দেশ বনাম রাষ্ট্র

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশ মূলত একটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা, যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা অঞ্চলকে বোঝায়। অন্যদিকে, রাষ্ট্র হলো একটি রাজনৈতিক ও আইনগত ধারণা। অর্থাৎ, দেশ হলো মানুষের আবেগের জায়গা আর রাষ্ট্র হলো সেই দেশ পরিচালনার আইনি ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো। সংজ্ঞানুসারে বলা যায় যে, দেশ হলো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা ভূখণ্ড। রাষ্ট্র হলো, রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জনসমষ্টি, যাদের নির্দিষ্ট সরকার ও সার্বভৌমত্ব থাকে। দেশের মূল ভিত্তি হলো, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি। রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো, তার চারটি উপাদান ১. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ২. জনসংখ্যা, ৩. সরকার এবং ৪. সার্বভৌমত্ব। দেশের সার্বভৌমত্ব না-ও থাকতে পারে (যেমন: পরাধীন দেশ)। সার্বভৌম রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান হলো রাষ্ট্র সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়। এভাবেও বলা যায়, দেশ এটি মূলত একটি ভৌগোলিক ও আবেগীয় সত্তা (যেমন: দেশপ্রেম)। রাষ্ট্রৎ এটি একটি প্রশাসনিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠান। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, স্বাধীন হওয়ার আগে বাংলাদেশ কিন্তু একটি দেশ ছিল। বর্তমানে স্কটল্যান্ড একটি দেশ, কিন্তু এটা গ্রেট ব্রিটেনের অধীন, কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। আবার বাংলাদেশ, ভারত বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে একটি দেশ ও একটি রাষ্ট্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাষ্ট্র’ অপেক্ষা ‘দেশ’ বা ‘সমাজ’ শব্দটিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হলো একটি যান্ত্রিক ও বাহ্যিক শাসনতন্ত্র, যা ক্ষমতার জোরে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, ‘দেশ’ বা ‘সমাজ’ হলো মানুষের আত্মিক ও জীবন্ত মিলনক্ষেত্র, যেখানে মানুষ ভালোবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে। তিনি কেন ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি এড়িয়ে চলতেন, তার প্রধান কারণগুলো হলো: ১. রবীন্দ্রনাথ ‘রাষ্ট্র’কে একটি ক্ষতিকর যন্ত্র বা ‘ডিমের খোসা’ হিসেবে তুলনা করেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র মানুষকে কেবল ক্ষমতার অধীনে বাঁধে, কিন্তু মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্ব ও মুক্তির বিকাশ ঘটাতে পারে না। ২. প্রাচ্যের দেশগুলোতে সমাজ সবসময়ই রাষ্ট্রকে পরিচালনা করেছে এবং মানুষ আত্মরক্ষা করেছে নিজেদের সামাজিক শক্তির বলে। তাই রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও তিনি সমাজকে শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল করার ওপর জোর দিয়েছেন। ৩. রবীন্দ্রনাথ ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরোধী। তিনি ‘রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ’ বা উগ্র ন্যাশনালিজম পছন্দ করতেন না। তাঁর মতে, রাষ্ট্র যখন নিজের স্বার্থ উদ্ধারে উগ্র জাতীয়তাবাদ তৈরি করে, তখন তা সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিতদের মতে, দেশ মূলত একটি ভৌগোলিক অঞ্চল বা মানুষের জন্মভূমি। পক্ষান্তরে রাষ্ট্র হলো আইনগত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব এই চারটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। পণ্ডিতদের দেওয়া মূল পার্থক্যগুলো হলো–উপাদান: ১. দেশ গঠনের জন্য কেবল একটি ভূখণ্ড ও জনসমষ্টি থাকলেই চলে। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি ও সরকারের পাশাপাশি সার্বভৌমত্ব বা চূড়ান্ত ক্ষমতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ২. দেশের সার্বভৌমত্ব নাও থাকতে পারে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের চরম বা সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাষ্ট্রের নিজস্ব সার্বভৌম ক্ষমতা রয়েছে, যার মাধ্যমে এটি স্বাধীনভাবে নিজের আইন তৈরি ও প্রয়োগ করতে পারে। ৩. দেশের ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বীকৃতি বেলায় দেখা যায় যে, দেশ একটি ভৌগোলিক ধারণা, যার রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তনশীল হতে পারে। রাষ্ট্র হলো একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক সত্তা। ৪. একটি দেশ সবসময় একই ভৌগোলিক পরিচয়ে টিকে থাকতে পারে, এমনকি পরাধীন অবস্থায়ও (যেমন ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ একটি ‘দেশ’ ছিল)। কিন্তু সরকার বা সীমানা বদলালেও রাষ্ট্র তার সার্বভৌম রূপ নিয়ে টিকে থাকে। মার্কসীয় তত্ত্বে দেশ হলো ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সমষ্টি। অপরদিকে রাষ্ট্র হলো একটি রাজনৈতিক যন্ত্র, যা কার্ল মার্ক্সের মতে শোষক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ ও রাষ্ট্রের প্রধান পার্থক্য হলো: ১. শ্রেণি শাসনের হাতিয়ার বনাম ভৌগোলিক পরিচয়। মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে, রাষ্ট্র কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়–এটি সমাজের সুবিধাভোগী বা পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে প্রলেতারিয়েত (শ্রমিক) শ্রেণির ওপর আধিপত্য বিস্তারের একটি রাজনৈতিক যন্ত্র। অন্যদিকে দেশ হলো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর একটি আবেগীয় ও ভৌগোলিক পরিচয়, যেখানে সব শ্রেণির মানুষের বসবাস থাকে। ২. রাষ্ট্র চিরন্তন বা প্রাকৃতিক কোনো বিষয় নয়–সমাজ যখন শ্রেণিবিভক্ত (শোষক ও শোষিত) হলো, তখন সম্পদ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। পক্ষান্তরে, দেশ ও সমাজ মানুষের পারস্পরিক প্রয়োজন ও শ্রম বিভাগের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে। ৩. রাষ্ট্র মূলত উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে রূপ বদলায় (যেমন–দাস রাষ্ট্র থেকে সামন্ততান্ত্রিক, অতঃপর পুঁজিবাদী রাষ্ট্র)। মার্ক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী, শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে। তবে ‘দেশ’ নামক ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সত্তাটি তার স্বকীয়তায় টিকে থাকে। ৪. বুর্জোয়া রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্বের ধারণাটি শোষক শ্রেণির ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়। কিন্তু মার্কসীয় আদর্শে একটি প্রকৃত ‘দেশ’ বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা থাকবে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের হাতে, যা ধীরে ধীরে শ্রেণিশূন্য সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। এরিস্টটলের রাষ্ট্র দর্শন মূলত ‘নগর-রাষ্ট্র’ কেন্দ্রিক ছিল। তাঁর দর্শনে দেশ ও রাষ্ট্রের মধ্যে আধুনিক ধারণার মতো খুব সুস্পষ্ট কোনো পার্থক্য ছিল না। তবে তিনি সমাজ, রাষ্ট্র এবং দেশের মধ্যে যে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পার্থক্যগুলো দেখিয়েছেন তা হলো: ১. দেশ হলো একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড, যা কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সীমানা নিয়ে গঠিত। ২. রাষ্ট্র : রাষ্ট্র হলো কতগুলো পরিবার ও গ্রামের সমষ্টি, যা মানুষের উত্তম জীবন নিশ্চিত করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে। এটি কেবল একটি স্থান নয়, বরং একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। আবার তিনি বলেচেণ যে, দেশ হলো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্র মাত্র। এরিস্টটলের মতে, রাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও উত্তম জীবন নিশ্চিত করা। এক কথাটি তিনি বলেছেন যে, দেশ হলো এখানে অঞ্চলভিত্তিক মানুষের বসবাস থাকে। অপর দিকে রাষ্ট্র হলো, এটি সুনির্দিষ্ট আইন, সংবিধান ও রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত একটি সার্বভৌম সত্তা। রাষ্ট্রকে এরিস্টটল একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব এবং রাষ্ট্রের মাঝেই কেবল মানুষ তার নৈতিক গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। দেশ সেই অর্থে একটি জড় ভৌগোলিক ধারণা। সবশেষ বলা যায় যে, একটি দেশ ও রাষ্ট্র মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, পরিচয় এবং অধিকারের মূল ভিত্তি। এটি নাগরিকদের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্র তার সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখে এবং সামগ্রিক উন্নয়নে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। লেখক : কলামিস্ট মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব লেখকের। -সম্পাদক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..