সিপিবির গভীর শোক ও শ্রদ্ধা

বীর মুক্তিযোদ্ধা লীনা চক্রবর্তীর জীবনাবসান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও কন্ট্রোল কমিশনের সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, কৃষক আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড লীনা চক্রবর্তী আর নেই। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে সাভার এনাম মেডিকেলে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গত ৪ অক্টোবর ২০২৫ দুপুর ১টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কমরেড লীনা চক্রবর্তীর মৃত্যুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে গভীর শোক ও শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, কমরেড লীনা চক্রবর্তী এদেশের শোষিত নিপীড়িত শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে একজন নিবেদিত প্রাণ। তিনি এ দেশের কৃষক ও নারী আন্দোলনের একজন অনুসরণীয় অন্যতম নেত্রী। কমরেড লীনা চক্রবর্তী মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছার ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশ কৃষক সমিতির শোক: বাংলাদেশ কৃষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এ্যাড. এস এম এ সবুর ও সাধারণ সম্পাদক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন এক বিবৃতিতে কমরেড লীনা চক্রবর্তীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, কমরেড লীনা চক্রবর্তীর মৃত্যুতে এদেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি কৃষক আন্দোলনে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। লীনা চক্রবর্তীর সংক্ষিপ্ত জীবনী : লীনা চক্রবর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলার চাষাড়ায় মামার বাড়িতে ১৯৩৭ সালের ২৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বাবু বিজয় ভূষণ চ্যাটার্জী ছিলেন ১৯৫৪ সালে তৎকালীন ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত নরসিংদীর এমএলএ। তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। স্বদেশি আন্দোলনের দায়ে তিনি কয়েকবার জেলেও গিয়েছেন। জড়িত ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে। ছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। মা নিহার কনা চ্যাটার্জী ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে লীনা চক্রবর্তী সবার বড়। তার ছেলেবেলা কেটেছে তৎকালীন ঢাকা জেলার বর্তমান নরসিংদী জেলার পলাশ থানার ঝিনারদিবাজারে। ছেলেবেলা থেকেই একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মাঝে বেড়ে উঠতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার বাবা সর্বহারা মানুষের জন্য ঝিনারদিবাজারে একটি লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। সেখান থেকে খিচুড়ি রান্না করে মানুষের মাঝে বিতরণ করা হতো। সেই লঙ্গরখানার স্মৃতি অল্প অল্প মনে করতে পারতেন লীনা চক্রবর্তী। বাবার এই মহৎ কর্মটিই পরবর্তীতে লীনা চক্রবর্তীকে বিভিন্ন বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ১৯৫০ সালে তার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর সেই সময় টাইফয়েডে তার মা মারা যান। সংসার দেখাশোনার পুরো ভার এসে পড়ে লীনা চক্রবর্তীর উপরে। একমাত্র ছোট ভাইয়ের বয়স তখন মাত্র তিন মাস। সংসার, ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা সব মিলিয়ে লীনা চক্রবর্তীর ছেলেবেলা আর সবার ছেলেবেলার মতো দূরন্তপনায় কাটেনি। তৎকালীন সময়ে সামাজিকভাবে অধিকাংশ জায়গায় স্কুলে মেয়েদের লেখাপড়া করার সুযোগ ছিলো না। মূলত বাবার প্রবল ইচ্ছার কারণে ১৯৫৩ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে প্রাইভেটে মেট্রিক পাস করেন লীনা চক্রবর্তী। পরবর্তীকলে বিয়ের পরে প্রাইভেটেই ইন্টারমিডিয়েট ও অনার্স পাস করেন। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সুরেশ চন্দ্র ব্রিটিশ মিলিটারির একজন কর্মকর্তা। পরবর্তীতে পাকিস্তান মিলিটারিতে যোগ দেন। সেই সূত্রেই পাকিস্থানের বেলুচিস্থান প্রদেশের রাজধানী কোয়েতায় লীনা চক্রবর্তী স্বামীর সাথে তিন বছর কাটিয়েছেন। লীনা চক্রবর্তী এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জননী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লীনা চক্রবর্তীর স্বামী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন। অপরদিকে তার বাবা বিজয় চ্যাটার্জীও আত্মগোপনে। এমন অবস্থায় তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা লীনা চক্রবর্তী বর্ডার পার হয়ে আগরতলা চলে যান। সময়টা ৭১’র এপ্রিল মাস। সেখানে গিয়ে ওঠেন আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের থাকার জন্য ক্যাডেট হোস্টেলে। কিছুদিন থেকে বাবা বিজয় চ্যাটার্জীর সাথে দেখা করতে সেখান থেকে ট্রাকে চড়ে তিন ছেলে-মেয়েকে সাথে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। কলকাতায় পৌঁছুতে পাঁচদিন সময় লাগে। এই পাঁচ দিনে তারা দাঁড়িয়েই গেছে এবং পাঁচ দিনে মাত্র একদিন ভাত খেতে পেরেছিলেন। কলকাতায় গিয়ে হিসাবরক্ষক হিসেবে যুক্ত হন সেখানে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা তথ্য বেতার কেন্দ্রে। বেতার কেন্দ্র থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে যেতে থাকেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হওয়ার কারণে মে মাসের দিকে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একমাত্র ট্রেনিং ক্যাম্প ‘গোবরা ক্যাম্পে’ যোগ দেন। কিন্তু অস্ত্রের স্বল্পতার কারণে সরাসরি গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার লক্ষ্যে বিশ্রামগঞ্জ নার্সিং ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং নেন। অপরদিকে তাজউদ্দীন আহমদের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেয়ার জন্য নারীদের সংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করেন। এরই ফলশ্রুতিতে প্রায় সাড়ে তিনশো নারী গোবরা ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নেন। লীনা চক্রবর্তী ১৯৬৪ সালে ঢাকার হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন-এ কর্মজীবন শুরু করেন। এই প্রতিষ্ঠানেই তিনি ৩০ বছর চাকরি করে ১৯৯৪ সালে অবসর নেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতিস্বরূপ নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সাভার সেনাবাহিনী থেকে তাকে সম্মাননায় ভূষিত করে। জীবনের পুরোটা সময় লীনা চক্রবর্তী কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য এবং বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পরেও মানবসেবায় যুক্ত থাকার জন্য তিনি নিজের দেহখানিও দান করে গেছেন হাসপাতালে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..