সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর
আকমল হোসেন
২৫ জনুয়ারি ১৯৭২-এ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্ট হয়েছিলো, সেদিক থেকে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। সে সময়ের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর দেশে দেশে স¦াধীনতা এবং সকল ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলো সবার আগে। কারণ তারা ছিলো জার বা রাজতন্ত্রের শাসনে শোষিত। সেই অনুভূতি থেকেই হয়তো তারা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছিলো। কবির ভাষায় “কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভু আসি বিষে দংশনি যারে।” দুঃখ নির্যাতন আর বঞ্চনা যে ভোগ করেছে, তার জ্বালা তো সেই বুঝবে, উপলদ্ধি করতে শিখবে এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখবে। এর ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু নয়। তবে তার সংখ্যাগত অবস্থান খুব একটা বেশি নয়। পৃথিবীর বৃহৎ ভূখন্ডের অধিকারী (পৃথিবীর ৬ ভাগের ১ ভাগ)- ইউরোপ ও এশিয়ার অংশ নিয়ে গড়ে ওঠা ইউ-রেশিয়া। যার নাম ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। জারতন্ত্র/পুঁজিবাদ, লুটেরা সাম্রাজ্যবাদী শাসনের হাত থেকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের, মানুষ হিসেবে অধিকারের ব্যবস্থা করতেই বলশেভিকদের নেতৃত্বে ১৯০৪ সালে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল।
বিদ্রোহ/বিপ্লব সেবারের মত ব্যর্থ হলেও বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষ বলশেভিক/কমিউনিস্ট পার্টির ব্যানারে দাঁড়িয়েছিল মুক্তির প্রত্যাশায়। সর্বশেষে ১৯১৭ সালে বিজয় সূচিত হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। সব মানুষের জন্য আলিশান বাড়ি গাড়ি না জুটলেও মানুষ হিসেবে মানুষের যে বাসস্থান, শিক্ষা চিকিৎসা, মুক্তচিন্তÍা আর বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিল অতি অল্প সময়েই। তাই তো একসময়ের অখ্যাত দেশ রাশিয়া পৃথিবীর নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের আপনজনে পরিণত হয়েছিল। যেখানেই মানুষের ওপর মানুষের শোষণ, নির্যাতন আর বর্বরতা সেখানেই সোভিয়েত রাশিয়া ছুটে গেছে নির্যাতিত মানুষকে মুক্ত করতে। আমেরিকার মতো লুটপাট আর মুনাফার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে গেছে মানবিকতার দায়বদ্ধতা থেকে।
১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রামে সেই মানবিকতার কারণেই ছুটে এসেছিল অর্থ, অস্ত্র আর মানসিকতা নিয়ে। এটা অব্যাহত ছিল স্বাধীনতার শুরু থেকে শেষ অবধি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল, নির্বাচিতদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, ২৫ মার্চ ১৯৭১ নিরীহ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরচিত হামলার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়েই সোভিয়েত রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পদগর্নি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে এক পত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছিলেন। (১) যদিও সেটি কাজে আসেনি। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রাশিয়া জাতিসংঘে ভেটো প্রদানের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে নিরলসভাবে কাজ করেছে। পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে চীন, এ অবস্থায় ভারত তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকায় প্রাথমিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তার দেশে প্রবেশ ও থাকার ব্যবস্থা করলেও বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সে চাচ্ছিল এ যুদ্ধে রাশিয়ার সমর্থন। তবে আওয়ামী লীগের কর্মীদের নিয়ে গঠিত প্রবাসী সরকারকে সোভিয়েত রাশিয়া কীভাবে বিবেচনা করবে সে প্রশ্ন এসে যায়। কারণ, ৫০-এর দশকে আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুজিবসহ ছিলেন মার্কিন লবির রাজনৈতিক দল। ৭০-এর দশকে জোট নিরপেক্ষতার কথা বললেও তা রাশিয়ার কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে এ দুশ্চিন্তা ছিল ভারত ও আওয়ামী শিবিরে।
তবে বিবেকের দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বৈঠক এবং বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতিদানের দ্ব্যর্থহীন আহ্বান জানান। সোভিয়েত সমর্থন পেতেই একপর্যায়ে তাজউদ্দিন সরকার এ দেশের বামপন্থিদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে বহুদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছিলেন। যদিও বামপন্থিরা যুদ্ধের শুরুতেই মুক্তি সংগ্রামের জন্য অস্ত্রধারণ ও মুক্তিবাহিনীতে গিয়েছিলেন। আগস্টের ৯ তারিখে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকা দিল্লী সফর করেন এবং ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। (২)
সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে রাশিয়াতে মস্কো শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে (১ অক্টোবর) সোভিয়েত বার্তা সংস্থা তাস-সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা নির্যাতন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ ও নিন্দা জানায়। এ সময় পাকিস্তানি হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবাদ সভা অনুষ্টিত হয়। ১৬ অক্টোবর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “প্রাভদা” পত্রিকায় স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে উপমহাদেশে উত্তেজনার কারণ এবং এ উত্তেজনা বৃদ্ধির সব দায় সর্বত্রভাবেই পাকিস্তানের একার । ২৩ অক্টোবর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মার্কিনিদের এক প্রস্তাবের উত্তরে জানিয়ে দেন, শেখ মুজিবের মুক্তি এবং পূর্ব পাকিস্তানের দ্রত রাজনৈতিক নিষ্পত্তিসাধন ব্যতীত কেবল সীমান্ত অঞ্চল থেকে ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুদ্ধের আশংকা রোধ করা সম্ভব নয়। (৩)
২৭ অক্টোবর সোভিয়েত প্রতিনিধি ফিরুবিন ভারত সফর করে, এরপরই পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য ৩১ অক্টোবর সোভিয়েত বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল কুটাকভের নেতৃত্বে এক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সোভিয়েত সামরিক মিশন দিল্লি রওনা হয়। ১ নভেম্বর থেকে আকাশপথে ভারতে সোভিয়েত সামরিক সরবরাহ শুরু হয়। (৪)
পাকিস্তান তার পক্ষে চীনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিল। কিন্তু ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি উসুরি নদী বরাবর ৪০ ডিভিশন এবং সিংকিয়াংয়ের সীমান্তে আরো ৬-৭ ডিভিশন সৈন্য সোভিয়েত রাশিয়া মোতায়েন করে রেখেছিল, যে কারণে চীনের মুভ করা অনিশ্চিত হয়ে পরেছিল। ডিসেম্বর মাসে ৩-দফা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মার্কিনি যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভেটো প্রদান করে রাশিয়া। ফলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম নিয়ে মার্কিনী ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়। সর্বশেষ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবের বিপক্ষে রাশিয়া ও কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক দেশ অবস্থান গ্রহণ করে। এরপরই সংবাদ সংস্থা তাস মারফত সোভিয়েত সরকার উপমহাদেশে যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানকে সর্বাংশে দায়ী করে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আইনসঙ্গত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানান। এ সংঘর্ষ সোভিয়েত সীমান্তের সন্নিকটে সংঘটিত হওয়ায় এর সঙ্গে সোভিয়েত নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত বলে উল্লেখ করেন। পরিস্থিতির অবনতির রোধকল্পে বিদ্যমান পক্ষদ্বয়ের (মার্কিন, চীন) সঙ্গে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
ডিসেম্বর প্রথম সপ্তাহের দিকে নিয়াজির মনোবল অটুট রাখার জন্য পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি নিয়াজিকে চীনা হস্তক্ষেপের সংবাদ দিয়ে চলছিল । কিন্তু উত্তরের গিরিপথ এবং সিংকিয়াং সীমান্তে সোভিয়েত স্থল ও বিমান বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি চীনকে ভাবিয়ে তুলেছিল। ফলে চীন আক্রমণের দিকে অগ্রসর হয়নি। (৫)
পূর্ব পাকিস্তানে, পাকিস্তান বাহিনীর শোচনীয় অবস্থা , অন্যদিকে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে তখনও দেরি। এমন অবস্থায় পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ৯ ও ১০ ডিসেম্বর ২ দফা, সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভকে বার্তা পাঠিয়ে জানান যে, যেখানে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় যুদ্ধবিরতি, যাতে অনুসরণ করে, সে ব্যাপারে যেন ব্যবস্থা নেয়া হয় ।
অনেকটা হুমকির সুরে এ বার্তা পাঠান হয়েছিল। এর সঙ্গে নিক্সন আরও জানান, ভারত যদি এরপরও সম্মত না হয় তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। (৬)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানের পক্ষে সপ্তম নৌবহর প্রেরণের হুমকির পরপরই সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নৌবহর কে সতর্ক করে এবং রাশিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে আগত রুশ যুদ্ধ জাহাজ ও সাবমেরিন তাদের হাতে মহাসাগরীয় নৌবহরে শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মার্কিন নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী হয় তখন ৫টি সাবমেরিনসহ মোট ১৬টি যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহকারী জাহাজ বঙ্গোপসাগর ও তার আশপাশে সমবেত হয়েছিল বলে জানা যায়। ১০ ডিসেম্বর মার্কিন সপ্তম নৌবহর চীন ও ভারত মহাসাগর সংযোগকারী ৫০০ মাইল দীর্ঘ মালাস্কা প্রণালীর ওপারে, এমতাবস্থায় সপ্তম নৌবহরের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন “কসমস-৪৬৪” উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করে। এর চারদিন আগে উপমহাদেশের যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে রাশিয়া “কসমস”-৪৬৩ উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করেছিল। (৭)
১০ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খানের অনুমতি নিয়ে রাও ফরমান আলী আত্মসমর্পণের যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল তা মার্কিনিদের ষড়যন্ত্রে বাতিল হয়ে যায়। সপ্তম নৌবহর পাকিস্তানিদের সহায়তায় যাত্রা শুরু করলেও তা পৌঁছানোর আগেই পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা নিয়াজী ৯৮ হাজার সৈন্য ও আধাসামরিক বাহিনীসহ আত্মসমর্পণ করলে সপ্তম নৌবহর অকার্যকর অবস্থায় ফিরে যায়। সপ্তম নৌবহরের বিপরীতে রাশিয়ার নৌবহর ও সাবমেরিন যে প্রস্তুতি নিয়েছিল সেটিও বাঙালির জন্য বিরাট শক্তির উৎস ছিল। এভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্রাজ্যবাদ মৌলবাদী ও আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের জীবন ও সংগ্রামের পক্ষে কাজ করেছে। আজ সোভিয়েতের মতো মানবতাবাদী শক্তির ক্ষয়িষ্ণুতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীব্যাপী তার শক্তির ছড়ি ঘুরাচ্ছে। আফগানিস্তান মার্কিন সৈন্যদের হত্যার শিকারে পরিণত হয়েছিলো, সবে সেটা থেকে আফগানিস্থান মুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে চীনের সার্বিক অগ্রগতির সাথে পেরে না ওঠায় নানাভারে চীনকে হুমকি দিচ্ছে।
লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি
তথ্যসূত্র:-১। পৌরবিজ্ঞানের আলো, ইনসান আলী গাজী, পৃষ্ঠা ৯৭। ২। মূল ধারা ৭১, মঈদুল হাসান, পৃষ্ঠা ৭২। ৩। মূলধারা ৭১, মঈদুল হাসান, পৃষ্ঠা ১৩৮। ৪। মূলধারা ৭১, মঈদুল হাসান, পৃষ্ঠা ১৩৯। ৫। পাকিস্তান ক্রাইসিস ইন লিডারশীপ, পৃষ্ঠা ১৭৪। ৬। মূলধারা ৭১, পৃষ্ঠা ২০৪ (৩ এপ্রিল-২০১০, দৈনিক সংবাদ)। ৭। ডেসপাস ফর্ম জজ উইলসন অফ ওয়াশিংটন পোস্ট, রিপ্রিন্টেড ইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস- জানুয়ারি ৮, ১৯৭২।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন