সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
[এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২ নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১১ম কিস্তি।]
(১১)
একতার গত সংখ্যায় পার্টির প্রথম কংগ্রেসে (১৯৬৮) অনুমোদিত ‘কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক রিপোর্ট’ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার রিপোর্টের পরবর্তী কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো। পার্টি কংগ্রেসের রিপোর্ট থেকে দেশের ও বিশ্বের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ বিভিন্ন ঘটনায় পার্টির ভূমিকা এবং তা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়।
[একতার ৪১তম সংখ্যায় প্রকাশিত অংশের পর]
পার্টিতে বামপন্থী সংকীর্ণতাবাদী ও দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতির প্রকাশ
কেন্দ্রে ও এই প্রদেশে আওয়ামী লীগের কোয়ালিশন।--- মন্ত্রীসভা সম্পর্কে পার্টির নীতি ও অন্যান্য কার্য পদ্ধতি ব্যাখ্যা করিয়া কেন্দ্রীয় কমিটি একটি দলিল ৭/১০/৫৬ পার্টির ভিতর প্রচার করিয়াছিল। সে দলিলে প্রদেশের মন্ত্রীসভাকে ‘জনপ্রিয় কোয়ালিশন সরকার’ বলিয়া বিশ্লেষণ করিয়া বলা হইয়াছিল যে, ইহাকে ‘আমরা সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করিয়া’, উহার ‘গৃহীত কর্মসূচী বাস্তবে রূপায়িত’ হওয়ার জন্য ‘আমরা সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালাইব’।---
কেন্দ্রীয় সরকার সম্পর্কে ঐ দলিলে বিশ্লেষণ করা হইয়াছিল যে, ‘এই সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রীসভার মত জনপ্রিয় কোয়ালিশন সরকার নহে।’ কিন্তু, আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব ও আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট অংশ গ্রহণসহ ‘কেন্দ্রে নয়া সরকার গঠন পাকিস্তানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করিতেছে।’---
সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট সোহরাওয়ার্দীর আত্মসমর্পণের আগে পর্যন্ত ঐ দলিলের নীতি ও কর্মসূচী ছিল পার্টির স্বীকৃত কর্মপন্থা। কিন্তু, সোহরাওয়ার্দীর আত্মসমর্পণের পর কেন্দ্রীয় কমিটির ঐ সব নীতি তথা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নীতি নিয়া পার্টির ভিতর কতকগুলি প্রশ্ন দেখা দিয়াছিল।--- কিছু সংখ্যক কমরেড আওয়ামী লীগ অধীনতা তথা আওয়ামী লীগ সম্পর্কেই পার্টির নীতিকে ‘বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি’ বলিয়া সমালোচনা করিতেছিলেন।---
১৯৫৬ সনে পার্টির সম্মেলনে আওয়ামী লীগ মাধ্যমে কাজ করার ঐ কর্মকৌশলগত নীতি গৃহীত হওয়ার পর ঐ কমরেডরা সে কর্মকৌশল স্বীকার করিয়া নিয়াছিলেন বটে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট সোহরাওয়ার্দীর আত্মসমর্পণের পর তাহারা কার্যতঃ তাহাদের পুরাণো সমালোচনার প্রতিধ্বনি করিতেছিলেন। ইহাতে সম্মেলনের কিছুদিন পরই আবার আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নীতি নিয়া পার্টির ভিতর তীব্র মত বিরোধ দেখা দিয়াছিল।
এই পরিস্থিতিতে, কেন্দ্রীয় কমিটি--- তার কার্যাবলীর একটা ‘পর্যালোচনা,’ ১৪/৯/৫৭ পার্টির ভিতর প্রচার করিয়াছিল। ঐ ‘পর্যালোচনায়’ বলা হইয়াছিল যে পূর্ববঙ্গ আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির বিশ্লেষণ ও কর্মপন্থা ‘মূলতঃ সঠিক’ ছিল এবং ‘কেন্দ্রে নয়া সরকার গঠন পাকিস্তানের পক্ষে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করিতেছে’ বলিয়া কেন্দ্রীয় কমিটি যে বিশ্লেষণ করিয়াছিল, তাহার সত্যতা--- বাস্তবে প্রমাণিত হইয়াছিল।---
সঙ্গে সঙ্গে, ঐ ‘পর্যালোচনায়’ কেন্দ্রীয় কমিটি আত্মসমালোচনামূলকভাবে এই ভুলও স্বীকার করিয়াছিল যে, এই দেশের ‘বুর্জোয়া ও পেটীবুর্জোয়া শ্রেণীর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহ্যের অভাবহেতু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ক্ষমতায় যাওয়ার পর সহজেই সাম্রাজ্যবাদের চাপের নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছে। বুর্জোয়া ও পেটীবুর্জোয়া শ্রেণীর ঐ রাজনৈতিক দুর্বলতা পূর্বে বুঝিতে না পারার দরুণ কেন্দ্রীয় কমিটি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আত্মসমর্পণের আশঙ্কার কথা পূর্ব হইতে অনুধাবন করিতে পারে নাই। বরং, ঐ সব শ্রেণী তথা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের উপর কেন্দ্রীয় কমিটি অতিরিক্ত ভরসা করিয়াছিল। এই বিচ্যুতি মূলতঃ দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদ।’
ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হইয়া নূতন রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তানের জন্ম হইয়াছিল এবং বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া, শ্রমিক প্রভৃতি শ্রেণীগুলি এখানে নূতন করিয়া গড়িয়া উঠিতেছিল। পূর্ববঙ্গের বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কি ভূমিকা পালন করিবে, এ সম্পর্কে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির শুধু কতকগুলি সাধারণ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব ব্যতীত কোন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিতে পারে নাই। অন্যদিকে, ১৯৪৯ সন হইতে আওয়ামী লীগের বুর্জোয়া পেটিবুর্জোয়া নেতৃত্ব বিভিন্ন প্রশ্নে একটা প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছিল এবং বৈদেশিক নীতিতে তাহারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতিও গ্রহণ করিয়াছিল।
এই পরিস্থিতিতে, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ হইতে আওয়ামী লীগের বুর্জোয়া পেটিবুর্জোয়া নেতৃত্বের সামগ্রিক রাজনৈতিক চরিত্রের মূল্যায়নে ঐরূপ বিচ্যুতি ঘটিয়াছিল এবং ইহার দরুণ পার্টির সভ্যদের ভিতর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত আশা জাগিয়াছিল ও ইহাতে পার্টির কাজকর্মের ক্ষতি হইয়াছিল। কিন্তু, উহাকে ‘বুর্জোয়ার লেজুড়বৃত্তি’ বলিয়া অভিহিত করা যাইতে পারে না।
ঐ বিচ্যুতি সত্যি সত্যিই ‘বুর্জোয়ার লেজুড়বৃত্তি’ হইত যদি সোহরাওয়ার্দীর আত্মসমর্পণের পরেও কেন্দ্রীয় কমিটি উহাকে সমর্থন করিত।---
---কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে ‘বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির’ অভিযোগ যেসব কমরেড উঠাইয়াছিলেন তাঁহারা বিগত পার্টি সম্মেলনে গৃহীত আওয়ামী লীগ সম্পর্কে পার্টির নীতির কথা ভুলিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহারা ইহাও উপলব্ধি করিতে পারেন নাই যে, পাকিস্তানের তদানীন্তন পরিস্থিতিতে, যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ইস্কান্দার মীর্জা এবং সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার জন্য উন্মুখ হইয়াছিল, তখন আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীমণ্ডলীর পক্ষ হইতে- তাহাদের সাম্রাজ্যবাদের নিকট আত্মসমর্পণ সত্ত্বেও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসার, যুক্ত নির্বাচন কায়েম ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ প্রভৃতি জনস্বার্থের অনুকূল ছিল।
---তাই, আওয়ামী লীগ তথা তদানীন্তন মন্ত্রীমণ্ডলী সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির ও পার্টির নীতি ও কর্মপন্থাকে ‘বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি’ বলিয়া ঐ কমরেডদের সমালোচনা ছিল বামপন্থী সংকীর্ণতাবাদ ও বালসুলভ চপলতার প্রকাশ মাত্র।---
তবে, তখন সমগ্র পার্টিরই দুইটি গভীর বিচ্যুতি ঘটিতেছিল। প্রথমতঃ, বিপ্লবী আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য শ্রমিক-কৃষকের ভিতর দৈনন্দিন কাজ করা---। পার্টির নিজস্ব উদ্যোগে জনসমাবেশ হইল শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির শক্তির মূল উৎস ও বিপ্লবী প্রলেতারীয় কার্যপদ্ধতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু, পার্টি এই বিপ্লবী প্রলেতারীয় কার্যপদ্ধতি হইতে বিচ্যুতি হইয়া বুর্জোয়া কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করিয়া শুধু মাত্র কতকগুলি রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক প্রচার অভিযানে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখিতেছিল।
