বামপন্থিদের ঐক্য ও সংহতির নতুন বার্তা

সিপিবিসহ ৮ দলের বাম গণতান্ত্রিক জোট

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : দুঃশাসন, জুলুম-লুটপাটতন্ত্র প্রতিহত, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম জোরদার করা এবং বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-সহ আটটি দলের সমন্বয়ে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ এর পথচলা শুরু হয়েছে। গত ১৮ জুলাই ঢাকার পুরানা পল্টনস্থ সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এ জোটের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়। সিপিবি ছাড়া জোটের শরীক বাকি ৭টি দল হচ্ছে—বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। সংবাদ সম্মেলনের প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন বাসদ-এর সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাসদ (মার্কসবাদী)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্তী। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আমরা দেশকে বাঁচাতে চাই। এই সরকারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে চাই। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই জোট গড়ে উঠেছে। গত ১ বছরে একাধিক হরতালসহ নানা কর্মসূচি আমরা যৌথভাবে পালন করেছি। আন্দোলনের ভেতর দিয়েই আমরা এক জোটে এসে মিলিত হয়েছি। আমাদের আন্দোলনের সব খবর মিডিয়ায় আসে না। আমরা ‘দুর্বল’ বলে শাসক শ্রেণি প্রচার করে। আমরা যদি দুর্বলই হতাম, তাহলে শাসক শ্রেণি আমাদের ওপর এত নিপীড়ন চালাত না। সরকারের দমন নীতি আমাদের কর্মীদের ওপর আসছে। এখনও আমাদের অনেক কর্মী হাসপাতালে। কমরেড সেলিম আরও বলেন, আমাদের জনসমর্থন রাজপথে। জনগণের মনের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষাটা আছে, সেই আকাঙ্ক্ষাটা আমরা প্রতিধ্বনিত করি। জনগণের সমর্থন ভোটের সংখ্যায় রূপান্তর করার চেষ্টা অবশ্যই থাকবে। নির্বাচন যেখানে ‘প্রহসনে’ পরিণত হয়েছে, সেখানে আমাদের প্রকৃত জনসমর্থন কী করে বোঝা যাবে? আমরা ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার জন্য জোট করছি না। আমাদের জোট ইলেকশন অ্যালায়েন্স নয়। নির্বাচন আমাদের সামগ্রিক আন্দোলনের অংশ। আন্দোলনের স্বার্থে আমরা ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারি, আবার বয়কটও করতে পারি। জোট সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে কমরেড সেলিম বলেন, প্রকৃত বামপন্থিরা রাজপথে নামলে, মিলিতভাবে এই জোটকে আরও সম্প্রসারণ করব। কিন্তু যারা শাসক শ্রেণির সঙ্গে, এই ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, তারা আমাদের এই চিন্তা বা আহ্বানের আওতাভুক্ত না। আমাদের লড়াই তাদের বিরুদ্ধেও। নির্বাচন সম্পর্কে সিপিবির সভাপতি বলেন, এই কথা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। নির্বাচন ‘প্রহসনে’ পরিণত হয়েছে। সুতরাং পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচনকালে যাতে প্রকৃত নিরপেক্ষ সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উভয়ের ক্ষেত্রে যাতে নিরপেক্ষ কর্তৃত্ব থাকে, সেই জন্য সংবিধান সংশোধন করে হলেও সেই ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করতে হবে। আমরা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুসহ নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার চাই। টাকার খেলা, পেশিশক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি থেকে নির্বাচনকে মুক্ত করতে চাই। নির্বাচন কমিশন জামানতের টাকা বাড়িয়ে নাকি ৫০ হাজার টাকা করার চিন্তা-ভাবনা করছে। কমিশন এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে, তা হবে গরিব মানুষের স্বার্থবিরোধী, গবিবদের প্রার্থী হওয়া থেকে বঞ্চিত করার পদক্ষেপ। তখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কি না সেই বিষয়ে একশ বার ভেবে দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রাষ্ট্র ও সরকারের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি শাসক লুটেরা পুঁজিপতিদের শাসন তথা বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন। দেশবাসী এই দুঃসহ অবস্থার পরিবর্তন চায়, মুক্তি চায় এই দুঃশাসন থেকে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে নতজানু লুটেরা পুঁজিপতি ধনিক শ্রেণির দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বারা বা তাদের মধ্যে ক্ষমতার গতানুগতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে এই সব সংকট ও দুর্দশা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না। লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, লুটেরা পুঁজিপতি শ্রেণির নিষ্ঠুর শোষণমূলক ব্যবস্থা, বর্তমান স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রীক লুটেরা ধনিক শ্রেণির দ্বি-দলীয় অপরাজনীতির বাইরে জনগণের নিজস্ব বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশ জোরদার করা জরুরি। বাম, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তিই জনগণের প্রকৃত ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে। এই রাজনৈতিক অবস্থান ও লক্ষ্য নিয়েই গত এক বছর ধরে আমরা সিপিবি-বাসদ-গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার অন্তর্ভুক্ত ৮টি রাজনৈতিক দল আন্দোলনের আশু ৫ দফা দাবিসমূহের ভিত্তিতে গণ-আন্দোলন, গণসংগ্রাম বিকশিত ও জোরদার করতে কাজ করে আসছি। আমাদের এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করতে আমরা আমাদের ঐক্য ও সংহতিকে নতুন স্তরে উন্নীত করা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এই লক্ষ্যে আমরা আন্দোলনের নতুন জোট ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করতে, বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে সকল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গসহ দেশবাসীর প্রতি সংবাদ সম্মেলন থেকে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জোটের ১৬ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ ও সমন্বয়কের নাম ঘোষণা করা হয়। জোটের সমন্বয়ক হিসেবে আগামী ৩ মাস দায়িত্ব পালন করবেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন– মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মো. শাহ আলম, খালেকুজ্জামান, বজলুর রশীদ ফিরোজ, সাইফুল হক, আকবর খান, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, ফখরুদ্দিন কবির আতিক, জোনায়েদ সাকি, ফিরোজ আহমেদ, মোশাররফ হোসেন নান্নু, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, মোশরেফা মিশু, মমিন উর রহমান বিশাল, হামিদুল হক, রণজিত কুমার। কমরেড মণি সিংহ সড়কস্থ সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জোটের অস্থায়ী কার্যালয় হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচিগুলো হচ্ছে– ১) ২৪ জুলাই মঙ্গলবার : দুঃশাসন, জুলুম, দুর্নীতি-লুটপাটতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র প্রতিরোধ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ-সমাবেশ। (ঢাকার কর্মসূচি : বিকেল ৪টায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে) ২) ৪ আগস্ট শনিবার : ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে ঢাকায় মতবিনিময় সভা। ৩) ১০ ও ১১ আগস্ট শুক্র ও শনিবার : ৬টি বিভাগীয় শহরে (চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর) সভা, সমাবেশ, জনসভা, মিছিল। জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..