ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো
মনজুরুল হক
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ও পাকিস্তান ভূখণ্ডে ভারত যে এয়ার অ্যাটাক করেছে সেটা যুদ্ধ নয়। ছোট একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, যেটা ‘ল’ অব রিটালিয়েশন’ অনুযায়ী ২২ এপ্রিল রাতে বা ২৩ এপ্রিল সকালেই করা উচিৎ ছিল।
ভারত সেটা করেনি ‘চাণক্যনীতি’ অনুসারে। প্রথমে নিজেদের সামরিক, লজিস্টিক, কূটনৈতিক, বৈশ্বিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, জিওস্ট্রাটিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট সংহত করেছে। ইতোমধ্যে শত্রুপক্ষের সঙ্গে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ চালিয়ে শত্রুকে ‘প্যানিকড’ করেছে।
এরপর সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত করেছে। চেনাব (চন্দ্রভাগা) নদীর জল বন্ধ করেছে। আবার কাশ্মীরের ঝিলাম নদীর পানি ছেড়ে দিয়েছে, যেন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ সেচ ও কৃষি হয় পূর্ব দিকের নদীর (ঝিলাম, চেনাব ও সিন্ধু) পানিতে।
পানিচুক্তি স্থগিত করার আগেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ হুংকার দিয়েছিলেন-“পানি বন্ধ করলে সেটা হবে অলআউট যুদ্ধ। পাকিস্তান নিউক্লিয়ার আক্রমণ করবে”। তবে ভারত পানি বন্ধ করার ১০ দিন পরও নিউক্লিয়ার হামলা করেনি।
তার বদলে শাহবাজ শরীফ মুসলিম বিশ্বসহ বিশ্বের সকল সুপার পাওয়ারের কাছে ধর্না দিয়ে অনুরোধ করেছে- ‘এখনই ভারতের এস্কালেশন থামান’। সুপার পাওয়ারদের কেউ সেই আবেদন-নিবেদনে সাড়া দেয়নি। মুসলিম বিশ্বে শুধুমাত্র তুরস্ক একটা যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে, আর ইরান-মালয়েশিয়া ‘সর্বতোভাবে পাশে আছি’ বলেছে।
এদিকে, পেহেলগাম হামলার পরপরই পাকিস্তান তার গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনগুলোকে বালুচ ফ্রন্ট লাইন, খাইবার পাখতুনখোয়া ফ্রন্ট লাইন থেকে সরিয়ে চড়ক এর মুজাফরাবাদ ও মিরপুরে ডেপ্লয় করেছিল। তার ফলে বালুচ লিবারেশন আর্মি করাচি-কোয়েটা হাইওয়ের দখল নিয়েছে। পাকিস্তানি পুলিশ ফাঁড়িগুলো খালি করে পুলিশরাও সরে এসেছে।
পাকিস্তান জানতো, যেহেতু ভারত প্রথমেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করবে না, তারা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট ও নারিশ করা সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর হামলা করবে, তাই পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বার প্রধান হাফিজ সাইদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়েছে। তাকে লাহোরের মাদরাসা, মসজিদ আছে এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাঙ্কারে রেখেছে এবং ঘন ঘন তার অবস্থান পরিবর্তন করছে।
এই যুদ্ধ নিয়ে সবিস্তারে পরে আলোচনা করা যাবে। আপাতত কয়েকটি বিষয় আমাদের মানে বাংলাদেশিদের জেনে রাখা ভালো।
১। এটা হবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, ফলে তা পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, কারণ পাকিস্তানে শাহবাজ শরীফ প্রধানমন্ত্রী হলেও সকল ক্ষমতা আর্মি চিফ আসিম মুনিরের হাতে। তিনি ধমীয় উগ্রবাদে বিশ্বাসী। তিনিই পেহেলগাম আক্রমণের পাঁচদিন আগে ঘোষণা করেছিলেন- “হিন্দুদের সঙ্গে আমরা মুসলিমরা সকল দিক থেকেই আলাদা। হিন্দুদের সঙ্গে জং লড়া আমাদের জিহাদ, আমাদের কর্তব্য, এবং সেটা আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে ভালোভাবে শেখাতে হবে। আমরা প্রয়োজনে হিন্দুস্তানের বিরুদ্ধে হাজার বছর যুদ্ধ করবো”।
২। আসিম মুনিরের প্ল্যানই ছিল ৫ আগস্টের পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশ তাদের ৫৩ বছর বছর আগের ‘হারিয়ে যাওয়া ভাই’কে ফিরে পাওয়া। পেহেলগাম ঘটনার কারণে সেই ভাইকে নিয়ে মাখামাখি একটু কমে গেলেও তিনি এখনো বাংলাদেশকে ‘আরেকটি নিজস্ব ফ্রন্ট’ হিসেবে ভেবে নিয়ে এখান থেকে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’-এ আক্রমণ করে বসতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি ইউজ করতে চাইবেন ‘ননস্টেট অ্যাক্টর’দের। এর আভাস মেলে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ফজলুর রহমানের কথায়। যিনি কি না সম্প্রতি বলেছেন- “ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করলে বাংলাদেশের উচিৎ হবে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্য দখল করে নেওয়া।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাদুজ্জামান তো অনেক আগে থেকেই পাকিস্তান থেকে কয়েকটা এটম বোমা এনে ভারতকে ভয় দেখানোর তত্ত্ব দিয়ে আসছেন। এখন বাংলাদেশ থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ননস্টেট অ্যাক্টরদের দিয়ে হামলা শুরু হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশও সরাসরি ভারতের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়বে।
৩। যে কোনো ওয়ারফেয়ারের মেইন পাওয়ার স্যুইচ অর্থনীতি। ভারত যুদ্ধে জড়ালে তার অর্থনীতি ড্যামেজ হবে। খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। তাই সে তার সমস্ত খাদ্য রফতানি বন্ধ করে দেবে। সেটা হলে বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। পাকিস্তান-মিয়ানমার দুদেশের কেউই এক ছটাক খাদ্য সহায়তা দেবে না।
৪। পাক-ভারত যুদ্ধে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কোনো প্ররোচনায় পা দেবে না। সরকারও হয়তো পা দিতে চাইবে না, কিন্তু সরকারকে যারা সরকারে বসিয়েছে সেই ননস্টেট অ্যাক্টররা নাক গলাবেই। আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে যাবে না ইউনূস সরকার। আদতে তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তার হাতে নেই।
৫। একে তো রাখাইনে করিডোর দিয়ে এক মহা ঘোলাটি পরিস্থিতি পাকিয়ে বসেছে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতেও পারছে না বা পারবেও না। দেশের ওই অঞ্চল এখন কার্যত ‘হাতছাড়া’। তার ওপর পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে যদি কোনোভাবে এখানকার রেডিক্যাল ইসলামিস্টরা নাক গলিয়ে বসে তাহলে তার মাশুল গুনতে হবে সাধারণ জনগণকে, এবং চড়া মূল্য দিয়ে।
ইতোমধ্যেই মধ্যবাম লিবারেলরা কাছা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে! পেহেলগামে নিরীহ ২৬ জন পর্যটককে নির্মমভাবে নাম, ধর্ম, কলেমা পড়তে পারে কি না, দেখে দেখে হত্যা করার ঘটনায় এরা হিরন্ময় নীরবতা পালন করেছিল। আজকে যেই ভারত হালকা একটা অ্যাটাক করেছে, ওমনি এইসব তালেবররা কী-বোর্ড নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। এরা এখন আন্তর্জাতিক আইন-আদালত, মানবতা, যুদ্ধ নয় শান্তির বাণী বর্ষণ করবে। ওসব দিয়ে শিশু হত্যার ছবি বানাবে। অর্থাৎ, ইমোশনাল গেম খেলতে নেমে যাবে।
লেখক : রাজনীতিক
অভিমত
যে পথে আসবে মুক্তি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন