প্রগতি লেখক সংঘ ও লেখক-শিল্পীদের ধারাবাহিক ভূমিকা
গোলাম কিবরিয়া পিনু :
ভারতবর্ষে প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৩৬ সালে লক্ষ্ণৌয়ে। সে বছর ১০ এপ্রিল জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন স্থলের পাশে সর্বভারতীয় এক সাহিত্যিক-সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ। এই সংঘ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের যে সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব ছিল পরাধীন দেশে এবং পরবর্তীতেও এর প্রভাব বিভিন্ন পর্যায়ে অনুঘটকের ভূমিকায় দোদীপ্যমান হয়ে থাকে।
প্রগতি লেখক সংঘের ঘোষণার কিছু অংশ, যা আজও প্রাসঙ্গিক, তা উল্লেখ করছি–‘আমাদের দেশে নানা মূর্তিতে যে প্রগতিদ্রোহ আজ মাথা তুলেছে তাকে আমরা সহ্য করব না।... যা কিছু আমাদের নিশ্চেষ্টতা, অকর্মণ্যতা, যুক্তিহীনতার দিকে টানে, তাকে আমরা প্রগতিবিরোধী বলে প্রত্যাখান করি। যা কিছু আমাদের বিচার-বুদ্ধিকে উদ্বুদ্ধ করে, সমাজব্যবস্থাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে পরীক্ষা করে, আমাদের কর্মিষ্ঠ, শৃঙ্খলাপটু, সমাজের রূপান্তরক্ষম করে, তাকে আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করব।’
ঘোষণায় আরও বলা হয়েছিল-‘মানবের মানবত্বকে আশঙ্কিত ধ্বংসের মুখ হইতে রক্ষা করিতে হইলে সব মানবের সংহত চেষ্টা প্রয়োজন। যাহার বাহুতে বল আছে, চিত্তে আছে যার ধীশক্তি ও ভাবুকতা, কণ্ঠে আছে যার বাগ্মিতা, লেখনী যার শক্তিমান–সকলের সমবেত চেষ্টা আজ প্রয়োজন–মানবের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রগতিকে দৃপ্ত শক্তির মূর্ত অকল্যাণের হস্তে আসন্ন ধ্বংস হইতে রক্ষা করিবার।’
এই লেখক সংঘের কর্মকাণ্ডের প্রেষণায় লেখক-শিল্পীদের মধ্যে যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় অসম্প্রদায়িকবোধ, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা, যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবোধের ভিত্তিমূল পাকিস্তান আমলেও ছিন্ন হয়নি। পঞ্চাশ-ষাট দশকে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত থাকা অগ্রসর কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরা গৌরবের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা এবং তাঁদের উত্তরাধিকারেরা এখনো সক্রিয়।
“একথা অনস্বীকার্য যে ‘প্রগতি’-র একটি সর্বজনগ্রাহ্য সাধারণ অর্থ যদি হয় বৌদ্ধিক চেতনার অগ্রসরমানতা এবং সমাজজীবনে যুক্তিবাদ-উদারনৈতিকতা-ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও মানবতাবাদের সঞ্চার, তবে নিঃসন্দেহে ভারতীয় সাহিত্যে প্রগতিশীলতার সূত্রপাতে ঊনবিংশ শতাব্দীর ডিরোজিও এবং ‘বঙ্গীয়-রেনেসাঁস’ লালিত বাংলা সাহিত্যের বিকাশের যুগের কিংবদন্তীতুল্য সাহিত্যিকগণ ও তাঁদের সাহিত্যকর্মগুলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। রামমোহন রায়ের ধর্ম-নিরপেক্ষ গদ্য-সাহিত্য থেকে মাইকেল মধুসূদনের বিদ্রোহী কাব্যসাহিত্য; প্যারীচাঁদ মিত্র ও বিদ্যাসাগরের সমাজ-সংস্কারের হাতিয়ার-সাদৃশ প্রহসন ও জ্ঞানগর্ভ সর্ন্দভগুলি থেকে দীনবন্ধু মিত্র-র নীলদর্পণ; মীর মোশারফ হোসেনের রচনা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’, ‘গোরা’ ও ‘চার অধ্যায়’ এবং অক্ষয়কুমার দত্ত, প্রমথ চৌধুরী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো আরো বহু বাঙালী বিদ্বানের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে ভারতবর্ষের প্রগতি-সাহিত্য চর্চা। ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র (১৮৫০-১৮৮৫)-র মতো হিন্দি ভাষার সাহিত্যিক-সম্পাদকদের সেকালের ভূমিকাও এ-প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। পরে বিংশ শতাব্দীতে উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যে এসে গিয়েছিলেন প্রেমচন্দ (১৮৮০-১৯৩৬), সুমিত্রানন্দন পন্থ (১৯০০-১৯৭৭) প্রমুখ। তামিল, মালায়লাম ও মারাঠি সাহিত্যেও তখন রূপান্তর ঘটছিল। সব্রমনিয়াম ভারতী (১৮৮২-১৯২১) দক্ষিণী-কাব্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। সাহিত্যে প্রগতি চেতনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য স্পষ্টতর হয়ে ওঠে স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাহিত্য-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। অক্ষয়কুমার মৈত্র, সখারাম গণেশ দেউস্কর, কৃষ্ণকুমার মিত্র, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সরলাদেবী চৌধুরাণী তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলীতে এই প্রথম প্রত্যক্ষভাবে ঔপনিবেশিকতাণ্ডবিরোধী উপাদানগুলি জাতীয়তাবাদকে আশ্রয় করে নতুনতর সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে তুলতে সফল হয়েছিল, যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।” (সুন্নাত দাশ, প্রগতি লেখক সঙ্ঘ ফিরে দেখা ৭৫)
আমরা লক্ষ্য করি, বিশের দশকে ম্যাক্সিম গোর্কির রচনাও সেই সময়ের ভারতীয় সাহিত্যিকদের বিশেষভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্ফর আহমদ তখন সদ্য-যুদ্ধ ফেরত হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতাকে কেন্দ্র করে সান্ধ্য নবযুগ-এর পৃষ্ঠায় নিপীড়িত মানুষের বেদনা-ক্ষোভকে নতুন ভাষায় প্রকাশ করলেন। প্রকাশিত হলেন জগদীশ গুপ্ত, হেমন্ত কুমার সরকার, প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো নতুন যুগের লেখকরা। ‘সংহতি’, ‘আত্মশক্তি’, ‘বিজলী’, ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’, ‘লাঙ্গল’, ‘গণবাণী’, ‘নবশক্তি’, ‘বঙ্গবাণী’ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় নতুন ভাবনার সাহিত্য প্রকাশিত হতে থাকল। অগ্রসর চেতনার ভিত্তিমূল নিয়ে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা নির্ভর সাহিত্যের দিগন্ত উন্মোচিত হতে থাকল।
১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘ-এর ভিত্তিমূল তৈরি হয়েছিল ১৯৩২-৩৩-৩৪ সালে লন্ডনে। সেখানে মুল্ক্রাজ আনন্দ, সাজ্জাদ জহীর, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ভবানী ভট্টাচার্য, ইকবাল সিং, রাজা রাও, মহম্মদ আশ্রফ প্রমুখ লন্ডন-প্রবাসী ভারতীয়-ছাত্ররা উদ্যোগী হয়েছিলেন। এঁরা অনুপ্রাণিত হোন রোমাঁ রোল্যাঁ, বারব্যুস, গোর্কি, ফর্স্টার, স্ট্রাচি প্রমুখ মনস্বীদের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের আহ্বানে এবং হ্যারল্ড ল্যাক্সি, হাবার্ট রীড, মন্টেগু শ্যাটার, রজনীপাম দত্ত প্রমুখ বিদেশী মার্কসবাদী বন্ধুদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ আলাপ আলোচনার মাধ্যমেও। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে জর্জি ডিমিট্রভ ততদিনে (১৯৩৫) ‘সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুক্তফ্রন্ট’-তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৩৬-এর এপ্রিলে লক্ষ্ণৌতে মুন্সী প্রেমচন্দ-এর সভাপতিত্বে গঠিত হলো নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ। প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠায় মার্কসীয় বুদ্ধিজীবী ও কমিউনিস্টদের সক্রিয় উদ্যোগ ছিল। তৎকালে বামপন্থী রূপে পরিচিত কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরুরও ছিল পরোক্ষ উৎসাহ। সদ্য ইউরোপ-প্রত্যাগত সাজ্জাদ জহীর, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়রা ছিলেন এর নেতৃত্বে।
১৯৩৫ সাল থেকেই ইউরোপে ফ্যাসিবাদী আক্রমণ শুরু হয়। ইতালি ১৯৩৫-এ আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) এবং জার্মানি স্পেনের ওপর হামলা শুরু করে। তখন শিল্পী পাবলো পিকাসো প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ছবি এঁকে। ১৯৩৬-এর ৩রা সেপ্টেম্বর রোমা রল্যাঁর আহ্বানে ব্রাসেলস শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলন, তাতে বলা হলো :