---অন্যদিকে, কিছুসংখ্যক কমরেড তখন শ্রমিক-কৃষকদের শ্রেণী আন্দোলন ও শ্রেণী সংগঠন গড়ে তোলাকে পার্টির প্রধান এবং প্রকৃত পক্ষে একমাত্র কাজ বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। কিন্তু, রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক আন্দোলন অবহেলা করিয়া শ্রমিক-কৃষকদের শ্রেণীগত আন্দোলনকে একমাত্র কাজ বলিয়া গণ্য করার তত্ত্ব ছিল বামপন্থী সংকীর্ণতাবাদী বিচ্যুতি।
কিছুকাল পর, কেন্দ্রীয় কমিটির--- ১৪/৯/৫৭ তারিখের ‘পর্যালোচনায়’--- আত্মসমালোচনা মূলকভাবে বলা হইয়াছিল, ‘জনতার ভিতর দৈনন্দিন কাজ না করা এবং নীচু হইতে গণ-আন্দোলন গড়িয়া না তোলা হইল আমাদের মূল বিচ্যুতি। এই বিচ্যুতির জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমাদের গণ-ভিত্তি গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। আমাদের গণ-ভিত্তি না থাকার জন্য জটিল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে আমরা নিজেরা জনসমাবেশ করিয়া অবস্থার মোড় ঘুরাইতে সচেষ্ট হইতে পারি নাই। ইহাতে আমরা অসহায় ও হতাশ বোধ করিয়াছি।’
দ্বিতীয়তঃ, ১৯৫৬ সনে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেসে--- বর্তমান আন্তর্জাতিক অবস্থায় ‘শ্রমিক শ্রেণি উহার চারিপাশে--- সমাবেশ করিয়া--- পার্লামেন্ট দৃঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করিতে পারে এবং এই পার্লামেন্টকে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের হাতিয়ার হইতে জনগণের স্বার্থের সাচ্চা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিতে পারে বলিয়া যে নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হইয়াছিল, উহাকে আমাদের কিছু সংখ্যক কমরেড, বিশেষতঃ যাহারা তখন আইন সভায় সদস্য ছিলেন, তাঁহাদের অনেকে অত্যন্ত ভুলভাবে বুঝিয়াছিলেন। সেই ভুলকে সমালোচনা করিয়া কেন্দ্রীয় কমিটির ১/১২/৬০ তারিখের ‘পর্যালোচনামূলক রিপোর্টে’ বলা হইয়াছিল “অনেক বন্ধু পার্লামেন্টের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনাকে শ্রেণী সংগ্রাম ও গণ-সংগ্রাম বাদ দিয়া শুধু আইনসভা ও নির্বাচনের মারফত শান্তিপূর্ণ পথে ‘ক্ষমতা দখল করার’ পথ বলিয়া মনে করিয়াছিলেন।’ ইহার ফলে--- ‘পার্লামেন্টারী ফ্রন্টের’ কাজে অধিকতর মনোনিবেশ করার বিচ্যুতিও ১৯৫৬-৫৮ সনে পার্টির ভিতর দেখা দিয়াছিল। এই বিচ্যুতিও ছিল দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদ।
সেই ‘পর্যালোচনামূলক রিপোর্টে’ আরও বলা হইয়াছিল যে ১৯৫৬-৫৮ সনে--- তখন যতটুকু গণ সংযোগের কাজ আমরা করিয়াছিলাম তাহাও ঠিক বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় নাই। সে কাজগুলি হইয়াছে ভাসাভাসা (অর্থাৎ বুর্জোয়া পদ্ধতিতে)। উহাতে জনগণের ভিতর পার্টির গভীর সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।’
ঐ রিপোর্টে ইহাও বলা হইয়াছিল যে পার্টির পেটিবুর্জোয়া চরিত্র ছিল ঐ সব বিচ্যুতির মূল উৎস। প্রকৃতপক্ষে, পার্টির পেটিবুর্জোয়া চরিত্র হইতে বামপন্থী সংকীর্ণতাবাদ ও দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদ–এই উভয় বিচ্যুতির উদ্ভব হইয়াছিল এবং পার্টির গণ-ভিত্তি থাকিতেছিল একান্ত দুর্বল (চলবে)
[পরবর্তী সংখ্যায় ‘ন্যাপ গঠনের পরেও বুর্জোয়াসুলভ বিচ্যুতি’ ও আরও কিছু ঘটনাবলীর প্রসঙ্গ এবং সাময়িক শাসন জারির আগ পর্যন্ত সময়ের মৌল শিক্ষা প্রসঙ্গ রয়েছে]
প্রথম পাতা
ধর্ষণ, হত্যা, মবসন্ত্রাসের প্রতিবাদে উত্তাল দেশ
জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি বাতিলে সরকারের প্রতি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা
‘শিশুহত্যাকারী’ ইউনূস-নূরজাহানের বিচারের দাবি যুব ইউনিয়নের
‘হিস্যা’
বামপন্থিদের বর্ধিত ভূমিকা প্রয়োজন
পার্টিকে শক্তিশালী করার আহ্বান
বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে জনগণকে পিষ্ট করবেন না
হাম: জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান প্রগতিশীল চিকিৎসকদের
নারী ও শিশু ধর্ষণ-হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন