফলস্বরূপ গঠন হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মডেল হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব
পূর্বেকার সব বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লবের তাৎপর্য একেবারেই ভিন্ন। ১৮৮৯ এর ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে সব বিপ্লবেই নতুন শোষক শ্রেণি পুরোনো শোষক শ্রেণির শাসনকে উৎখাত করেছে। রুশ বিপ্লবের ফলে যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়, তারই প্রভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী সরকারগুলো জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মডেল চালু করতে বাধ্য হয়।
রুশ বিপ্লবের ভিত্তি ‘মার্কসবাদ’
কার্ল মার্কসের উদ্ভাবিত জীবনব্যবস্থা, পথ ও পন্থার নির্দেশনাই হল মার্কসবাদ। তিনি ১৯ শতক এর তিনটি উন্নত দেশের মানবাদর্শের ব্যাপক বিশ্লেষণ করেছিলেন। শাস্ত্রীয় জার্মান দর্শন, শাস্ত্রীয় ইংরেজ রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ফরাসি সমাজতন্ত্রের ও ফরাসি বিপ্লবের মৌলনীতির সমন্বয় সাধন করেছেন।
মার্কস আধুনিক বস্তুবাদ এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিকাশ, শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন সংগ্রাম এবং দাবি আদায়ের লড়াই পৃথিবীর সব দেশে স্থাপন করে গেছেন। যারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে।
রুশ বিপ্লবের সাফল্য
এই বিপ্লবের ফলে গৃহযুদ্ধের অবসানের পর এক দশকের ভেতর সোভিয়েত ইউনিয়নে নিরক্ষরতা দূর হয়েছিল। রাষ্ট্র্রীয় খরচে বিভিন্ন বইপত্র, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও শিল্পকলা নিয়ে প্রকাশনা ও পরিবেশনা উন্মুক্ত করা হয়েছিল। সর্বজনীনন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছিল। সেই সঙ্গে সাত বছরের সর্বজনীন শিক্ষা এবং ১০ বছরের সর্বজনীন মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছিল। ইউরোপের দেশগুলোতে যা প্রথম। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে কৃষকদের যৌথ খামার ও সমবায়ে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। নাগরিকদের বিনা খরচে চিকিৎসা এবং বেকারত্ব দূর করার জন্য কাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। ১৯৩৬ সালের মধ্যে সব এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। নতুন সরকারের অন্যতম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল মহিলাদের সমানাধিকার, ভোটের অধিকার, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন অধিকার এবং বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করা।
সমগ্র মানবজাতি শত শত বছর ধরে যে স্বপ্ন লালন করেছে, তা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শোষিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার স্বপ্ন। রুশ বিপ্লব সেই স্বপ্নপূরণের দিকে প্রথম পদচিহ্ন অঙ্কন করে এবং গোটা দুনিয়ায় গণতেন্ত্রর এক নব অধ্যায় সূচিত হয়।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন