দেশজুড়ে ছড়িয়েছে হাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : দেশে হঠাৎ দেখা দিয়েছে হামের প্রকোপ। প্রথমে উত্তরবঙ্গের দিকে প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও এ সংক্রামক রোগ এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় র্অধশত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসেই মারা গেছে অন্তত ৩২ জন। হঠাৎ এই অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকা নিয়ে করা গাফিলতিকে দায়ী করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। নাগরিক সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সেটাই প্রাথমিক কারণ। স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং রাজশাহী ও পাবনায় ১ জন করে শিশু মারা গেছে। তবে বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য যোগ করলে এ বছর মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাম রোগের বিষয়ে সরকারের কোনো প্রস্তুতি ছিল না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি বলেছেন, ‘বজ্রপাতের মতো হঠাৎ এসেছে হাম, আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। দেশব্যাপী হাম প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।’ চলতি সপ্তাহ (৫ এপ্রিল, রবিবার) থেকে মাঠ পর্যায়ে এই কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানা গেছে। ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। এ রোগের আলোচনা শুরু হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। রাজশাহী অঞ্চলে হামের পরিস্থিতি খুবই আশঙ্কাজনক। সেখানে একটি আলাদা আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫০ জন এবং নোয়াখালীতে গত ১৫ দিনে ৩০০-এর বেশি শিশু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে, টিকা কর্মসূচির ব্যর্থতা ও বর্তমান সংকট তৈরির জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে সবচেয়ে বেশি। অভিযোগকারীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মন্ত্রী ও নেতাদের কেউ কেউ রয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী মহলও অন্তর্বর্তী সরকারকে তুলাধোনা করতে ছাড়েনি। হাম আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের দায় রয়েছে মন্তব্য করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবিও তুলেছেন নাগরিকদের অনেকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, স্বাস্থ্য খাতে এবং টিকা-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টি। আবার তাঁদের কারও মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে যে দুর্নীতি ও অনিয়ম ছিল, সেখানে সংস্কার আনতে গিয়ে উল্টো এ সংকট তৈরি হয়েছে। ইপিআই (ইপিআই) পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর একটি বিশেষ হামের টিকা কর্মসূচি (ক্যাম্পেইন) পরিচালিত হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে এটি হয়েছিল। ২০২৪ সালে দেশের পরিস্থিতির জন্য টিকা কর্মসূচি পরিচালনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে তিনবার নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। ভিটামিন-এ এবং কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানোর কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়ায় শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে। এটাও হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রিয়াজ মোবারক জানান, এবার ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা সচরাচর ঘটে না। মায়েদের টিকা নেওয়া না থাকলে বা শিশুর সঠিক সময়ে টিকা না হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক এ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এন্ডেমিক (রোগের উপস্থিতি সব সময় থাকে) হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে। এর অর্থ অন্তত ১২ মাস হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ অনুপস্থিত থাকা। এই প্রেক্ষাপটে হাম ও রুবেলা নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ বেশ ভালো করছিল। প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ছিল ২০২২ সালে ১ দশমিক ৪১, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৩ ও ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৭২। বর্তমানে তা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৫৬টি জেলায়। রাঙামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দারবান-এই আট জেলায় হাম ধরা পড়েনি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..