রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিম্নমুখিতা

সিরাজুমমুনীর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব সংক্রমিত হচ্ছে দিনদিন। নিম্নমুখিতার দিকে যাচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ঘুনে পোকায় আক্রান্ত হয়ে চরম দুর্ভিক্ষাবস্থায় বিরাজ করছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষর আমাদের সংস্কৃতি। অধঃপতিত পচনশীল নিকৃষ্ট ধরনের এক সংস্কৃতির প্রচলন ঘটছে আমাদের রাজনীতিতে, আমাদের স্লোগানে, আমাদের রাজনৈতিক চর্চ্চায়। রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে বা রাজনীতি প্রবহমানতা থাকে রাজনৈতিক মতাদর্শ, চর্চ্চা, প্রয়োগ বিধি বা প্রয়োগিক অনুশীলনের মাধ্যমে। রাজনীতিতে এই প্রয়োগিক অনুশীলনের জনগনের সাথে বা জনমনোভাবের সাথে সম্পৃক্ততা বা সম্মিলনই হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতিতে মনস্তাত্বিক সংস্কৃতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তন সামাজিক উন্নয়নে কতোটা প্রভাবিত হচ্ছে, তা দেখার বিষয়। মানুষের মনস্তাত্বিক সংস্কৃতি কয়েকটি কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো ব্যক্তির আত্মনিরীক্ষণ, আত্মচর্চ্চা, ন্যায়বোধ, মানবিকতা, সৃজনশীলতা, ইত্যাদি নির্ভর করে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের বস্তুগত বিষয়ের ওপর। একজন মানুষ নিজ থেকেই তার মনোজগৎ, তার মনোভাব, তার আচার আচরণ অভ্যাস বা জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না। এমনকি কোনো বিশ্বাসের ওপর ভর করে বা সম্পূর্ণ আস্থা রেখেও সে নিজের মতো করে চলতে পারে না। একজন মানুষ কোনো ধরনের সামাজিক পরিবেশে, কোনো ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জীবন ধারণ করছে, তার ওপরই নির্ভর করছে ঐ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংস্কৃতি। এরকম একটি তাত্ত্বিক অনুমোদিত সিদ্ধান্ত থেকেই হয়তো আমরা বলে আসছি, “মানুষ সামাজিক জীব”। সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের উপর ভিত্তি করেই মানুষের জীবনধারা চালিত হয়ে আসছে। এছাড়াও জলবায়ু প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং স্থানিক আঞ্চলিক বা দেশীয় পরিমণ্ডলগত আইন নিয়ম রীতিনীতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটায়। এই পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক এবং অবশ্যম্ভাবী বিষয়। জীবনধারণে পরিবর্তনশীল ইতিবাচক ভূমিকা এবং সৃজনশীল বুদ্ধিদীপ্ত মেধা ও মনন গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমাদের রাজনীতিতে ‘ট্যাগিং’ এখন এক মহাব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ট্যাগিংয়ের রাজনীতি নতুন নয়। পাকিস্তান আমলেও এই ভূখন্ডে লক্ষ্য করা গেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বা সিআইএ’র দালাল, ভারতের দালাল, পাকিস্তানের দালাল, চীন-রাশিয়ার দালাল, ইত্যাদি বহু রকমের ট্যাগিং প্রবঞ্চনা আমরা শুনে আসছি। তবে সেই সময়কালে এসব ট্যাগিং টাইপের বক্তব্য রাজনীতিতে রেটোরিক বক্তব্য হিসেবেই ধরা হতো। এখন ট্যাগ দিয়ে অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। রাজনীতির স্বচ্ছতা বিনষ্ট করা হয়। রাজনৈতিক সৃজনশীলতাকে প্রশ্নাতীত করা হয়। রাজনৈতিক শ্লীলতা বিলুপ্ত করা হয়। ট্যাগ দিয়ে গুজব সৃষ্টির পায়তারা করা হয়। ট্যাগ দিয়ে মব সৃষ্টি করা হয়। সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। একটা মিথ্যাকে সত্য বানানোর চেষ্টা করা হয়। রাজনীতিতে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করা হয়। রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত করা হয়। সমাজে বিশৃঙ্খলা ও রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে ট্যাগ। রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিম্নমুখিতার জন্যও দায়ী থাকছে এই ট্যাগিং রাজনীতি। রাজনীতিবিদদের ট্যাগ দিয়ে যারা হেয় প্রতিপন্ন করছে, তারা মূলত রাজনৈতিক চক্রান্তকারী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবেই খ্যাত হয়ে থাকবে ইতিহাসে। জার্মানির ফ্যাসিস্ট হিটলারের মন্ত্রিসভার সদস্য গোয়েবলস বলেছিলেন, “আপনি যদি একটি মিথ্যা কথা বলেন এবং সেটা বারবার সবার সামনে বলতে থাকেন, তাহলে লোকজন একসময় সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করবে।” ইহুদি নিধনের সময় গোয়েবলস প্রচার করতো, “জার্মানিতে হিটলারের মতোই শক্তিশালী একজন দরকার। তিনিই পারবেন জার্মান জাতিকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে।” গোয়েবলস তার মিথ্যা বয়ান প্রচারের জন্য জনগণের মধ্যে অসংখ্য রেডিও বিতরণ করেছিলো। ইতিহাসে নেতিবাচকভাবে এটা “গোয়েবলস থিওরি” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রাজনীতির একটা ব্যাকরণ আছে। রাজনীতির নিজস্ব ভাষা আছে। নিজস্ব চলন নীতি ও প্রয়োগ নীতি আছে। পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা ও স্থানিক জলবায়ু বা পরিবেশিক কারণে রাজনীতির প্রয়োগনীতিও ভিন্ন ভিন্ন ধারা বা মাত্রায় প্রচলিত হয়ে আসছে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। একেক দেশের রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক মিছিল, স্লোগান, সমাবেশ, বক্তৃতার ধরণ, একেকরকম। জনগণকে উজ্জীবিত করা বা সংগ্রামে সামিল করার পদ্ধতিও ভিন্ন। যেমন ধরুন, ভারতের পশ্চিম বাংলার ভাষা বাংলা হলেও মিছিলের স্লোগানের সুর-তাল-ছন্দ অন্য রকম। বাংলাদেশের সঙ্গে যার মিল নেই। কোনো দেশের জনগণ নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সময় কিংবা জনগণের চিন্তা-চেতনা ও সামাজিক মনোভাবের ওপর ভিত্তি করেই সেই দেশের রাজনৈতিক পরিচালন নীতি নির্ধারিত হয়ে থাকে। একটা নিজস্ব প্রয়োগিক ধরণ তৈরি হয়, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। রাজনীতি হচ্ছে সমগ্র জনগণের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। কোনো এক শ্রেণি বা গোষ্ঠীর পক্ষের রাজনীতি করলেও সমগ্র জনগণের মনোভাব বা সামাজিক মনোভাবকে গুরুত্ব দিতে হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে। রাজনৈতিক ব্যাকরণে হিসেব নিকেষে গড়মিল হলেই রাজনীতি তার পরিচ্ছন্নতা হারায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই ব্যাকরণের হিসেব নিকেষে যথেষ্ট রকম গড়মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে রাজনৈতিক পরিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক সৃজনশীলতা লুপ্ত হচ্ছে দিনদিন। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণমানুষের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সম্মিলিত প্রয়াসে যে আস্থা ও বিশ্বাসের ভূমিকা থাকে, তা-ও হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মূল্যবোধ, নীতিনিষ্ঠতা, শিষ্ঠাচার, আদর্শবাদিতার বিপরীতে নেতিবাচক সামাজিক মনোভাবের উদ্ভব হচ্ছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও পচনশীলতার দিকে যাচ্ছে। দ্রুতই রুদ্ধ হচ্ছে সামাজিক উন্নয়নের চিরায়ত সকল বিকাশমান পথ। ইতিহাসকে বিকৃতি করে, সত্যকে আড়ল করে, সত্যের মধ্যে মিথ্যা খুঁজে, ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে, ঘটনাকে অঘটন বানিয়ে কখনোই সত্যের মৌল নীতি ঢেকে দেয়া যায় না। সত্য হচ্ছে বাস্তবতার প্রতিরূপ। যাকে ভয় দেখিয়ে, অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে, অনুমান দিয়ে, মিথ্যা প্রচার দিয়ে বা বিজ্ঞানের বিকৃত তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। নিজস্ব বা গোষ্ঠীগত ক্ষমতা দিয়েও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কথায় তো আছে, সত্য ঢাকা যায় না। সত্যেরও ইতিহাস আছে। আছে ঐতিহ্য, নীতি, আদর্শ। আছে মানবিক জীবনযাত্রার তত্ত্ব। সত্য বেঁচে থাকে একা। একাই পথ চলে। কারো ওপর নির্ভর করে চলে না। বরং সত্যের ওপর ভর করেই সভ্যতা এগোয় সামনের দিকে। আবার সেই সত্যকে চেপে দিয়ে, বিকৃত করে মানুষেরই এক অংশ হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই সমাজেই স্থান করে নিতে চায়। রাজনীতি ও সমাজনীতি কুক্ষিগত করতে চায়। শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টি করে, শোষণ নির্যাতন করে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম ব্যবহার করে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ ও মানুষে মানুষে আন্তসম্পর্ক। ভোগবাদিত্ব সমাজ ও নিপীড়নমুলক রাষ্ট্র নির্মিত হচ্ছে। চরম আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি হচ্ছে। ইট-পাথরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে চরম দুর্নীতির পথ প্রশস্থ হলেও সামাজিক উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হচ্ছে ক্রমশ। কথাগুলো বলা হচ্ছে একারণেই, “জাল পরা বাসন্তী” বা “জজ মিয়া নাটক’’ ইত্যাদি ধরনের ঘটনাকে যে যেভাবেই মূল্যায়িত করে স্বীয়স্বার্থ হাসিল করুক না কেনো, অন্তর্নিহিত ঘটনা বা সত্যকে কেউই ঢেকে রাখতে পারবে না। “চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ’’ বা ‘’একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা” বা “বিডিআর বিদ্রোহ” নামে ৫৭ সেনা অফিসার হত্যার সত্যতা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে যাবে একদিন। সাবেক এক শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, প্রকৃত শিক্ষাবিদ বা শিক্ষানুরাগীগণ কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হতে চান না। প্রকৃত শিক্ষাবিদগণের এই মানসিক পরিবর্তন আমাদের জাতির জন্য শুধুই দুঃখজনক নয়, লজ্জাজনকও বটে। শিক্ষাবিদদের অনাগ্রহতা বাড়ছে দিনদিন। একসময় প্রকৃত শিক্ষাবিদগণই সম্মানজনক পদ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিযুক্ত হতেন। সত্তর বা আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিগণের তালিকা দেখলেই সত্যতার প্রমাণ মিলবে। যেদিন থেকে ক্ষমতাসীনদের অবৈধ রাজনৈতিক প্রভাব বলয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ভিসি নিয়োগে দলীয় মনোনয়ন বা দলবাজি বা তদবির বাণিজ্য যুক্ত হয়েছে; সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে অপশাসন, স্বজনপ্রীতি, পরিবারপ্রীতি, নীতিহীনতা, ব্যাপক দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিকতা, বিচারহীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট’৭৩ না মানা, ইত্যাদি। মানদণ্ডের বিচারে শিক্ষার মানও নেমেছে নিম্নগতিতে। প্রকৃত শিক্ষাবিদদের মানষিক পরিবর্তনের এটাও মুখ্য কারন বলে মনে করা হয়। ব্যক্তিজীবনেও মানুষের নীতি-আদর্শ থাকে। নীতি-আদর্শহীন মানুষ সামাজিক জীব হয়ে উঠতে পারে না। দলকানা অন্ধ, অপরিপক্ব, স্বার্থবাদী বা ধর্মান্ধ রাজনীতিবিদ দ্বারা সুষ্ঠু রাজনীতির বিকাশ অসম্ভব। বরং রাজনীতিকে সুবিধাবাদী ভোগবাদী অমানবিক কর্তৃত্ববাদিত্বের দিকে নিয়ে যায়। অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারীত্বের দিকে নিয়ে যায়। ধর্মীয় বিভাজনকে আরো বিকশিত করে। শ্রমশোষণ প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করে শ্রেণিবৈষম্য চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। সামাজিক সম্পর্ক ভূলুণ্ঠিত করে সামাজিক আস্থা-অনাস্থা বিঘ্নিত করে। ইতিহাস ঐতিহ্য ও চলমান রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ধারা বিলুপ্তির পথে এগোতে থাকে। ধ্বংস হতে থাকে সমাজ প্রগতি ও সামাজিক উন্নয়ন। সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে নীতি আদর্শ হচ্ছে মৌল উপাদান। যারা এই মৌল উপাদান বিসর্জন দেয়, তাদের মানবিক মূল্যবোধ থাকে না। তাদের সংস্কৃতিরও অবক্ষয় ঘটে। রাজনীতি বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তাদের কাছে অস্তিত্ব রক্ষা বা সমাজের অবৈধ সুবিধা নেয়ার বাহন হিসেবে কাজ করে। তারা লোকচক্ষুকে অবজ্ঞা করে। তারা সহযোগী বা সহকর্মীদের নিয়ে একসাথে চলার স্মৃতিও ভুলে যায়। জনমনোভাবকেও তারা তোয়াক্কা করে না। তারা ভোগবাদীত্বে বিশ্বাস করতে থাকে। আরাম আয়েশি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে থাকে। তারা নিজস্ব ভাবমুর্তির কথাও চিন্তা করে না। তারা রাজনীতিতে অনাস্থার জায়গা তৈরি করে। বিশেষ করে বাম প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী রাজনীতিতে এগুলো এক নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকে। জনগণের অনাস্থা গ্রথিত হতে হতে ক্রমশ ঘনীভূত হয়। বামপন্থিদের ওপর জনগণের আস্থাহীনতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এইসব সুবিধাভোগী নীতি-আদর্শহীন ব্যক্তিবর্গের রাজনীতিতে ধৃষ্টতাপূর্ণ পদচারণায়। ফলে সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কলুষিত করা হচ্ছে। সমাজ ও রাজনীতিতে সুসম সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা নিতে হয় বেশি। রাষ্ট্রের ইতিবাচক ভূমিকার ওপরেই নাগরিকদের সৃজনশীল ও প্রগতিশীল সংস্কৃতি গতিশীল হতে পারে। শিশু কিশোর যুবকসহ সকল মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শারীরিক গঠন, মনোরঞ্জন, আনন্দ উৎসব, মানবিক মূল্যবোধ, নীতিনিষ্ঠ আদর্শ, সামাজিক উন্নয়ন ও মানষিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতীব প্রয়োজন পাড়ায় মহল্লায় গ্রামেগঞ্জে খেলার মাঠসহ ক্লাব ও সাহিত্য-সংগীত-নাট্যচর্চ্চার জন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও পরবর্তীকালেও সমগ্র বাংলাদেশে এর বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর গ্রাম ও শহর পাড়া-মহল্লা থেকে খেলার মাঠসহ ক্লাব ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রগতিশীল মানুষ, গবেষক ও বিজ্ঞজনেরা একথা বলে আসছে দীর্ঘদিন থেকেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই বিশেষ করে ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাসের প্ররোচনায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বন্ধ করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। সংস্কৃতিচর্চ্চাও এখন হীন ভোট রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ হয় কম। অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই অনুৎসাহিত করা হচ্ছে দিনদিন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চ্চার অভাবের কারণেও দেশময় মাদক প্রবাহের এতো বিস্তার। ইট-পাথরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে না সামাজিক উন্নয়ন। দেশ ও সমাজটাকে পিছিয়ে নেয়ার এ এক মহা পরিকল্পনা। এসব বাস্তবতাবর্জিত মহাপরিকল্পনার ফলেই সমাজ ও সামাজিক মনোভাব পিছিয়ে পড়ছে দিনদিন। আর মহাসংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। পন্থিকেন্দ্রিক আর অন্ধত্ব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অন্ধগলিতে নিমজ্জিত করেছে। পন্থিকেন্দ্রিক রাজনীতি আমাদের মেধা-মনন বিকাশের পথ রুদ্ধ করেছে। সৃজনশীল সক্ষমতার গতিময়তাকে পঙ্গু করেছে। চিন্তাশক্তির স্বাধীনতা বিনষ্ট করেছে। একসময় এমন প্রবাদও ছিলো, “মস্কো বা পিকিং বৃষ্টি হলে এদেশে ছাতা ধরে।” পরনির্ভরশীল এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের আচ্ছন্ন করেছে। ধর্মীয় অন্ধত্ব যেমন সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পিছিয়ে নেয়, প্রগতি ও বিজ্ঞানমনস্কতার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, পন্থিকেন্দ্রিক রাজনীতির পথও অনেকটা ঐরকম। যদিও বামপন্থিদের মধ্যে এখন মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ডানপন্থি ও সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহের মধ্যে পন্থিকেন্দ্রিক, অন্ধ মৌলবাদিত্ব ও পরিবারকেন্দ্রিকতা প্রবল আকারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তা পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যায়। জোটভুক্ত হওয়া উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে বহুদিন থেকেই প্রচলিত হয়ে আসছে। এখন পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিভক্ত দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া, কর্মসূচিভিত্তিক জোটভুক্ত হওয়া, একসঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, ইত্যাদি। ছোট ছোট দলগুলো একসঙ্গে নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় স্বার্থহীনভাবে কৌশলগত সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদি জোটবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে অংশ নেয় বা জনগণের দাবি পূরণে অগ্রসর ভূমিকা পালন করে, তা ইতিবাচকভাবেই দেখার অবকাশ আছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কলুষিত করছে বৃহৎ দলগুলোর সাথে ছোট দলগুলোর জোটভুক্ত ঐক্য। প্রয়াত অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান বাংলাদেশে বারবার অস্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে “মাতস্যন্যায়” এর কথা বলেছেন। তাঁর মতে, “প্রাচীন বাংলায় চিন্তানায়কেরা অস্থিতিশীলতাকে মাতস্যান্যায় বলে অভিহিত করতেন। আভিধানিক অর্থে, মাতস্যান্যায় হলো মাছের মতো অবস্থা, যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে এবং ছোট মাছের বাঁচার কোনো অধিকার থাকে না”। বড় দলের সাথে ঐক্য মানে হচ্ছে ছোট দলের অধিকার বিনষ্ট হওয়া। বড় দলের প্রভুত্ব মেনে ঐক্য রক্ষা করা। বড় দলে সকল কর্ম বা অপকর্ম নিজেদের দলের দায় হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত হওয়া। কালক্রমে ছোট দলকে সুবিধাবাদী আপসকামী দল হিসেবে পরিণত করা। রাজনীতিতে সম্ভবত একটা শূন্যতা বিরাজ করছে। কোন প্রজন্ম চর্চ্চা করবে রাজনীতি, কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক চর্চা সামনের দিকে এগোবে, কিংবা আমাদের রাজনীতি কার হাতে থাকবে, কে বা কারা নিয়ন্ত্রণ করবে, নির্দিষ্ট রক্তীয় পরিবার নাকি পারিবারিক গোষ্ঠী, ব্যবসায়িক মহলের অবৈধ স্বার্থান্বেষী মহল, নাকি মুক্ত চিন্তাশীল বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল প্রজন্ম। প্রয়োজন একটি উন্নত বিজ্ঞানমনস্ক একমুখী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। এ ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সমাজে ইহজাগতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন বাস্তবতার বিকাশ ঘটতে পারে। লেখক : রাজনীতিক ও লেখক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..