অর্থনীতি নিয়ে গবেষণার ইতিহাস
লুৎফর রহমান
শুরুর কথা :
ধ্রুপদী বুর্জোয়া অর্থনীতির রচনাগুলো, যেমন- এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডোর রচনাগুলো মার্কসীয় অর্থনীতির অন্যতম উৎস ছিলো। তারও আগের কথায় যদি আসা যায় দেখা যাবে ১৭শ’ শতাব্দীতে এই শাস্ত্র আলাদা বিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বহু আগেই অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যার চেষ্টা হয়েছিলো। মানুষের প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক কাজগুলো যেমন, চাষ, পশুপালন, হস্তশিল্প, বাজারের কেনা-বেচা, অন্যের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছিলো। মানুষ চেষ্টা করতো ব্যক্তিগত ইউনিটের উৎপাদনকে কী করে আরো অর্থনৈতিকভাবে চালিয়ে লাভবান হওয়া যায়। প্রাচীন মিশরীয়, গ্রীক, হিন্দু ও অন্যান্য জাতির কাছে সে সময়ই- পণ্য, বিনিময়, অর্থ, দাম, ঋণের সুদ, বাণিজ্যিক মুনাফা ইত্যাদি অর্থনৈতিক বর্গগুলো জানা ছিলো। এসব কথা জানা যায় প্রাচীন মিশরীয় পাপিরাসের পুঁথিগুলো থেকে। ব্যাবিলনিয়ার শাসক হাম্বুরাবির সংবিধান থেকে। প্রাচীন ভারতের বেদগ্রন্থ থেকে। গ্রীক কবি হোমারের ‘অডিসি’, জেনোফন, প্লেটো, এরিস্টটল এবং অন্যান্য গ্রীক দার্শনিকের লেখায় অর্থনীতির এসব বিষয় আছে।
মানবসমাজের একেবারে প্রথমদিকের অর্থনৈতিক চিন্তাকে বলা যায় ভ্রূণাবস্থা। অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাস আরম্ভ হয় জেনোফন, প্লেটো এবং এরিস্টটলের রচনা থেকে। তাঁরা প্রাচীন গ্রীক সমাজের ক্রীতদাসপ্রথার অভ্যুদয়কালীন অর্থনীতি সম্বন্ধে এক তত্ত¡গত উপলব্ধির দিকে প্রথম পা ফেলেছিলেন। মূল্য, পণ্য বিনিময় ও পুঁজির আদিমতম রূপ- বণিকের পুঁজি সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন। এঙ্গেলস তাঁদের প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন কারণ তাদের চিন্তা ছিলো অর্থনীতির যাত্রাবিন্দু।
মার্কেন্টাইলিজম ও ফিজিওক্রাটরা :
পুঁজিবাদের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশের প্রয়োজনে বাজারের সম্প্রসারণ দরকার হয়েছিলো। রাষ্ট্রকে সামন্ততান্ত্রিক বিক্ষিপ্ত অবস্থা থেকে সুসংগঠিত করার প্রয়োজন পড়েছিলো। তখন একক ইউনিটগুলোর পরিবর্তে সমগ্র জাতীয় অর্থনীতি পরিচালনার জন্য নিয়ম-নীতি প্রণয়নের প্রয়োজন পড়েছিলো। তার ফলে আত্মপ্রকাশ করেছিলো অর্থশাস্ত্র। সেই অর্থনীতিতে ব্যক্ত হয়েছিলো উদীয়মান বুর্জোয়াদের স্বার্থ।
বুর্জোয়া কাঠামোগুলো প্রথমে আকৃতি লাভ করেছিলো উৎপাদন নয় বাণিজ্যে, অর্থসংক্রান্ত কাজ-কারবারে। যার জন্য প্রথম অর্থনৈতিক মতবাদটির নাম ছিলো মার্কেন্টাইলিজম। Mercantilism শব্দের অর্থ বাণিজ্যবাদ যেখানে অর্থই একমাত্র সম্পদ। মার্কেন্টাইলিজম প্রকাশ করেছিলো বণিকের পুঁজির স্বার্থ। অর্থনৈতিক চিন্তার সেই ধারাটি আত্মপ্রকাশ করেছিলো ১৭শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়াতে তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছিলো।
