হাম : খামখেয়ালির মূল্যে প্রাণ দিচ্ছে শিশুরা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ধর্ষণের মহামারি, হত্যা-খুন-রাহাজানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বিরোধীদের মতের ওপর দমনপীড়ন চলছে। সাংবাদিকদের খোঁজে নেমে পড়েছে গোয়েন্দারা। আগের বাংলাদেশই। ওই ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুন। এক জায়গায় খানিকটা বদল দেখা যাচ্ছে। তা-ও নেতিবাচক। সেটা হলো হাম। শেষ কবে এমন শিশুমৃত্যুর প্রকোপ দেখেছে বাংলাদেশ? মনে পড়ছে না। কোভিড গেছে, সে তো বিশ্বজুড়েই ছিল। মৃত্যু, পরীক্ষা, আইসোলেশন, ধকল সবই গেছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ তো এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। মরবেই মানুষ। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা থাকবেন উদাসীন। কিন্তু যে রোগকে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, সেই হাম আবার এসে শত শত শিশুর প্রাণ নিয়ে যাবে, এমনটা ভাবা যায়নি। এটাই নতুন। গণমাধ্যম বলছে, বাংলাদেশে হামের প্রকোপ থামছেই না। মাত্র আড়াই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় পাঁচশ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এই রোগের টিকা থাকার পরেও কেন এত মৃত্যু? কেন বাংলাদেশ এ পরিস্থিতি ঠেকাতে পারলো না? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন হাম রোগী ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। আর শুধু তাই নয়, হাম শিশুর শরীরের পুরো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। আক্রান্ত শিশুরা পরে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা কিডনির জটিলতায় ভোগে। মূলত, অপুষ্টি আর দেরিতে চিকিৎসা শুরু করায় হামে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। কিন্তু হঠাৎ করেই কেন এত বড় সংকট দেখা দিলো? উত্তর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশু সংস্থা ইউনিসেফ। তারা বলছে, এমনটা যে হতে পারে সে বিষয়ে তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে বারবার সতর্ক করেছিল। পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দেয়া হয়েছিল। বারবার বলা হয়েছিল, টিকা সংকট আসছে, প্রস্তুতি নিন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত দশবার জরুরি বৈঠক করেন ইউনিসেফের প্রতিনিধি। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। কেন কাজ হয়নি? ইউনিসেফের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনার পদ্ধতি বদলে ফেলেছিল। উন্মুক্ত দরপত্র চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এই সিদ্ধান্তের কারণেই টিকা কেনা আটকে যায়। অথচ সময় বিবেচনায় এটি ছিল অদূরদর্শী, অপরিপক্ব ও খামখেয়ালি ভরা বিপজ্জনক পদক্ষেপ। আগে কখনোই যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি সেটা খোদ ইউনিসেফই বলছে। নিজের দায় এড়ানোর সহজ পথে হাঁটছেন এখনকার সরকারও। তারা অন্তর্বর্তী আর আগের আওয়ামী সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর কাজটি করতে পারছেন না। টিকার ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সাধারণ যেসব পদক্ষেপ সেটা তো চাইলেই নেওয়া যায়। সংক্রমণের শিকার শিশুকে আলাদা করা, তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা, সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, একটা টাস্কফোর্স বানিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় করা, এগুলো তো এখনকার কাজ। বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা বলছেন, গত দুই বছরে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনার কোনো উদ্যোগই নেয়নি। তারা টিকা সংকটের বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কর্মকর্তা এখন বলছেন, তারা অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ করলেই কি টিকা চলে আসে? ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করার পরও কেন জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র প্রক্রিয়া দ্রুত করা হয়নি? কেন বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা হয়নি? কেন বৈঠক করে শুধু সময় নষ্ট করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। বরং তাদের খামখেয়ালি আর দেরির মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের, প্রাণ দিয়ে। ইউনিসেফ আরও জানিয়েছে, তারা যে শুধু চিঠি দিয়েছে তা-ই নয়। তারা নিজেরাও সতর্ক করেছিল যে সংকট ভয়াবহ আকার নিতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই সতর্কবাণী তুচ্ছ করেছে। বিন্দুমাত্র আমল দেয়নি। এটাকে ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা বললে কি খুব বেশি বলা হয়? এখনকার সরকার টিকা সংগ্রহের কথা বলছে। এডিবি ও গ্যাভির সহায়তায় টিকা আনা হয়েছে। ইউনিসেফ থেকেও টিকা এসেছে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। হাজার হাজার শিশু এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। শত শত শিশু মারাও গেছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, শুধু টিকার সংকটই বড় কথা নয়। সংক্রমণ ঠেকানোর প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলোও যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের আইসিইউ বাড়ানোর চেয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণই বেশি জরুরি ছিল। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি। তাবু খাটিয়ে হলেও আইসোলেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এসব দায়ও সরকার ও কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। প্রতিটি শিশুর মৃত্যু যাদের খামখেয়ালির কারণে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..