ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ব্যবস্থা বদলের ‘নির্বাচনী ইশতেহার’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মুখবন্ধ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর দেশ আজ এক গভীর সংকটে নিপতিত। একদিকে ভয়ংকর বিপদ আর অন্যদিকে সম্ভাবনা-এর মধ্যে ক্রান্তিকালীন এক যুগসন্ধিক্ষণে দেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দেশি-বিদেশি লুটেরা ধনিকদের বেপরোয়া শোষণ যেমন পাহাড়সম বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, তেমনি খেটেখাওয়া মানুষসহ আপামর জনতার জীবনে তা জন্ম দিয়েছে ক্রমবর্ধমান সংকট, অবক্ষয়, নৈরাজ্য ও হতাশা। লুটপাটতন্ত্র বহাল রাখার স্বার্থে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস সাধন, গণতন্ত্রের ক্রমাগত সংকোচন, মানুষের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ধারাবাহিকভাবে খর্ব করায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে শুধু সরকার গঠনের কাজটিই সম্পন্ন হবে না, এর ফলাফল দ্বারা নির্ধারিত হবে যে, আগামী দিনে দেশ কোন পথে এগোবে-গণতন্ত্রের পথে না কি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দিকে। বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে চরম ডানপন্থি ও উগ্র সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নানা ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা। তারা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র, বিভ্রান্তি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই নির্বাচন-পর্বকালীন সংগ্রামে এসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ, সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করা আজ সময়ের জরুরি কর্তব্য। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৯ নভেম্বর দেশের প্রধান কয়েকটি বামপন্থি, র্যাডিক্যাল ও উদার গণতান্ত্রিক দলের আহ্বানে অনুষ্ঠিত জাতীয় রাজনৈতিক কনভেনশনে ২৯ দফা ‘জনতার সনদ’ ও ‘ঘোষণা’র ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’। এই যুক্তফ্রন্ট গঠন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ, যা দেশকে সংকটমুক্ত করার পথ উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক রাজনৈতিক দল। পার্টির ত্রয়োদশ কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক লাইন অনুযায়ী সিপিবি এই যুক্তফ্রন্ট গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তফ্রন্ট এখনও বিকাশমান; পূর্ণাঙ্গভাবে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে এবং দ্রুতই তা আরও বৃহৎ ও ব্যাপক গণভিত্তিসম্পন্ন রূপ নেবে। এই প্রাথমিক গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা অবস্থাতেই যুক্তফ্রন্টের সম্মিলিত শক্তিকে নিয়েই সিপিবি আসন্ন নির্বাচনী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করছে। সিপিবি গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারকে আন্তরিকতার সঙ্গে সিপিবি ধারণ করে। সরকার গঠনের জন্য নির্বাচিত হলে অথবা সিপিবির অংশগ্রহণে সরকার গঠিত হলে, কোন কোন মৌলিক প্রশ্নে ও ক্ষেত্রে, এবং কোন সময়সীমা ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি বলে সিপিবি মনে করে। সেই প্রয়োজন থেকেই সিপিবির এই ‘ব্যবস্থা বদলের ইশতেহার’। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারকে ভিত্তি করে তা আরও স্পষ্ট, সম্প্রসারিত, সময় নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকারের আকারে সিপিবি এই ‘ব্যবস্থা বদলের’ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছে। বলা যায় যে-এটি গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ইশতেহারের পরিপূরক এবং সিপিবির নিজস্ব শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট স্বরূপের প্রকাশ। কমিউনিস্টদের স্পষ্ট ঘোষণা হলো-কমিউনিস্টরা আন্দোলনের বর্তমানের মধ্যে থেকেই আন্দোলনের ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চূড়ান্ত লক্ষ্য সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ দীর্ঘ হতে পারে। ধারাবাহিক ও বহুমুখী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সিপিবি সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হবে এবং সব অবস্থাতেই সেই লক্ষ্যাভিমুখীতা দৃঢ় রাখতে এবং তা যথাসম্ভব অগ্রসর করতে সচেষ্ট হবে। বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের দিকে রাষ্ট্রের গতিমুখ এগিয়ে নিতে হলে বিদ্যমান শোষণমূলক, বৈষম্যমূলক ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বদল ঘটানো অপরিহার্য। এই ব্যবস্থা বদল ছাড়া রাষ্ট্র কখনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও শোষণ-বৈষম্যহীন হওয়া তো দূরের কথা এমনকি জনকল্যাণমূলক হয়ে উঠতে পারে না। এই কারণেই সিপিবি ‘ব্যবস্থা বদল’-এর কর্মসূচিকে আজকের রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রে স্থাপন করেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংহত করা, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রকে সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর করার জন্য এই কর্মসূচিকে গণমানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করা এবং তার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থনকে ভিত্তি করে বিকল্প শ্রেণি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরাই সিপিবির নির্বাচনী সংগ্রামের মূল লক্ষ্য। এই ইশতেহার সেই সংগ্রামের দিকনির্দেশনা। বর্তমান সংকটের বাস্তব মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ মুক্তির স্বপ্নকে একসূত্রে গাঁথা এক দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার হচ্ছে এই ইশতেহার।  পাঁচ বছর ধরে চলতে থাকা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ, শক্তি-সামর্থ্যরে বিন্যাস ইত্যাদির আলোকে এই কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যস্তকরণের উদ্দেশ্যে একটি স্থায়ী কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। ব্যবস্থা বদলের ১৮ দফা অঙ্গীকার ১. রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জনগণের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক, দমনমূলক ও জবাবদিহিহীন কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণের হাতে না থেকে ক্রমশ একটি সীমিত রাজনৈতিক-প্রশাসনিক-বিত্তশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যার ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে এবং নাগরিক অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মনে করে-এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি আবশ্যিক শর্ত হলো, রাষ্ট্রের মৌলিক গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন। রাষ্ট্রকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রক্ষমতার সব উৎস জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে, জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না যায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্র হবে জনগণের-জনগণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মতপ্রকাশ, সংবাদ মাধ্যম, সমাবেশ, সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত সকল আইনগত ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিলোপ করা হবে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী সকল দমনমূলক আইন বাতিল করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে ঘোষিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সংবিধানে বর্ণিত চার মূলনীতির ভিত্তি সমুন্নত রাখা হবে। সংবিধানের কোনো ধারা, আইন বা বিধি-বিধান যদি এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা বাতিল অথবা সংশোধন করা হবে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানকে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এসব মৌলিক নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসী ও অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষের অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে। সমাজে ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী-শ্রমজীবী মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমান অধিকার, বিকাশের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। আস্থা ভোট ও অর্থবিল ছাড়া অন্যসব বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সবার সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১ বছরের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের সকল প্রকার প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করার যাবতীয় পদক্ষেপ কার্যকর করা হবে। বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার লক্ষ্যে স্বচ্ছ সাংবিধানিক কাঠামো কার্যকর করা হবে। জনগণের বিচারপ্রাপ্তি সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বাস্তবায়ন দৃশ্যমান করা হবে। পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সব সংস্থার গণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও মানবাধিকারসম্মত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক দমনযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আইন, মানবাধিকার ও জাতীয় সংসদের কার্যকর নজরদারির আওতায় আনা হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা হবে। ক্রমান্বয়ে দেশরক্ষার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সকল সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণসহ একটি যুগোপযোগী ও আত্মনির্ভর জাতীয় প্রতিরক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রতিরক্ষানীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম জাতীয় সংসদের কাছে পূর্ণভাবে দায়বদ্ধ থাকবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। কমিশনের ওপর নির্বাহী ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে তার ক্ষমতা, দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়ানো হবে। ২. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন আইনের শাসনই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তা। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়ে ক্ষমতাবানদের রক্ষাকবচ ও সাধারণ মানুষের জন্য নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বিচারহীনতা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে দিয়েছে। এই আইনি দুর্বলতার সুযোগে সন্ত্রাস, উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সহিংসতা ও মবসন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন উসকে দিয়ে জনগণের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা হয়েছে। আইনের শাসন ভেঙে পড়ার ফল হিসেবে একইসঙ্গে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, ব্যাংক ও আর্থিক খাত লুণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থপাচার একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সিপিবি মনে করে-আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া সন্ত্রাস দমন, সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই সম্ভব নয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হবে-আইনকে দলীয় কৌশলগত এবং ক্ষমতার সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে সব নাগরিকের জন্য সমভাবে কার্যকর করা, রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক করা এবং সমাজে ন্যায়, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির পরিবেশ নিশ্চিত করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে প্রতীকী নয়, জুলাই হত্যাকা-সহ সকল রাজনৈতিক হত্যার সঠিক বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা হবে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার সত্য উদ্ঘাটনের জন্য একটি স্বাধীন, সাংবিধানিক ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে, যার সুপারিশ বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে জরুরি ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক দমনযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা হবে এবং তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আপসহীন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি বা উসকানি বরদাস্ত করা হবে না। একইসঙ্গে মবসন্ত্রাস, গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি প্রদানের সংস্কৃতি কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। সকল নাগরিকের ধর্মচর্চার অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং ধর্মের নামে বিদ্বেষ, উসকানি ও বিভাজন সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার বন্ধ করা হবে। এ ধরনের সব মামলা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাতিল করা হবে এবং ফৌজদারি অপরাধে সম্পৃক্ত নয়-এমন সকল রাজনৈতিক বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতি উচ্ছেদের জন্য কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘুষ-দুর্নীতি-তদবির লুটপাটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা এবং কার্যকর করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত মামলার জট কমাতে সময়সীমাভিত্তিক বিচারপ্রক্রিয়া চালু করা হবে। বিচার পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে রাষ্ট্রীয় আইনগত সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে, যাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে ও উপযুক্ত মানের আইনি সহায়তা পায়। নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সাইবার আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এই আইন একদিকে নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত করবে, অন্যদিকে সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক তৎপরতা ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ নিশ্চিত করবে। এসব ক্ষেত্রে আক্রান্তদের কার্যকর আইনগত সুরক্ষা দেওয়া হবে। রাষ্ট্র ও বিভিন্ন সংস্থার উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ এবং দেশের সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সম্পদ, আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে সংঘটিত লুটপাটের ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। ঘুষ-দুর্নীতি ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অংশীদার হয়ে ওঠে। ১ বছরের মধ্যে চোরাচালান, মাদক বাণিজ্য, মানবপাচার, অস্ত্র বাণিজ্য, পরিবেশ ধ্বংসকারী অবৈধ বাণিজ্য এবং কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সমন্বিত রাষ্ট্রীয় অভিযান জোরদার করা হবে। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। কালো টাকা সাদা করার সকল ধরনের সুযোগ, বিশেষ আইন ও প্রশাসনিক ফাঁক স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রীয় ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে স্বচ্ছ, অনলাইনভিত্তিক ও নাগরিক নজরদারিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে জনগণ রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি নজরদারি করতে পারে। রাষ্ট্রীয় তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের প্রকৃত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, ব্যয়, চুক্তি ও নীতিনির্ধারণ সম্পর্কে জনগণ পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও সময়োচিত তথ্য লাভ করতে পারে। ৩. প্রকৃত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বাংলাদেশে গণতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে; রাষ্ট্রক্ষমতা বাস্তবে কেন্দ্রীভূত রয়েছে রাজধানী ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হাতে। এর ফলে জনগণ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে ক্রমাগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষের জীবন, জীবিকা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষা করেই গ্রহণ করা হচ্ছে, যার পরিণতিতে দুর্নীতি, বৈষম্য ও প্রশাসনিক অদক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সিপিবি বিশ্বাস করে-ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। প্রকৃত গণতন্ত্র মানে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার করা। স্থানীয় সরকার হবে কেবল প্রশাসনিক একক নয়; এটি হবে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আর মনোনীত বা আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে না-সব প্রতিষ্ঠান জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবে। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হবে। জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করে, নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের প্রতি তাদের পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন, স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় কর ও ফি আরোপের আইনগত ক্ষমতা প্রদান করা হবে, যাতে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করতে পারে। ১ বছরের মধ্যে জাতীয় বাজেটের একটি নির্দিষ্ট ও ক্রমবর্ধমান অংশ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় নিশ্চিত করা হবে। এই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি, যোগাযোগ, সামাজিক সেবা ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের মতো খাতে স্থানীয় জনগণের অগ্রাধিকার অনুযায়ী ব্যয় করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নারীদের পর্যায়ক্রমে ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। নারীরা কেবল সংরক্ষিত আসনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমেও নেতৃত্বের সুযোগ পাবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সকল জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত করতে আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা হবে। স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়ন ব্যবস্থা চালু করা হবে। জনগণ সরাসরি সভা, গণশুনানি ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণে অংশ নিতে পারবে। ২ বছরের মধ্যে গ্রাম, ওয়ার্ড ও পাড়া পর্যায়ে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে স্থানীয় গণপরিষদ ও নাগরিক কমিটি গঠন করা হবে। এসব কাঠামো স্থানীয় সরকারের পরিকল্পনা, বাজেট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গণতান্ত্রিক নজরদারি নিশ্চিত করবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক গণশুনানি, সামাজিক নিরীক্ষা ও তথ্য প্রকাশ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং স্থানীয় অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের অধীনে ন্যস্ত করা হবে। ৪. নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকার জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের মৌলিক শর্ত ও উপাদান। জনগণ প্রতিটি স্তরে ও ক্ষেত্রে অবাধে, নির্ভয়ে ও সচেতনভাবে ভোট দিতে না পারলে রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে না। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থা পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করা হয়েছে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং কালো টাকা, পেশিশক্তি ও ভয়ভীতির মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এর ফলে নির্বাচন জনগণের মত প্রকাশের মাধ্যম না হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। সিপিবি বিশ্বাস করে-ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া জনগণের স্বার্থানুকূল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এই লক্ষ্যে একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, নাগরিক সমাজ, শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদার নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার বাতিল করে ব্যালটভিত্তিক ভোটগ্রহণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে। ভোটগ্রহণ ও গণনার প্রতিটি ধাপ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য করা হবে। ‘না ভোট’ বা প্রার্থিতা প্রত্যাখ্যানের অধিকার চালু করা হবে। কোনো আসনে ‘না ভোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে, সেখানে পুনর্নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হবে। কালো টাকা, প্রশাসনিক প্রভাব, পেশিশক্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ভোটকেন্দ্র দখলকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তি বা প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ ও সুয়ো-মোটো (স্ব-উদ্যোগে) ব্যবস্থা গ্রহণসহ তার বাস্তবায়ন করা হবে। সকল প্রার্থীর আয়-ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে। ১ বছরের মধ্যে জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার ও সব সাংবিধানিক নির্বাচনের জন্য একটি সমন্বিত ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন আইন প্রণয়ন করা হবে। এই আইনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি জনগণের আস্থা ভঙ্গ করে, নির্বাচনী অঙ্গীকার লঙ্ঘন করে, দুর্নীতিতে জড়ায় বা জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজে যুক্ত হয়-সে ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধি প্রত্যাহারের অধিকার (জরমযঃ ঃড় জবপধষষ) আইনগতভাবে নিশ্চিত করা হবে। নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে প্রতিনিধি প্রত্যাহারের গণভোট আয়োজনের বিধান চালু করা হবে। যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের আজীবন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি, অর্থপাচারে দণ্ডিত ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে। এই অযোগ্যতার বিধান কেবল সংসদ নয়, স্থানীয় সরকারসহ সব নির্বাচনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। ভোটার তালিকা সম্পূর্ণভাবে হালনাগাদ ও স্বচ্ছ করা হবে, যাতে কোনো যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং কোনো ভুয়া ভোটার তালিকাভুক্ত না থাকে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি চালু করা হবে। নির্বাচনী অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্বাচন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। ৫. বৈষম্য হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জনগণের প্রয়োজন, জীবনমান ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরে এই অর্থনীতি একটি সংকীর্ণ ধনিক, করপোরেট ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মুনাফা নিশ্চিত করার যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ব্যবস্থাপনা জনগণের উৎপাদনশীলতা ও কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়ে ঋণনির্ভরতা, লুটপাট, পুঁজিপাচার ও চরম বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। উৎপাদনশীল খাত উপেক্ষিত হয়ে অনুৎপাদনশীল লুটপাটমুখী খাত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। ফলে একদিকে অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ ও ক্ষমতার পাহাড় গড়ে উঠেছে, অন্যদিকে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষ বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আয় হ্রাস ও জীবন-জীবিকার বিভীষিকাময় অনিশ্চয়তার ভারে জর্জরিত। মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও, মানুষের প্রকৃত জীবনমান অবনতির দিকে গেছে। সিপিবি মনে করে-মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কোনো স্বাভাবিক বা অনিবার্য প্রক্রিয়া নয়, এটি ভুল নীতি, দুর্নীতি, বাজার কারসাজি ও রাষ্ট্রীয় দায়হীনতার ফল। তাই অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য হবে বাজারকে জনগণের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা এবং উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টানতে জরুরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ শুরু করা হবে। চাল, ডাল, তেল, আটা, চিনি, নিত্যভোগ্য খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও গণপরিবহন ভাড়ার ওপর তাৎক্ষণিক মূল্যনিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণকে রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হবে। অপ্রয়োজনীয় অর্থ-ছাপা বন্ধ করা হবে। অবৈধ মূলধন পাচার ও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও বাজার কারসাজিকে গুরুতর অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই একটি জাতীয় অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ঘোষণা জারি করা হবে। এই ঘোষণার ভিত্তি হবে বটম-আপ পরিকল্পনা পদ্ধতি, যেখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু হবে স্থানীয় ও আঞ্চলিক স্তর থেকে এবং সেখান থেকে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত হবে। উন্নয়ন-প্রজেক্ট আর ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে না; জনগণের প্রয়োজন, স্থানীয় বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিক-এই তিনটি বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই স্থানীয় সরকার, কৃষক-শ্রমিক সংগঠন, সমবায়, নারী ও যুব সংগঠন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাজারের একটি জাতীয় তথ্যভিত্তিক মানচিত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তব তথ্য ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়। এই সময়ের মধ্যেই একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। এই নীতির আওতায় উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন খরচ, কর কাঠামো, আমদানি-রপ্তানি নীতি এবং আর্থিক খাতের ভূমিকা সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হবে। ১ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাজেট, ভর্তুকি ও প্রণোদনার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করা হবে। উৎপাদনশীল খাতের বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক অনুৎপাদনশীল লুটপাটমুখী খাতকে মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিরুৎসাহিত করা হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ব্যবস্থাপনাকে পরিকল্পিতভাবে জনগণের উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে শিল্পনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হবে। সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজার সংযোগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে শিল্প বিকাশ নিশ্চিত করা হবে। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য শক্তি ও বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন জোরদার করা হবে। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক জ্বালানি প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। শিল্পখাতে যথোপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। জ্বালানি অপচয় রোধ এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে মানসম্মত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জৈব-প্রযুক্তি মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং উৎপাদন বৃদ্ধি, শ্রমের মান উন্নয়ন, ঝুঁকি হ্রাস ও সামাজিক কল্যাণে যথোপযুক্ত ক্ষেত্রে ও মাত্রায় ব্যবহার করা হবে। শিল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রমঘন প্রযুক্তি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী বিশ্ববাজারের অসম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার নীতি গ্রহণ করা হবে। জাতীয় অর্থনীতি ও দেশীয় শিল্প বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে-এমন বিদেশি সাহায্য, ঋণ বা চুক্তি গ্রহণ বন্ধ করা হবে এবং বহুজাতিক সংস্থা ও বিদেশি পুঁজির জাতীয় স্বার্থবিরোধী অনুপ্রবেশ রোধ করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, শ্রমিক অধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পরিবেশ সুরক্ষাকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে কার্যকর করা হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও কৌশলগত শিল্পখাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রাধান্য নিশ্চিত করা হবে। এসব খাতে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি, অসম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয় চুক্তি এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্প পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সেগুলো বাতিল বা পুনর্বিন্যাস করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই শ্রমের অবাধ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, স্থানান্তরিত শ্রমিকদের জন্য আবাসন, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি হাওর, নদীভাঙনপ্রবণ ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের দুর্দশা স্থায়ীভাবে নিরসনে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। বন্ধ হয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি কলকারখানাগুলো চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, প্রয়োজনে শ্রমিক-সমবায় ব্যবস্থাপনায়, পুনরায় চালু করা হবে। ইতিপূর্বে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরিত কিন্তু অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব পণ্য জাতীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে বা উৎপাদন সম্ভব, সেসব পণ্যের অযৌক্তিক আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিলাসপণ্যের আমদানির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মূল্যনিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে। জাতীয় শিল্প বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে-এমন ভোগবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে ও মিতব্যয়িতার স্বপক্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রগতিশীল কর ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠা করা হবে। উচ্চ আয়, বৃহৎ সম্পদ, করপোরেট মুনাফা ও আর্থিক লেনদেনের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হবে এবং সাধারণ জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের চাপ কমানো হবে। কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও কালো টাকা সাদা করার সব পথ বন্ধ করা হবে। এই কর ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্ব আয় জাতীয় উন্নয়ন বাজেটে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ ও অঞ্চলের স্বার্থে পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হবে। জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের ব্যয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নে এবং উৎপাদনশীল খাতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে-এই তিন ক্ষেত্রে মোটা দাগে এক-তৃতীয়াংশ করে বরাদ্দ করা হবে। দেশ ত্যাগের আগেই প্রবাসে কর্মরতদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষতাসম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবাসীদের সুরক্ষা ও তাদের অর্জিত আয়ের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করা হবে। প্রবাসী আয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরের ব্যবস্থা সহজ ও আকর্ষণীয় করা হবে এবং বিদেশে বাংলাদেশি কূটনৈতিক ও শ্রম সহায়তা কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। ২ বছরের মধ্যে জাতীয় অর্থনীতিকে আমদানি-নির্ভর ও ভোগবাদী কাঠামো থেকে বের করে এনে উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে। শিল্পের বহুমুখীকরণ, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক বরাদ্দ কার্যকর করা হবে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার চাপের বিরুদ্ধে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি জোরদার করা হবে এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা হবে। ৬. কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস বাংলাদেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এগুলো একটি বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো ও শ্রমবিরোধী উন্নয়ন দর্শনের সরাসরি ফল। একদিকে বিপুল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে কাজের সুযোগ ও ন্যায্য আয়ের বাইরে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ সুবিধা কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে। শহর ও গ্রামের মধ্যে, অঞ্চলভেদে এবং শ্রেণিভেদে সুযোগ-সুবিধার গভীর বৈষম্য সমাজকে বিভক্ত করেছে। সিপিবি মনে করে-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস কোনো দাতব্য কর্মসূচি নয়; এগুলো রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কাজের অধিকার, ন্যূনতম জীবনমান এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার যা নিশ্চিত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত। সিপিবির লক্ষ্য হলো-কাজকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, প্রত্যেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্যকে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হবে এবং সেই ভিত্তিতে দেশের শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও প্রযুক্তি নীতিকে ঢেলে সাজানো হবে। কাজের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবায়নের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করা হবে। বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে চলতে থাকা দলীয়করণ, দুর্নীতি ও বঞ্চনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা শুরু করা হবে। প্রকৃত দরিদ্র, অনাহারী, বেকার, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত কল্যার্থে সেগুলোকে সমন্বিত ও বিস্তৃত করার মাধ্যমে যাদের জীবনযন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘবের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়ার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাদ্য, নগদ সহায়তা ও জরুরি সেবাভিত্তিক কর্মসূচিতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে রাষ্ট্রীয়, সমবায় ও ব্যক্তিখাতে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের বহুমুখীকরণ ও নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলে পাঁচ বছরে কমপক্ষে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। প্রত্যেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের জন্য কাজ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি জাতীয় কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচি চালু করা হবে। প্রাপ্তবয়স্ক সকল নাগরিকের কাজ পাওয়াকে তার আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। ১ বছরের মধ্যে এক বছরের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য একটি সমন্বিত ও অধিকারভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। দরিদ্র, অনাহারী, বেকার, অসহায় ও কর্মক্ষম মানুষের জন্য ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় বাজেটে এই খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে এবং সামাজিক-নাগরিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে। এই পর্যায়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। খাদ্যশস্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নির্ধারিত পরিমাণে ও ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, যাতে কেউ মূল্যবৃদ্ধি বা বাজার অস্থিরতার কারণে অনাহারে না পড়ে। এই রেশনিং ব্যবস্থা হবে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও ডিজিটাল নিবন্ধনভিত্তিক। এই পর্যায়ে শহর ও গ্রামের মধ্যে, অঞ্চলভেদে এবং শহরের গরিব-মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত অংশের মানুষের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য বিদ্যমান, তা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক সেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। ২ বছরের মধ্যে দুই বছরের মধ্যে স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করা হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে সার্বজনীন ও অধিকারভিত্তিক করা হবে। দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে, যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। এই পর্যায়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাসকে দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ দেওয়া হবে। ৭. শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ ও শ্রেণিভিত্তিক বিভাজনের শিকার। একদিকে সীমিতসংখ্যক মানুষের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হলেও, অপরদিকে বৃহৎ জনগোষ্ঠী ব্যয়বহুল, মানহীন ও কর্মসংস্থানবিচ্ছিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে। শিক্ষা ক্রমেই পণ্যে পরিণত হয়েছে, বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণা অবহেলিত হয়েছে এবং শিক্ষার গণতান্ত্রিক ও মানবিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিপিবি মনে করে-শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, জনগণের মৌলিক অধিকার এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও একই ধারার গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হবে, যা কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক মুক্তি ও জাতীয় আত্মনির্ভরতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকবে। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করা হবে। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য গাইডলাইন হিসেবে একটি শিক্ষা ঘোষণা এই সময়সীমার মধ্যে প্রণয়ন করা হবে। ঘোষণায় শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের নীতিগত অবসান ঘটানো এবং প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একগণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও একই ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের প্রস্তুতি শুরু করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনার কাজ শুরু হবে, যাতে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্যমূলক ধারণা ও অন্ধবিশ্বাস দূর করে মানবতাবোধ, গণতান্ত্রিক চেতনা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং অন্যায়-অবিচার-শোষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা জাগ্রত করা যায়। ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচিত হলে ছয় মাসের মধ্যে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে খাদ্য, উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও পরিবহন সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। নিরক্ষরতা দূর করার জন্য পাঁচ বছরের একটি জাতীয় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও ব্যাপক গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে। একইসঙ্গে সকল জাতিসত্তার শিশুদের জন্য প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর হয়। এই পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নীতির ভিত্তিতে গৃহীত সংস্কারসমূহ বাতিল করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রকৃত অর্থে জাতীয়করণ করা হবে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ন্যূনতম ৮ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। ১ বছরের মধ্যে এক বছরের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতি দুই বর্গকিলোমিটারে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও শিক্ষাখরচ বহনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালু করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে এবং শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা, পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা ও পেশাগত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সর্বোচ্চ ১ঃ২৫ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরীক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এনে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থা বাতিল করা হবে এবং সৃজনশীল ও মূল্যায়নভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হবে। সকল পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইনগত ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ২ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের আলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত করার ব্যবস্থা করা হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও অভিন্ন টিউশন ফি কাঠামো চালু করা হবে। এই পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জৈবপ্রযুক্তিতে রাষ্ট্রীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন জোরদার করা হবে, যাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন জাতীয় উৎপাদন ও সামাজিক

অগ্রগতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে। ৮. জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার গণমুখী সংস্কার বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ ও অব্যবস্থাপনার শিকার। একদিকে করপোরেট ও মুনাফাভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত। গ্রাম ও শহর, ধনী ও দরিদ্র, কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে অসম। স্বাস্থ্য ক্রমে নাগরিক অধিকারের পরিবর্তে পণ্যে পরিণত হয়েছে, যা একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। সিপিবি মনে করে-স্বাস্থ্য প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, প্রতিরোধমূলক সেবা ও নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে একটি সর্বজনীন, সমতা-ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। মুনাফার জন্য নয়, স্বাস্থ্যনীতি হবে মানুষের জীবন ও মর্যাদার পক্ষে। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর পরই একটি জাতীয় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংস্কার ঘোষণা জারি করা হবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে সকল নাগরিকের জন্য একটি সমন্বিত, সর্বজনীন ও গণমুখী চিকিৎসা নীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও ওষুধনীতি চালুর রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা করা হবে। ধাপে ধাপে সকল নাগরিককে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনার প্রস্তুতি শুরু করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর জরুরি সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না হয়। ৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিধি সম্প্রসারিত করা হবে এবং শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হবে। ওষুধের মূল্যনিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা হবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ, টিকা ইত্যাদির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। একইসঙ্গে দুর্গম এলাকা, হাওর, চর, পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করা হবে, যাতে অঞ্চলভিত্তিক স্বাস্থ্য-বৈষম্য হ্রাস পায়। ১ বছরের মধ্যে এক বছরের মধ্যে দেশের সকল মানুষের জন্য নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, গণস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাসম্পন্ন স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে উপযুক্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। এই পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। অযৌক্তিক পরীক্ষা, অতিরিক্ত বিল আদায় এবং চিকিৎসার নামে ব্যবসা বন্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও টেকনিশিয়ানদের জন্য ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। ২ বছরের মধ্যে নির্বাচিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। প্রতিটি নাগরিক তার আয়, বসবাসের স্থান বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে। এই পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়ন ও যৌক্তিক ব্যবহার রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হবে, যাতে বহুমাত্রিক ও জনগণকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ওষুধ, টিকা চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মৌলিক স্বাস্থ্য উপকরণ উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানো হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে এবং চিকিৎসা ব্যয় জনগণের নাগালের মধ্যে থাকে। ওষুধ উৎপাদনে গবেষণার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দেওয়া হবে। ৯. কৃষিব্যবস্থার সংস্কার ও গ্রামের উন্নয়ন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে শোষণ, বৈষম্য ও নীতিগত অবহেলার শিকার। কৃষক উৎপাদন করে, কিন্তু ন্যায্যমূল্য পায় না; ক্ষেতমজুর শ্রম দেয়, কিন্তু কাজের নিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা পায় না; গ্রাম খাদ্য জোগান দেয়, কিন্তু উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকে। জমির অসম বণ্টন, খাসজমি দখল, মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য, কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্য, করপোরেট নিয়ন্ত্রিত কৃষির বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কৃষিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। সিপিবি মনে করে-কৃষি কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবিকা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের ভিত্তি। কৃষক ও ক্ষেতমজুরের মর্যাদা, ন্যায্য আয় ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সিপিবির লক্ষ্য হলো- কৃষিকে লাভজনক ও টেকসই করা, খাদ্যকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং গ্রামকে শোষণ ও বঞ্চনার অঞ্চল থেকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে রূপান্তর করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ধান, গম, ডাল, তেলবীজসহ প্রধান খাদ্যশস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য রোধে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ জোরদার করা হবে। একইসঙ্গে গ্রাম থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে উৎপাদন ও বিনিয়োগের নীতিগত রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে সীমিত আকারে ভূমি সংস্কারের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। খাসজমির সকল অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিল করে, ভূমিহীন কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের মধ্যে খাসজমি বণ্টন নিশ্চিত করা হবে। খাস খাল, বিল, জলাভূমি ও চর এলাকার ব্যবস্থাপনা স্থানীয় দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণে গঠিত সমবায়ের হাতে ন্যস্ত করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই বীজ, সার, সেচ, কৃষিযন্ত্র ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা হবে। ক্ষতিকর হাইব্রিড বীজের আমদানি ও করপোরেট ফার্মিংয়ের সুযোগ বন্ধ করা হবে। বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণে রাষ্ট্রীয় ও সমবায় উদ্যোগ জোরদার করা হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র ও কৃষিপণ্য বিপণন সমবায় স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে উৎপাদক সমবায় ও ক্রেতা সমবায় গড়ে তোলা হবে, যাতে কৃষক ও উৎপাদকরা সমবায়ের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারে এবং ভোক্তারা ন্যায্য দামে পণ্য কিনতে পারে। এই সমবায়ভিত্তিক সরাসরি কেনাবেচা ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া ও সিন্ডিকেটের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্র এই সমবায়গুলোর জন্য আইনগত সুরক্ষা, প্রাথমিক পুঁজি, পরিবহন ও সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করবে। হাওর, চর, উপকূলীয় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ কৃষি ও জীবিকাভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। ১ বছরের মধ্যে এক বছরের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বজনীন ও অধিকারভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুত, ন্যায্য বণ্টন ও বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনো মানুষ অনাহারে না পড়ে এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত না হয়। এই পর্যায়ে ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ শ্রমজীবীদের জন্য সারা বছর কাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে এবং কাজের নিশ্চয়তা কর্মসূচি চালু করা হবে। ক্ষেতমজুরদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, দমন ও শ্রম চুরি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষিতে গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার দিকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া হবে, যাতে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকে। গ্রামীণ অবকাঠামো-রাস্তাঘাট, সেচ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ২ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যে গ্রামীণ অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করা হবে। কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সমবায় উদ্যোগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের বিকাশের মাধ্যমে গ্রামে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। নদী, হাওর, বাওর, বিল ও জলাভূমিতে প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত হবে। খাদ্যশস্য মজুত ও বণ্টনে আধুনিক, স্বচ্ছ ও গণনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ১০. শ্রমজীবীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ-শ্রমিক, কর্মচারী, ক্ষেতমজুর, দিনমজুর, গৃহশ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত কোটি কোটি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শোষণ, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্যে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দাবি থাকলেও, শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয়নি, কাজের নিরাপত্তা গড়ে ওঠেনি এবং শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার বারবার দমন করা হয়েছে। এর ফলে বেকারত্ব, অর্ধবেকারত্ব, অনিরাপদ কাজ ও দারিদ্র্য গভীর হয়েছে। সিপিবি মনে করে-শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত না করে, কাজের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা না দিয়ে এবং ন্যায্য মজুরি প্রতিষ্ঠা না করে কোনো উন্নয়ন টেকসই বা ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না। সিপিবির লক্ষ্য হলো-কর্মসংস্থানকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পরিণত করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং শ্রমকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে স্থাপন করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বিদ্যমান আইনগত ও প্রশাসনিক বাধা প্রত্যাহার করা হবে এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে মজুরি কমিশনসমূহ পুনর্গঠন করে তাদের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধির নিয়মিত প্রক্রিয়া চালু করা হবে। মজুরি কাঠামো সর্বোচ্চ দুই বছর অন্তর পুনর্বিন্যাস করা হবে। এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ওখঙ) কনভেনশনসমূহ অনুসারে শ্রমিক, কর্মচারী ও ক্ষেতমজুরসহ সকল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, সমবেত দরকষাকষি ও অন্যান্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা হবে। বর্তমানে বিদ্যমান দমনমূলক শ্রম আইন বাতিল করে শ্রমিকদের অনুকূলে যুগোপযোগী শ্রম আইন প্রণয়ন করা হবে। চাকরির নিরাপত্তা, পূর্ণ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও ধর্মঘটের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। ১ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে গার্মেন্ট শিল্পসহ সকল কলকারখানায় দুর্ঘটনা রোধ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। ফ্যাক্টরি আইন পূর্ণমাত্রায় কার্যকর করা হবে এবং স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি চালু করা হবে। শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন ব্যবস্থা এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে খাদ্য ও জীবনধারণের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। শ্রমজীবী মানুষের বসবাসের জন্য পরিকল্পিত শ্রমিক কলোনি নির্মাণ শুরু করা হবে। ২ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ওপর মাফিয়া গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে। গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। এই পর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকের কাজ হারানো ঠেকাতে পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রযুক্তি শ্রমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হবে-এই নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করা হবে। ১১. নারী অধিকার বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নারী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, সহিংসতা ও কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর শ্রম ও ভূমিকা অবমূল্যায়িত হয়েছে, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোতে বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং নারীর ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন আজও এক নির্মম বাস্তবতা। সিপিবি মনে করে-নারীর পূর্ণ নাগরিক অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো সমাজ ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক হতে পারে না। সিপিবির লক্ষ্য হলো-নারীর ওপর সকল প্রকার বৈষম্য, শোষণ ও সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে নারীর সমান অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার সনদ, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (ঈঊউঅড), ভিয়েনা ঘোষণা ও বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশনের প্রতিশ্রুতিসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। নারী নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হবে এবং জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। সাইবার বুলিং মনিটরিংয়ের জন্য বিশেষ সেল গঠন হবে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচিত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বিদ্যমান পারিবারিক আইন ও উত্তরাধিকার আইনে যে বৈষম্য বিরাজ করছে তা দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে এবং ধাপে ধাপে একটি বৈষম্যহীন, মানবাধিকারসম্মত অভিন্ন নাগরিক আইনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া হবে। নারী নির্যাতন দমন আইনকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা হবে। ন্যূনতম চার মাসের পূর্ণ বেতনের মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রাথমিক প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালু করা হবে। নারী ও পুরুষের মধ্যে কাজ ও মজুরির বৈষম্য দূর করতে কার্যকর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ১ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক দল, সংসদ, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এক-তৃতীয়াংশে উন্নীত করা হবে এবং সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ সম্প্রসারিত করা হবে। এই পর্যায়ে জেন্ডার বিষয়ক সংসদীয় কমিশন গঠন করা হবে এবং নারী ও জেন্ডার বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পৃথক করে পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। নারী নির্যাতন ও বৈষম্য প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। ২ বছরের মধ্যে দুই বছরের মধ্যে পরিবার ও গৃহস্থালি কাজে নারীর শ্রমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করা হবে। কাজ ও মজুরির ক্ষেত্রে পূর্ণ সমতা নিশ্চিত করা হবে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ১২. যুবশক্তির বিকাশ ঘটাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ তরুণ ও যুব। এই বিপুল তারুণ্যশক্তিই দেশের সামাজিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে যুবসমাজকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে এই শক্তি আজ বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা, হতাশা, মাদকাসক্তি, সহিংসতা ও ভবিষ্যৎহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে। কর্মসংস্থানের অভাব, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাস্তব জীবনের বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যুবকদের অর্থবহ অংশগ্রহণের সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও গভীর করেছে। সিপিবি মনে করে-যুবকদের সৃজনশীলতা, শ্রম, জ্ঞান ও উদ্যমকে সংগঠিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের কাজে যুক্ত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। যুবশক্তিকে কেবল শ্রমবাজারের জন্য নয়, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে ৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে যুবসমাজের সৃজনশীল শক্তিকে রাষ্ট্র গঠনের কাজে যুক্ত করার জন্য একটি জাতীয় যুব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও সামাজিক সেবাখাতে যুবকদের সংগঠিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। দেশে বিদ্যমান কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও যে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অপচয় হচ্ছে, তা রোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। কর্মক্ষম কিন্তু বেকার যুবকদের জন্য বাস্তব চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পুনঃদক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সংযোগমূলক কর্মসূচি চালু করা হবে। সরকারি, সমবায় ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হবে। যুব উদ্যোক্তার জন্য সহজ শর্তে পুঁজি, কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হবে। উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিনামূল্যে অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। ১ বছরের মধ্যে যুবসমাজকে বেকারত্ব, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করতে বহুমুখী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা হবে, যাতে পড়াশোনা শেষ করেই যুবকদের দীর্ঘদিন বেকার থাকতে না হয়। মাদকাসক্তি, সহিংসতা, সন্ত্রাস ও অপরাধের দিকে যুবসমাজের ঝুঁঁকে পড়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। মাদক ব্যবসায়ী, গডফাদার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আপসহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যুবসমাজের জন্য সাংস্কৃতিক চর্চা, ক্রীড়া, পাঠাগার, নাট্যচর্চা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনভিত্তিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের মাধ্যমে সুস্থ, মানবিক ও সৃজনশীল সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি এলাকায় যুবদের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া পরিসর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ২ বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুবদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরামর্শমূলক যুব ফোরাম ও স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো গড়ে তোলা হবে। যুব সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হবে, তবে কোনো ধরনের দলীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ব্যবহার বা প্রশাসনিক চাপ চাপিয়ে দেওয়া হবে না। যুবদের স্বাধীন চিন্তা, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। গৌরবময় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারাকে ধারণ করে আধুনিকতার নামে ইতিহাসবিচ্ছিন্নতা, সাম্প্রদায়িকতা ও বিকৃত চিন্তার প্রবণতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা হবে। যুবসমাজকে বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনায় গড়ে তুলতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের সভা সেমিনার আয়োজন করা হবে। ১৩. পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সংস্কার পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সংযোগ ও জাতীয় সংহতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবহনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা ও করপোরেট স্বার্থের কারণে জনগণের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট, অতিভাড়া, অনিরাপদ গণপরিবহন, অবহেলিত রেলপথ ও নৌপথ-এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করেছে। সিপিবি মনে করে-পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও সমন্বিত চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শহর ও গ্রামের মানুষ সমানভাবে উপকৃত হবে এবং জাতীয় উন্নয়ন ভারসাম্যপূর্ণ হবে। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ৬ মাসের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই একটি সমন্বিত জাতীয় পরিবহন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। এই নীতিতে সড়ক, রেল ও নৌপথকে প্রতিযোগী নয়, পরস্পর পরিপূরক হিসেবে পরিকল্পিত করা হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিভাড়া, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালকের লাইসেন্স ব্যবস্থা সংস্কার, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা জোরদার এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। ১ বছরের মধ্যে সাশ্রয়ী রেলপথকে দেশের প্রধান গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। অবহেলিত ও বন্ধ রেললাইন পুনরুদ্ধার, নতুন রেলপথ নির্মাণ এবং রেলের সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মান উন্নত করা হবে। নৌপথের ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন শক্তিশালী করা হবে। নদী খনন, নৌবন্দর আধুনিকীকরণ ও নিরাপদ যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ নিশ্চিত হয়। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক, টেকসই ও নিরাপদ সড়ক নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জনগণের সংযোগ জোরদার করা হবে। মেট্রোরেলের ভাড়া কমানো হবে, ট্রিপসংখ্যা বাড়ানো হবে। ২ বছরের মধ্যে শহর ও মহানগরগুলোতে আধুনিক, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। গণপরিবহনকে ব্যক্তিগত যানবাহনের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় করতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সময়ানুবর্তিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পণ্য পরিবহনে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়িয়ে সড়কের ওপর চাপ কমানো হবে, যাতে দুর্ঘটনা ও পরিবহন ব্যয় হ্রাস পায় এবং পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে। পরিবহন খাতে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করে পরিকল্পনা, নির্মাণ ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে একটি সমন্বিত জাতীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যেখানে সড়ক, রেল ও নৌপথ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্য ও সমতা ভিত্তিক আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার করা হবে, তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রেখে। পরিবহন ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করতে বিদ্যুৎচালিত যান, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করা হবে। ১৪. প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা বাংলাদেশ আজ ভয়াবহ পরিবেশ ও জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। নদী দখল ও দূষণ, বন উজাড়, পাহাড় কাটা, বালু ও পাথর লুট, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ, জলাভূমি ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রকৃতি ও মানুষের জীবন একসঙ্গে বিপর্যস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূল, হাওর, চর ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষ বাস্তুচ্যুতি, জীবিকা হারানো ও দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে-যে সংকটের জন্য তারা দায়ী নয়। সিপিবি মনে করে-পরিবেশ সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। মুনাফাভিত্তিক উন্নয়ন, করপোরেট লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার ফলেই পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। প্রকৃতি রক্ষা মানে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা করা। সিপিবির লক্ষ্য হলো-পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে এই সময়ের মধ্যেই পানি, মাটি ও বায়ু দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু হবে। নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাশয় দখলকারী, বন উজাড়কারী, বন দখলকারী, পাহাড় ধ্বংসকারী ও পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ ধ্বংসে জড়িত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসব অপরাধ বিচারের জন্য বিশেষ পরিবেশ আদালত গঠন করা হবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সাগর ও স্থলভাগের তেল-গ্যাস আহরণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।  ৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারের একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলীসহ দেশের সকল নদী ও জলাধার থেকে অবৈধ দখল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। শুকিয়ে যাওয়া ও মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনর্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এই সময়ের মধ্যেই সুন্দরবনসহ দেশের সকল বনাঞ্চল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্পকারখানা নির্মাণ বন্ধ করা হবে এবং সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা হবে। উপকূল, হাওর, চর ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য পৃথক জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ১ বছরের মধ্যে এক বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়-মাটি, গাছ ও পানির সর্বোচ্চ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ ও মাটি রক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে জনগণের মধ্যে সামাজিক পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সকল উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ২ বছরের মধ্যে দুই বছরের মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ-নদী, বন, পাহাড়, খনিজ ও পানির ব্যবস্থাপনায় জনগণের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের লুটপাট ও করপোরেট দখল সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে এবং এসব সম্পদের ব্যবহার হবে সামাজিক প্রয়োজন ও পরিবেশ সংরক্ষণের ভিত্তিতে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই স্থানীয় উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হবে, যাতে উন্নয়ন প্রকৃতি ও মানুষের বিরুদ্ধে না গিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থানের পথে অগ্রসর হয়। ১৫. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও গবেষণার গণমুখী সংস্কার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, খণ্ডিত পরিকল্পনা ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কারণে তার সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হতে পারেনি। গবেষণা কার্যক্রম শিক্ষা ও শিল্পের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত নয়, বিজ্ঞানচর্চা সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবদ্ধ এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রে করপোরেট মুনাফা ও নজরদারিমুখী প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সিপিবি মনে করে-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও এর সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ ও শিল্প বিকাশের অপরিহার্য শর্ত। জ্ঞান ও গবেষণাকে বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও সামাজিক কল্যাণের অধীন করাই হবে সিপিবির নীতি। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ৬ মাসের মধ্যে একটি জাতীয় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। এই নীতির লক্ষ্য হবে বিজ্ঞান শিক্ষা, মৌলিক ও প্রয়োগমূলক গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং শিল্প-কৃষি-স্বাস্থ্য-পরিবেশের সঙ্গে গবেষণার কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা হবে। গবেষণা খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি করা হবে এবং গবেষণা তহবিল বণ্টনে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমিয়ে স্বচ্ছ, পিয়ার-রিভিউভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হবে। ১ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বিত গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। গবেষণার ফলাফল যেন কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উৎপাদন, সেবা ও নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত হয়-সে জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবকেন্দ্রিক ও নৈতিক নীতিমালা কার্যকর করা হবে। প্রযুক্তির প্রয়োগ হবে মানুষের কাজ সহজ ও নিরাপদ করার জন্য, কর্মসংস্থান ধ্বংস বা নজরদারি বাড়ানোর জন্য নয়। প্রযুক্তির কারণে কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন এলে শ্রমিক ও কর্মচারীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা হবে। জৈবপ্রযুক্তি, চিকিৎসা গবেষণা ও কৃষি গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। বীজ উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে দেশীয় গবেষণা সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে এবং করপোরেট একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রোধ করা হবে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাধীন গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মানবসম্পদ সহায়তা দেওয়া হবে। ২ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণাকে জাতীয় শিল্পনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, পরিবেশনীতি ও জ্বালানি নীতির সঙ্গে কার্যকরভাবে সমন্বিত করা হবে। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় ও সমবায় উদ্যোগে প্রয়োগের মাধ্যমে দেশীয় উদ্ভাবনকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে। মেধা পাচার রোধে গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, গবেষণা স্বাধীনতা ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশে কাজে লাগাতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। ডিজিটাল অবকাঠামো, ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যাতে তথ্যপ্রযুক্তি খাত জাতীয় স্বার্থ ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও উদ্ভাবনক্ষম রাষ্ট্রে রূপান্তর করা হবে। গবেষণা হবে মুক্তচিন্তা ও সমালোচনামূলক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ওপর দাঁড়ানোর নিয়ন্ত্রণ ও দমন নয়। বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা হবে। ১৬.গণমাধ্যম, তথ্যের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া জনগণের মতপ্রকাশ, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে গণমাধ্যম আজ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট মালিকানা, ভয়ভিত্তিক আইন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চাপে সংকুচিত। সাংবাদিকতা ক্রমে জনস্বার্থের বদলে ক্ষমতা ও পুঁজির স্বার্থ রক্ষার ঝুঁকিতে পড়েছে। সিপিবি মনে করে-গণমাধ্যম কোনো সরকারের মুখপত্র বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রচারযন্ত্র নয়। গণমাধ্যম হবে জনগণের কণ্ঠস্বর, সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যম এবং রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির ক্ষেত্র। সিপিবির লক্ষ্য হলো-ভয়মুক্ত, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে মতপ্রকাশ, সংবাদ প্রকাশ ও সাংবাদিকতার ওপর আরোপিত সকল দমনমূলক আইনগত ও প্রশাসনিক বাধা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, হয়রানি ও গ্রেপ্তার বন্ধ করা হবে এবং এ ধরনের সব মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ৬ মাসের মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত গণমাধ্যম নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। এই নীতির মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ও নৈতিক সাংবাদিকতার পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। সরকারি বিজ্ঞাপন, লাইসেন্স ও আর্থিক সুবিধা ব্যবহার করে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রথা বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জনগণের গণমাধ্যমে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ১ বছরের মধ্যে গণমাধ্যমে করপোরেট একচেটিয়াবাদ ও মালিকানার কেন্দ্রীকরণ রোধে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গণমাধ্যম মালিকানা ও অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে, যাতে সংবাদ পরিবেশনায় জনস্বার্থ অগ্রাধিকার পায়। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন ও স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থভিত্তিক প্রতিবেদন উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা হবে। বেতনকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি বাড়ানো হবে। রাষ্ট্রীয় তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার বাস্তবে কার্যকর করা হবে, যাতে নাগরিক ও গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও চুক্তি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে পারে। ১৭. সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল সামাজিক চেতনার বিকাশ ঘটানো সাহিত্য ও সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মার প্রকাশ। জনগণের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও মূল্যবোধ সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই রূপ পায়। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে। অথচ আজ এই সাহিত্য-সংস্কৃতি ভোগবাদ, অশ্লীলতা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, করপোরেট আধিপত্য ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চাপে বিকৃত ও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সিপিবি মনে করে-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ছাড়া কোনো মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়। বাজারের পণ্য বা ক্ষমতাসীনদের প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত না করে। সংস্কৃতিকে জনগণের মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র হিসেবে পুনর্গঠন করাই আমাদের লক্ষ্য। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মতপ্রকাশ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ওপর সকল প্রকার অঘোষিত সেন্সরশিপ, প্রশাসনিক বাধা ও রাজনৈতিক চাপ প্রত্যাহার করা হবে। জীবনবিরোধী, ভোগবাদী, অশ্লীল ও কুসংস্কারমূলক উপসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করা হবে এবং সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল ও মানবতাবিরোধী চিন্তার বিস্তার রোধে সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। ৬ মাসের মধ্যে ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে জনগণের সুস্থ, মানবিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি গণতান্ত্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। এই নীতির আওতায় শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রামভিত্তিক সাহিত্য-সংস্কৃতিকে মূলধারায় নিয়ে আসার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। যাত্রাসহ লোকজ সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করা হবে এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমির কার্যক্রমকে-দলীয়করণমুক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা হবে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পশ্চাদপদতা দূর করার লক্ষ্যে উদার, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সাংস্কৃতিক ধারার বিকাশে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ১ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা হবে এবং দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করার লক্ষ্যে সাহিত্যকর্ম অনুবাদের জন্য বিশেষ অনুদান ও অনুবাদ সেল গঠন করা হবে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে করপোরেট আধিপত্য বন্ধ করা হবে। চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে এবং নতুন নির্মাতাদের উৎসাহ দিতে সরকারি অনুদান বাড়ানো হবে। সব জেলা ও উপজেলায় নাট্যচর্চার জন্য স্থায়ী মঞ্চ এবং আধুনিক পাঠাগার, প্রেক্ষাগৃহ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ২ বছরের মধ্যে সাহিত্য-সংস্কৃতিকে গণতান্ত্রিক সামাজিক রূপান্তরের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ, মানবিকতা ও সামাজিক সাম্যের মূল্যবোধকে সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা ও বিশ্বব্যাপী প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। করপোরেট বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হবে না। ১৮. পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন, সক্রিয় ও জোট-নিরপেক্ষ। এই নীতির মূল ভিত্তি থাকবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, জনগণের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরোধিতা। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বাংলাদেশকে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তি-জোটের অনুসারী না বানিয়ে, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থানে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করা হবে। পররাষ্ট্রনীতি কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শ্রম, অভিবাসন, পরিবেশ, শান্তি ও জনগণের নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত-এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। সরকার পরিচালনা করার দায়িত্ব পেলে, সিপিবি এ ক্ষেত্রে যা করবে প্রথম ৬ মাসের মধ্যে স্বাধীন ও সক্রিয় জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনঃঘোষণা করা হবে। পারস্পরিক স্বার্থ, সমমর্যাদা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও সামরিক-বাণিজ্যিক বোঝাপড়াগুলো জাতীয় স্বার্থের আলোকে পর্যালোচনা করা হবে। যেসব চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, পরিবেশ বা জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী, সেগুলো বাতিল অথবা পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র, জাতিস্বাধীনতা ও প্রতিটি জাতির নিজস্ব উন্নয়নপথ বেছে নেওয়ার অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা হবে। এই লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা হবে এবং বিশ্বশান্তি ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাম্রাজ্যবাদ, নব্য উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবাদ, জায়নবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদার করা হবে। নিপীড়িত জাতি ও জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামের প্রতি নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখা হবে। ২ বছরের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ও জোরদার করা হবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অধিকতর গণতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দাবিতে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, তাতে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা হবে। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সব অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্যসহ অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাপ্য সম্পদ, যুদ্ধাপরাধের দায় এবং প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলো জাতীয় স্বার্থের আলোকে উত্থাপন ও নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। এসব ক্ষেত্রে পরাশক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখা হবে। ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে। দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তির বাইরে থেকে আঞ্চলিক সহযোগিতার কার্যকর ফোরাম হিসেবে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, শান্তি ও জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক সংযোগ গভীর করা হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক নজরদারি নিশ্চিত করা হবে। সংসদে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে পররাষ্ট্রনীতি গোপন চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..