বিএনপি সরকারের গণবিরোধী চরিত্র ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে
সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় বক্তারা
একতা প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর সময়ে একের পর এক জাতীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থ পরিপন্থী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের গণবিরোধী চরিত্র ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবির নেতারা।
৬-৭ আগস্ট রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির দুইদিনব্যাপী সভার প্রস্তাবে এ কথা উল্লেখ করেন তারা।
সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত রিপোর্ট উত্থাপন করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন।
সভার রাজনৈতিক রিপোর্টে বলা হয়, পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও দেশের বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উপরন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পরিকল্পিত সহিংসতা, সন্ত্রাসের ফলে জননিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হয়েছে। সারাদেশে ক্রমবর্ধমান হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন, মব সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ মানুষের আতঙ্ক বেড়েছে।
সভার রাজনৈতিক রিপোর্টে আরও বলা হয়, বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচনী ইশতেহারের কোথাও ‘জনগণের সম্পত্তি’ ব্যক্তিমালিকদের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের কোনো কথা না থাকলেও ক্ষমতাসীন হয়েই ৪৪টি রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান লুটেরা ধনিকদের কাছে বিক্রি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইস্পাত, বস্ত্র, রাসায়নিক, চিনি, খাদ্য ও পাট খাতের ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীনে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার একরেরও বেশি শিল্পজমি, বিদ্যমান ভবন, ইউটিলিটি সংযোগ ও শিল্প অবকাঠামো, চিনিকলসমূহের আখ চাষের ১০ হাজার একর কৃষি জমি সব কিছু এক অর্থে নিলামে তোলা হচ্ছে। এত বিপুল সম্পদকে বলা হচ্ছে রাষ্ট্রের বোঝা। এ সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লোভনীয় জমি নিজেদের ভাই-বন্ধুদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে সরকার।
সভায় বলা হয়, জাতীয় সংসদের তথাকাথিত বিরোধী জোট সরকারের এসকল জাতীয় স্বার্থ ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে সাগরেদের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। স্বাধীনতাবিরোধী জামাত ও তার শরিকরা মুখে সৎ লোকের শাসনের কথা বললেও লোকচক্ষুর অন্তরালে সরকারি আর্থিক সহযোগিতা নিজ পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে লোপাট, চাকরির লোভ দেখিয়ে যৌন নিপীড়নসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। তারা একইসাথে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আক্রমণ পরিচালনা করছে।
রিপোর্টে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার উভয়ই রাষ্ট্র সংস্কারের কথা অনেক উঁচু গলায় বললেও বাস্তবে জনআকাঙ্ক্ষা চরম প্রতারণার শিকার হয়েছে। সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, বিচারিক, নির্বাচন ব্যবস্থা, শ্রম, নারী ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে একাধিক কমিশন গঠন করা হলেও অদ্যবধি শাসন পদ্ধতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন দেখা যায়নি। সংসদে গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ কেবলমাত্র নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বহু অধ্যাদেশ হুবহু অনুমোদিত হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কিত ৪টি অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, পাবলিক অডিট অধ্যাদেশের মত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো হারিয়ে গেছে।
সভায় বলা হয়, এত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে প্রাণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছে।
সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সভা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা প্রদানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধজোটে বাংলাদেশকে শামিল করার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দেয়া বিএনপি সরকার এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক যুদ্ধবিগ্রহের শিকারে পরিণত করেছে। সভা থেকে অবিলম্বে দেশের স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, জ্বালানি সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়।
সভায় বক্তব্য রাখেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রফিকুজ্জামান লায়েক, এস এ রশীদ, রাগিব আহসান মুন্না, জলি তালুকদার, আমিনুল ফরিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম, রুহিন হোসেন প্রিন্স, মিহির ঘোষ, লক্ষ্মী চক্রবর্তী, অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন, পরেশ কর, অধ্যাপক এম এম আকাশ, মৃণাল চৌধুরী, ডা. দিবালোক সিংহ, অ্যাড. এমদাদুল হক মিল্লাত, কাজী রুহুল আমিন, ডা. সাজেদুল হক রুবেল, লুনা নূর, মনিরা বেগম অনু, ডা. মনোজ দাশ, রেবেকা সরেন, সাদেকুর রহমান শামীম, এস এম শুভ প্রমুখ।
পরে ৮ আগস্ট সিপিবির জাতীয় পরিষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন