নিউমুরিং-লালদিয়া-পানগাঁও বিদেশিরা চালালে
নিজেদের বন্দরদক্ষতা বাড়বে কীভাবে?
Posted: 04 অক্টোবর, 2026
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সদা চমকপ্রিয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সহযোগীরা মিলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু যেসব কাজের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালে তার স্বাধীনতা লাভের মাত্র দু’দশকেরও কম সময়ের ব্যবধানে ‘সিঙ্গাপুর’ হয়ে উঠতে পেরেছে, বাংলাদেশের আজ পর্যন্ত সময়ের কোনো সরকারই প্রকৃত অর্থে সে পথে হাঁটেনি।
এ সূত্রে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি আজ এতটা বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার পেছনে যে কর্মকাণ্ডগুলো সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পেরেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বন্দরসেবা, যে সেবা প্রদানের সুযোগ ও সম্ভাবনা বাংলাদেশেরও অনেকখানি রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সিঙ্গাপুরের মতো করে সে মানের বন্দরসেবা প্রদানের জন্য নিজেদের দক্ষতা ও সামর্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে যে ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের নেওয়া উচিত ছিল, এ দেশের সরকারগুলো একের পর এক গ্রহণ করেছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত উদ্যোগ।
এ ধারার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে নিউমুরিং, লালদিয়া, পানগাঁও ইত্যাদি বন্দরের পরিচালনভার ২৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া। অথচ এই বন্দরগুলো যদি নিজেদের সীমিত দক্ষতা ও সামর্থ্য দিয়ে চালানোর পাশাপাশি এগুলোর নিজস্ব জনবলের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা যেত, তাহলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে স্থানীয় জনবলের এ সংক্রান্ত দক্ষতার স্তর সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে না হোক, অন্তত তার কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু অদৃশ্য কারণে আমাদের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক ও নির্বাহী আমলা কারোরই সেদিকে আগ্রহ নেই। তাদের উভয়েরই পছন্দ ও আগ্রহ বিদেশ নির্ভরতায়- এসব বন্দরের দায়িত্বভার বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ায়।
তো মুখে বলবেন সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে পৌঁছতে চান, আর বাস্তবে বন্দরগুলোর আওতাধীন সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর পরিচালনভার বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব জনবলের দক্ষতা ও সামর্থ্য উন্নয়নের সব পথ রুদ্ধ করে রাখবেন, এভাবে কী সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে পৌঁছা যায়? কখনই না।
আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, একদিকে স্লোগান চলছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, আর অন্যদিকে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে বন্দর, টার্মিনাল, বাণিজ্য ইত্যাদি নির্দ্বিধায় তুলে দেওয়া হচ্ছে বিদেশিদের হাতে— বিষয়টি কেমন স্ববিরোধী হয়ে গেল না?
বিষয়গুলো শুধু কষ্টেরই নয়— একইসঙ্গে বুঝে শুনে দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে এক নয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার আওতায় হস্তান্তরেরও শামিল। এভাবে চলতে থাকলে আজ বন্দরের টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা তো কাল পুরো কোনো বন্দরই হয়তো বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশকে যাতে নিকট বা দূর ভবিষ্যতে তেমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, তার জন্য বন্দর ব্যবস্থাপনা কৌশল নিয়ে দেশের রাজনীতিক ও আমলাদের মধ্যে বর্তমানে যে ধরনের ধারণা ও চিন্তাভাবনা কাজ করছে, সেসবের আশু পর্যালোচনা ও পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করি, যা নিয়ে লেখার পরবর্তী অংশে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করা হলো।
দেশের সমুদ্র, নৌ, স্থল ও বিমান বন্দর পরিচালনার জন্য কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল বাংলাদেশে একেবারেই নেই— এমন ধারণা থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু কিছু দক্ষতায় খানিকটা ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু সে ঘাটতিগুলো তাদের মেধা বা সামর্থ্যের অভাবজনিত নয়, বরং কাজের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতার জায়গাগুলোকে শাণিত করে তোলার সুযোগ না পাওয়ার কারণে। চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেডকে (সিডিডিএল) নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) দায়িত্ব না দিলে কখনও কি বুঝা