স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির তোষণ পরিহার করতে হবে

রাজনৈতিক ভাষ্যকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তরকালে বাংলাদেশ এক অভিনব পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হয়েছে। সরকার গঠন করেছে দক্ষিণপন্থী বিএনপি এবং বিরোধীদল গঠিত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সমন্বয়ে যার নেতৃত্বে রয়েছে জামাত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ক্ষমতালোভী কিছু তরুণদের দ্বারা গঠিত দল এনসিপি নিজেদের বিলীন করেছে জামাতী জোটে। জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দেড় মাস বয়সী বিএনপি সরকার কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি সুদসহ দশ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ি ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি কর্মসূচি শুরু করেছে। কতকগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ নিলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইতোমধ্যে নেতিবাচক অনেকগুলো ঘটনা তারা ঘটিয়েছে যা জনগণের ইচ্ছার পরিপন্থী। নির্বাচনের সময় জনাব তারেক রহমান নিজেকে মুক্তিযুদ্ধপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করলে আমাদের অস্তিত্ব থাকে না’ তার এই বক্তব্য মানুষকে আশ্বস্ত করেছিল। মানুষ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে ঠেকানোর জন্য বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে যা হয়নি, বাংলাদেশ আমলে যা ঘটেনি ’২১-এর প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে দোয়া মাহফিল করে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে খর্ব করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি ও ব্যক্তির সাথে আপোষ করেছে। জামাতসহ দক্ষিণপন্থী শক্তিকে খুশি করতে ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অপরাধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ডাকসুর ভিপি প্রার্থী ইমিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কিন বশংবদ খলিলুর রহমানকে টেকনোক্রেট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে ক্ষমতাগ্রহণের প্রথম দিনই আপোষ করেছে। জনাব খলিলুর রহমান এমন একজন ব্যক্তি যার সম্পর্কে দেশবাসীর মনে বিরূপ ধারণা রয়েছে। কারণ তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে মার্কিন স্বার্থে মায়ানমারকে করিডোর প্রদান, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়া, তুরস্ককে অস্ত্র কারখানা তৈরি করতে দেওয়া, জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী মার্কিনের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করা, ফিলিস্তিনের গাজায় ট্রাম্পের নেতৃত্বে গঠিত গাজা প্রশাসনে যুক্ত হওয়ার সম্মতি প্রদানে ভূমিকা ও নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। ফলে তার মতো ব্যক্তিকে মন্ত্রী করাটা সম্পূর্ণ অনৈতিক। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট খলিলুর রহমানকে মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের উপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায্য যুদ্ধের সরাসরি নিন্দা করতে সক্ষম হয়নি সরকার। উল্টো তারা ইরানি প্রতিরোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিএনপি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাশিয়ান তেল আমদানির অনুমোদন প্রার্থনা করেছে। এটি নতুন সরকারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নতজানু নীতির নমুনা। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দেয়া বিএনপি সরকার ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত দেশবিরোধী ‘বাণিজ্যচুক্তি’ বাতিল করেনি। বরং সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সরকার গঠিত হওয়ার আগের চুক্তির দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। দেড় মাসেই বিএনপি সরকার তার চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। তার প্রাণভোমরা দেশের জনগণের স্বার্থের মধ্যে নেই, অন্য কোনো সিন্দুকে লুকায়িত রয়েছে। লুটেরা ধনিক শ্রেণির সরকার সামিয়িকভাবে জনমনোরঞ্জনকারী যত কর্মসূচি গ্রহণ করুক না কেন অবশেষে তা জনবিরোধী হতে বাধ্য। বর্তমান দেশের পরিস্থিতির অভিনবত্ব হচ্ছে এ যাবতকাল রাজনৈতিক লড়াই পরিচালিত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে। একই শ্রেণির দল হওয়া স্বত্ত্বেও প্রধান বিরোধীদলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয় নাই। এবারই প্রথম এমন এক প্রধান বিরোধীদল দেশবাসী পেয়েছি যারা স্বাধীনতাবিরোধী, আদর্শগত দিক থেকে পুঁজিবাদী এবং পশ্চাতপদ চিন্তা প্রচারকারী। ফলে এবার সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক পুঁজি করে চেতনা ব্যাবসা করে ক্ষমতা ভোগ করেছে, নিজেদের স্বৈরতান্ত্রিক-দমনমূলক শাসনকে টিকিয়ে রাখতে মুক্তিযুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। সেই দ্বিচারিতাই তাদের পতন ডেকে এনেছে। তৃতীয় শক্তি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী ন্যারেটিভ নিয়ে ‘পতিত স্বৈরাচার’ পুনরায় আবির্ভূত হলে দেশবাসীও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল বলে প্রচার করছে আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে স্বাধীনতা বিরোধী, গণহত্যাকারী ধর্মান্ধ দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে তোষণ করছে। স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে কেউ টিকে থাকতে পারবে না। আবার স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে কেউ গদি রক্ষা করতে পারবে না। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের ঋণ মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের নেই। মুক্তিযুদ্ধের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে রাখতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী সকল শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতিনিধি সংসদ সদস্যরা দাঁড়াতে গড়িমসি করে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। যারা ১৯৭১ সালে এই দেশের জন্মকে রুখতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়েছিল, তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন সংসদে বসে দেশ অবমাননায় লিপ্ত রয়েছে। সংসদে শোক প্রস্তাবে একাত্তরের গণহত্যার সহযোগী চিহ্নিত ও দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নাম যুক্ত এবং স্পিকার কর্তৃক তা অনুমোদন করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের কোন সংসদের সদস্য না হওয়া স্বত্ত্বেও ১৯৭১ সালে রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা জামাত নেতা রাজাকার ইউসুফের নামও শোক প্রস্তাবে যুক্ত করা হয়েছে। এটি মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। নির্বাচনের প্রচারণায় বিএনপি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করে জনগণের কাছে ভোট চেয়েছে। আর সংসদের প্রথম অধিবেশনে তারা শোক প্রস্তাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নাম অনুমোদন করে জাতির কাছে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের একজন হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্যাঙ্গারু কোর্টে মুক্তিপ্রাপ্ত) কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলবদর এটিএম আজহারুল ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাকে সংসদের সম্মানজনক সভাপতিমণ্ডলীর প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা কেবল সংসদের মর্যাদাহানিই নয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবমাননার সামিল। বিএনপি সরকারের এ ধরনের দ্বিচারিতা বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। জনগণ স্বাধীনতাবিরোধী দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাজিত করতে এবং ক্ষমতার বাইরে রাখতেই তাদেরকে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে তোষণের যে কোনো নীতি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণবিরোধী হতে বাধ্য। যাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং যাদেরকে পরাজিত বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা ও মুক্তি পেয়েছে তাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির সকল ভিত ভেঙে দিতে হবে। এর বাইরের যে কোনো অবস্থান জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..