‘পৃথিবীর সম্মুখে আজ আতঙ্কের মতো আর এক বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা সমুপস্থিত। ফ্যাসিস্ত স্বৈরতন্ত্র মাখনের বদলে কামান তৈরিতে মগ্ন। তারা সংস্কৃতির বিকাশের বদলে বিকশিত করছে সাম্রাজ্য জয়ের উন্মাদ লালসা, প্রকাশ করছে নিজের হিংগ্র সামরিক স্বরূপকে।’
বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ অবশ্য ১৯৪২সালের ২৮শে মার্চ তারিখে কলকাতায় তরুণ কমিউনিস্ট লেখক সোমেন চন্দ-এর স্মরণসভা থেকে নাম বদল করে ফ্যাসিস্ত-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে পরিণত হয়। লেখক সোমেন চন্দ ঢাকার রাজপথে নির্মমভাবে নিহত হোন ৮ই মার্চ, ১৯৪২। এর আগের বছর জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের উদ্যোগে স্থাপিত হয় সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি। ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। সারা ভারতজুড়ে সৃষ্টি হয় এক মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিজাত জাগরণের। যুদ্ধ, মন্বন্তর, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রগতি লেখক সংঘ ছিল এই সাংস্কৃতিক জাগরণের মূল ও পথ-নির্দেশক শক্তি।
১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’। এই ধারাবাহিকতায় সোমেন চন্দ, সতীশ পাকড়াশী, রণেশ দাশগুপ্ত, জ্যোতির্ময় সেনের উদ্যোগে প্রগতি লেখক সংঘ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪০ সালে গেন্ডারিয়া হাইস্কুল মাঠে প্রগতি লেখক সংঘ-এর প্রথম সম্মেলন করে। এতে কাজী আবদুল ওদুদ সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে রণেশ দাশগুপ্ত সম্পাদক এবং সোমেন চন্দ সহসম্পাদক নির্বাচিত হোন। ১৯৪১ সালে জার্মান কর্তৃক সোভিয়েট রাশিয়া আক্রান্ত হলে লেখক সংঘ তার প্রতিবাদে ব্যাপ্টিস্ট মিশন হলে ‘সোভিয়েট মেলা’ নামে সপ্তাহব্যাপী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এভাবেই এই সময় সংঘের কার্যক্রম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রগতি লেখক সংঘ দিনদিন আন্তর্জাতিক রূপ পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর রাজনীতিতে পরিবর্তন দেখা দিলে সংঘের কার্যক্রম বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পর ধীরে ধীরে প্রগতি লেখক সংঘের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়।
২০০৮ সালে দেশের কিছু প্রগতিশীল লেখকের প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ’ পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। সেসময় একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক কমিটি :
বদিউর রহমান (আহ্বায়ক), রতন সিদ্দিকী (যুগ্ম-আহ্বায়ক), মতলুব আলী, নিরঞ্জন অধিকারী, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, সোহরাব হাসান, ভীষ্মদেব চৌধুরী, বিশ্বজিৎ ঘোষ, সৈয়দ আজিজুল হক, মশিউল আলম, সৌমিত্র শেখর।
৮ আগস্ট ২০১৪ এ বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হোন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এবং কার্যকরী সভাপতি হোন কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন নাট্যকার ড. রতন সিদ্দিকী। এই কমিটির উদ্যোগে ইতিমেধ্যে ৩০টির অধিক শাখা সংগঠনও গড়ে ওঠে। লেখক হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে এর অবস্থান দৃঢ় হচ্ছে। আগামী ২৭ জানুয়ারি ২০১৭ তে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর তৎপরতায় গৌণভাবে গড়ে উঠছে ভিন্ন মার্কার শিল্প-সাহিত্য। এরফলে বাংলাদেশের ধারাবাহিক চেতনা-নির্ভর শিল্প-সাহিত্যের সজীব ও অগ্রসরমান ধারা তা কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন শুধু হচ্ছে না, সেই
চতুর্থ পৃষ্ঠার পর
ধারাকে চোরাস্রোতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক ধরনের স্বাপদনির্ভর উন্মাদনা তৈরি করা হচ্ছে। এই শিবিরের উগ্রতা ও সংগঠিত হওয়ার বাস্তবতা কি প্রগতিশীল কবি-লেখক-শিল্পীদের মধ্যে কোনো রকম প্রণোদনা সৃষ্টি করছে না?
অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদীদের লোলুপতা আর তৃষ্ণা, এর কবলে পড়ে সারাবিশ্ব আজ নয়া-ঔপনিবেশিক বাস্তবতার মধ্যে পড়ে গিয়ে সেই পুরনো অর্থনৈতিক শোষণ ও লুণ্ঠনের দিকটি উন্মোচন করছে। সাম্রাজ্যবাদ আজ প্রযুক্তি আয়ত্ত্বে নিয়ে, মিডিয়া দখল করে, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সারাবিশ্বে নেটওয়ার্ক তৈরি করে, সমর শক্তিতে বলিয়ান হয়ে তাণ্ডব-সন্ত্রাস চালাচ্ছে। ইরাক-লিবিয়াতে যে দখলী-ভণ্ডামী চলল, তা আমেরিকাসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মুখোশকে উন্মোচন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কি বাংলাদেশের কবি-লেখক-শিল্পীরা মূক ও বধির হয়ে থাকতে পারে।
আমরা জানি–শিল্প ও সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্নমুখী মতামত আছে। ভাবুক ও লেখক-সমালোচকের মধ্যে বোঝাপড়ার পার্থক্যও আছে। কোন্টা ভালো সাহিত্য বা শিল্প–তা নিয়েও তর্ক আছে। কিন্তু তারপরও বলি–দেশ ও মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কি কবি-লেখক ও শিল্পীদের কোনো ভূমিকা থাকবে না? তাঁরা কি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও অগ্রগতি চাইবেন না? নিশ্চয় চাইবেন। পূর্বেও তাঁরা নিজেদের বিবেক-তাড়িত ভূমিকা রেখেছেন, বর্তমানেও তাঁরা সেই ভূমিকা শাণিত রাখবেন, সেটা অনেকেরই আকাক্সক্ষা।
লেখক-শিল্পীরা সংগঠন সক্রিয়ভাবে করতে পারেন, না-ও করতে পারেন। তবে শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবাদর্শের লড়াইটা কখনো মোটা দাগে বা কখনো সূক্ষ্মভাবে চলতে থাকে। এ থেকে শিল্পী ও লেখকেরা কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। এই লড়াই থেকে যে শিল্পী-লেখকেরা দূরে থাকতে চান, তারা অজান্তে কোনো পক্ষের উঠানে গিয়ে উপস্থিত হোন অথবা কোনো পক্ষের সেবাদাস হয়ে পড়েন। আর এই ধরনের যে মানুষেরা শিল্প-সাহিত্যকে রাজনীতিবর্জিত করে রাখতে চান, তারা হয়তো জানেন না–রাজনীতি মানে শুধু মিছিল-সভা-শ্লোগান নয়। রাজনীতি একটি দৃষ্টিভঙ্গি–বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি।
শিল্প-সাহিত্যে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের বাঁকে নতুন নতুন শিল্প-সাহিত্য যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি সমাজের পরিবর্তনের ধারাকে উন্মুখ বা বিকশিত করতে শিল্প-সাহিত্যের এক ধরনের ভূমিকাও থেকে যায়। এইভাবে মিথস্ক্রিয়ায় শিল্প-সাহিত্য ও সমাজ উভয় পরিবর্তিত হয়।
শিল্প ও সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে বহু তাত্ত্বিক প্রগতিশীল দর্শন ও বিবেচনাবেধে নতুন নতুন সমস্যা চিহিৃত করেছেন, পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে, প্রগতিশীল নন্দনতত্ত্বের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য কয়েকটি সূত্রে তৎকালীন সোভিয়েতের নন্দনতাত্ত্বিক আনাতোলি ইয়েগেরোভ উল্লেখ করেছেন :
এই নন্দনতত্ত্ব জগতকে অতীন্দ্রিয়তা ও ভাববাদ থেকে মুক্ত করে বিজ্ঞানসম্মত এক অখণ্ড তাৎপর্য দান করেছে।
শিল্প-সাহিত্যকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে মানবমনে ও জীবনে শিল্প-সাহিত্যের ব্যাপক ও সক্রিয় প্রভাব অন্বেষণ করেছে–এই নন্দনতত্ত্ব।
সামাজিক অবস্থার গতি-প্রকৃতির সঙ্গে সাহিত্যের গতি-প্রকৃতিকে অভিন্ন সূত্রে পর্যালোচনা করাই এই নন্দনতত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ইয়েগেরোভ-এর এই সূত্রের ভিত্তিমূল হচ্ছে–দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। এই সূত্রের তাৎপর্য এখনো শিল্প-সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। তবুও এর বিপরীতে নন্দনতত্বের আরও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবে নন্দনতত্ত্বের নামে শিল্প-সাহিত্যে যথেচ্ছাচার কাক্সিক্ষত নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্যদিকে একচক্ষুবিশিষ্ট দানবের মত সাম্রাজ্যবাদেও সর্বগ্রাসী উন্মাতাল পদচ্ছাপে যখন পৃথিবী রক্তাক্ত ও লণ্ডভণ্ড, তখন প্রগতিশীল শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের যুথবদ্ধতা জরুরি হয়ে পড়েছ্। দেশ, পৃথিবী ও মানুষের কল্যাণে কমিউনিস্ট-অকমিউনিস্ট, মার্কসবাদী-অমার্কসবাদী, জাতীয়তাবাদী ও মানবতাবাদী প্রগতিশীল লেখক-শিল্পীদের এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশে প্রগতিশীল শিল্পী-লেখকদের অবস্থান অনেক শক্তিশালী, এই অবস্থানকে আরও সংহত করা প্রয়োজন। যদিও কেউ কেউ দলবৃত্তের সংকীর্ণতায় (দল করা অসমীচীন বলছি নে) ও স্বার্থপরতার চোরাস্রোতে নিমজ্ঝমান, যা মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতার জন্ম দিচ্ছে, এরফলে লেখক-শিল্পীদের সম্পর্কে ভিন্ন ধারণারও উৎপত্তি হচ্ছে। এই ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে লেখক-শিল্পীদের গণমুখী ও ঐতিহ্যবাহী ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ও মৈত্রীর সম্পর্ক সুদৃঢ় করাও জরুরি।
জার্মান লেখক ব্রের্টোন্ট বেখ্ট-এর নির্দেশনাকারী রচনা থেকে লেখক-শিল্পীদের জন্য প্রাসঙ্গিক বলে কিছুটা উল্লেখ করি :‘রচনা সৃষ্টির মাধ্যমে সংগ্রামে অবতীর্ণ হও। তুমি প্রমাণ করো যে সংগ্রামে নেমেছো! সেটাই হলো সবল বাস্তববাদ। বাস্তবতা রয়েছে তোমার দিকে, তুমি বাস্তবতার দিকেই থাকবে। সমগ্র জীবন কথা বলে উঠুক–এর ব্যত্যয় না ঘটে। বুর্জোয়ারা চায় না সামগ্রীক জীবনের মুখর প্রকাশ। তবু তোমার সাধ্য রয়েছে–সাধ্যের প্রকাশ ঘটুক। বাস্তবতাকে যেখানে নির্বাসনে দেওয়া হয়েছে, চকচকে প্রলেপে ঢেকে রাখা হয়েছে, সেখানে প্রলেপের আবরণ ছিঁড়ে ফেল! স্বগতোক্তি না করে মুখর প্রতিবাদ জানাও। আরও প্রতিবাদ তুলে ধর। তুমি স্বয়ং প্রাণবন্ত যুক্তির অধিকারী–বস্তুসম্মত যুক্তির চর্চাতেই জীবন সক্রিয়। নির্ভয় হও, যা সত্য তা বলবে।’
লেখক : কার্যকরী সভাপতি–বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন