গণতন্ত্র কায়েমে বৃহত্তর ঐক্যের লড়াই অনিবার্য
ডা. সাজেদুল হক রুবেল
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান কোন ‘মেটিকুলাস প্ল্যান, আর ওয়েল ডিজাইন’ এর ফসল ছিল না। দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রহীনতা, শাসক শ্রেণির বেশুমার দুর্নীতি-লুটপাট, বিচারহীনতার সংস্কৃতি গণমানুষের ক্ষোভকে চরম স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। শ্রমিকের ন্যূনতম মানবিক মজুরিসহ তার সকল অধিকার, কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাবি- এইসব ক্ষেত্রেই স্বৈরাচারী সরকারের উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় নি।
বিক্ষুব্ধ মানুষ সরকার পরিবর্তনের যে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবে, সে রাস্তাও শাসক দল বন্ধ করে দিয়েছিল। টানা তিনবার প্রহসনের নির্বাচন, মানুষের ভোটের অধিকার কে পদদলিত করেছে। খুন-গুম-ধর্ষণ তো ছিলই। পুঞ্জীভূত এই বিক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ চব্বিশের এই অভ্যুত্থান।
দিনবদলের যে স্বপ্ন জাতি দেখা শুরু করেছিল, আজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাত্র ১০ মাসেই তা দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হতে চলেছে। কতক অতিশয়োক্তি মানুষকে বিভক্ত, বিভ্রান্ত, বিক্ষুব্ধ করেছে। আগস্ট ২০২৪-এ ড. ইউনূস দেশে ফিরেই এ অভ্যুত্থানকে বলে বসলেন ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের সামনে ঘোষণা করলেন, এই আন্দোলন নাকি সুগভীর, দক্ষ, চাতুর্যপূর্ণ পরিকল্পনার ফসল, দেশবাসীর কাছে সম্পূর্ণ অজানা অপরিচিত এক ব্যক্তিকে পৃথিবীর মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিলেন আন্দোলনের মস্তিষ্করূপে। সে সফরেই ভয়েস অব আমেরিকার সাক্ষাৎকারে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার প্রশ্নে তিনি বলে বসলেন- রিসেট বাটন পুশের কথা। আন্দোলন-অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে রীতিমতো বিকৃত করবার ধৃষ্ঠতম কাজ ড. ইউনূস করেছেন।
গণতান্ত্রিক, বামপন্থি, কমিউনিস্টসহ দেশের আপামর চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ জানতেন শাসকদলের পরিবর্তন হয়েছিল মাত্র। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্যে বাংলাদেশকে আরো পথ পেরোতে হবে। কিন্তু এসময়কার ঘটনাবলি, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সমর্থকদের কর্মকাণ্ড, প্রবণতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথকে ক্রমশ দুর্গম করে তুলছে।
মাসখানেক পূর্বে বর্তমান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা দেশবাসীকে একটা আশার কথা শুনানোর চেষ্টা করেছিলেন- মায়ানমারের জান্তা সরকার নাকি কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশে অবস্থানরত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিবে।
খলিল সাহেবের এই বক্তব্যে দেশের ন্যূনতম সচেতন মানুষদের হাসির উদ্রেক করে। কারণ জান্তা সরকার যে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে, তার ৯০%-এর অধিক অঞ্চল বিদ্রোহী আরাকান বাহিনীর দখলে। এমনকি বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের সীমান্ত রেখাও আরাকান বাহিনীর কব্জায়। উলটো গত মাস দেড়েকে প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গারা নতুন করে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে- বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এই আরাকানীরা প্রচণ্ডভাবে মুসলিম রোহিঙ্গা বিদ্বেষী। তারা রোহিঙ্গাদের বহিরাগত বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে বহু পূর্ব থেকেই। আবার গত দুই বছর আরাকান বাহিনী যখন কেন্দ্রের জান্তা সরকারের সাথে লড়ছিল, তখন রোহিঙ্গা মায়ানমারের জান্তা সরকারের তাঁবেদারি করেছিল। জান্তা সরকারের পক্ষে গিয়ে আরাকান বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিল। শেষতক জান্তা সরকারের বাহিনী ও রোহিঙ্গা উভয়ই যুদ্ধে প্রায় পরাস্ত।
এরমধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বিপজ্জনক পরিকল্পনা শোনালো দেশবাসীকে। তা হলো বাংলাদেশ ‘মানবিক করিডোর’ দিবে রাখাইন রাজ্যে। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ বা মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় নাকি এই উদ্যোগ। অর্থাৎ রসদ পৌঁছাবে আরাকান বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলে। রসদ কি শুধুই ত্রাণ-সাহায্য নাকি অস্ত্রশস্ত্র। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা ব্যতিরেকে এতো বড় এক ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে চলেছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট আরাকান বাহিনী আর অপরদিকে চীনের পুরাতন মিত্র জান্তা সরকার। বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর প্রক্সিযুদ্ধ ক্ষেত্র।
এ অঞ্চল নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা বহু পুরাতন। বার্মা অ্যাক্ট কিংবা কোয়াড, সবকিছুর মূল লক্ষ্য চীনকে ঘিরে ধরা। বাণিজ্য যুদ্ধে চীনকে তারা পরাস্ত না করতে পারায় এবার তারা সমর যুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের জনগণকে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার কি জেনে বুঝে এ বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
আর এর সাথে সমান্তরালে চলছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুড়িং টার্মিনালকে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডে হাতে তুলে দেবার পাঁয়তারা। করিডোর-বন্দর প্রসঙ্গে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একগুঁয়ে আচরণ, রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে এ বিষয় আলোচনাকে এড়িয়ে যাওয়া- জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এর প্রতিবাদে কমিউনিস্ট পার্টি সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে।
করিডোর-বন্দর না দেওয়া ডিসেম্বর ২৫-এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, ইত্যাদি জনদাবি যখন সরকারকে চাপে ফেলে তখন হঠাৎই জনৈক ছাত্রনেতা প্রধান উপদেষ্টার যমুনা বাসভবন ঘেরাও করে আন্দোলন শুরু করেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে তিনদিনের মতো আন্দোলন চলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা, শীতল বাতাস, সুপেয় পানি দিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আন্দোলন সফল হয়েছে। নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে।
এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে চান বলে এনসিপির নেতার বরাতে মানুষ জানতে পারে। আবার উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন জানান- প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের সাথে প্রধান উপদেষ্টার কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। দেশবাসী প্রধান উপদেষ্টার এহেন রহস্যময় আচরণকে নেতিবাচকভাবেই দেখেছেন। অনেকেই একে নাটক বা পাতানো খেলা বলে মন্তব্য করেছেন।
সম্প্রতি রায় বেড়িয়েছে, রিভিউ আপিলে মুক্তি পেয়েছে একাত্তরের হানাদার পাকিস্তানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অংশ নেওয়া আল বদর বাহিনীর নেতা রাজাকার এ টি এম আজহারুল ইসলাম। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেবার পাঁয়তারা অগ্রসর হচ্ছে।
এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্র ইউনিয়নসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলা করে জামাত শিবিরের কর্মীরা।
বিএনপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ প্রায় সকল দলই যখন ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি করছেন অনেকদিন থেকেই। প্রধান উপদেষ্টা তখন জাপানে বসে বলছেন- ‘একটি মাত্র দল’ শুধু ডিসেম্বরে নির্বাচন চায়। এই বক্তব্য দেবার মাধ্যমে তিনি অসত্য বলেছেন ও দুরভিসন্ধিমূলক প্রবণতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্তরণে এহেন শাসকগোষ্ঠী আসলে কতটা আন্তরিক, জনমনে সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আদতে গণতন্ত্র কায়েমের লড়াইয়ে সমবেত হওয়া ছাড়া মেহনতি মানুষের বিকল্প নেই। এ লড়াইে প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক ও বামপন্থি শক্তিকে বৃহত্তর বলয় সৃষ্টি করে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।
প্রথম পাতা
‘আষাঢ়ের গর্জনে নবযাত্রার ডাক বৈষম্য বিনাশে মানুষ জেগে থাক’
হাম ও উপসর্গে প্রাণহানি থামছে না
বাজেটে বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানা চালু করার বরাদ্দ দিতে হবে
বাজেটের শ্রেণি চরিত্র
‘মিরাকল প্রতিমন্ত্রী’
ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে চিকিৎসাধীন কমরেড সেলিম
‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’ স্লোগানে বর্ষা উৎসব
সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
বিশ্বকাপে ফিফাকে ভক্তদের দুয়ো
প্রাথমিকে পরীক্ষার ফি বাতিল এবং সঙ্গীত-চারু-কারুকলার শিক্ষক নিয়োগের দাবি
মানুষের মুক্তির জন্য বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আনতে হবে
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন