সিলেটে চা-শ্রমিকদের কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক ও চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনএকতা প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত, শোষিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী চা-জনগোষ্ঠী। ১৮৫ বছর ধরে এ ভূখণ্ডে বসবাস করলেও নাগরিক মৌলিক অধিকার থেকে আজও বঞ্চিত চা-শ্রমিকরা। দেশের সর্বনিম্ন মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকায় দৈনিক হাজিরাতে কাজ করে যাচ্ছেন চা-শ্রমিকরা। এত নিম্ন মজুরিতে দু’বেলা ভাত খাওয়াও চা-শ্রমিক পরিবারগুলোর জন্য কষ্টকর।
বছরের পর বছর মুনাফা করলেও চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মালিকরা নানা টালবাহানা করেই চলেছেন। আর সরকার চা-শ্রমিকদের বিষয়ে বরাবরের মতই উদাসীন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও ১০ লাখ চা-জনগোষ্ঠী আজও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চা-শ্রমিকরা আজও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রীয় বৈষম্যর মাধ্যমে চা-জনগোষ্ঠীকে সমাজের অপরাপর অংশ থেকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বৈষম্যর বিরুদ্ধে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র- চা-শ্রমিক টিইউসি দীর্ঘদিন যাবত লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। চা-শ্রমিকদের সংগঠিত করে নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে অগ্রসর করতে চা-শ্রমিক টিইউসি বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। তারই অংশ হিসেবে ২৮-২৯ মার্চ ২০২৬, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর মিশনে দুইদিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চা-শ্রমিক টিইউসির সভাপতি শ্রমিকনেতা সবুজ তাঁতির সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণদাস অলমিকের সঞ্চালনায় শুরুতেই উদ্বোধনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক ও চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রর উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সিপিবি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার লুতফুর রহমান, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাসুক মিয়া, সিপিবি কুলাউড়া উপজেলা কমিটির সভাপতি আব্দুল লতিফ, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য জহর লাল দত্ত, সিপিবি সিলেট জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আনোয়ার হোসেন সুমন, কালিটি চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি অনিমা অলমিক প্রমুখ।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তারা বলেন, সমাজ পরিবর্তনের লড়াইকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বুদ্ধিবৃত্তিক মতাদর্শিক লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হবে। শোষণের প্রক্রিয়াগুলোকে চিহ্নিত করে সে ব্যবস্থা নির্মূলে কার্যকরী লক্ষ্যভেদী লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। শ্রমিকশ্রেণির লড়াইকে বিভক্ত করার সকল অপকৌশলকে দৃঢ়তার সাথে রুখে দিতে হবে। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকশেণি সকল শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তমানবের মুক্ত শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণের প্রধানতম শক্তি। এই কর্মশালা সেই লড়াইকে শানিত এবং বেগবান করবে।
শ্রমিকশ্রেণির ইতিহাস, বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শ্রম আইন বিষয়ক প্রাথমিক ধারণা, সংগঠন ও নেতৃত্ব, সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা, পুঁজিবাদ-সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ, শ্রম আইন-প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারী চা-শ্রমিকদের ভূমিকা বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় বিষয়ভিত্তিক আলোচনা উত্থাপন করেন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, চা-শ্রমিক টিইউসির উপদেষ্টা আনোয়ার হোসেন সুমন, প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শাহীন রহমান, শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি এলায়েন্সের সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী মিনা, চা-শ্রমিক টিইউসির সহসভাপতি ও নারীনেত্রী সন্ধ্যা রানী ভৌমিক।
বিভিন্ন সেশনে আলোচকরা বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে, যার শিকার এদেশের শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষ। গরিবকে আরও গরিব বানিয়ে ধনীরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে, আর রাষ্ট্র এই ব্যবস্থার প্রধান মদদদাতা। রাষ্ট্রের মদদে দেশের সম্পদ আজ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বন্দী। অথচ যারা সম্পদ সৃষ্টি করছেন, সেই মেহনতি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। মালিকদের এই শোষণমূলক ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করতে হলে আজ শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
আলোচকরা বলেন, ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সংগঠন। যার নেতৃত্বে থাকবেন নির্ভীক, দৃঢ়চিত্তের সাহসী শ্রমিকরা। যারা লোভের কাছে বিক্রি হবেন না, ভয়ের কাছে পরাজিত হবেন না। সাধারণ শ্রমিকদের বোঝাতে হবে, যে সম্পদ তাঁরা সৃষ্টি করে চলেছেন অবিরাম, সেই সম্পদ ভোগ করছেন মালিকরা। শ্রমিকদের প্রাপ্য ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করেই মালিকরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। আর শ্রমিকদের শোষণের এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখছে রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বদল ছাড়া শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব।
তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বদলাতে হলে শ্রমিকশ্রেণির বিল্পবী রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে হবে। তাই প্রয়োজন শ্রমিকশ্রেণির শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। সেজন্য প্রতিনিয়ত বুদ্ধিবৃত্তিক মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। ভোগবাদী, শ্রমিক স্বার্থবিরোধী, অমানবিক এই পঁচা, ঘুনেধরা সমাজব্যবস্থার বিপরীতে মানবিক সমাজ বিনির্মাণের লড়াইয়ে কর্মশালা সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী চা-শ্রমিকরা উন্মুক্ত আলোচনায় অভিযোগ করেন, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিদ্যমান শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে শ্রমিকদের অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। রাষ্ট্র কর্তৃক শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিনিয়ত কেড়ে নেয়া হচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের চেয়ে বকেয়া মজুরি আদায়েই তাদের মূল ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।
তারা বলেন, শ্রম আইনের খড়গ মালিকের বেলায় প্রযোজ্য না হলেও শ্রমিকের ক্ষেত্রে তা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই আমাদের শ্রমিকদের লড়াই করে নিজেদের অধিকার আদায়ের বিকল্প নেই।
চা-শ্রমিকরা বলেন, শ্রমিকরা আজ যেটুকু সুযোগসুবিধা পাচ্ছে তা লড়াইয়ের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে, কারো দান-দক্ষিণা নয়। তাই ভবিষ্যতেও অধিকার আদায়ে লড়াই সংগ্রামের বিকল্প নেই।