কমিউনিস্ট পার্টির ৬৮ বছর
শামছুজ্জামান সেলিম: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ এই ভুখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬৮ বছর বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে সিপিবি। এত পুরোনো রাজনৈতিক দল এদেশে আর আছে বলে মনে হয় না। আবেগপ্রবণ হয়ে হঠাৎ পুরোনো দিন নিয়ে চর্চা করা, বিষয়টা ঠিক এরকম নয়। নির্মোহ অবস্থানে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে দেখা সময়ের প্রয়োজন বলে মনে হয়। নতুন করে পেছনটাকে সম্মুখে রেখেই এগুতে হবে।
৬৮ বছরের পথ যাত্রায় সিপিবি বিস্ময়কর সব ঘটনাবহুল পথ অতিক্রম করেছে- যা এদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অভিজ্ঞতায় নেই। ৪৮-৫০ সাল ছিল ‘রণদিভের’ বাম হটকারী রাজনৈতিক ‘লাইন’ অনুসরণের কালপর্ব। এ সময়ে পার্টি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটির’ মত ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের অভিঘাত। পরিসংখ্যান দেখলে গা শিউরে ওঠে। সিপিবির ওপর কি প্রচণ্ড নির্যাতন চালিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি! ১৩ হাজার পার্টি সদস্যের মাত্র ১৫০ জন এদেশে টিকতে পেরেছিলেন!! পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির হাতে খুন হয়েছিলেন শত শত পার্টি সদস্য, কর্মী ও সমর্থক। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাতজন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতাকে। আহত হয়েছিলেন শতাধিক। তাঁদের অনেকেই শরীরে গুলি নিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন।
সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রথম শহীদ কমিউনিস্ট। বন্দি অবস্থায় জেলের অভ্যন্তরে প্রথম শহীদ হন কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দই। যারা বাংলাদেশের ইতিহাস লেখেন তারা ইতিহাসের এই সত্যকে আজও স্বীকৃতি দেননি। তাদের এই দেউলিয়াপনাকে ধিক্কার জানানো ছাড়া কি-ই বা করার আছে!
পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির প্রচণ্ড নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেই সিপিবি খুব দ্রুতই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে মুক্ত করে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্টায় উদ্যোগ নেয়। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনকে সংগঠিত করতে ‘কেন্দ্রীয়’ ভূমিকা পালন করে সিপিবি। এরপর সিপিবিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ’৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন (এই নির্বাচনে প্রকাশ্যে বা গোপনে সিপিবির ১৮ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন), ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান এবং ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সিপিবির অংশগ্রহণ ছিল এক অনন্য সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা।
প্রতিষ্ঠা লগ্নেই সিপিবি সিদ্ধান্তগ্রহণ করেছিল ‘পাকিস্তান একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র’। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন চালু ছিল। পার্টির সিদ্ধান্ত ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার ২৪ বছর অতিক্রম করার আগেই ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ মৃত্যু ঘটেছিল। বিশ্বের মানচিত্রে আবির্ভূত হয়েছিল স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। সদ্য স্বাধীন এই রাষ্ট্রের মূলনীতি ছিল ‘সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ’। এই রাষ্ট্র ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্বের উচ্চ কণ্ঠ সদস্য।
এখন আমাদের বিচার করে দেখতে হবে, তৃতীয় বিশ্বের একটি অতি দরিদ্র দেশে- যে দেশ কিনা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ‘মুসলমানের রাষ্ট্র’ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দিয়েছিল, সেরকম একটি দেশে বিপর্যস্ত একটি কমিউনিস্ট পার্টি কিভাবে অসাধারণ এই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করলো? আজকের সিপিবির হাজার হাজার সদস্যকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হবে অথবা যাঁরা জানেন তাঁদের নতুন করে স্মরণ করতে হবে।
অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অংশ হিসেবে সিপিবি গত শতাব্দির চল্লিশের দশকের মধ্যভাগে পূর্ব বাংলায় জঙ্গি কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলে। ওই সময়কালে অবিভক্ত বাংলার ১৯টি জেলায় ৭০ লক্ষ কৃষক এই আন্দোলনে যোগ দেয়। শতাধিক কৃষক নেতা ও কর্মী শহীদ হন এই আন্দোলনে। তেভাগা নামে খ্যাত এ আন্দোলন তদানীন্তন বাংলার গ্রামাঞ্চলকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পূর্ব বাংলায় কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে ভিন্ন ধারার কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ‘টংক’ প্রথা বিরোধী এই আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। এই লড়াইয়ে ৬০ জন কৃষকযোদ্ধা শহীদ হোন। এভাবে কমরেড ইলা মিত্রের নেতৃত্বে ‘নাচোল বিদ্রোহ’, কমরেড অজয় ভট্টাচার্য ও বারীণ দত্তের নেতৃত্বে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ‘নানকার’ আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব ফেলে পূর্ব বাংলার কৃষকদের মধ্যে। ‘নানকার’ আন্দোলনে ১৪ জন কৃষক এবং কমিউনিস্ট নেতা শহীদ হন।
পূর্ব বাংলায় তেভাগা আন্দোলনে উত্তর বাংলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন, ছয়ের উদ্দিন, জিতেন দত্ত, সখার উদ্দিন, হাজি দানেশ, অমূল্য লাহিড়ী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। দক্ষিণ বাংলার নেতা ছিলেন কমরেড অমল সেন, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়াও বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছিলেন পূর্ণন্দেু দস্তিদার, আব্দুস সত্তার, পুর্ণন্দেু কানুন গো, অনঙ্গ সেন। খুলনা অঞ্চলে ছিলেন কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি, রতণ সেন। বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে আশু ভরদ্বাজ এবং সন্তোষ ব্যানার্জি; বরিশাল অঞ্চলে নলিনী দাস, মুকুল সেন, নরুল ইসলাম মুন্সি; বৃহত্তর ময়মনসিংহে জ্যোতিষ বসু, মন্মথ দে, আলতাব আলী, সুকুমার ভাওয়াল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ছিলেন রূপকথা তুল্য কমিউনিস্ট নেতা। ওই একই সময়ে পূর্ব বাংলায় সুতাকল ও রেল শ্রমিকদের মধ্যে কমরেড অনীল মুখার্জি, নেপাল নাগ, সুনীল রায়, শেখ রওশন আলী এবং রেল শ্রমিকদের মধ্যে কমরেড জ্যোতি বসু, ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বে কমিউস্টরা শ্রমিকদের মধ্যে বড় বড় সংগ্রাম গড়ে তোলেন ।
গত শতাব্দির চল্লিশের দশকের মধ্যভাগ থেকে দশকের শেষ পর্যন্ত সাবেক পূর্ব বাংলায় এক বিশাল শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল কমিউনিস্ট পার্টি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লক্ষ লক্ষ কৃষক-শ্রমিককে ওই শ্রেণি সংগ্রামে সক্রিয় করতে পেরেছিল কমিউনিস্ট পার্টি। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামেও কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল।
গত শতাব্দির ত্রিশের দশকের মধ্যভাগে শেরে বাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় সদ্য আবির্ভূত মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। হিন্দু জমিদারদের অধীনে থাকা কোটি কোটি মুসলিম প্রজা বিশ্বাস করেছিল, পাকিস্তান হলে হিন্দু জমিদারের অত্যাচার ও শোষণ থেকে তারা মুক্তি পাবে। শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ চেয়েছিল হিন্দুরা এ দেশ থেকে চলে যাক। চলে গেলে ‘চাকুরির বাজার’ তাদের হয়ে যাবে। এই মধ্যবিত্তরাই ’৪৬ এর দাঙ্গায় অতি উৎসাহে অংশ নিয়েছিল। এ রকম একটি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কমিউনিস্ট পার্টির জন্যে খুব কঠিন কাজ ছিল।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সিপিবি খুব দ্রুতই তার কর্তব্য নির্ধারণ করে ফেলে- যা শুরুতেই উল্লেখ করেছি। যে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় থাকে সে দেশের বাস্তবতা ও বিশেষত্ব অনুধাবন করার ক্ষমতা নেতৃত্বের থাকা অতি আবশ্যিক শর্ত।