যেত, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার কাজটি তারা কি চমৎকার দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে করতে পারে? এ কাজটি যদি তারা সামনের দিনগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে করে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে তাদের দক্ষতা ও নৈপুণ্যের স্তর যে আরও অনেক ওপরে উঠে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে যাবে, সে ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই। আর বস্তুত সেটিই হচ্ছে সিঙ্গাপুর, সাংহাই কিংবা গুয়াংজো বন্দরের সমপর্যায়ের মান। কিন্তু এনসিটি পরিচালনায় সিডিডিএলের এরূপ চমৎকার দক্ষতা ও নৈপুণ্য দেখানোর পরও যদি এটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, ভূত সরিষার মধ্যেই নিহিত।
উল্লেখ্য, গণমাধ্যমের তথ্যমতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব শিগগিরই ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা কোনোভাবেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তার মানে এটি নিছকই একটি চমক সৃষ্টিমূলক স্লোগান।
একই কথা প্রযোজ্য লালদিয়া, পানগাঁও কিংবা অন্যান্য বন্দর ও টার্মিনালের ক্ষেত্রেও। ওইসব বন্দর-টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব যদি সিডিডিএল বা অনুরূপ কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হতো, হলফ করে বলতে পারি, তারাও সিডিডিএলের মতোই দক্ষতা ও নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রাখতে পারত। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেশীয় প্রতিষ্ঠান বা দেশের দক্ষ ও যোগ্য মানুষদের দেওয়া হয়নি। কেন হয়নি তা এ দেশের অধিকাংশ মানুষ বুঝলেও সে অন্যায়কে ঠেকাবার মতো সাংগঠনিক ঐক্য ও শক্তি তাদের নেই। আর দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে এতটাই নিমগ্ন যে, দেশ ও জনগণের সমুদয় স্বার্থও যদি বিদেশি বণিক পুঁজির কাছে সমর্পিত হয়ে যায়, তাহলেও তাদের কারোরই কিছু আসে- যায় না।
যদি যেত, তাহলে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আত্মস্বার্থ বিক্রির পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) কিছুতেই স্বাক্ষরিত হতে পারত না। কিংবা এটি একটি অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে স্বাক্ষর হলেও নির্বাচিত সরকারের আমলে এসে বাতিল হয়ে যেত। একইভাবে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালও (এলসিটি) ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের কাছে হস্তান্তরিত হতে পারত না। কিন্তু ঘটা করে গত ৩০ আগস্ট সেটিরই নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যে কাজ একেবারেই করার কথা ছিল না কিংবা অন্যায়ভাবে করার কারণে তা লুকিয়ে করার কথা ছিল (লুকিয়ে করাকে সমর্থন করা হচ্ছে না)। অথচ সে কাজ এখন সরকার করছে অহং মেশানো জৌলুসের সঙ্গে। আর দেশের অপরাপর রাজনীতিকরা তা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে দেখছেন।
আসলে শুধু বন্দর কেন, সব কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রেই এ দেশের সরকারগুলো রাষ্ট্রের নিজস্ব দক্ষতা ও সামর্থ্য উন্নয়নের ব্যাপারে পরিপূর্ণভাবে নির্লিপ্ত। তারা বরং বিদেশের কাছ থেকে রাজনৈতিক আশীর্বাদ প্রার্থনার পাশাপাশি বিদেশি পুঁজিলগ্নিকারীদের কাছ থেকে নানা আঙ্গিকের বৈষয়িক আশীর্বাদও খুঁজে ফেরেন।
আর তারা তা খোঁজেন বলেই মানুষকে অভুক্ত রেখে হলেও তারা বিদেশের কাছ থেকে ঋণ করে যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্র কেনেন, বিনা দরপত্রে উড়োজাহাজ ক্রয় করেন, টনপ্রতি ৩৫ ডলার বেশি দিয়ে গম কেনেন, চরম বিদ্যুৎ ঘাটতির মুহূর্তেও ঋণ নিয়ে বৈদ্যুতিক বাস কেনার প্রকল্প গ্রহণ করেন, ইউনিটপ্রতি ২৫ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি করেন এবং এমন আরও অনেক কিছু করেন, যা সাধারণ মানুষ জানেই না।
অথচ এ জাতীয় চুক্তির বিষয়গুলো জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জনগণকে নিয়মিতভাবে অবহিত করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৫.ক)। কিন্তু সরকারগুলোর প্রায় কেউই তা করে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বন্দর এখন শুধু বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। একইসঙ্গে তা গুরুত্বপূর্ণ সিঙ্গাপুরের মতো যারা অন্য দেশকে বন্দরসেবা দিয়ে দেশে বসেই মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে চায় তাদের আয়-উন্নতি বাড়াবার জন্যও, যেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। নিজস্ব জনবলকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ ও আধুনিক বন্দর পরিকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ-যে শুধু নিজেদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকেই শক্তিশালী করে তুলতে পারে তাই নয়। একইসঙ্গে ত্রিমাত্রিক (নৌ, স্থল ও বিমান) বন্দরসেবা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও ভুটানের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল পরিমাণ রাজস্বও আহরণ করতে পারত। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতার কারণে বাংলাদেশের সরকারগুলো এখন পর্যন্ত অন্য দেশের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যস্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখার মতো কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রিক পেশাদারিত্ব দেখাতে পারেনি ও পারছে না।
ফলে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের বিষয়টি রাজনীতির পারদের সঙ্গে ওঠানামা করছে, যা সম্ভবত সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে শুধু বাংলাদেশের মতো দেশেই ঘটছে। এই যে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর বিরোধ, যা দিনে দিনে আরও প্রচণ্ড আকার ধারণ করছে— সেই চরম বিরোধের মধ্যেও তাদের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন কিন্তু ক্রমাগত হারে বেড়েই চলেছে। অথচ গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য এরূপ যে, সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে গেছে এবং তা শুনে ‘তৌহিদী জনতা’র করতালি বহুলাংশে বেড়ে গেছে। প্রসঙ্গটির উত্থাপন এ কারণে যে, বন্দরসেবা প্রদানের মাধ্যমে ভারত, নেপাল ও ভুটানের কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর যে পরিমাণে রাজস্ব আয় করত, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। অথচ উল্লিখিত দেশগুলোতে বাংলাদেশের বন্দরসেবা কার্যক্রম কোভিড-পরবর্তী সময় থেকেই আস্তে আস্তে জোরদার হচ্ছিল, গত দুবছরের মধ্যে যা আরও অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত। বাংলাদেশ তার এই সময়কার উগ্র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেটি বহুলাংশেই হারিয়ে ফেলেছে।
সে যাইহোক, বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখনও এক অমিত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি নিকট ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে অধিকতর মনোযোগী হয়, তাহলে সে সম্ভাবনা আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে। তদুপরি দেশে যদি বিনিয়োগ বাড়ে, তাহলেও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বন্দরের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। আর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন জোরদার হলে বন্দরের গুরুত্বতো বাড়বেই, যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মোটকথা, বন্দর এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তিগুলোর একটি। আর দেশের অর্থনীতির আকার যত বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব যত বৃদ্ধি পাবে, বন্দরের এ নিয়ামকতাও ততই আরও বেশি মাত্রায় অপরিহার্য হয়ে ওঠবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বন্দরের এ ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে ধারণ করে বন্দরগুলোকে অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য যে বর্ধিত দক্ষতা ও সামর্থ্য দরকার, বন্দরগুলো বিদেশিদের হাতে চলে গেলে নিজেদের দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধির সে সুযোগটি আর থাকছে কোথায়?
এ অবস্থায় চুক্তি অনুযায়ী দীর্ঘ ৩০ বছর পর এসব বন্দর যখন বিদেশিরা বাংলাদেশের হাতে ফেরত দিতে চাইবে, তখন তা বুঝে নেওয়ার জন্য কতিপয় শ্রমিক ছাড়া কোনো দক্ষ প্রকৌশলী বা ব্যবস্থাপককেই আর এসব প্রতিষ্ঠানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেননা পদ্ধতিগত কারণেই এ সময়ের মধ্যে দেশে বন্দর পরিচালনার মতো কোনো দক্ষ জনবল গড়ে ওঠবে না। সে অবস্থায় বাংলাদেশকে তখন হয়তো বাধ্য হয়েই বিদেশিদের অনুরোধ করতে হবে বন্দরগুলোর দায়িত্ব স্থায়ীভাবে রেখে দেয়ার জন্য। আর আন্তর্জাতিক বণিকেরা সেটি বুঝে এবং সে অনুযায়ী চিন্তাভাবনা করেই হয়তো আজ ছলেবলে কৌশলে বন্দরগুলোকে নিজেদের কব্জায় নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, যা আসলে তাদের জন্য একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শুভ সূচনা। মোটকথা, বন্দরগুলো এখন বিদেশিদের ৩০ বছরের চুক্তিতে দিলেও সেগুলো ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের হাতে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অর্থাৎ এপিএম টার্মিনালস, ডিপি ওয়ার্ল্ড ও মেডলগ এসএ’র কাছে লালদিয়া, নিউমুরিং ও পানগাঁও বন্দর হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্ভবত এ বন্দরগুলোর কর্তৃত্ব স্থায়ীভাবেই হারাতে যাচ্ছে, যেমনটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে আঠারো শতকে হারিয়েছিল কলকাতা বন্দরের কর্তৃত্ব।
লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক