
একতা ডেস্ক :
চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের যুগে বসে যখন রবীন্দ্রনাথের নিসর্গচিন্তা নিয়ে ভাবতে যাই, দেখি রবীন্দ্রযুগের পরিবেশ ছিল আজকের তুলনায় স্বর্গ-উদ্যান বা নন্দনকানন। ফলে পরিবেশ নিয়ে ভাবলেই মনে হয় অতীত সবসময়ই স্বর্গ। আমরা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। মানে আমরা ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ করেছি। ‘প্যারাডাইজ রিগেইন’ করার আকুতি যাদের ভেতর ছিল তারা চিরকালই ভাবকেন্দ্রিকতার প্রতি আকুল ছিল। ‘রোমান্টিক’ যুগকে বিতাড়িত করে স্বর্গে পাঠানো হল, মর্তে পড়ে রইল ক্ষমতা পূজারিরা। তাদের দৌড়-ঝাপে আজ পৃথিবী কম্পিত। পৃথিবীতে ‘আধুনিক’ যুগের নিষ্পত্তি ‘বোধহয়’ পরকাল ছাড়া সম্ভব হবে না। কারণ যে নদী মরে গেছে, যে ঘুঘু ঝরে গেছে, তাদের জিন্দা করে তাদের গান শোনা হবে কী ফের?
মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বিশ্বজুড়েই প্রকৃতি-পরিবেশ, মানুষ এবং প্রাণীর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। যে জন্য গবেষকরা বেশি দায়ী করছেন উন্নত দেশগুলোকে, যারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে যাচ্ছেতাইভাবে পরিবেশের উপর আধিপত্য দেখাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমন উপলব্ধি ছিল বলেই তিনি ‘অরণ্য দেবতা’ প্রবন্ধে এমন মন্তব্য করেছেন, মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের হাত থেকে অরণ্যসম্পদকে রক্ষা করা সর্বত্রই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিধাতা পাঠিয়েছিলেন প্রাণকে, চারিদিকে তারই আয়োজন করে রেখেছিলেন- মানুষই নিজের লোভের দ্বারা মরণের উপকরণ জুগিয়েছে। বিধাতার অভিপ্রায়কে লঙ্ঘন করেই মানুষের সমাজে আজ এত অভিসম্পাত। লুব্ধ মানুষ অরণ্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতিকে ডেকে এনেছে; বায়ুকে নির্মল করবার ভার যে গাছপালার উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে। বিধাতার যা-কিছু কল্যাণের দান, আপনার কল্যাণ বিস্মৃত হয়ে মানুষ তাকেই নষ্ট করেছে।
যে বিষয়টি বর্তমানে পরিবেশবিদদের অত্যন্ত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিই রবীন্দ্রনাথ অনেক আগে উপলব্ধি করেছিলেন এবং সেই প্রকৃতিবাদী দর্শনচিন্তার প্রতিফলন রেখে গেছেন বিভিন্ন কাব্যে-সাহিত্যে। তাঁর ‘আত্মশক্তি’ নামক রচনায় নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি পাওয়া যায়, আমরা লোভবশত প্রকৃতির প্রতি ব্যভিচার যেন না করি। আমাদের ধর্মে-কর্মে ভাবে-ভঙ্গিতে প্রত্যহই তাহা করিতেছি, এইজন্য আমাদের সমস্যা উত্তরোত্তর জটিল হইয়া উঠিতেছে- আমরা কেবলই অকৃতকার্য এবং ভারাক্রান্ত হইয়া পড়িতেছি। বস্তুত জটিলতা আমাদের দেশের ধর্ম নহে। উপকরণের বিরলতা, জীবনযাত্রার সরলতা আমাদের দেশের নিজস্ব- এইখানেই আমাদের বল, আমাদের প্রাণ, আমাদের প্রতিভা।
রবীন্দ্রনাথ ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় প্রকৃতির অপরূপ রূপের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!; গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।; অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,; ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
তিনি এখানে কেবল প্রকৃতির রূপ বর্ণনা করেছেন, আমরা যদি কেবল এতটুকু উপলব্ধি করি- তবে তা অপর্যাপ্ত থেকে যাবে এজন্য যে, তিনি এখানে প্রকৃতির রূপ বর্ণনার পাশাপাশি প্রকৃতিকে মায়ের সাথে তুলনা করেছেন। যার মাধ্যমে আসলে তিনি প্রকৃতির মর্যাদা বা গুরুত্বকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর ‘বৃক্ষ’ নামক কবিতায় মানুষকে নয় বরং বৃক্ষকেই ‘মৃত্তিকার বীর সন্তান’ এবং ‘আদিপ্রাণের’ স্বীকৃতি দিয়েছেন।
‘মৃত্তিকার হে বীর সন্তান,; সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদান; মরুর দারুণ দুর্গ হতে; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে; সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে’
পৃথিবীব্যাপী এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে। কার্বন নিঃসরণ, পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। আমরা প্রতিনিয়তই হা-পিত্যেশ করতে থাকি আমাদের নগর জীবন নিয়ে। যে উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথ আগেই করে বলেছিলেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’ তাছাড়া তিনি প্রকৃতির সমন্বয় ও ঐক্যের পক্ষে ছিলেন বলেই শহরকে উদ্দেশ্য করে বলতে পেরেছিলেন, ইঁটের ‘পরে ইঁট, মাঝে মানুষ-কীট; নাইকো ভালোবাসা, নাইকো খেলা।; কোথায় আছ তুমি কোথায় মা গো, কেমনে ভুলে তুই আছিস হাঁগো।; উঠিলে নব শশী, ছাদের ‘পরে বসি; আর কি রূপকথা বলিবি না গো!
একইসঙ্গে গ্রামকে নিয়েও বলেছিলেন, লোকে অনেক সময়ই আমার সম্বন্ধে সমালোচনা করে ঘরগড়া মত নিয়ে। বলে, ‘উনি তো ধনী-ঘরের ছেলে। ইংরেজিতে যাকে বলে, রুপোর চামচে মুখে নিয়ে জন্মেছেন। পল্লীগ্রামের কথা উনি কী জানেন। আমি বলতে পারি, আমার থেকে কম জানেন তাঁরা যাঁরা এমন কথা বলেন। কী দিয়ে জানেন তাঁরা। অভ্যাসের জড়তার ভিতর দিয়ে জানা কি যায়? যথার্থ জানাই ভালোবাসা। কুঁড়ির মধ্যে যে কীট জন্মেছে সে জানে না ফুলকে। জানে, বাইরে থেকে যে পেয়েছে আনন্দ। আমার যে নিরন্তন ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে আমি পল্লীগ্রামকে দেখছি তাতেই তার হৃদয়ের দ্বার খুলে গিয়েছে।’
রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা নাটকে আধুনিক যন্ত্রদানবের কথা পরিষ্কারভাবে এসেছে এবং মানুষ কিভাবে বাঁধ নির্মাণ করে প্রকৃতির জলধারাকে বাগে এনে প্রকৃতির উপর অবিচার করে এতে তার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর ডাক- ফিরে চল, ফিরে চল, ফিরে চল মাটির টানে; যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।
রবীন্দ্রনাথ প্রথম পরিবেশ বিষয়ে নাড়া খান জাপান যাবার পথে ১৯১৪ সালে একটি জাহাজের থেকে তেল চুঁইয়ে পড়তে দেখে। আধুনিক মানুষের এই উদাসীন মনোভাব প্রকৃতিপ্রেমী রবিকে তীব্র নাড়া দেয়। এর ফলে, রবীন্দ্রনাথের অজস্র লেখায় পরিবেশ সচেতনতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়াও তার প্রবন্ধ- ‘পল্লী প্রকৃতি’, ‘শহর ও নগর’, ‘বিলাসের ফাঁস’, ‘অরণ্য দেবতা’, ‘হলকর্ষণ’, ‘উপেক্ষিতা পল্লি’ , তার কবিতা ‘দুই পাখি’, ‘বসুন্ধরা,’ ‘প্রশ্ন’ ও গীত নাট্য ‘রক্তকরবী’ ও ‘মুক্তধারা’য় ও তার চিঠিপত্র ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে তাঁর গভীর পরিবেশ সচেতনতা ও তাঁর পরিবেশ ভাবনাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবার তাগিদ যোগায়। তাই ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় কবি উদাত্তভাবে শহুরে জীবন ত্যাগ করতে আহ্বান জানান: দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর; লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর; হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী; দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি।