গত শতাব্দির পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে বিজ্ঞানভিত্তিক মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে সিপিবি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতের দিকপালরা প্রায় সবাই ছিলেন বাম গণতান্ত্রিক সেক্যুলার চেতনার আলোকিত মানুষ। এদের সকলেই ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় মুক্ত চেতনার এই মানুষেরাই নেতৃত্বে ছিলেন। সমগ্র ষাটের দশকে এদের নেতৃত্বে সাম্প্র্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্ব শোচনীয়ভাবে পরাভূত হয় এবং অসাম্প্রদায়িক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা দৃঢ় ভিত্তি পায়। এই ভাবাদর্শিক প্রস্তুতি ছিল বলেই বাঙালি ভাষাভিত্তিক স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠন করতে পেরেছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরে আল্বদর বাহিনী এই চেতনার ধারক বুদ্ধিজীবীদেরই হত্যা করেছিল নির্মমভাবে।
চল্লিশ পঞ্চাশের দশকের সিপিবি নেতৃত্বের লড়াকু ও ত্যাগী জীবনের প্রতি এদেশের কৃষক, শ্রমিক এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। এরা পার্টি নেতাদের শ্রদ্ধাভরে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। এঁরা প্রবাদ তুল্য মানুষ ছিলেন। এই ‘দাদারা’ যৌবনে ভারত মাতাকে স্বাধীন করার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন। ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে ‘দাদারা’ কমিউনিস্ট হয়েছিলেন। ‘বন্দেমাতরমকে’ পরিত্যাগ করে গ্রহণ করেছিলেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (বিপ্লব জিন্দাবাদ)। কৃষক-শ্রমিকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে দাদারা তাদের জীবনের সুখে দুখের সমান ভাগিদার হয়ে তাদের স্বার্থেই লড়াই করেছেন জীবন বাজি রেখে। বছরের পর বছর নীরবে-নিভৃতে কৃষকের কুঁড়েঘরে, শ্রমিকের বস্তিতে বা কলোনিতে পড়ে থেকে তাদের সংগঠিত করেছেন। আত্মপ্রচারবিমুখ এই মানুষদের কোনো লোভ বা উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল না। ‘দাদারা’ এই ভুখণ্ডের সেরা কমিউনিস্ট ছিলেন নিজ গুণে। ১৯৭৩ সালে সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেস এবং প্রথম প্রকাশ্য কংগ্রেসের হিসেব থেকে দেখা যায়, তখন পর্যন্ত জীবিত ‘দাদাদের’ সম্মিলিত জেল জীবন ৫০০ বছরেরও অধীক এবং আত্মগোপন জীবন ৪০০ বছরেরও অধীক ছিল। সিপিবি নেতৃত্বের এই ভাবমূর্তি হাজার হাজার তরুণকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে সমাজতান্ত্রিক সেক্যুলার জীবন দর্শনের প্রতি। জাতি আজও কমবেশি এই ভাবাদর্শের সুফল ভোগ করছে।
’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে সিপিবি ছিল প্রথম সারিতে। মুক্তিযুদ্ধে সিপিবি নিজস্ব গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়নের শ্লোগান ছিল, ‘লক্ষ প্রাণের আত্মদানে মুক্ত স্বদেশ, এসো দেশ গড়ি’। সিপিবিও এই রাজনৈতিক ‘লাইন’ গ্রহণ করে নবীন রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার ডাক দেয়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ডেমরার লতিফ বাওয়ানি জুট মিলস, কাঞ্চনের উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, পাকশির নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলসের শ্রমিক, কর্মচারি এবং কর্মকর্তাবৃন্দ স্বেচ্ছাশ্রমে পাকবাহিনী কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা পুনর্গঠন করে। নর্থ বেঙ্গ পেপার মিলসের বহু শ্রমিক কর্মচারি শত শত ঘণ্টা ওভার টাইম করেও বিল নেননি। সচিবালয়ের অনেক কর্মচারি, কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় রাত-দিন খেটেছেন বাংলাদেশ গড়ার জন্য। দেশবাসীর মধ্যে উৎসাহের ঢেউ উঠেছিল। এই উদ্যোগ ভুল হয়ে যায় শ্রমিক লীগের ‘লালবাহিনী’ এবং আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির লুটপাটকারীর অপতৎপরতায়। ছাত্র ইউনিয়নের ‘ভূয়া রেশন কার্ড উদ্ধার’ কর্মসূচিও ওই একই কারণে মাঝপথে থেমে যায়।
১৯৭৪ সালের দূর্ভিক্ষের সময় সিপিবি ‘লঙ্গর খানা’ পরিচালনায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। সিপিবির এই ভূমিকা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এককভাবে সরকার গঠন এবং আওয়ামী লীগের দলবাজি, সংকীর্ণতা, দুর্নীতি, লুটপাট সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ ব্যর্থ করার পাশাপাশি দেশকে এক গভীর সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। দেশ ভয়ানক এক নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ে যায়। এই পটভূমিতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে ঘটে ইতিহাসের বেদনাদায়ক ঘটনা।
১৭৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে। হতবিহ্বল এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে পুনঃরায় সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয় পার্টি। ১৫ আগস্ট পরবর্তী কঠিন দিনগুলোতে সিপিবি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল গণতান্ত্রিক সেক্যুলার শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে মোশতাক সরকারকে উৎখাতের ‘লাইন’ নেয়। মোশতাক উৎখাতের পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭৬ সালের শুরুতে জিয়া সিপিবি’র শত শত নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে জেলে বন্দি করেন। জিয়া সিপিবিকে নিষিদ্ধও করেছিলেন।
১৯৮০ সালে পার্টি তৃতীয় কংগ্রেসে মিলিত হয়। কংগ্রেসের রাজনৈতিক রিপোর্টে বলা হয়, “সিপিবির বঙ্গবন্ধু সরকারের নীতিকে সমর্থন করা সঠিক ছিল। সিপিবি বঙ্গবন্ধু সরকারের ভুল নীতি ও পদক্ষেপ, দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে যথাসময়ে সংগ্রাম ও প্রতিরোধ গড়ে না তুলে ভুল করেছে। সিপিবি যথাযথভাবে ‘ঐক্য ও সংগ্রামের’ নীতি গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছিল। ঐক্যের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর শ্রেণির ঊর্ধ্বে বিবেচনা করে সিপিবি ঠিক করেনি।” এই নীতি গ্রহণের ফলে ’৭০ এর দশকে সাময়িক সময়ের জন্য সিপিবির কিছুটা গণবিচ্ছিন্নতা ঘটে। ’৮০ এর দশকের শুরুতেই এই সমস্যাকে অতিক্রম করে আবার সম্মুখে চলে আসে সিপিবি।
আশির দশকে সিপিবি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। সিপিবি ছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের চালিকা কেন্দ্র। একই সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণি, গ্রামীণ মজুর ও কৃষক আন্দোলনের জোট সমূহের নেতা এবং মূল শক্তি ছিল সিপিবি। সিপিবির কেন্দ্রীয় অফিস ছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ‘তিন জোটের’ হেড কোয়ার্টার। ১৯৮৬ সালের পার্লামেন্টে সিপিবি, ন্যাপ (মো) এবং ওয়ার্কার্স পাটির্র (নজরুল) মিলিত এমপির সংখ্যা ছিল ১৮ জন। ইতিহাসের ওই সময়টায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট, বাম এবং গণতান্ত্রিক শক্তির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বাম দিকেই ঝুঁকেছিল। চরম ডানপন্থি শক্তি ছিল ‘প্রান্তিক’ অবস্থানে (যারা আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দাপট দেখাচ্ছে)। আশির দশকে সিপিবি চতুর্থ এবং পঞ্চম কংগ্রেসে মিলিত হতে পেরেছিল।
নব্বইয়ের দশক থেকে আজ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টিকে নতুন করে অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের পতনের পর বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্তব্য নতুন করে নির্ধারণ করতে হচ্ছে। আমরা আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্যে লড়ছি। দ্বিমেরু কেন্দ্রীক রাজনীতি ভেঙ্গে ফেলে বাম গণতান্ত্রিক সেক্যুলার শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার লড়াই আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। এ লড়াইয়ে জিততে হবে- আটষট্টি বছরে এসে এই আমাদের শপথ।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন