ত্রুটি-ঘাটতি দূর করে প্রগতিমুখীন সংস্কারের জন্য সংগ্রাম চালাবে সিপিবি

Posted: 11 অক্টোবর, 2026

সংসদের আসন্ন অধিবেশনে ‘সংবিধান সংশোধন বিল’ উত্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। একটি দেশের সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ, প্রতিটি বাক্য এবং তার যে কোনো সংশোধনীর তাৎপর্য বিশাল। একটি রাষ্ট্র, তা সে যে চরিত্রেরই হোক, তার একটি প্রধান ভিত্তিমূলক বিষয় হলো ‘আইনের শাসন’। ফ্রি স্টাইল নৈরাজ্য থেকে রক্ষা পেতে হলে একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পথে চলতে হয়। সংবিধান যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আইন, তাই দেশের পথ পরিক্রমণের ক্ষেত্রে সংবিধান বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে দেশের যে সংবিধান রচিত হয়, তা মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীকে অগ্রাহ্য করে প্রণয়ন করা সম্ভব ছিল না। ১৯৭২ সালের সংবিধান সেভাবে প্রণীত হলেও তাতে বেশ কিছু স্ববিরোধিতা, ত্রুটি, বিচ্যুতি, ঘাটতি, অনুল্লেখ- ইত্যাদি ছিল। গত ৫৪ বছরে সেগুলো দূর করা তো হয়ই নাই, বরং মৌলিক বিষয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই আদি সংবিধানের ডজন খানেকেরও বেশি পশ্চাদমুখী প্রতিক্রিয়াশীল সংশোধনী করা হয়েছে। সংবিধানের এসব কাটাছেঁড়ার (সংশোধনের) কারণে তার প্রগতিশীল উপাদানগুলো প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই পশ্চাদগতি থেকে ফিরে আসতে হবে। শুধু তাই নয়, ১৯৭১-এ মুক্তিকামী জনগণ যে স্বপ্ন দেখেছিল তার বাস্তবায়নের পথে আদি সংবিধানের প্রগতিমুখীন সংশোধন করার কাজটিও এখন ফরজ কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। সংশোধনের নামে তাতে প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদমুখী উপাদান যুক্ত করার জন্য একটি মহলের বিশেষ তোড়জোড়ের কারণে তা আরও গুরুত্ব লাভ করেছে। সংবিধান সংশোধনের বিষয়টির প্রতি নজর না রাখার তাই কোনো সুযোগ নেই। দেশের সংবিধান কারো খামখেয়ালি ইচ্ছা-অনিচ্ছা দ্বারা রচিত হয় না। অনেকে মনে করে থাকেন যে ‘সার্বভৌম পার্লামেন্ট’ সংবিধান রচনা করে। কিন্তু কথাটি সঠিক নয়। পার্লামেন্ট সার্বভৌম বটে। কিন্তু ‘পার্লামেন্ট পুরুষকে নারী বা নারীকে পুরুষ করা ছাড়া সবকিছু করারই অধিকার রাখে’-এ কথাটি মোটেও সত্য নয়। পার্লামেন্ট অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখে ঠিকই, কিন্তু সে যা ইচ্ছা তাই’ করতে পারে না। পার্লামেন্ট তার সংবিধানে বর্ণিত বিধান অনুসারে সংবিধান সংশোধন করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তা রচনা করতে অথবা তার এমন কোনো সংশোধনী করতে পারে না যা সংবিধানের মৌলিক চরিত্রকে বদলে দেয়। এর কারণ হিসেবে যে কথাটি মনে রাখা আবশ্যক তা হলো, ‘পার্লামেন্ট সংবিধানের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সংবিধান পার্লামেন্ট দ্বারা সৃষ্ট হয়নি’। সংবিধান ও পার্লামেন্ট— কোনটার অবস্থান কোনটার উপরে সে কথা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক স্পষ্ট রায়ে পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান নিয়ে ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতেছিল। সংবিধানকে রক্ষা করার শপথ নিয়ে তারা ক্ষমতায় যাওয়া সত্ত্বেও, তাদের তরফ থেকেই ‘নতুন প্রজাতন্ত্র’, বর্তমান সংবিধানকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে ‘নতুন তৌহিদী সংবিধান’ প্রবর্তন— ইত্যাদি আওয়াজ তোলা হয়েছিল। এসব আওয়াজ জনগণের সমর্থন পায়নি। গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতেও দেয়ালে দেয়ালে যেসব অসংখ্য গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল, তার কোনোটিতেই নতুন সংবিধান রচনার স্লোগান উৎকীর্ণ ছিল না। সবচেয়ে বেশি যে দুটি স্লোগান সেখানে উৎকীর্ণ হয়েছিল সেগুলো হলো ‘স্বাধীনতা এনেছি (জাতীয় পতাকার পাশে এই বাক্যটি লেখা থাকায় এক্ষেত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধকেই বোঝানো হয়েছে) সংস্কারও আনবো’ এবং ‘ধর্ম যার যার—রাষ্ট্র সবার’। অন্তর্বর্তী সরকারে বিদেশি অনুগ্রহে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা দ্বারা কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা মহলটি তাদের ‘তৌহিদী বিপ্লবের’ ট্যাবলেট জনগণকে খাওয়াতে ব্যর্থ হয়ে, সংবিধানসহ শাসন কাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্দেশ্যে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করে মতবিনিময়ের এক দীর্ঘ পর্ব শুরু করেছিল। এটি যে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার একটি কৌশল মাত্র- তা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে যায় তখন, যখন সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় অহেতুক বিলম্ব ঘটিয়ে, শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে, জনগণকে অন্ধকারে রেখে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা, দেশের মাটিতে মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি, রাখাইন এলাকার জন্য ‘মানবিক করিডোর’ স্থাপন, আমেরিকার সাথে অসম ও চরমভাবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করলো বা সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিল। এভাবে থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো। বোঝা গেল যে আমেরিকার স্বার্থরক্ষায় এসব পদক্ষেপগুলো ছিল তাদের ‘গুপ্ত অ্যাজেন্ডা’, অথবা বহুজনের মতে, তাদের জন্য আমেরিকার প্রদত্ত ‘বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট’। আমেরিকার এই ষড়যন্ত্রের খেলা এখনও চলছে। নতুন সরকারও যে নতজানু নীতি নিবে না, সে সম্পর্কে মানুষের মনে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। যাই হোক! ‘নয়া প্রজাতন্ত্র’, ‘নতুন তৌহিদী সংবিধান’ ইত্যাদি পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। সংবিধান সংশোধনের ইস্যুটি এখন অ্যাজেন্ডা হিসেবে সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি সরকার এ বিষয়ে তার আনীত বিলে কী প্রস্তাবনা হাজির করবে তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা এটা জানি যে ১৯৭২-এর সংবিধান রচনাকালেই তাতে অনেক ত্রুটি, বিচ্যুতি, ঘাটতি, দুর্বলতা ছিল। ১৯৭২ সালেই সিপিবি এসব বিষয়ে তার আপত্তির কথা জানিয়ে এ সম্পর্কে তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাসমূহ সরকার ও সংসদকে জানিয়েছিল। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এবং ডাকসুর ভিপি। আমার নেতৃত্বে প্রস্তাবিত সংবিধানের বেশ কিন্তু বিষয়ে সংশোধনী ও নতুন ধারা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে একাধিক দিন প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছিল। কিন্তু সরকার আমাদের দাবি ও সুপারিশগুলো গ্রহণ করেনি। স্বাধীন দেশে সংবিধান প্রণয়নে ইতিহাস রচিত একটি বাস্তব প্রেক্ষাপট ছিল। বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের হানাদার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গোটা দেশের সমগ্র জনগণের এক ঐতিহাসিক বিজয়ী সশস্ত্র লড়াইয়ের পর্ব। এটি ছিল প্রকৃতই একটি ‘জনযুদ্ধ’। কিন্তু এই পর্বটি শুধু মাত্র একটি সামরিক অভিযান ছিল না। তার প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল কয়েক দশক ধরে চলতে থাকা অগণিত দেশবাসীর বীরত্বপূর্ণ গণসংগ্রাম, শ্রেণি সংগ্রামের ফলাফল হিসাবে। ভাত-কাপড়, রুটি-রুজি, গণতন্ত্র, মাতৃভাষা, স্বাধিকার, সাম্রাজ্যবাদের নয়া-উপনিবেশি শোষণ, পাকিস্তানের ২২টি লুটেরা ধনিক পরিবার ও তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী সরকারের উপনিবেশিক শাসন-শোষণ-বঞ্চনা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংগ্রামের যে মহা ইতিহাস রচনা করেছিল, ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর - এই নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল সেই সুদীর্ঘ সংগ্রামের শীর্ষ পর্ব। এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষসহ সর্বস্তরের জনগণের দীর্ঘ দিনের ধারাবাহিক সংগ্রামের পরিণতিতে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র জনযুদ্ধে হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা গণ-সংগ্রামের এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশবাসীর মাঝে স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক নীতিমালা কী হবে, সে বিষয়ে এক অনন্য ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেসব নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ঘোষণা করে, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত এমএলএ ও এমপিএ গণ একত্রিত হয়ে নিজেরা গণপরিষদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এক সপ্তাহের মাথায় ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও জনগণের সামনে হাজির হয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রাপ্ত ম্যানডেটের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেছিল। এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দেশবাসীকে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্যে আবদ্ধ করে মরণপণ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেই ভিত্তিতেই ৯ মাস জুড়ে সশস্ত্র জনযুদ্ধ সংঘটিত করে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে এক অনন্য বিজয় অর্জিত হয়েছিল। সেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বলা হয়েছিল যে- ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম।’ দেশ হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পর গণপরিষদের সদস্য হিসাবে তারা দেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিল। তাতে সাধারণভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকারের প্রতিফলন থাকলেও, কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি, ঘাটতি ও ব্যত্যয় ছিল। উপযুক্ত সংশোধনীর মাধ্যমে সেসব দুর্বলতা দূর করার সুযোগ থাকলেও তা করার বদলে, শ্বাসরুদ্ধকর একদলীয় রেজিমেন্টেশন ব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তন, সামরিক শাসন, ফরমান ও অধ্যাদেশ জারি ইত্যাদির সহায়তায় শাসকচক্রের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে কর্তৃত্ববাদী হুকুমদারী শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত পাঁচ দশক ধরে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবিধানকে এমনভাবে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে যে, সেটি এখন গণতন্ত্রের বাহক না হয়ে স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসন এবং লুটপাট-শোষণ-বৈষম্যের লালনকারী ও হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এর প্রতিবিধানকল্পে উচ্চ আদালত একাধিকবার এসব বিকৃতিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও, লুটেরা শোষকরা সংবিধানকে বারবার ক্ষত-বিক্ষত করেছে। এমতাবস্থায়, উপযুক্ত সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ত্রুটিগুলো দূর করে তাকে তার ক্ষতবিক্ষত হাল থেকে উদ্ধার করার বিষয়টি বহুদিন ধরে একটি অবশ্য করণীয় হিসেবে বিরাজ করছে। এই বিবেচনা ও দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ও তার আলোকে ১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধানের চার মূলনীতিকে ভিত্তি হিসেবে ঠিক রেখে সংবিধানের কয়েকটি জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধনী আনা প্রয়োজন বলে সিপিবি মনে করে। এই সংশোধনীগুলোর জন্য পার্টি প্রথম দিন থেকেই সংগ্রাম করেছে এবং আগামীতেও তা করে যাবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধন সাধনের জন্য জনগণের সম্মতি ও সক্রিয় অংশগ্রহণের নিশ্চয়তার জন্য একটি আবশ্যিক শর্ত। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সুযোগ এনে দিয়েছিল, সংবিধান সংশোধনের ইস্যুতে জনগণের মতামত গ্রহণ করে আইনি পথে সংবিধানকে রুগ্নতা মুক্ত করার ও মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেওয়া জনআকাঙ্ক্ষার সুদৃঢ় বাস্তবায়নের পথে তাকে পরিপুষ্ট করা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সহজ-স্বাভাবিক পথে অগ্রসর হওয়ার বদলে সাংবিধানিক সংস্কারের নামে নতুন ‘তৌহিদী প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা, সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিয়ে নয়া সংবিধান চাপিয়ে দেওয়া, প্রকৃত স্বাধীনতা এসেছে ১৯৪৭ সালে বিধায় পাকিস্তান আমলের কিছু ভুল-ত্রুটি দূর করে দেশকে পাকিস্তানি ধারা ও ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া ইত্যাদি প্রচারণা চালিয়ে এবং কৃত্রিমভাবে মব শক্তি নামিয়ে তাকে জনমতের প্রতিফলন রূপে দেখাতে সচেষ্ট হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামাতের নেতৃত্বে উগ্র সাম্প্রদায়িক একটি বিশেষ মহল এসব রাষ্ট্রদ্রোহী প্রচারণা ও তৎপরতা চালায়। এভাবে সংবিধান প্রশ্নে দেশ গুরুতর বিপদের সম্মুখীন হয়। মুক্তিযুদ্ধ, তাকে ঘিরে জনগণের স্বপ্নকে, কয়েক যুগ ধরে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-জনতার রুটি-রুজি-অধিকার-জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার-গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে এবং একাত্তরের ৩০ লক্ষ শহীদসহ অগণিত শহীদানদের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে অন্ধকার যুগের চরম প্রতিক্রিয়াশীল দানবীয় অপশক্তির ষড়যন্ত্রের খেলা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তাদের পূর্ণ পরিকল্পনা জনগণের মাঝে বেচতে ব্যর্থ হয়ে তারা ‘ঐক্যমত্য কমিশনের’ দ্বারা, পূর্ণভাবে না হলেও, একই ধারায় ‘ঐকমত্য’ হয়েছে বলে মিথ্যা দাবি সামনে আনে। এ সুযোগটি তারা পেত না যদি সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াগত বৈধতার কারণ উল্লেখ করে তারা কমিশনের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে বিরত থাকতো। এক্ষেত্রে শুরুতেই বিএনপি ভুল করায় সে নিজেই ওদের পাতানো ফাঁদে আটকা পড়ে গিয়ে তারা যে ‘ঐকমত্য’ প্রতিষ্ঠার বিরোধী না তার প্রমাণ দিতে ওদের নানা প্রস্তাবনা মেনে নিয়েছিল। অবশেষে, সংসদের সম্মতি ব্যতিরেকে গণভোটের কোনো আইনি ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও, তারা এ বিষয়ে নিজস্ব মনগড়া অবস্থানকে প্রতারণামূলক এ ভুয়া একটি ‘ঐক্যেমত্যের দলিল’ হাজির করে, বেশুমার সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করে, অপ্রয়োজনীয় গণভোটের নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। এই গণভোটের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ‘ঐকমত্যের প্রস্তাবনা-র নামে যে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে, তাতে কয়েকটি সমর্থনযোগ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, সেখানে এমন কতক প্রস্তাবনা রয়েছে যেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার ও অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তাদের ছল চাতুরী, মিথ্যাচার, প্রতারণামূলক তথ্য দিয়ে, ইতিহাসের প্রকৃত বয়ানকে বিকৃত করে, পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যযুগীয় তত্ত্ব-আদর্শ-ব্যবস্থার সাথে যোগসূত্র পুনঃস্থাপন করে, দেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা এখনও জোরদারভাবে অব্যাহত আছে। দেশবাসীকে সে বিষয়ে হুঁশিয়ার থাকতে হবে এ ধরনের ধরনের যে কোন অপচেষ্টা রুখে দাঁড়াতে হবে। ইতিমধ্যে দেশে নির্বাচন হয়েছে, সংসদ গঠিত হয়েছে, নির্বাচিত সরকার কাজ শুরু করেছে। এমতাবস্থায়, বহুদিন ধরে ফেলে রাখা সংবিধান সংশোধনের ইস্যুটি নিষ্পন্ন করার এখনই উপযুক্ত সময়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জনগণের সামনে সংবিধান সংশোধনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থিত করবে। এসব প্রস্তাবনাসহ অন্যান্য সব প্রস্তাবনা নিয়ে সিপিবি খোলা মনে সকলের সাথে আলোচনা করতে প্রস্তুত ও আগ্রহী। সিপিবির সংবিধান সংশোধনী বিষয়ক নিজস্ব দলীয় প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা আছে। সেটি দেশবাসী ও সরকার-সংসদের কাছে উপস্থিত করবে।