পরিবেশকে বিপর্যস্ত ও বিপন্ন হতে দেখে কবি বিচলিত হয়ে পড়েন। তাই ‘তপোবন’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, মানুষকে বেষ্টন করে এই যে জগৎপ্রকৃতি আছে, এ যে অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে মানুষের সকল চিন্তা সকল কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে। মানুষের লোকালয় যদি কেবলই একান্ত মানবময় হয়ে ওঠে, এর ফাঁকে ফাঁকে যদি প্রকৃতি কোনওমতে প্রবেশাধিকার না পায় তাহলে আমাদের চিন্তা ও কর্ম ক্রমশ কলুষিত ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে নিজের অতল-স্পর্শ আবর্জনার মধ্যে আত্মহত্যা করে মরে। এই যে প্রকৃতি আমাদের মধ্যে নিত্যনিয়ত কাজ করছে অথচ দেখাচ্ছে যেন সে বেচারা নিতান্ত একটা বাহার মাত্র, এই প্রকৃতিকে আমাদের দেশের কবিরা বেশ করে চিনে নিয়েছেন। এই প্রকৃতি মানুষের সমস্ত সুখদুঃখের মধ্যে যে অনন্তের সুরটি মিলিয়ে রাখছে সেই সুরটিকে আমাদের দেশের প্রাচীন কবিরা সর্বদাই তাঁদের কাব্যের মধ্যে বাজিয়ে রেখেছেন।
তাই কবি প্রকৃতির প্রতি সচেতন হয়ে ‘বৃক্ষরোপণ’ নামে গাছ লাগানোর একটি উৎসবের সূচনা করেছিলেন। ‘হলকর্ষণ’ নামে রচনা করেছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। তিনি লিখলেন- ‘পৃথিবী একদিন যখন সমুদ্রস্নানের পর জীবধাত্রীরূপ ধারণ করলেন তখন তাঁর প্রথম যে প্রাণের আতিথ্যক্ষেত্র সে ছিল অরণ্যে। তাই মানুষের আদিম জীবনযাত্রা ছিল অরণ্যচররূপে। পুরাণে আমরা দেখতে পাই, এখন যে-সকল দেশ মরুভূমির মতো, প্রখর গ্রীষ্মের তাপে উত্তপ্ত, সেখানে এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্ত পর্যন্ত দণ্ডক নৈমিষ খা-ব ইত্যাদি বড় বড় সুনিবিড় অরণ্য ছায়া বিস্তার করেছিল। আর্য ঔপনিবেশিকেরা প্রথম আশ্রয় পেয়েছিলেন এই-সব অরণ্যে, জীবিকা পেয়েছিলেন এরই ফলে মূলে, আর আত্মজ্ঞানের সূচনা পেয়েছিলেন এরই জনবিরল শান্তির গভীরতায়’।
১৯২৫ সালের পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মোৎসব পালিত হয় শান্তিনিকেতনে। বৃক্ষরোপণ উপলক্ষে সেদিন কবির সদ্য রচিত গান গাওয়া হয়। যা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ সচেতনতা প্রকাশ করে দারুণভাবে: মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ।; ধূলিরে ধন্য করো করুণার পুণ্যে হে কোমল প্রাণ॥; মৌনী মাটির মর্মের গান কবে উঠিবে ধ্বনিয়া মর্মর তব রবে,; মাধুরী ভরিবে ফুলে ফলে পল্লবে হে মোহন প্রাণ॥
তার বেশ কিছু অনবদ্য প্রবন্ধে গ্রামের প্রতি অনুরাগ আর তা রক্ষার তাগিদ ফুটে উঠেছে। এইসব প্রবন্ধে তাঁর পরিবেশ সচেতনতা তাঁকে নিঃসন্দেহে পরিবেশবাদীরূপে তুলে ধরেছে। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবাদী প্রবন্ধগুলো হল: ‘পল্লী-প্রকৃতি’ ‘ভূমিলক্ষী’ ‘দেশের কাজ’ ‘শ্রীনিকেতন’ ‘পল্লী সেবা’ ও ‘উপেক্ষিতা পল্লী’ ইত্যাদি।
শিল্পায়ন, নগরায়নের নামে ফসলি জমির যে ক্ষতি হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ তা দেখে বিচলিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও তেমনিভাবে সতর্কবাণী দিয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শত বছর আগেই পরিবেশের ক্ষীয়মাণ রুগ্ন দশা দেখে তা রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছিলেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। ‘পল্লী প্রকৃতিতে’ তিনি বিষাদের সুরে-হারিয়ে যাওয়া গ্রাম্য সৌন্দর্য আর শহর ও শিল্পের উত্থানে ব্যথিত হন। কারণ তিনি তখনি বুঝতে পারছিলেন যে এই নগরায়ন আর প্রকৃতির বিনাশ আমাদের সঙ্গে পরিবেশের যে ভারসাম্য তা একসময় আমাদের হুমকির মুখে ফেলবে।
বর্তমানে আমরা সভ্যতার যে প্রবণতা দেখি তাতে বোঝা যায় যে, সে ক্রমশই প্রকৃতির সহজ নিয়ম পেরিয়ে বহুদূরে চলে যাচ্ছে। মানুষের শক্তি জয়ী হয়েছে প্রকৃতির শক্তির উপরে, তাতে লুঠের মাল যা জমে উঠল তা প্রভূত। এই জয়ের ব্যাপারে প্রথম গৌরব পেল মানুষের বুদ্ধিবীর্য, কিন্তু তার পিছন-পিছন এল দুর্বাসনা। তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা স্বভাবের নিয়মের মধ্যে সন্তুষ্ট রইল না, সমাজে ক্রমশই অস্বাস্থ্যের সঞ্চার করতে লাগল, এবং স্বভাবের অতিরিক্ত উপায়ে চলেছে তার আরোগ্যের চেষ্টা। বাগানে দেখতে পাওয়া যায় কোনও কোনও গাছ ফলফুল-উৎপাদনের অতিমাত্রায় নিজের শক্তিকে নিঃশেষিত করে মারা যায়- তার অসামান্যতার অস্বাভাবিক গুরুভারই তার সর্বনাশের কারণ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিকে অতিক্রমণ কিছুদূর পর্যন্ত সয়, তার পরে আসে বিনাশের পালা। ইহুদীদের পুরাণে বেব্ল্’-এর জয়স্তম্ভ-রচনার উল্লেখ আছে, সেই স্তম্ভ যতই অতিরিক্ত উপরে চড়ছিল ততই তার উপর লাগছিল নীচে নামাবার নিশ্চিত আকর্ষণ।
আমাদের পল্লী মগ্ন হয়েছে চিরদুঃখের অন্ধকারে। সেখান থেকে মানুষের শক্তি বিক্ষিপ্ত হয়ে চলে গেছে অন্যত্র। কৃত্রিম ব্যবস্থায় মানবসমাজের সর্বত্রই এই-যে প্রাণশোষণকারী বিদীর্ণতা এনেছে, একদিন মানুষকে এর মূল্য শোধ করতে দেউলে হতে হবে। সেই দিন নিকটে এল।
আজ থেকে শতবর্ষ আগেই তিনি যন্ত্রের ব্যবহার যাতে মঙ্গলময় হয় তা বলে গেছেন ‘পল্লী প্রকৃতিতে’: মানুষ যেমন একদিন হাল লাঙ্গলকে, চরকা তাঁতকে, তীর ধনুককে, চক্রবান যানবাহনকে গ্রহণ করে তাকে নিজের জীবনযাত্রার অনুগত করেছিল, আধুনিক যন্ত্রকেও সেইরকম করতে হবে।
কিন্তু এতদিন পরে এসে আমরা যা দেখছি প্রাকৃতিক শক্তির প্রাধান্য নয় বরং যান্ত্রিক শক্তির প্রাবল্যে প্রকৃতি আজ সত্যিই অসহায়। ‘অরণ্য দেবতা’ নামক প্রসিদ্ধ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন, কিভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট হল তিনি বলেন, এ সমস্যা আজ শুধু এখানে নয়, মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের হাত থেকে অরণ্যসম্পদকে রক্ষা করা সর্বত্রই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিধাতা পাঠিয়েছিলেন প্রাণকে, চারি দিকে তারই আয়োজন করে রেখেছিলেন- মানুষই নিজের লোভের দ্বারা মরণের উপকরণ জুগিয়েছে। বিধাতার অভিপ্রায়কে লঙ্ঘন করেই মানুষের সমাজে আজ এত অভিসম্পাত। লুব্ধ মানুষ অরণ্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতিকে ডেকে এনেছে; বায়ুকে নির্মল করবার ভার যে গাছপালার উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে। বিধাতার যা-কিছু কল্যাণের দান, আপনার কল্যাণ বিস্মৃত হয়ে মানুষ তাকেই নষ্ট করেছে।
আর প্রকৃতির এই মৃতপ্রায় অবস্থার জন্যে যে দায়ী আমরা সচেতন মানুষেরা তা বুঝতে কষ্ট হয় না। কারণ মানুষ কখনওই প্রকৃতির সঙ্গে নৈতিক আচরণ করেনি। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেন: আমি যেভাবে প্রকৃতিকে এঁকেছি তা তার বাইরের রূপ মাত্র। এখন বাকি ভাবনাটা আপনাদের ওপর- প্রকৃতির যে কি করুণ আর বিপর্যস্ত অবস্থা!
বনবাণীর ‘বৃক্ষবন্দনা’ পরিবেশবাদী চিন্তাবিদদের কাছে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা; কারণ গাছ রক্ষা বর্তমান পরিবেশবাদীদের কাছে অন্যতম প্রধান বিষয়। একদিকে গাছ আমরা নির্বিচারে নিধন করছি; আবার বলছি এই গাছকে রক্ষা করতে হবে আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় নেন গাছের কাছে তার সংগীতময় উৎসবে: “বৃক্ষবন্দনা”
বাণীশূন্য ছিল একদিন; জলস্থল শূন্যতল, ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন; শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয়,; যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয়,; কবি ছুটে যান বৃক্ষের তলদেশে কারণ বৃক্ষ শান্তির বাণী ধরে রাখে যুগ যুগ ধরে,; তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে; শুনিতে মৌনের মহাবানী; দুশ্চিন্তার গুরুভারে; নতশীর্ষ বিলুণ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব-; প্রাণের উদার রূপ, রসরূপ নিত্য নব নব,।
কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো গাছের নিচে শুধু সান্ত¡না পান না বেদনাহত মনে দেখেন গাছেদের করুণ অন্তর্ধান। এই বেদনার মাঝেই তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো বৃক্ষপ্রেম রেখে যান; চার্লটের চাওয়া এই গাছ নিধন বন্ধ হোক।
‘রক্তকরবী’ নাটকটি মানুষের অপরিসীম লোভ আর প্রতীকীভাবে পুঁজিবাদের চরিত্র ফুটিয়ে তোলে। মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কতোটা অমানবিক আর দুর্বল হয়ে পড়ে রাজা মকররাজ তার উদাহরণ। রাজা মকররাজ তার ‘যক্ষপুরী’ কারাগারে মাটির তল খুঁড়ে একদল ক্রীতদাস দিয়ে সোনা আহরণে মগ্ন। রাজার এই সোনা আহরণের নেশায় প্রকৃতি হতে থাকে ক্ষতবিক্ষত। চলে প্রকৃতির প্রতি অন্যায়-অবিচার। রাজার নাগপাশে বন্দী একদল লোক। খুবই লোভী রাজার লোভের আগুনে পুড়ে মরছে তার নিযুক্ত সোনার খনির শ্রমিকরা। পুঁজিবাদী সমাজের অসহায় প্রতিনিধি তারাই রাজার স্বর্ণলাভের একমাত্র মাধ্যম। পুঁজিবাদের কালো থাবা যেভাবে খনি খুঁড়ে, শিল্পায়ন আর শহরায়নের নামে প্রকৃতিকে বিদীর্ণ করছে আধুনিক কবিরাও তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ একটি গীতিনাটক। ‘মুক্তধারা’ নাটকে আধুনিক যন্ত্রদানবের কথা পরিষ্কারভাবে এসেছে এবং মানুষ কীভাবে বাঁধ নির্মাণ করে প্রকৃতির জল ধারাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে প্রকৃতির উপর অবিচার করে এতে তার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। নাটকটিতে প্রতীকীভাবে একচ্ছত্র শাসকদের অপশাসন আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে চরম উদাসীনতা প্রকাশ পেয়েছে গভীরভাবে।
রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত ‘দুই পাখি’ কবিতায়, দুটি পাখি- একটি বনের একটি খাঁচার পাখির দারুণ কথোপকথনের মাধ্যমে সভ্যতা ও প্রকৃতির মাঝে যে চিরায়ত দ্বন্দ্ব তা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। দুই পাখির খাঁচার পাখি হচ্ছে সংস্কৃতি যাকে মানুষ বন্দি করে রাখে আর নিজের মতো চালনা করে; আর এক পাখি বনের পাখি হচ্ছে মুক্ত প্রকৃতির প্রতীক; দুই পাখি একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয় কিন্তু দুই দ্বান্দ্বিক জীবন তাদের মিলনের প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে মানুষের দুটো বিছিন্ন রূপ কবি মনোবৈজ্ঞানিকভাবে রূপায়িত করেন। দুই পাখির দ্বন্দ্বভরা কথোপকথনে বেরিয়ে আসে খাঁচার পাখির চরম অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা। যেমনভাবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক জীবন অভ্যস্ততা প্রকৃতিকে বন্দি দাসে পরিণত করে আমাদের অস্তিত্বকে নির্জীব আর দুর্বল করে দেয় তেমনিভাবে খাঁচার পাখি বনের পাখির আকুতি ভরা আহ্বান গ্রহণ করতে পারে না। প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা যে মানুষকে কতটা কৃত্রিম করে তোলে তার প্রমাণ মেলে প্রতীকীভাবে খাঁচার পাখির কৃত্রিমতায় রূপকভাবে।
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘বলাই’ পরিবেশ সচেতনতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। গাছপালা আর প্রকৃতির প্রতি বলাই এর আকর্ষণবোধ আর ভালোবাসা পরিবেশ সচেতনতার একটি অনন্য সাহিত্যকর্ম। বলাই এর পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ দেখে বলা যায়, বলাই পরিবেশ সচেতন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য চরিত্র। একটি শিমুল গাছের প্রতি বলাই এর অনুরক্ততা, রবীন্দ্রনাথ যে পরিবেশ সচেতনতার খুব প্রথম সারির দার্শনিক ছিলেন তাই প্রমাণ করে।
প্রকৃতির শক্তিকে মানুষ যে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে পৃথিবীকে ভারসাম্যহীন করে তুলছে রবীন্দ্রনাথ সে কথাও বলে গিয়েছিলেন, অথচ এ ভারসাম্যের ব্যাঘাতের জন্যই আজ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, এই জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্ব-সমস্যা। জলবায়ুর এই অসম পরিবর্তন ও বিষ-উষ্ণতা যদি না ঠেকানো যায় তবে হয়ত আর অল্প কিছু কালের মাঝেই এ ধরিত্রী বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
এমনিভাবে আজ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এতদিন পরেও রবীন্দ্র সাহিত্য আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ চাননি মানুষ প্রভু হয়ে পরিবেশকে দাস করে নিয়ন্ত্রণ করুক। রবীন্দ্রনাথ ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতি তথা মানুষের সঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্যপূর্ণ সহ-অবস্থানের কথা বলে গেছেন; যা আধুনিক যান্ত্রিক যুগে খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ এখন সেই আকুল শ্রাবণ নেই, তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে দিনে দিনে, শীতকালে হচ্ছে অকাল বৃষ্টি, শরতের সেই মনোহর রূপ আজ উধাও হতে যাচ্ছে। মানুষের অপরিসীম লোভ প্রকৃতিকে করে তুলেছে ভারসাম্যহীন। নির্বিচারে বন উজাড়, গাছ কাটা, ব্যাপকহারে নগরায়ন ও শিল্পায়ন ও এর উদ্ভূত বিরূপ উপজাত- বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন পরিবেশের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথ তার কাব্যে, গানে, প্রবন্ধে খুব সচেতন হয়ে এই কথাটি বলে গেছেন; আজ তা বুঝবার দিন এসেছে তাই বহুমুখী রবীন্দ্র-সাহিত্য এখন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে ভালোবেসেছিলেন গভীরভাবে। তার সঙ্গে যেন প্রকৃতির একটা আত্মিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতির উপর মানুষের লোভী আক্রমণ আর ধ্বংসযজ্ঞ রবীন্দ্রনাথকে বিচলিত করে গভীর বেদনায়। তিনি জানতেন মানুষের প্রকৃতির উপর এই অপরিসীম লোভ আর ক্ষুধা কখনও শেষ হবে না। তাই ‘প্রশ্ন’ কবিতায় কবি সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচারের ভার রেখে যান এইভাবে: যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,; তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছ ভালো?