বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ড. রেবা মন্ডল : হিন্দু আইনে বিয়ে একটি সামাজিক উৎসর্গ, মুসলিম আইনে বিয়ে একটি দেওয়ানী চুক্তি, খ্রিষ্টান আইনে বিয়ে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও একটি পবিত্র চুক্তি, যার মাধ্যমে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সারাজীবনের জন্য একটি দাম্পত্য সম্পর্ক তৈরি হয়। বিয়ের মানে যে আইনে যে রকমই থাকুক না কেন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-১৯২৯ বা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬ বাংলাদেশের সব নাগরিকের ওপর প্রযোজ্য। ২০১৪ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের খসড়া সংসদে অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। ১৯২৯ সালের সংশ্লিষ্ট আইনে শিশু বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝাবে, যার বয়স পুরুষ হলে ২১ বৎসর এবং স্ত্রী হলে ১৮ বছরের নিচে। নাবালক অর্থ- ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষ এবং নাবালিকা ১৮ বছরের কম বয়সী নারী। আইনে পুরুষ ও নারীর যথাক্রমে ২১ ও ১৮ বছরের কম বয়স হলে এবং তাদের বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ বলে গন্য হবে এবং এরূপ বিয়ে আইনে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০১৪ সালে একবার কথা উঠেছিল ছেলের বয়স ১৮ এবং মেয়ের বয়স ১৬ হলেই বিয়ে বৈধ হবে এবং তা বাল্যবিবাহ বলে গণ্য হবে না। দেশের সচেতন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সমৃদ্ধ মানুষ তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সেই বিরোধিতা এখন ২০১৫ পেরিয়ে ২০১৬-তে পা দিল। আবার এরই মধ্যে নতুন করে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬, চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অনুমোদিত এই আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ছেলের ২১ এবং মেয়ের ১৮ বছর বয়সের সীমারেখা ঠিক থাকলেও বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের অনুমতি নিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সর্বোত্তম স্বার্থে বিয়ে দেয়ার বিধান রাখা হলো। এই বিশেষ সুযোগ সম্বলিত ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬’র চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আইনটির ১৯ ধারার অধীনে যে কোন বয়সের, যেমন দুই, তিন, পাঁচ বা ২০ বছর বয়স যাই হোক না কেন- একটি মেয়েকে বিয়ে দেয়া যাবে। অথচ ২,৩,৪ কিংবা ৫, ১০ বছরের ছেলেকে বিয়ে করানো যাবে কিনা আইনে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয় নাই। এর অর্থ দাঁড়ায়, ৮০ বছরের বুড়োর সাথেও একটি শিশুকন্যাকে বিয়ে দেয়া বৈধ। আমরা মনে করি, বিশেষ প্রেক্ষাপট বলতে মূলতঃ ‘‘অ্যাবিউস” বা অপব্যবহার কথাটিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। যে কোন অবস্থায় একটি কন্যাশিশুকে বিয়ে দেয়া যাবে। এ আইন কার্যকর হলে সত্যিকার অর্থেই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর ধর্ষণকে বৈধতা দেয়া হবে। এটি কোন মতেই মেনে নিতে পারে না কোন সভ্য সমাজ। বিয়ের সয়স ২১, ১৮ ঠিক রেখে আবার যে কোন বয়সের কন্যাকে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিয়ে দেয়ার বৈধতা গাছের গোড়া কেটে মাথায় জল ঢালার মতই। এই আইনের সুযোগে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করার জন্য বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করে নেবে পুরুষরা। প্রভাবশালীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিষয়টিও এর সাথে যুক্ত হতে পারে সন্দেহ নাই। কাজেই আইন হতে হবে স্বচ্ছ, যাতে আইনটিকে অসৎব্যবহারের সুযোগ বা কোন পরিবেশ না সৃষ্টি না করা যায়। যারা আইনের লেজুরটি (বিশেষ পরিস্থিতি) রাখার পক্ষে তারা মূলতঃ নারীদের বিরুদ্ধে কোন শত্রুপক্ষ। ১৮ এর নিচে মেয়েদের বিয়ের অর্থ হলো- মেয়েদের অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্র তৈরি করা। নারীশিক্ষার হার কমানো। সমাজে অশিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত নারীর সংখ্যা বাড়িয়ে পশ্চাদপদ অবৈজ্ঞানিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। মেয়েদের ব্যক্তিত্ব, মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করা। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। অথচ তাদেরকে লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, পশ্চাদপদ রেখে অবৈজ্ঞানিক রেখে কোনক্রমেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক একটি মেয়ে পারিবারিক ঝামেলা সামলাতে না পারার কারণে পারিবারিক ঝগড়া, কলহ সৃষ্টি হওয়া। অল্প বয়স্ক নারীরা মা হবার কারণে মা ও শিশু দুজনই অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়। পরিবারে অর্থনৈতিক উপার্জনে অংশগ্রহণে নারীকে বাধাপ্রাপ্ত করা। এর ফলে পারিবারিক দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয় আয় হ্রাস পায়। মা যদি অল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত থেকে যায় তাহলে সে মা তার সন্তানকে সঠিকভাবে শিক্ষাগত, নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে গড়ে তুলতে পারে না। যার ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয় ভয়ঙ্কর, দুর্নীতিবাজ, নীতিহীন, হৃদয়হীন, মানবিকতাহীন, অবৈজ্ঞানিক, পশ্চাদপদ, বিশৃঙ্খল ও ধর্মান্ধ প্রজন্ম। আমরা জানি, বিয়ের উদ্দেশ্য শুধু সন্তান উৎপাদনই নয় বরং সুশৃংখল, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ একটি জীবন পরিক্রমা। এই আইন পাস হলে আমরা আর লন্ডনের গার্লস সামিটে গিয়ে কি করব! মানবধিকারের সর্বজনীন দলিল বা বেইজিং সম্মেলন দিয়েই বা কি হবে আমাদের? আমাদের সংবিধানে নারী উন্নয়ন, সংরক্ষণমূলক অনুচ্ছেদ যতই থাক না কেন, ইভটিজিং বিরোধী আইন, নারী ও শিশু নির্র্যাতন দমন আইন সবই অর্থহীন, অকার্যকর ছাড়া আর কিছুই হবে না। সুতরাং জরুরি ভিত্তিতে ২০১৬ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিয়ের বিধানটি বাতিল করা খুবই জরুরি। আর শাস্তির বিধান ১৯২৯ সালের আইনটিতে তো খুবই সীমিত ছিল। সে তুলনায় ২০১৬ সালের আইনে শাস্তির বিধান যে বেড়েছে তা মোটেও নয়। ২০১৬ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে শাস্তি সর্বনিম্ন ৬ মাস, সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাথে সর্বোচ্চ অর্থদণ্ড ১ লাখ টাকা, সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা। এ দণ্ড খুবই কম যা সামাজিক প্রেক্ষাপটে সর্বনিম্ন ৫ বছর হওয়া বাঞ্চনীয় এবং অর্থদণ্ড সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা হওয়া দরকার। কারণ, কৃত অপরাধের শাস্তি কম হলে অপরাধী অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। বাল্যবিবাহ নিরোধ খসড়া আইন, ২০১৬ এর ১৯ ধারায় বলা হয়েছে যে, বিশেষ ক্ষেত্রে যে কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশে এবং মা বাবার সম্মতিতে বিয়ে হতে পারবে। দেখা যাক, ১৯২৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের সর্বোত্তম কোন স্বার্থ কি ছিল না? ১৯২৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মেয়েদের সর্বোত্তম স্বার্থে বিয়েই একমাত্র সমাধান ছিল? রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা কেউ কেউ অপ্রাপ্ত বয়সের বিয়েকে জনগণের সম্মতি আদায়ের লক্ষ্যে (পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ) বলতে দেখা গেছে- কোন কিশোরী গর্ভবতী হয়ে গেলে তার কি হবে? অভিভাবকহীন প্রতিবন্ধী কিশোরীর থাকার জায়গা না থাকলে বিয়ে দেয়া যেতে পারে ইত্যাদি। বলতে ভীষণ কষ্ট হয় যে, মেয়েরা কত অসহায় সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক একটি শিশু প্রতিবন্ধী কন্যার বিপদে সমাজ ও রাষ্ট্র তাকে থাকার জায়গাটি, জীবনের অন্যান্য নিরাপত্তাটুকুও দিতে পারে না! আবার প্রেমের বিষয়টিও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রাপ্ত বয়স্করা না বুঝে যার তার সঙ্গে প্রেম করে। তাই বলে রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্বে থাকা কোন অভিভাবক কি জেনেশুনে তার নিজের নিষ্পাপ শিশু কন্যাকে অশিক্ষিত, বখাটে, মদখোর কিংবা গাঁজাখোর কিংবা ইয়াবাসেবীর মত কারও কাছে বিয়ে দিয়ে দেবেন? মেয়েটি প্রেম করেছে বলেই কি তাকে সাগরে ভাসিয়ে দেবেন?যেটি নিজের বেলায় প্রযোজ্য নয় সেটি অন্য কারো বেলায় প্রয়োগযোগ্য বলে যুক্তি দেয়া যায় না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের বুকে নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষের এক বৃহৎ পথিকৃৎ বলে আমরা সম্মান করি, গর্ব করি কিন্তু তার নিজের দেশেই নারীর ক্ষমতায়নের পথের মৌলিক বাধাটিকে আইন করে বৈধতা দেবেন এমনটি অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত, অনাকাক্সিক্ষত এবং হতাশার। কাজেই বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬ এর ১৯ ধারাটি বাতিল করা মানবিক, যৌক্তিক, কল্যাণময় ও সভ্যতার পরিচায়ক বলেই আমরা মনে করি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..