মার্কেন্টাইলিস্টরা মনে করতেন যে অর্থনীতির পক্ষে বাণিজ্যই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্ণ ও অর্থই সম্পদের প্রধান রূপ। তাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাজে তাদের সুপারিশগুলো সেরকমই ছিলো। তাঁরা বণিকদের স্বার্থে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের জোরালো হস্তক্ষেপ দাবি করেছিলো। মুনাফার চেষ্টায় সস্তায় কেনা এবং দামে বিক্রি এটাকেই তাঁরা নীতি ঠিক করেছিলো। সেই লক্ষ্যে তাঁরা সোনা রপ্তানি বন্ধ করার প্রস্তাব করেছিলো। বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করে সামগ্রী রপ্তানি করে এর বদলে স্বর্ণ পাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, রাষ্ট্রের উচিত একটা সংরক্ষণমূলক নীতি অনুসরণ করা। যারা জাতীয় সম্পদ রপ্তানির জন্য কাজ করছে তাদের বিকাশে রাষ্ট্র উৎসাহ যোগাবে। এছাড়া যেসব সামগ্রীর দাম সোনায় দিতে হবে সেগুলোর আমদানি সীমিত করা। তবে সে সময়ের মার্কেন্টাইলিস্ট তত্ত্বগুলো ছিলো অগভীর। তারপরও সেগুলোই ছিলো বুর্জোয়া ভাবধারণার প্রথম তত্ত্বগত প্রয়াস।
‘পলিটিকাল ইকনমি’ বা অর্থনীতি কথাটা প্রথম ব্যবহার করেন ফরাসি মার্কেন্টাইলিস্ট আঁতোয়াঁ দ্য মঁক্রেতিয়েঁ তাঁর ‘অর্থনীতি বিষয়ে রচনা’ গ্রন্থে ১৬১৫ সালে। সেটাতে রাষ্ট্রের অর্থনীতি পরিচালনা এবং দেশের সম্পদ বাড়ানোর উপায় নিয়ে সুপারিশ ছিলো। ‘পলিটিকাল ইকনমি’ কথাটির উৎপত্তি হলো গ্রীক শব্দ politikos -অর্থ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক; oikos অর্থ গৃহস্থালি বা তার ব্যবস্থাপনা; এবং nomos -অর্থ নিয়ম বা আইন। সব মিলিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার নিয়ম’।
‘পলিটিকাল ইকনমি’ নামটি পাওয়ার পরেও এই শাস্ত্র সাথে সাথে তার উপযুক্ত বিষয়বস্তু ঠিক করতে পারেনি। শরুর দিকে বিবেচনায় ছিলো রাষ্ট্রের আভ্যন্তরিক ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ। যেমন- বৈদেশিক বাণিজ্য, অর্থ বাজারে ছাড়া ইত্যাদি। মার্কেন্টাইল কালপর্বে অর্থনীতি কার্যত ছিলো রাষ্ট্রীয় বিষয়সমূহ ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে এক নিয়ম-নীতি।
ফিজিওক্রাটরা: মার্কেন্টাইলিজম এবং বুর্জোয়া অর্থনীতির মাঝে একটা সেতু নির্মাণ করেন ফিজিওক্র্যাটরা। Physio গ্রীক শব্দ (fi-yi-o), অর্থ প্রকৃতি অর্থাৎ বাস্তবতা। ফিজিওক্র্যাটরা বাস্তবকে অনুসরণ করেন। এঁদের মধ্যে আছেন ফ্রাঁসোয়া কেনে, আন রবেয়ার জাক তিউর্গো ও অন্যান্যরা। মার্কেন্টাইলিস্টদের বিপরীতে, অর্থনৈতিক গবেষণায় তাঁরা জোর দেন উৎপাদনের ক্ষেত্রে। তাঁরা, কেবল লেনদেনের ক্ষেত্রটি থেকে সরে আসেন, এক ভিত্তিভূমি স্থাপন করেন পুঁজিবাদী উৎপাদনের। তবে তারা উৎপাদনের ক্ষেত্রটিকে সীমিত করেন কৃষির মধ্যে। আর শিল্পকে ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন অর্থনীতির অনুৎপাদনশীল ক্ষেত্রটির মধ্যে।
বুর্জোয়া অর্থনীতির বিকাশ কাল :
১৭শ শতাব্দী থেকে ১৮৩০-এর দশক পর্যন্ত কালপর্বটি চিহ্নিত ছিলো বুর্জোয়া অর্থনীতির এক বিকাশ কাল হিসেবে। এর কারণ ছিলো ক্রমবর্ধমান পুঁজিবাদী উৎপাদন, বাণিজ্য ও ব্যাংকিংয়ের চাহিদা। এই অবস্থায় দরকার ছিলো একক অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর পরিবর্তে গোটা এক একটা দেশের অর্থনৈতিক ব্যাপারসমূহের এবং এর বিকাশের বিশ্লেষণ করা। অন্যান্য দেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের নীতি নির্ধারণ করা। সেই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের নতুন ভূমিকা নির্ণয় করা। সে সময়টাতে রাষ্ট্র শুধু বুর্জোয়াদের সম্পদই রক্ষা করতো না সম্পদের বৃদ্ধিতেও সাহায্য করতো। সেই কালপর্বে বুর্জোয়া অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ইংল্যান্ডের উইলিয়াম পেটি এবং ফ্রান্সের পিয়ের বোয়াগিলবের। তাঁরাই সর্বপ্রথম সূত্রবদ্ধ করেন মূল্যের শ্রম তত্ত্ব। তাঁরা ছিলেন ক্লাসিকাল বুর্জোয়া অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা। সে অর্থনীতির সর্বোচ্চ বিকাশ আমরা দেখি স্কটিশ অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ এবং ইংরেজ অর্থনীতিবিদ ডেভিট রিকার্ডোর রচনায়।
ক্লাসিকাল ধারার অর্থনীতিবিদরা বুর্জোয়াদের স্বার্থ ব্যক্ত করেছিলন এমন এক ঐতিহাসিক কালপর্বে যে সময়টাতে তারা ছিলেন উদীয়মান একটা শ্রেণি। তখন বুর্জোয়ারা সংগ্রাম করছিলো সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে। তখন পর্যন্ত মজুরি-শ্রম ও পুঁজির ভেতরকার দ্বন্দ্বগুলো তীব্র রূপ পায়নি। সেই কালপর্বে বুর্জোয়া শ্রেণির ভাবাদর্শবাদীরা বুর্জোয়া সমাজকে দেখেছিলেন প্রগতিশীল মনোভাব থেকে। সে জন্যেই তাঁরা সে সময়ের পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের নিয়মগুলোকে সততার সাথে বিশ্লেষণ করেছিলেন।
মার্কেন্টাইলিস্টদের বিপরীতে ক্লাসিকাল অর্থনীতিবিদরা জোর দেন উৎপাদনে এবং তার আভ্যন্তরিক নিয়মগুলোর বিশ্লেষণের দিকে। ফিজিওক্র্যাটদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শুধু কৃষি নয় শিল্পের দিকেও মনোনিবেশ করেন। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে বৈষয়িক উৎপাদন ও শ্রমই জাতিসমূহের সম্পদের উৎস। এইভাবে তাঁরা মূল্যের শ্রম তত্ত্বের বুনিয়াদ স্থাপন করেছিলেন। তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী আরেকটি পণ্যের বদলে নির্দিষ্ট অনুপাতে বিনিময়-হওয়া একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় সেটির উৎপানে ব্যয়িত শ্রম দিয়ে।
এডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিকাশের জন্মগত সাধারণ নিয়মগুলো আবিষ্কার করেছিলেন। পুঁজিপতি, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও ভূস্বামিদের সম্পদের প্রকৃত উৎসের দিকে এগিয়েছিলেন। তাঁরা বোঝাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন এর উৎস কল-কারখানা ও ক্ষেত-খামারে নিয়োজিত শ্রমিকদের শ্রম। সে ক্ষেত্রে রিকার্ডো সবচেয়ে অগ্রসর ছিলেন। তিনি বুর্জোয়া সমাজের শ্রেণি কাঠামোটি দেখিয়েছিলেন। তিনি প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়া শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থের ভেতরকার দ্বন্দ্বের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। তবে তিনি এই দ্বন্দ্বকে দেখেছিলেন স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে।
স্মিথ ও রিকার্ডো শ্রমের অবাধ গতিবিধি ও ভাড়া নেওয়া, জমির অবাধ ক্রয়-বিক্রয় এবং অবাধ বৈদেশিক বাণিজ্য, এবং দেশের অভ্যন্তরে পণ্য বাণিজ্যে শুল্ক উঠানোর সুপারিশ করেছিলেন। সামন্ততন্ত্র প্রণীত নিয়মের বিপক্ষে তাদের অবস্থান আসলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ও বিনিময়ে এবং বিকাশে অবাধ সুযোগের দাবি। বেড়ে-ওঠা বুর্জোয়াশ্রেণি এগুলোকে সানন্দে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ক্লাসিকাল এইসব অর্থনীতিবিদরা পুঁজিবাদকে দেখেছিলেন একমাত্র যুক্তিসংগত, ত্রুটিহীন ও চিরন্তন সমাজ-ব্যবস্থা হিসেবে। শ্রেণি-সংগ্রাম, পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবি পতন, ইত্যাদি উপলব্ধি করার স্তরে তাঁরা পৌঁছতে পারেন নি।
বিজ্ঞানসম্মত প্রলেতারীয় অর্থনীতি :
অর্থনীতির বিকাশের ধারায় কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বিকশিত করেন এক বিজ্ঞানসম্মত প্রলেতারীয় (Proletarian) বা শ্রমিকশ্রেণির অর্থনীতি। অর্থনীতি-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটা একটা বিপ্লব বা আমূল পরিবর্তন। তাঁরা অর্থনীতি তত্ত্বের বড় বড় সমস্যার সমাধান করেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে। তাঁরা তত্ত্বগুলো সূত্রবদ্ধ করেন নতুনভাবে সমাজের সবচেয়ে বিপ্লবী শ্রেণি প্রলেতারিয়েতের অবস্থান থেকে। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের যেখানে ছিলো ভাসাভাসা দৃষ্টি সেখানে মার্কস-এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পদ্ধতি অনুসরণ করেন। নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থায় মানুষে-মানুষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বের করে দেখান যে এটাই সামাজিক সম্পর্কের মূলে কাজ করে।
মার্কস মানবজাতিকে এক নতুন ঐতিহাসিক যুগে নিয়ে যেতে, সাম্যবাদে নিয়ে যেতে পথনির্দেশ করেছেন। এখানেই তিনি রিকার্ডো, হেগেল, ফয়েরবাখ, ফুরিয়ে, ওয়েন এবং সাঁ-সিমোঁ থেকে পৃথক। স্মিথ ও রিকার্ডো প্রণীত অর্থনীতির সংজ্ঞাগুলো প্রতিভাদীপ্ত আন্দাজের বেশি কিছু ছিলো না। মার্কস সেগুলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রণয়ন করেন। মহামতি এঙ্গেলস মার্কসের দুটি আবিষ্কারের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। প্রথমটা হচ্ছে, ইতিহাসের বস্তুবাদী উপলব্ধি আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্ব। এই প্রয়াস অর্থনীতিকে পরিণত করেছিলো বিজ্ঞানে যা শ্রমিকশ্রেণির সেবায় ব্যবহৃত হয়।
লেনিন বলেছিলেন উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্ব হচ্ছে মার্কসবাদের ভিত্তিমূল। মার্কস পুঁজিবাদের অন্ত:সার উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বটি আবিষ্কার করেন এবং দেখান যে মুনাফা, সুদ, জমির খাজনা ইত্যাদি এর বহি:প্রকাশ, বাহ্যিক রূপ। এই আবিষ্কার উন্মোচিত করে, শ্রমিকশ্রেণি আর বুর্জোয়া শ্রেণির মাঝে আপোসহীন শ্রেণিদ্বন্দ্বের ভিত্তিকে। এই তত্ত্ব পুজিবাদী অর্থনীতি এবং মার্কসীয় অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়।
মার্কসীয় অর্থনীতি বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করে যে সমাজতন্ত্র দ্বারা পুঁজিবাদ প্রতিস্থাপিত হতে বাধ্য। বিপরীতদিকে বুর্জোয়া অর্থনীতি বোঝায়, পুঁজিবাদই স্থায়ি এবং যথার্থ সমাজব্যবস্থা। কিন্তু মার্কস দেখিয়ে দেন কীভাবে পুঁজিবাদের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিলো। তিনি পুঁজিবাদের পতনের অর্থনৈতিক নিয়মগুলো আবিষ্কার করেন। তিনি দেখান শ্রেণি-সংগ্রামের সমগ্র ধারাটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বৈষয়িক ও বিষয়ীগত পূর্বশর্তগুলোকে প্রস্তুত করে। বৃহদায়তন যন্ত্রভিত্তিক পুঁজিবাদী উৎপাদন শ্রমিকশ্রেণিকে বৃদ্ধি করে এবং বুর্জোয়া শ্রেণির সাথে আপোসহীন দ্বন্দ্বের কারণে সংগঠিত হতে বাধ্য করে। পরিণামে এটাই বিপ্লবকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। এভাবেই মার্কস পুঁজিবাদের পতন এবং সমাজতন্ত্রের জয়লাভের ঐতিহাসিক অবশ্যম্ভাবিতাকে প্রমাণ করেন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে। পুঁজিবাদের ধ্বংসসাধক এবং সমাজতন্ত্রের স্থপতি হিসেবে দুনিয়ার ইতিহাসে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা আবিষ্কারই মার্কসের মতবাদের মূল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘পুঁজি’ বুর্জোয়াদের জন্য বড় আঘাত :
সমাজবিকাশের মতামতে কার্ল মার্কস আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন তাঁর ‘পুঁজি’ গ্রন্থে। তিনি এই বইয়ে অর্থনীতিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সাজিয়েছিলেন। দর্শন ও ইতিহাসের মিশ্রণে ‘পুঁজি’ রচিত। এর মাধ্যমে মার্কস পুঁজিবাদী বিকাশের নিয়ম, উদ্বৃত্ত-মূল্যের নিয়ম আবিষ্কার করেন।
‘পুঁজি’ গ্রন্থে মার্কস পুঁজিবাদ সম্বন্ধে সার্বিক অনুসন্ধান চালান। মানুষে-মানুষে অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন। তিনি নির্ণয় করেন, পুঁজিবাদে প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা এবং বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি এই দুই শ্রেণির দ্বন্দ্বই সমাজের মূল দ্বন্দ্ব। আবিষ্কার করেন, পুঁজিপতিদের শ্রেণিস্বার্থ সুরক্ষিত করে বুর্জোয়া রাজনৈতিক উপরিকাঠামো।
মার্কস ‘পুঁজি’কে তার জীবনের প্রধান কাজ হিসেবে গণ্য করেন। চল্লিশ বছর ধরে তিনি গভীর অধ্যবসায়ের সাথে বইটি নিয়ে কাজ করেন। তিনি ১৮৪০-এর দশক থেকে শুরু করে এর উপর শ্রম দেন ১৮৮৩ সাল অর্থাৎ তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত। প্রথম খণ্ডটি ১৮৬৭ সালে মার্কস নিজেই প্রকাশ করেছিলেন। অন্য খণ্ডগুলো অসম্পূর্ণ থেকেছিলো। ‘পুঁজি’ লেখা ও প্রকাশের কাজে এঙ্গেলস মার্কসকে প্রচুর সহায়তা করেছিলেন। মার্কসের মৃত্যুর পর এঙ্গেলস একটানা এগার বছর খেটে অসম্পূর্ণ দুটো খণ্ড তৈরি করেছিলেন। ২য় খণ্ড ১৮৮৫ সালে এবং ৩য় খণ্ড ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো। মহামতি লেনিন যথার্থ লিখেছেন ‘পুঁজি’র ২য় ও ৩য় খণ্ড মার্কস-এঙ্গেলসের রচনা।
১৮৯৫ সালে এঙ্গেলস মারা যান। তিনি ৪র্থ খণ্ডটি প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করে যেতে পারেননি। ‘পুঁজি’র ৪র্থ খণ্ডটি ১৯০৫-১৯১০সালে সর্বপ্রথম প্রকাশ করেছিলেন কার্ল কাউৎস্কি। তিনি মার্কসবাদের কতোগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ইচ্ছেমতো সংশোধন-পরিমার্জন করেছিলেন। তাই সোভিয়েত মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ইনস্টিটিউট ১৯৫৪ থেকে ১৯৬১ সাল - এই কালপর্বে ‘পুঁজি’র ৪র্থ খণ্ড প্রকাশ করেন মার্কসের তত্ত্বগুলোর সাথে মিল রেখে। ‘পুঁজি’র ১ম খণ্ডে আছে পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিশ্লেষণ। ২য় খণ্ডে আছে পুঁজির সঞ্চালন প্রসঙ্গ। ৩য় খণ্ডে রয়েছে সামগ্রীকভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদনের এক বিশ্লেষণ। আর ৪র্থ খণ্ডটি হলো মার্কসের ঐতিহাসিক-সমালোচনামূলক এবং ঐতিহাসিক-সাহিত্যিক অংশ।
‘পুঁজি’ হচ্ছে মূলত পুঁজিবাদী উৎপাদনের এক সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ। এতে পুঁজিবাদের গতির নিয়ম ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে আছে বুর্জোয়া অর্থনীতির এক সমালোচনামূলক বিচার। তাই এই গ্রন্থটি বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণির মোক্ষম এক অস্ত্র। তাই এঙ্গেলস যথার্থভাবেই ‘পুঁজি’কে অভিহিত করেছিলেন, বুর্জোয়া শ্রেণির মস্তকে নিক্ষিপ্ত ভয়ঙ্করতম মিসাইল বলে।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন