সুফিয়া কামাল ও নারীবাদী আন্দোলন

কাবেরী গায়েন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
(পূর্ব প্রকাশের পর) কার্ল মার্কসের শিক্ষায় সমাজ পরিবর্তনের যে কোনো ঘটনাকে আমরা সে সময়ের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ঘটনার সাথে মিলিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে নারীদের মধ্যে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিলো, তার সাথে সে সময়কার সমাজ পরিবর্তনের গভীর যোগ ছিলো। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে উনিশ শতকের প্রথম তিন দশক পর্যন্ত ইংরেজদের কারনে বঙ্গদেশে (পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে) ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিলো অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবন ধারায়। প্রথমে কলকাতায় এবং ছয়-সাত দশক পরে অনান্য নগরকেন্দ্রে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকলে তার অভিঘাত এসে পড়ে বিয়ে, স্ত্রীশিক্ষা, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি প্রসঙ্গে। উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং সংস্কারবাদী ব্রাহ্ম সমাজের নারীর জীবনে এই পরিবর্তন যত দ্রুত এসেছিলো, নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান নারীর জীবনে ততোাঁ সহজে হয়নি এই পরিবর্তন। তবে ১৯১১ সালে জন্ম নেয়া সুফিয়া খাতুন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি শিক্ষিত হতে না পারলেও সমাজ-রাজনীতির এক দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে তার বেড়ে ওঠা। রামমোহন এবং বিদ্যাসাগরদের গড়ে তোলা বাংলার রেনেসাঁর পাাঁতনে বেগম রোকেয়ার লড়াই শক্তি সঞ্চয় করেছিলো আর সুফিয়া কামালের বেড়ে ওঠা মুসলিম নারীর জন্য বেগম রোকেয়ার গড়ে তোলা ঘাত-প্রতিঘাত সংকুল সামাজিক পরিসরে, কলিকাতায়। তবে, তার আগে বরিশালের জাতীয়তাবাদী, ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশে যে স্বাদেশিকতায় তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিলো ১৪ বছর বয়সে যার ভিত্তিভূমিতে ছিলো সমাজসেবা, সেই সত্তাই বিশ শতকের তিরিশ দশকে কলকাতায় সাহিত্যচর্চা এবং ১৯২৯ সালে বেগম রোকেয়ার সান্নিধ্য, তার নারীশিক্ষা এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে তাকে গড়ে তুলছিলো একজন সাহিত্যিক এবং নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে। কলকাতায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পাশাপাশি সমাজবাদী নেতাদের সাথে পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আদর্শিক প্রভাব, বিশেষ করে নজরুলের নারী জাগরণের ডাক তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বলা হয়ে থাকে নজরুলের রোমান্টিকতা যদি সুফিয়া কামালের কবিতায় প্রভাব রেখে থাকে, তবে নজরুলের সাম্যবাদী আদর্শ তার কথাসাহিত্যকে করেছে জীবনবাদী। আর ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সাথে তার পরিচয় ও সম্পর্ক তাঁর লেখকসত্তাকে প্রকাশিত করেছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে। সেই তিরিশের দশকের মধ্যেই তাঁর ভবিষ্যত জীবনের রুপকাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। ১৯২৯ সালের ২৩ জুলাই, মাত্র ১৮ বছর বয়সে লিখেছেন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনকে, “আমি আমার কাজ করে যাব নীরবে, নিশ্বব্দে। আমি পথের কঁাাঁ সরিয়ে যাব-এরপর যারা আসবে যেন কঁাাঁ না ফুটে তাদের পায়ে তারা যেনো কণ্টকবিদ্ধ পদে পিছিয়ে না পড়ে। ওইটুকু আমি করবো আমার যতটুকু শক্তি আছে তা দিয়ে।” (উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, ২০০২) সুফিয়া কামাল নারীনেতা কিংবা সমাজ সংস্কারক হয়ে উঠবার আগেই সাহিত্যিক পরিচিতি পেয়েছেন প্রথমে ‘সৈনিকের বধূ’ লিখে বরিশালের তরুণ পত্রিকায়। তারপর সওগাত পত্রিকায় কবিতা লিখে। ১৯৩০ সালে ‘সওগাত-মহিলা সংখ্যা’ প্রকাশিত হলে তাঁর ছবিসহ কবিতা ছাপা হয়। তিনি মুসলিম নারী সমাজের অগ্রগণ্য কবি হয়ে ওঠেন। একইসাথে তাঁর বোরকা খুলে ফেলা এবং ছবিসহ পত্রিকায় কবিতা ছাপানো রীতিমত বিপ্লবী পদক্ষেপ সে সময়ের একজন মুসলিম নারীর পক্ষে। ১৯৩২ সালে তার প্রথম স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেন মৃত্যুবরণ করলে তাঁর সাহিত্যযাত্রা এক ভিন্ন বাঁক নেয়। তার কবিতার রোমান্টিক যাত্রার পথটি একটি নারীবাদী ধারায় বাঁক নেয় গদ্য সাহিত্যে, যার প্রকাশ দেখি আমরা কেয়ার কঁাাঁ (১৯৩৭) গল্পগ্রন্থে। এই বইয়ের গল্পে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, নারীকণ্ঠে যৌনতার দাবি এবং জীবন সম্পর্কে নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেবার খোলাখুলি ঘোষণা সেই সময়ের জন্য বেশ সাহসীই ছিলো। তাঁর সাহিত্যিক অভিযাত্রায় বেগম রোকেয়ার নারীবাদী প্রভাব ছিলো যেমন একদিকে, অন্যদিকে বেগম রোকেয়ার সাথে সম্পর্কের সূত্রে সামাজিক কাজেও জড়িয়ে পড়েন। বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলামের সাথে যুক্ত হন ১৯২৯ সালে। তাকে যুক্ত হতে দেখি অল-ইন্ডিয়া উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্সে। ১৯৩১ সালে সুফিয়া কামাল মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে তিনি যে শুধু তার স্বামীকেই হারান এমন নয়, তিনি হারান তাঁর আদর্শিক গুরু বেগম রোকেয়াকেও। এই সময়ের একাকীত্বকেই তিনি নিয়োজিত করেছিলেন নতুন ধারার সাহিত্য রচনায়। কেয়ার কঁাাঁর পরে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাঁঝের মায়া কাব্যগ্রন্থটি যার প্রশংসা করেছেন রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল দু‘জনেই। ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন খানের সাথে তাঁর পুনরায় বিয়ের পরে কলকাতাতেই বসবাস করতে থাকেন ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে পর্যন্ত। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত কলকাতার নানা সামাজিক কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় দাঙ্গাপীড়িতদের সহায়তার জন্য কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে বেগম পত্রিকা প্রকাশিত হলে প্রথম সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন কয়েক মাস। এ বছরেরই অক্টোবর মাসে তিনি সপরিবারে ঢাকা চলে আসেন দেশ বিভাগের বাস্তবতায়। তখন ঢাকায় লীলা রায়ের মাধ্যমে শান্তিরক্ষা কমিটিতে যুক্ত হয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে পার্টির নারী গণসংগঠন ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ নিষিদ্ধ হয়। ফলে এবছরই তাঁকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে তাঁর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সুলতানা পত্রিকা, যার নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থের প্রধান চরিত্রের নামানুসারে। ১৯৫০ সালে বেগম পত্রিকা নূরজাহান বেগমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হবার পাশাপাশি গঠন করা হয় ‘বেগম ক্লাব’ যা ঐ সময়কার নারী লেখকদের লেখালেখি এবং আড্ডার পরিসর হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, তিনি একজন নারীবাদীর সংজ্ঞা ঘোষিত লেখক-সম্পাদক এবং আন্দোলনকারীর দ্বৈত ভূমিকায় নিয়োজিত হয়ে যান। দেশ বিভাগোত্তর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আসার পরে নারী আন্দোলনের ঝান্ডাাঁ লীলা রায় তার হাতেই তুলে দিয়ে যান শান্তি কমিটির দায়িত্ব দিয়ে যাবার মধ্য দিয়ে। তিনি একে একে নারী অন্দোলনের বহু সংগঠনের প্রধান হিসেবে কাজ করতে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি (১৯৪৮), ঢাকা শহর শিশুরক্ষা সমিতি (১৯৫১), ওয়ারী মহিলা সমিতি (১৯৫৪), নারী কল্যাণ সংস্থা (১৯৬৫), মহিলা সংসদ (১৯৬৬) এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (১৯৭০)-এর সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে যেমন তাকে দেখা যায় মুসলিম পারিবারিক আইনের পক্ষে প্রচারাভিযান চালাতে, তেমনি ১৯৮৩ সালে দেখা যায় নারী নির্যাতন (নিবর্তক) আইন ও তার পরবর্তী সংশোধনীগুলোর প্রতি সমর্থন ও সংহতি গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত হতে। এতগুলো সংগঠনের দায়িত্ব তাঁর উপরে অর্পিত হওয়াাঁ অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো। কারণ একদিকে তাঁর প্রস্তুতি তখনএকজন নারী সাহিত্যিক হিসেবে যাঁর লেখায় নারীর প্রতি সুষ্পষ্ট দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান, অন্যদিকে বেগম রোকেয়ার সাথে কাজ করে আসার অভিজ্ঞতাসহ নারীর জন্য আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা। তৃতীয় আরেকটি কারণ হলো সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তানের এই অংশে যেসব অমুসলিম নারীরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন এতোকাল, তাদের জন্য রাজনীতি করাঁ সহজ রইলো না সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কারণে। অনেকেই ভারতে চলে যেতে বাধ্য হলেন। সেই সময়ে সুফিয়া কামালের আন্দোলন অভিজ্ঞতা এবং নারী সমাজের মুক্তির জন্য প্রতিজ্ঞা নিয়ে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে এদেশের নারী আন্দোলনের অবিসংবাদিত আইকনে পরিণত করে তুলল। এদেশের নতুন নারীদের আন্দোলন-সংগ্রামের মশাল বাহক হয়ে উঠলেন তিনি। বিশেষ করে, ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠিত হবার পরে। নারীমুক্তি আন্দোলন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের নারীমুক্তির আন্দোলন এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সমার্থক বললে সম্ভবত অত্যুক্তি হয় না, তবে সতর্কতা থেকে বলা যেতে পারে যে ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদের আত্মপ্রকাশের পর থেকে নারীমুক্তি আন্দোলন এবং মহিলা পরিষদ সমান্তরাল, যার পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমৃত্যু নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন সুফিয়া কামাল। এ বিষয়ে মালেকা বেগমের বই নারী আন্দেলনের পাঁচ দশক (২০০২)-এ বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে জেলায় জেলায় মহিলা পরিষদ নারী সমাজের করণীয় সম্পর্কে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেছে ঝটিকা সফরে গিয়ে। দেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকার শহীদ মিনারে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম জনসমাবেশ হয়েছিলো। সেই সভায় এসেছিলেন শোকাকুল মা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, রাজাকারের হাতে নিহত শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী। তাদের বেদনা এবং ক্ষোভ ছিলো। স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এদেশের নারীদের উপর যে যৌন সহিংসতা চালিয়েছিলো, সেইসব নারীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং যুদ্ধশিশুদের নিয়ে কাজ করাই হয়ে উঠেছিলো জাতীয় দায়িত্ব। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে এবং স্বেচ্ছাসেবী নারীনেতা ও কর্মীরা নারী পুনর্বাসন সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন স্বাধীনতার সাত দিনের মধ্যেই। অস্ট্রেলিয়ার শল্য চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস ১ লাখ ৭০ হাজার নারীর গর্ভপাত করেছেন। (বেগম, ২০০২:৭১) ৬১ বছর বয়সে সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পদ্ধতির নির্বাচন চেয়ে রাজপথে হেঁটেছেন তিনি। মালেকা বেগমের মতে, নারী আন্দোলন যে জাতীয়-আন্তর্জাতিক, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে মানব সমাজেরই সর্বাঙ্গীন প্রগতির প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে সেটা সুফিয়া কামাল তাদের শিখিয়েছেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের আদর্শ অনুসরণ করে সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে একটি বক্তব্য আজীবন প্রোথিত করে গেছেন যে, মানবমুক্তির জন্য ‘নারীমুক্তি’ অপরিহার্য পদক্ষেপ। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে মহিলা পরিষদ নারী সমাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কিছুআইন প্রনয়ণ করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৭৪ সালে বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন প্রনয়ণ করতে সক্ষম হয়, সক্ষম হয় যৌতুক নিরোধ আইন পাস করতে। সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে মহিলা পরিষদ নারী মুক্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বই প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানকারী ভূমিকা গ্রহণ করে। সুফিয়া কামাল দীর্ঘ সংগ্রামী অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন, দেশের সকল নারী আন্দোলনকারী সংগঠনকে এক তারে বেধে, এক স্বরে নারীনির্যাতন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলেই কেবল সাফল্য আশা করা সম্ভব। নারী আন্দোলনের নতুন বিকাশ ও বিস্তারের পাশাপাশি সত্তরের দশক থেকে পাশ্চাত্যের নারীবাদী চিন্তা ও কর্মসম্পাদনের কৌশল এদেশের মাটিতে কতটুকু প্রয়োগযোগ্য সেটি বিচার করে গ্রহণ-বর্জনের বিবেচনা করেছেন। তাঁর সক্রিয়তার যে দীর্ঘ সময় ধারাবাহিকভাবে নারীমুক্তি আন্দোলনে তিনি দিয়েছেন, এত দীর্ঘ সক্রিয়তা দেশে তো বটেই সারাবিশে^র বিচারেই বিরল। আজীবন নারীর মর্যাদা এবং সমানাধিকার দাবি করে যাওয়া এই কবি নিজেকে কখনো নারীবাদী দাবী করেননি। বরং তারমধ্যে একজন মাতৃরুপ প্রজ্জ্বলিত রেখেছেন। তাঁর সাহসী মাতৃরুপ এদেশের নারী আন্দোলনকর্মীদের বরাভয়। নারীবাদীদের আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। তিনি আজীবন নারীর মুক্তির জন্য লেখায় এবং নারী আন্দোলনে রাজপথে হেঁটেছেন। তিনি জাতীয় রাজনীতির সাথে (সরকারী রাজনীতির সাথে নয়) নারী আন্দোলনের এক মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছেন, যা আজকের দিনেরনারীবাদ চর্চ্চাকারীদের মধ্যে অনুপস্থিত। আমি যখন স্কুল টেক্সট বইয়ে কবি সুফিয়া কামালের কবিতা পড়ার দিন পেরিয়ে তাকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম, সেই সময়টা ছিলো এমনই যে পত্রিকার পাতায় সুফিয়া কামাল অত্যন্ত আলোচিত, সবখানে তার প্রবল উপস্থিতি, সেই উপস্থিতি প্রধানত সমাজ সংস্কারক হিসেবে, নারী-নেতা হিসাবে। তখন তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। কবিতা লিখতে কম সময় পাচ্ছেন। এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সাথে আমলে আনা প্রয়োজন যে আমাদের নারী আন্দোলনের, বিশেষ করে মুসলিম নারী জাগরণের, দুই পথিকৃত নারী বেগম রোকেয়া এবং বেগম সুফিয়া কামাল দু’জনেরই দু’টি সত্তা প্রবলভাবে অথচ সমান্তরালভাবে প্রবহমান। একটি সৃজনশীল সত্তা, অন্যটি সমাজ-সংস্কারক সত্তা। কারণটি কি এই যে, সেই সময়ে নারীর বেরিয়ে আসা এতো সীমিত ছিলো যে যারা বেরিয়ে এসেছেন তাদের দুটো দিকেই পথ দেখাতে হয়েছে? কারণ যাই-ই হোক, বেগম রোকেয়া সমাজ সংস্কারক হিসেবে যে কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেননি, সে কথাই বলেছেন তার উপন্যাসের নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে পদ্মরাগের মধ্য দিয়ে। সুফিয়া কামাল আমূল রোমান্টিক কবি অথচ তার সমাজ সংস্কারক ভুমিকা নারীমুক্তিকে রাজনীতি সংলগ্নতা দিয়েছে। এটি বাংলার নারীমুক্তির আন্দোলনের দ্বিতীয় স্রোত। তিনি বলেছেন, ‘নারীর অধিকার, গণতন্ত্র ও বিশ্বশান্তির সংগ্রাম এক ও অবিচ্ছেদ্য’। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পরে নারীর মুক্তিকে, অধিকারকে রাজনীতি, এমনকি বিশ্বরাজনীতির সাথে একাকার করে দেখেছেন প্রথম সুফিয়া কামাল। আজ, সর্বগ্রাসী পূঁজির পাাঁতনে নারীমুক্তি নিয়ে যারা কাজ করছেন এটি তাদের জন্য খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি বার্তা । আজকের নারীবাদ তাত্ত্বিকভাবে অনেক এগিয়েছে সত্য কিন্তু রাজনীতির সাথে, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সাথে তাদের আকাংখা মেলাতে পারেনি বলে কাংখিত ফল আসেনি। নারীর আন্দোলন অনেকটাই বি-রাজনীতিক কর্পোরেট পুঁজির বৃত্তে আঁকে পড়েছে। এমনকি তিনি তার কবিতাকেও রাজনীতির বাইরে রাখেননি, “যতদিন পর্যন্ত রাজনীতি বলতে মানবতাবোধের পুনরাধিষ্ঠান, সমতার অধিকার, মানুষের ভালো থাকা এবং ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনের উপর তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বোঝায়, আমার কবিতা আর রাজনীতি একসূত্রে গাঁথা”। সুফিয়া কামালের কবিতা না পড়ে তার মূল্যায়ণ খন্ডিত হতে বাধ্য। নারীবাদের যে ধারাটিতে তার বিচরণ সেটি উপরভাসা পাঠের আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তিনি বুঝি নারীর চিরাচরিত কল্যাণময়ী, জননী রুপটিতেই মনোযোগী থাকতে চেয়েছেন, জীইয়ে রাখতে চেরয়ছেন এবং আমার সমসাময়িকদের অনেকের মধ্যেই এই অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে হয়। পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতে যেমন দেখা যায়, যিনি একজন কবি অথচ একজন নারীও বটে, এবং তার জীবনবোধ যদি আরোপিত না হয় তবে তার অভিজ্ঞতার অকপট প্রকাশকে পুরুষ পরিমন্ডল নিকৃষ্ট বলে আখ্যা দেয় আর আমরা এই লিঙ্গ রাজনীতির শিকার হই। আমি ভাবি ঘরের যে জগত সেই জগতের হদিস না জানা বা না জানার ভান করা এই পুরুষ পরিমন্ডলের সাহিত্যচিন্তা যে কতো সীমাবদ্ধ, সে’কথা সাহস করে কেই-বা বলতে পেরেছে কবে! ফরাসি নারীবাদী তাত্ত্বিক এলেন সিক্সু নারীকে পুরুষ অভিজ্ঞতায় নয়, নিজের অভিজ্ঞতার প্রকাশকে নারীর সৃজনশীলসত্তার মুক্তির সূত্র হিসেবে দেখছেন। সুফিয়া কামালের কবিতায় নারী তার নারীত্বের শক্তিতে উজ্জ্বল, নারীত্বের শক্তির কাছে তার আহবান। তার জীবন, সংগ্রাম এবং সৃজনশীলতা এক অখন্ড প্রয়াস। তাই তিনি ‘আলোর দুহিতা’, ‘সেই পুরাতন আলেফ লায়লা’, ‘জেব-উন-নিসা’, ‘অঙ্গনার অন্য নাম’, ’অনন্যা’, ’নারী ও ধরিত্রী’ কিংবা ‘অমৃত কন্যা’র শরণ নেন বার বার, টেক্সটে তুলে আনেন। বিশেষ করে যে কোন অনটনের বিপরীতে, যেকোন অশুভের বিরুদ্ধে, অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে মায়ের দাঁড়িয়ে যাবার যে সংস্কৃতি এই অঞ্চলে প্রবহমান নাম না জানা অতীত থেকে, সেই শক্তির সাথে তিনি আপোষ করেছেন বলে কোন নজির পাওয়া যায় না, তার জীবনে কিংবা রচিত সাহিত্যে। যে হাতিয়ার তখন তার কাছে তিনি সেটির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। আজ যখন রাস্তায়, গণমাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যমে এবং ঘরে নারী নির্যাতিত এবং এনজিও নারীবাদ প্রকৃতপক্ষে নারীবাদী সার্বক্ষণিক লড়াইকে বিদেশী ডোনারদের দেয়া মৌসুমী এজেন্ডায় পরিণত করেছে, তখন ১৪ বছর বয়স থেকে নারীর জন্য লিখে যাওয়া এবং রাজপথে হেঁটে যাওয়া এই জননী সাহসিকার লেখা এবং কাজ আজও ভরসার আলোকবর্তিকা। একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং একটি কবিতা দিয়ে এই আমূল মানবতাবদী নারীনেতা, সমাজসংস্কারক এবং কবির জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, যেখানে ফুটে আছে মেয়েদের জন্য তার আশিস। ১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচন হলো। আমি শামসুন নাহার হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। স্বভাবতই দায়িত্ব পড়লো অভিষেক-সংকলন প্রকাশের। সাহস করে একদিন কবির কাছে ফোন করে একটি কবিতা চেয়ে বসলাম, তিনি বললেন, “আমি তো আধুনিক কবিতা লিখি না, তোমাদের কি পছন্দ হবে?” পরদিন ‘সাঁঝের মায়া’য় গিয়ে কবিতাটি নিয়ে আসতে বললেন। নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে দেখি তিনি বারান্দার রোদে কিছু সবজি কাঁছেন নিজ হাতে। ধবধবে পরিস্কার সাদা শাড়ি পরা। পরিচয় দিতেই বসতে দিলেন, একটা ছোঁ কাঁচের বাটিতে দিলেন একটা চিড়ের মোয়া, দুটো নাড়ু আর এক গ্লাস ঠান্ডা জল। ভেতর থেকে নিয়ে এলেন ‘কন্যারা’ নামে একটা কবিতা, মিষ্টিস্বরে পড়ে শোনালেন। কবিতাটি ছাপা হলো আমাদের অভিষেক সংকলন পোড়া করোটিতে ফুলের সমারোহ-তে। কবিতাটি অনন্য এবং আমার জানা মতে আর কোথাও ছাপা হয়নি, তাই তুলে দিচ্ছি এখানে: কন্যারা ধান কন্যারা জাগে বক্ষভরি মমতার ক্ষীর ক্ষুধার্ত সন্তান লাগি কোমল মাটির ফসলের ভার নিত্যই দিতেছে উপহার। নিত্যই দিতেছে রূপ, ছন্দ, গন্ধ গান নয়ন জড়ানো, তৃপ্তি লভে যাতে প্রাণ। উদার সানন্দ চিত্ত যাতে হয় মানব সন্তান ধৈর্য্যে, সাহসের বীর্য্যে মানব মহান নিত্যকার হানাহানি কুটিল বিদ্বেষ যেনো হয় শেষ। শান্তির কপোত দিক ডানা মেলে তার ঘুচুক অজ্ঞান অন্ধকার ধান কন্যারা দিক ফসলের ভার নিত্য উপহার ক্ষুধার্ত লভুক তৃপ্তি শান্তির কপোত দিকে দিকে প্রসন্ন অনন্দ বার্তা যাক লিখে লিখে। তিনি প্রসন্ন আনন্দবার্তা লিখে শান্তির কপোতের মাধ্যমে নারীর সমানাধিকারের কথা বিশ্বমাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। নারীবাদ এই মানবমূর্তির বার্তাই তো ছড়াতে চায় পৃথিবীতে। জননী সাহসিকার নিরানব্বইতম জন্মদিনে শ্রদ্ধা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..