চির প্রেম চির নির্বাসিত কবি মাহমুদ দারবিশ
মনির তালুকদার :
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী কলম মুক্তিকামী মানুষের কাছে চিরদিনের প্রেরণা। সারা পৃথিবীর নির্যাতিত ও মুক্তিকামী মানুষের বিবেক। সমসাময়িক বিশ্ব কাব্যসাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ।
স্কুল জীবন থেকেই তার সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যায়। কবিতার প্রতি তার ঝোঁক অল্প বয়স থেকেই। ১৯৫৩ সালের একটি ঘটনা। ১২ বছর বয়সী দারবিশ ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল এক ইহুদি বালকের প্রতি এক আরব বালকের করুন আবেদন। “ওয়া ইয়া লিমুরারাতিল মুফারিকা” নামক সেই কবিতায় দারবিশ বলেন:-
“হে বন্ধু !
তুমি তোমার খেয়াল খুশিমতো দিনের বেলায়
খেলতে পার
তুমি তোমার খেলনা বানাতে পার।
কিন্তু আমি পারি না,
তোমার যা কিছু আছে, আমার তার কিছুই নেই
তোমার বাড়ি আছে, আমার নেই।
আমি উদ্বাস্তু....।
আমরা কেন একসাথে খেলতেও পারব না?”
দারবিশ সেই কিশোর বয়স থেকেই একের পর এক রচনা করে গেছেন অসাধারণ সব সাহিত্য, দ্রোহাত্মক-প্রতিবাদী কবিতা। বেশিরভাগ আরব কবির বেলায় যেটা দেখা যায় ষাট বছর বয়সের মধ্যেই তাদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর রচনা শেষ হয়ে যায়। এরপর বলতে গেলে নতুনত্ব আর তেমন থাকে না। দারবিশ ছিলেন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তার আগের চেয়ে পরের রচনায় আছে আরো চমৎকারিত্ব। প্রতিটিতেই ছিলো নতুনত্ব। মূলত কবিতা লিখলেও সাধারণ সুন্দর গদ্যও রচনা করেছেন। আরবিতেই লিখতেন তিনি।
তবে ইংরেজি, ফরাসি এবং হিব্রু ভাষাতেও ভালো দখল ছিল তাঁর। ২৫টি ভাষায় তার রচনা অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে প্রায় ২০টির মতো গ্রন্থ। ফ্রান্সে বরাবরই বেস্ট সেলারের তালিকায় থাকত তার গ্রন্থ। এ পর্যন্ত তার ৩০টি কাব্য এবং আটটি গদ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ষাটের দশক থেকে কাব্যচর্চায় নিয়মিত এই কবি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন ফিলিস্তিনি জনগণের কণ্ঠস্বর। তার কবিতা ধারণ করেছে রাষ্ট্রবিহীন ভূখণ্ডের অজস্র মানুষের আশা আকাক্সক্ষা আর বেদনাকে। তাদের জাতীয় কবি’র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। কবিতার মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিন জাতীয়তাবাদের চেতনা বপন করে গেছেন। আধুনিক আরবি কবিতায় প্রতিরোধ প্রতিবাদের একন নতুন কাবধারা ও শৈলীর জন্মদাতা তিনি।
রাজনৈতিক চেতনার কবিতার পাশাপাশি দারবিশ বার বার বলতেন শুদ্ধ কবিতার (Pure Poetry) কথা। কেননা তার কবিতা হলো বহুমুখী সংস্কৃতির সঙ্গে কথোপকথন। নির্দ্ধিধায় তিনি কবিতায় ব্যবহার করেন ইসলামিক, খ্রিষ্টিয় ও ইহুদি মিথ। মোহময় সংগীতময়তায় আচ্ছন্ন তাঁর কবিতা। যেখানে রয়েছে জীবনের আশ্চর্যময়তা Mistry of Life এবং মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যু তাঁর কাছে এক অন্য রূপান্তর। জন্ম এবং মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনিই তো বলতে পারেন:-
“যখনই আমি নিজেকে খুঁজি
অসংখ্য মানুষের দেখা পাই
যখনই তাঁদের খুঁজতে যাই
তখন আমি একা নিঃসঙ্গ।
তখন আমি লাখো জনতা।” (ম্যুরাল)
এভাবেই তিনি আত্মপরিচয়ের অযুথ বাণী তুলে ধরেন কবিতায়। জীবনের যুযুধান সময়কে সামনে রেখে হাঁটতে থাকেন। কেননা একই সঙ্গে তিনি একা এবং অসংখ্য। (Individul Crowed)
জাতিগত বিভেদের সমথনে যখন রাষ্ট্রীয় শক্তি দম্ভ প্রকাশ করে, দুই মানুষের মাঝখানে দেয়াল তুলে দেয়, তখন একজন কবিকে তা সবচেয়ে বেশি আহত করে। ইহুদি প্রেমিকার প্রণয়ের স্বীকৃতি যখন রাষ্ট্র দেয় না বরং রাইফেল উচিয়ে ধরে তখনই দারবিশের আর্তনাদ–
“রিতা এবং আমার দৃষ্টির মাঝখানে একটি রাইফেল,
ঐ মধুময় রঙিন চোখের দোবোপম দৃষ্টির দিকে
উবু হয়ে বসে খেলতে থাকে তার যৌবন....”
বিদ্রোহী আমি এক”
১৯৬৪ সালে লেখা মাহমুদ দারবিশের একটি বিখ্যাত কবিতা “দ্য প্রিজন সেল” যেখানে মাহমুদ দারবিশ লিখেন–
“ দেয়ালগুলোকে তুমি কি করলে?
আমি তা পাহাড়ে ছুড়ে ফেলেছি।
মাথার ওপরের অবরুদ্ধ চাঁদ?
আমি তা পায়ের তলায় পিষে এসেছি।
তোমার হাতের শেকলগুলো?
ও দিয়ে আমি কবিতা লেখার পেন্সিল বানিয়েছিলাম
চাঁদ এলো কোত্থেকে?
রাতের বাগদাদ থেকে
আর তরল পানীয়?
আলজিয়ার্সের দ্রাক্ষাক্ষেত্র চিরে।
স্বাধীনতা?
গত রাতে যে শেকলে তুমি আমায় বেঁধেছিলে-
স্বাধীনতার উৎসভূমি সেই শৃঙ্খল দেশ।”
তার কবিতায় বিদ্রোহী সুরের সঙ্গে আশাবাদ একই লয়ে বাঁধা। এ বিদ্রোহ চেতনা আসলে আশাবাদের যৌক্তিক বিস্তার। কবিখ্যাতি ছিল তাঁর কিংবদন্তির মতো। দারবিশ বলেছেন:-
“মানুষকে আমি ঘৃণা করি না
কিন্তু ক্ষুধার্ত হলে
জবর দখলকারীর মাংসই হবে আমার খাবার
সাবধান!
সাবধান!
আমার ক্ষুধা থেকে আমার রাগ থেকে...!”
কবিতা ও গান যেহেতু গণজাগরণের একটি বড় মাধ্যম, ফলত কবি আজীবন নিপীড়ত জনতার পক্ষে দাঁড়ান। এ জন্যেই পৃথিবীর দেশে দেশে উৎপীড়ক প্রশাসনের শিকার হয়েছেন কবি ও গায়করা। বহুবার এবং বহুস্থানে। কেননা ধারালো এবং শাণিত পংক্তি জাগিয়ে তুলতে পারে মানুষকে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে গান ও কবিতার মধ্যেই এ চেতনার অনুরণ দেখতে পাই।
শুধু আমাদের দেশেই নয়। আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন মেলায়েসকে হত্যা করা হয়েছিল। স্প্যানিশ ভাষার কবি লোরকাকে গুলি করে হত্যা করেছিল। তুরস্কের কবি ইয়াসার ফেমাল ও নাজিম হিকমতকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। স্বদেশের মুক্তির চেয়ে কবিতা লেখার অপরাধে বার বার কারাবরণ করতে হয়েছে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও মাহমুদ দারবিশকে।
১৯৪১ সালের ৩১ মার্চ, ফিলিস্তিনের গালিলি অঞ্চলের বিরওয়া গ্রামে জন্ম দারবিশের। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের ওপর জন্ম হয় ইসরাইলের, ৪১৭টি ফিলিস্তিনি গ্রাম জালিয়ে পুড়িয়ে। মুছে যায় ফিলিস্তিনের মানচিত্র। আজকের পৃথিবীতেও সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে মুছে দিতে চাইছে বহু দেশের মানচিত্র। দারবিশের বয়স তখন সাত। ১৯৪৮ সালের একরাতে ইসরাইলি সৈন্যরা হানা দেয় আল বিরওয়া গ্রামে। দারবিশের পরিবার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কোনোক্রমে পালিয়ে আশ্রয় নেয় পাশের দামুন গ্রামে, পরে লেবাননে। সেই থেকে মাহমুদ দারবিশের শরণার্থী জীবন শুরু। কোনো দেশেই তার নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নেই। তিনি ১৯৬৯ সালে লোটাস পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮৩ সালে লেনিন শান্তি পুরস্কার। ১৯৯৩ সালে পেয়েছেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান নাইডহুড অব আর্ট এন্ড লেটার্স।
১৯৬০ সালে স্নাতক ডিগ্রি পাবার পর মাহমুদ হাইফা থেকে প্রকাশিত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র দৈনিক আল ইত্তেহাদ (একতা) ও সাপ্তাহিক আল জাদিদের সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। ১৯৭০ সালে পলিটিক্যাল ইকনমির ওপর পড়াশুনার জন্যে চলে যান মস্কো। সেই থেকে একের পর এক দেশ বদলের পালা। ১৯৭৩ সালে সেন্টার ফর প্যালেস্টালিয়ান স্টাডিজ’র আমন্ত্রণে লেবানন চলে আসেন। এ সময় তিনি সম্পাদনা করতেন প্যালেস্টালিয়ান এফেয়ার্স। ওই বছরে পিএলও-তে যোগ দেন তিনি। এ সময় থেকেই ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ অলিখিতভাবে জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেন মাহমুদকে। বহুদিন থেকেই ইসরাইলের চিহ্নিত শত্রু ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে নিজেকে বাঁচাতে প্রথমে তিউনিস, তারপর মিসর এবং সেখান থেকে প্যারিস চলে আসেন। এসময় মাহমুদ ছিলেন পিএলও’র কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ১৯৯৩ সালে ইয়াসির আরাফাত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে ওসলো চুক্তি সম্পাদিত হয়। সে চুক্তিতে কোনো সাম্যতা ছিল না বলে ক্ষোভে, দুঃখে, রাগে পিএলও নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন মাহমুদ দারবিশ।
১৯৯৫ সালে ইসরাইলের বিখ্যাত কবি ও মাহমুদ দারবিশের ঘনিষ্ট বন্ধু এমিলি হাবিবি মৃত্যুবরণ করলে বন্ধুর মৃতদেহ দেখার জন্যে মাহমুদকে জন্মভূমিতে পা রাখার অনুমতি দেয় ইসরাইল সরকার।
সুদীর্ঘ সময় পর জন্মভূমির গালিলি ও জেরুজালের মাটিতে পা রাখলেন। এ প্রসঙ্গে মাহমুদ বলেছেন, ‘ঠিক তখন নিজেকে নিতান্ত শিশু মনে হচ্ছিল। আমি কাঁদছিলাম আর চিৎকার করে বলেছিলাম– এ মাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’ কিন্তু দশদিনের বেশি তার জন্মস্থান দেখতে দেয়নি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
উল্টো তাকে গালি দেয়া হয় সন্ত্রাসবাদী বলে। মাহমুদ দারবিশ বরং টুইন টাওয়ারে হামলার পর এক সাক্ষাতকারে বলেন– “আমরা কখনও সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করি না। আমরা আত্মঘাতী বোমাবাজি সমর্থন করি না। কিন্তু একটা বিষয় আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে এমন আত্মঘাতী প্রবণতার দিকে এই তরুণদের কারা ঠেলে দিচ্ছে। এক অন্ধকার পরাধীন জীবন থেকে মুক্তির জন্যে নিজেদের বোমার সঙ্গে উড়িয়ে দিচ্ছে। এ বড় দুঃখের, এ বড় ক্ষোভের।”
বিশ্বকাব্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ মাহমুদ দারবিশ ২০০৮ সালের ১০ আগষ্ট প্রয়াত হয়েছেন। ফিলিস্তিনসহ সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ সম্পর্কে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দারবিশের বিশ্বাস ছিল- তার ভাষায়- “শেষ পল্টনের শেষ অভিযাত্রীরও পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই.... শেষ আকাশের শেষ প্রান্তে হলেও না....।”
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন