ট্রাম্পের পরিকল্পনা: গাজাকে কব্জায় নেওয়ার পরিষ্কার চক্রান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ‘২০ দফা ফিলিস্তিন পরিকল্পনা’ কোনো শান্তির রূপরেখা নয়। এটি ফিলিস্তিনিদের অধিকার, মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নতুন হাতিয়ার, যা ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী আগ্রাসনকে বৈধতা দিতে যাচ্ছে। গাজার ধ্বংসস্তূপ, পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি, এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা গণহত্যার ইতিহাসকে এই পরিকল্পনায় উপেক্ষা করা হয়েছে। বিশ্ব জনমতকে অবজ্ঞা করে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মানবিক অধিকার এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির কথাও এখানে নেই। উল্টো চাওয়া, ফিলিস্তিনিরা যেন আবারও নিরপরাধ ভিখারির মতো অবস্থানে পড়ে, সেটা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ পরিকল্পনার মূল ত্রুটিই হলো- প্রস্তাবটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। যে দেশ প্রতি বছর ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে এবং আন্তর্জাতিক আদালত ও নিরাপত্তা পরিষদ যেন ইসরায়েলকে ধরতে না পারে তা নিশ্চিতে নানান বেআইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেই দেশ কীভাবে ‘সৎ মধ্যস্থতাকারী’ হতে পারে? এটি যে মধ্যস্থতা নয়; এটি যে আদতে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর মার্কিনিদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। পূর্ব জেরুজালেম, যা ফিলিস্তিনের জাতীয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক হৃদয়, তা নিয়ে পরিকল্পনায় কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
পরিকল্পনাটিতে এমনকি গাজার পুনর্গঠনেও ফিলিস্তিনি জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরটি পুনর্গঠনের দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের হাতে না রেখে মার্কিন প্রকৌশল ও নির্মাণ কোম্পানিগুলোকে বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ, যা ধ্বংসের হাত থেকে ফিলিস্তিনিদের মুক্তি তো নিশ্চিত করবেই না, তার বদলে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে হাজার কোটি ডলার কামানোর সুযোগ করে দেবে মার্কিন কোম্পানি ও তাদের অংশীদারদের।
ইসরায়েলি গণহত্যা, বাড়ি উচ্ছেদ, গ্রেফতার, হত্যা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা- দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই সব নিপীড়নের সুরাহাও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় হচ্ছে না। বরং এটিকে ইসরায়েলের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেন আন্তর্জাতিক বিচার ও তদারকি এড়ানো যায়।
ইতিহাস প্রমাণ করেছে, পূর্বের ব্যর্থ শান্তি চেষ্টাগুলো ফিলিস্তিনিদের অসদিচ্ছার কারণে হয়নি। সেগুলো ছিল ইসরায়েলের ভূমি দখলকে বৈধতা দেওয়ার ছলচাতুরি। ক্লিনটন প্রশাসনের আলোচনা থেকে অসলো চুক্তি- সবই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং ক্ষমতার ছলচাতুরির লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছিল। বর্তমান ‘২০ দফা পরিকল্পনা’ সেই ব্যর্থ কৌশলের পুনরাবৃত্তি। অতীতের ব্যর্থতা থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি।
ফিলিস্তিনিরা চায় ন্যায্য সমাধান, মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি, নিজেদের ভিটে, ঘরবাড়ি, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের সুরক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের চাপ কিংবা এ ধরনের ছলচাতুরি কখনো তা দিতে পারবে না। যতক্ষণ ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের সব প্রশ্নের উত্তর সততার সঙ্গে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে না, ততক্ষণ এই পরিকল্পনা কোনো কাজেই আসবে না। এগুলো সংঘাতকে টিকিয়ে রাখবে এবং ক্রমশ ফিলিস্তিনিদের অধিকার আরও লোপ করার চেষ্টা চালানো হবে।
মনে রাখা দরকার, ফিলিস্তিনিদের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি, ন্যায্যতা এবং সমান মর্যাদা ছাড়া কোনো শান্তি সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই পরিকল্পনা নয়; ফিলিস্তিনিদের দাবি ও ন্যায়ের প্রশ্নই একমাত্র পথ। ইসরায়েলের গণহত্যা, বাড়ি উচ্ছেদ, সামরিক আগ্রাসন বন্ধ ও সেগুলোর জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে কোনো পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। এখন সময় এসেছে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার।
ফিলিস্তিনিরা যে শান্তি, মর্যাদা ও ন্যায্য রাষ্ট্র চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই নতুন প্রস্তাব তা দিতে পারবে না। যে কারণে বিশ্ববাসী, এবং ন্যায্যতাকে সমর্থনকারী সকল মানুষকে এখনও সতর্ক থাকতে হবে এবং ফিলিস্তিনিদের ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।
সম্পাদকীয়
অবিলম্বে এই অমানবিক কাজ বন্ধ হোক
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন