২০ মে রক্তক্ষয়ী মুল্লুক চলো আন্দোলন

চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াই অনুপ্রেরণার উৎস

এস এম শুভ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

“...আমরা অনেকদিন আসামে ছিলাম, সেখানে বড় সুখ। কাজকাম একরকম না করিলেই চলে। তবে মাঝে মধ্যে বাগান ঝাঁড় দিতে হয় আর সকালে বিকালে কিছু পাতা তুলিতে হয়। এরূপ করিয়াই আমরা এত গহনা ও ভালো কাপড় পরিয়াছি। তোমরাও আমাদের সাথে চলো, আমাদের মতন ভালো অবস্থা হইবে।” অদ্য শুক্রবার আদরমনির অগস্ত্য যাত্রার দিন। সে প্রাতঃকালে উঠিয়া সমস্ত বাড়িটি প্রদক্ষিণ করিলো। গোয়াল ঘরে গাইটির কাছে গেলো... আম, জাম, নারিকেল, সুপারি গাছগুলির সাথে শেষ বিদায় হইলো। এখন প্রলোভনই আদরমনির চিত্ত টানিয়াছে। ... ছোট মেয়েটিকে কোলে করিয়া ধীরে ধীরে জঙ্গল পথে গোপালপুরের কুলি ডিপোতে আসিয়া উপস্থিত হইলো। “...সূর্যোদয়ের সাথে বাগানবাসী কুলিদিগের হৃদয়ে ভয়ানক আশংকা আসিয়া উপস্থিত হয়। বিষাদের ছলনাতে সুখ মলিন হয়, প্রাণ সংশয়ের বা প্রহারের .. জীবন নিরাময়ের হয়ে উঠে। ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বাগানের ম্যানেজার বেত সাহেব বলিতেছেন, আমি তোমাকে অনেকবার সতর্ক করিয়াছি কুলিদিগকে সামান্য পীড়ায় ছুটি দিবে না। কোম্পানি তোমাকে মাইনা দেয় জ্বর, উদরাময়ের মত ক্ষুদ্র রোগ পরীক্ষার জন্য নহে। যখন বারো হাত পা ভাংগিবে অথবা কেহ ওলা উঠা রোগগ্রস্ত হইবে তখন তুমি পরীক্ষা করিয়া ছুটি দিবে। “সাহেব আরও কুলি সংগ্রহের জন্য বললে কিনু সর্দার বলে, যাহাদিগকে ৩ বৎসরের কথা বলিয়া আনিয়া ছিলাম, আজ ৭ বৎসর হইতে চলিল, তাহার আর ছুটি পাইলো না। দেশেও ফিরিল না। তাহাদের মধ্যে আজ অনেকেই চিরদিনের জন্য ছুটি লইয়াছে। আদরমনির আক্ষেপ, “... সেই অবধি আজ পর্যন্ত দুই বেলা পেট পুরিয়া খাইতে পারি নাই, আর এই পিঠ দেখুন ইহাতে বড় বেতের দাগ রহিয়াছে। এই বলিয়া আদরমনি নিজের পিঠ খুলিয়া দেখাইলো এবং কন্যা-পুত্রদিগের পিঠ দেখাইয়া চিৎকার করিয়া কাদিয়া উঠিল...। রামকুমার বিদ্যারত্ন প্রণীত এবং বিশ্বনাথ মুখ্যোপাধ্যয় সম্পাদিক “কুলিকাহিনী” বইতে চা শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, জীবন-সংগ্রাম এভাবেই ফুটে উঠেছে। ২০ মে মুল্লুক চলো দিবস। ১৯২১ সালে চা-শ্রমিকরা অন্যায়-অত্যাচার-বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। ইতিহাসে যা ‘চরগোলা এক্সোডাস’ বা ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন নামে পরিচিত। মুল্লুক চলো আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: ১৮৩৯ সাল “আসাম টি কোম্পানি” গঠনের মাধ্যমে আসামে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হলেও ১৮৩০ সালে ভারতের আসাম ও দার্জিলিংয়ে এবং পরে কেনিয়া, শ্রীলংকা ও অন্যান্য উপনিবেশগুলিতে চা-চাষ শুরু করেন ব্রিটিশ উপনিবেশিকরা। একই সময়ে ব্রিটিশরা তখন রেল স্থাপন করছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। এসব কাছে নিয়োজিত শ্রমিকদের সস্তায় কাজের জন্য নিয়ে আসা হত প্রত্যন্ত হতদরিদ্র এলাকাগুলো থেকে। প্রধানত বিহার, উড়িষ্যা, সাঁওতাল পরগণা, উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিকদের এ অঞ্চলে নিয়ে আসা হয়। একটা পর্যায়ে নেপাল থেকেও শ্রমিকদের নিয়ে আসা হতো। যাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চা-চাষে নিয়োজিত হন। যাদের মাধ্যমে শ্রমিক সংগ্রহ করাহ তো তাদের ‘রিক্রুটার’ বা আরকাটী বলা হতো। তারা বিভিন্ন দালালদের মাধ্যমে দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামগুলোতে গিয়ে মিথ্যা প্রলোভন ও প্রতিশ্রুতি দিতো। গোপনে বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিয়ে এসে সবাইকে শ্রমিক ডিপোতে জড়ো করা হতো। কুলি রেজিষ্টার তাদের তালিকা করতেন। বিভিন্ন চা-বাগানের সাহেবরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী দালালদের কাছ থেকে ১৫০/২০০/২৫০ টাকায় শ্রমিকদের সংগ্রহ করতেন। আর এভাবেই চা-বাগানের বন্দিশালায় আটকে পরেন চা-শ্রমিকরা। কুলি ডিপো থেকে চা-বাগান অঞ্চলে শ্রমিকদের নিয়ে আসার প্রক্রিয়া ছিল চরম অমানবিক। শ্রমিকদের ঠাসাঠাসি করে জাহাজে তোলা হতো। যতটুকু না দিলেই নয়, ততটুকু খাবার দেয়া হতো। প্রায়ই কলেরা-বসন্তের মতো মহামারি রোগে আক্রান্ত হতেন। চিকিৎসার সে অর্থে কোন ব্যবস্থা না থাকায় পথিমধ্যেই অনেকেই মৃত্যুবরণ করতেন। মৃতদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। যারা বেঁচে থাকতেন তাদের নিয়ে আসা হতো জঙ্গলে-পাহাড় ঘেরা এলাকায়। জঙ্গল পরিষ্কার করে এখানে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, চা-বাগান তৈরির মত কষ্টসাধ্য কাজ করতে হতো প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টারও বেশি। একদিকে সাপ, বাঘ, ভাল্লুক, হাতির মতো হিংস্র প্রাণীর সাথে লড়াই করতে হতো। অন্যদিকে বিষাক্ত পোকামাকড়ের কারণে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ছিল নিত্যসঙ্গী। তার সঙ্গে ছিল ইংরেজ সাহেবদের নির্তনৈমত্তিক অত্যাচার। সাহেবদের চাহিদা মোতাবেক কাজ না করলে চাবুকের মার খেতে হতো। গাছে বেধে পেটানো ছিল সাধারণ ঘটনা। প্রথম দিকে চা শ্রমিকদের মাইনে দেয়া না হলেও পরবর্তীতে হাজিরা দেয়া শুরু হলেও তা দিয়ে জীবনধারণ ছিলো অসম্ভব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে শ্রমিকদের মাইনে ৩ আনা থেকে ১ আনা কমিয়ে দেয়া হয়। আধপেটা খেয়ে, না খেয়ে অমানুষিক পরিশ্রম আর নির্যাতনে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে, যার কিছুটা চা-শ্রমিকদেরও প্রভাবিত করে। ১৯২০ সালে রাউলাই আইন বাতিলের দাবিতে এবং খিলাফত আন্দোলন সমর্থনে ভারতীয় কংগ্রেস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। উন্নত জীবনযাপনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির স্বপ্ন ও মোহভঙ্গ ঘটলে চা-শ্রমিকরা যাদের ৩ বছরের কথা বলে নিয়ে আসা হয়েছিল তারা নিজ দেশে ফিরে যাবার জন্য মনস্থির করেন। এই বাস্তবতায় ব্রাক্ষণসমাজের মিশনারি ও কংগ্রেস কর্মীদের গোপন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সিলেটের বিপীন চন্দ্র পাল এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও পন্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত এবং পন্ডিত দেওসরন চা-শ্রমিকদের এই আন্দোলনে চা-শ্রমিকের সংগঠিত করেন এবং নেতৃত্ব দেন। ১৯২১ সালের ১ ও ২ মে কংগ্রেসের উদ্যোগে চরগোলা ভ্যালির রাতারবাড়ি বাজারে জনসভা হয়। ৩ মে প্রথম অনিপুর চা-বাগানের প্রায় হাজারখানেক শ্রমিক পরিবারসহ কর্তৃপক্ষের বাধা উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েন। শুরু হয় চা-বাগানের বন্দিত্ব ঘুচিয়ে নিজ দেশে ফেরার যাত্রা। যা ইতিহাসে “মুল্লুক চলো” আন্দোলন নামে পরিচিত। চরগোলা ভ্যালির ১৩টি এবং লাম্বাই ভ্যালির ৬টি বাগানের হাজার হাজার শ্রমিক বেরিয়ে পরেন। এই শ্রমিকেরা প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে করিমগঞ্জ রেল স্টেশনে হাজির হন। চা-বাগানের ব্রিটিশ মালিক যারা টি প্ল্যাল্টার্স নামে পরিচিত তাদের চাপে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের চাঁদপুর যাওয়ার টিকিট দেয়া বন্ধ করে দেন। হাজার হাজার শ্রমিকের উপস্থিতির কারণে করিমগঞ্জে দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সংকট যা ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বিপ্লবী যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তসহ (রেলওয়ের প্রখ্যাত শ্রমিকনেতা) কিছু কংগ্রেস নেতারা হস্তক্ষেপে নারী-শিশু-বৃদ্ধরা রেলে চড়ার সুযোপ পান। পুরুষরা পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। চরগোলা ও লঙ্গাইল শ্রমিকদের মুল্লুকে ফিরে যাবার খবর ছড়িয়ে পড়লে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকরাও বেরিয়ে পড়েন। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক দলে দলে হেঁটে সিলেট, কুলাউরা, বরমচাল, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল, সাতগাঁও, শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে জড়ো হতে থাকে চাঁদপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ১৯২০ সালের দ্বিতীয় সপ্তাহে হাজার হাজার শ্রমিক চাঁদপুর লঞ্চঘাটে এসে হাজির হন নিজ মুল্লুকে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু চাঁদপুরের মহকুমা প্রশাসক, টি প্ল্যাল্টার্সদের প্রতিনিধি ম্যাকফারস চা-শ্রমিকদের জাহাজে উঠতে বাধা দেন। এদিকে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে আসা ক্লান্ত-অভুক্ষ শ্রমিকরা দিশেহারা অবস্থার মধ্যে পরেন। কংগ্রেস নেতা হরদয়াল নাগের নেতৃত্বে স্থানীয়রা খাওয়ার বন্দোবস্ত করেন। ১৯ মে সুশীল কুমার সিংহের নেতৃত্বে সশ্রস্ত্র সৈন্যরা জাহাজে উঠতে থাকা নিরস্ত্র নিরীহ শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে জাহাজের পাটাতন সরিয়ে দিলে শত শত শিশু-বৃদ্ধ-নারী শ্রমিক মেঘনার জলে ভেসে যায়। পরদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে গোর্খা সৈনিক এনে শ্রমিকদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। হাজার হাজার শ্রমিকদের রক্তে লাল হয়ে যায় চাঁদপুরের রেল স্টেশন প্ল্যাটফর্ম। শ্রমিকদের হত্যার প্রতিবাদে রেল শ্রমিকরা ২৪ মে থেকে প্রায় দুই মাসের বেশি সময় আসাম-বেঙ্গল রেল ধর্মঘট ডাকেন। ধর্মঘটের কারণে প্রায় ৪ হাজারের ওপর শ্রমিককে চাকুরি হারাতে হয়েছে। আন্দোলনের তীব্রতায় শ্রমিকদের সাথে আলোচনায় বসেন কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস, যারা নিজ মুল্লুকে ফিরে যেতে চায় তাদের ফেরার ব্যবস্থাসহ কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই ইতিহাসের জায়গা করে নেয় মুল্লুক চলো আন্দোলন। কিছু দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার প্রেক্ষিতে চা-শ্রমিকদের জীবনযাপনে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হলেও ব্রিটিশরা বিতারিত হওয়ার পর পাকিস্তান পর্ব, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও চা-শ্রমিকরা আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আজও অবরুদ্ধ। বংশ পরম্পরায় চা-বাগানেই চা-শ্রমিকদের জীবনচক্র। ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে চা-শ্রমিকদের মৌলিক নাগরিক অধিকার আজও নিশ্চিত হয়নি। বাঁচার মতো মজুরি এখনো রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়নি। মাত্র দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে সংসারের খরচ সামলাতে হচ্ছে চা-শ্রমিক পরিবারগুলোকে। ফলে চরম মানবেতন জীবনযাপন করছেন চা-জনগোষ্ঠী। ২০ মে মুল্লুক চলো আন্দোলন, আজও চা-শ্রমিকদের শোষণমুক্তির শৃঙ্খল ভাঙার অনুপ্রেরণার উৎস। চা-শ্রমিকদের পূর্ব-পুরুষদের রক্তস্নাত ঐতিহাসিক মুল্লুক চলো আন্দোলন আজ আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার অনুপ্রেরণার উৎস। পূর্বপুরুষরা শিখিয়ে গেছেন, “বাঁচতে হলে লড়তে হবে। এ লড়াইয়ে জিততে হবে।” লেখক : প্রধান সমন্বয়ক, চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র তথ্যসূত্র: কুলিকাহিনী–রামকুমার বিদ্যারত্ন, সর্বজনকথা, প্রথম আলো, মঙ্গলধ্বনি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..