বিকল্প জ্বালানি ইথানল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মনির তালুকদার : জ্বালানি খাতে আমদানি ব্যয় হ্রাস এবং এ খাতে সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে আনতে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন বিকল্প জ্বালানি অনুসন্ধান ও ব্যবহারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে। ইতোপূর্বে জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসেবে যানবাহনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার চালু করা হলেও প্রতিবছর অপরিকল্পিতভাবে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহে স্বল্পতা, যথেষ্ট সংখ্যক সিএনজি ওয়ার্কশপ ও ফিলিং স্টেশন না থাকা এবং এখনো সিংহভাগ যানবাহন জ্বালানি তেলনির্ভর হওয়ায় দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা তেমন কমছে না। সে ক্ষেত্রে নতুন আরেকটি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে ইথানল ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প কর্পোরেশনের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃক চিটাগুড় থেকে তৈরিকৃত ওই ইথানাল বাজারজাত করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির তৈরি মদের উপজাত হিসেবে পাওয়া যায় চিটাগুড়। প্রতি বছর ৭৫ লাখ টন চিটাগুড় উৎপাদিত হয়। আর এই চিটাগুড় থেকে সরকার বছরে ৬০ লাখ লিটার ইথানল উৎপাদনের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ওই লক্ষ্যে কেরু এন্ড কোম্পানি ইতোমধ্যেই একটি ডিস্টিলেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে জ্বালানিখাতে প্রতিবছর প্রায় ১৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে সরকার আশা করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। ১৯৯৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের যানবাহনে গ্যাসোলিনের সঙ্গে ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবহনখাতে ব্রাজিল বিপুল ইথানল ব্যবহার করে। দেশটির অসংখ্য গাড়ির অন্তত ৩০ শতাংশ ইথানলের ওপর নির্ভরশীল। ইথানল ব্যবহারের ফলে দূষণের মাত্রা কমেছে এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাও হ্রাস পেয়েছে। গ্যাসোলিন জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতি যতটা অস্থিতিশীল ইথানলনির্ভর অর্থনীতি ততটা অস্থিতিশীল নয়। ব্রাজিলের অনেক গাড়ি দুই ধরনের জ্বালানি ব্যবহার উপযোগী করে নির্মিত। ব্রাজিলের ২৯ হাজার জ্বালানি স্টেশনের যে কোনটিতে মোটর গাড়ি বা গ্যাসোলিন বা ইথানল দিয়ে ট্যাংক ভরিয়ে নিতে পারে। দৃশ্যত চীন এখন ব্রাজিলের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে চায়। ইথানল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্রাজিল যে সফলতা অর্জন করেছে সেই সফলতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চায় চীন। পর্তুগিজ ভাষায় ইথানলকে বলা হয় আলকোল। ওই আলকোলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারে ব্রাজিল যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে; বেইজিং চাচ্ছে সে অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে। ইথানল নিয়ে ব্রাজিলের সাথে চীনের ব্যাপক আলোচনা হলেও বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ইথানলের বিপুল সম্ভাবনার ব্যাপারে চীন সচেতন থাকলেও বাস্তব কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০০৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। তবে বর্তমানে চীনের ৩০টি প্রদেশে ইথানল নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বেইজিংয়ের সিনঘুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক দেহুয়া লিও বলেন, ইথানল ব্যবহার ও উৎপাদনে চীনের অনেক কোম্পানি, কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় সরকার ব্যাপকভাবে আগ্রহী। তিনি আরও বলেন, ২০০ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে চীন প্রতি বছর ১.২ মিলিয়ন টন ইথানল উৎপাদন করেছে। তবে ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চীন প্রতিবছর ৪.৩ মিলিয়ন টন ইথানল উৎপডাদন করেছে। তবে ২০১৭ সাল থেকে উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করেছে চীন সরকার। কিন্তু এখনই চীনের প্রতিবছর প্রয়োজন কোটি কোটি টন জ্বালানি। ২০২০ সাল নগাদ নবায়গনযোগ্য জ্বালানি মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ পূরণ করবে। সে ক্ষেত্রে ইথানলের ভূমিকা থাকবে ক্ষুদ্র একটি অংশের। তা সত্ত্বেও চীনা সরকার এবং অন্যান্য ইথানল উৎপাদনকারীরা ব্রাজিলের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে উৎসাহী। অপর দিকে লাওসের অভিজ্ঞতার ব্যাপারেও চীন উৎসাহী। ইতোমধ্যে জৈব জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বৃহত্ত হেনান তিয়ানগুয়ান গ্রুপ লাওস সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছে ইথানল উৎপাদনের জন্যে। চুক্তির অধীনে লাওসের ২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা কাসাভা বৃক্ষভিত্তিক ইথানল উৎপাদনে হেনান তিয়ানগুয়ান গ্রুপ লিজ নিয়েছে। তবে চীন যদি ব্রাজিলের সফলতার পুরোপুরি পুনরাবৃত্তি করে, তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটার উপযোগী উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন হবে বিশাল আয়তনের ভূমি। ব্রাজিল আখ ছাড়াও অন্যান্য কিছু ফসল যেমন কর্ণ, কাসাভা এবং ধান ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করে। তেমনি চীনে বর্তমানে যে পরিমাণ ইথানল উৎপাদিত হচ্ছে তার ৮০ শতাংশই আসছে ওই তিন শস্য থেকে। বর্তমানে চীন ইথানল কর্মসূচিতে অনেক এগিয়ে গেছে। ইথানল ব্যবহারে গাড়ির ইঞ্জিনের কোনো ক্ষতি হয় না। ডিজেল, পেট্রোল বা অকটেনের সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পরিমাণ ইথানল মিশিয়ে স্বল্প খরচে যে কোনো গাড়ি চালানো সম্ভব। বাংলাদেশে ইথানল উৎপাদনে লিটার প্রতি খরচ পড়বে ৩০ টাকা আর তা বাজারে বিক্রি করা যাবে ৩৫ টাকা দরে। ইথানল ব্যবহারে সার্বিকভাবে জ্বালানি ব্যয় অনেকটা সাশ্রয় হলেও দেশে খুব বেশি পরিমাণ ইথানল উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। কারণ ইথানল তৈরির প্রধান কাঁচামাল আখ উৎপাদনে প্রচুর জমির প্রয়োজন। সেটা বাংলাদেশে নেই। তবে আশার কথা হচ্ছে ধান দিয়ে ইথানল তৈরি করা যায়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্রাজিলের ইউনিকার পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা নিতে পারে। ভেরেন্ডার তেল থেকে তৈরি বায়োডিজেল দিয়ে গাড়ি চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষকেরা। বিভাগীয় প্রধান ড. প্রবীর কুমার বসু জানান, ডেরেন্ডার বীজ থেকে তেল বের করে তা দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বায়োডিজেল। আর ১ লিটপার বায়োডিজেল তৈরিতে খরচ পড়বে ২২ রুপি। ইতোমধ্যে তারা বায়োডিজের দিয়ে চার সিলিন্ডারের গাড়ি চালিয়ে সফলতা পেয়েছেন। ইথানল শুধু বিপুল জ্বালানিই সাশ্রয় করে না, ইথানল একটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানিও বটে। অবশ্য ইথানলের মূল্য গ্যাসের চেয়ে একটু বেশি এবং লিটার প্রতি দূরতও অতিক্রম করা যায় কম। গ্যাসে লিটার প্রতি ১০ কিলোমিটার এবং ইথানল লিটার প্রতি ৭ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। তবে ওই সমস্যাগুলো দূর করা গেলে তেল ও গ্যাসের বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে ইথানল হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অন্যতম জ্বালানি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..