সোভিয়েত ইউনিয়নে একতার স্মৃতি
Posted: 04 অক্টোবর, 2026
একতায় লেখার আমন্ত্রণ পেলাম বন্ধু রতনের কাছ থেকে। আবদুল্লাহ আল ক্বাফি রতন, বর্তমানে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক। কী লিখব? গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতি শুক্রবার ‘প্রগতির যাত্রীতে’ লিখছি বিজ্ঞান ভাবনা ও বিজন ভাবনা নামে। তাই নতুন করে কি লেখা যায়? কিন্তু একতা মানেই এক ধরনের নস্টালজিয়া। তাই ভাবছি সেসব দিয়েই একতার পাঠকদের সাথে পরিচিত হওয়া যাক। সাড়া পেলে নিয়মিত না হলেও অনিয়মিতভাবে লিখব। তার আগে নিজের সম্পর্কে দুটি কথা বলে নেই।
আমি বিজন সাহা। মানিকগঞ্জ বাড়ি। কলেজ জীবনে আজাহারুল ইসলাম আরজু ভাইয়ের হাত ধরে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করি। সেটা অবশ্য হয়েছিল সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে এজিএস পদে নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে। রাশিয়ার প্রতি দুর্বলতা অনেক আগে থেকেই। সেই সময় বাড়িতে নিয়মিত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আসত। মূলত রুশ লেখকদের বিশেষ করে দস্তইয়েফস্কি আর চেখভের লেখা পড়ে নিজের অজান্তেই এদেশের প্রেমে পড়ে যাই।
ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেবার পর লতিফ সিদ্দিকী, আবুবকর সিদ্দিক তুলু, বিমল শিকদার, পরেশ রায়, হযরত আলী, প্রমথ স্যার, সঞ্জীব স্যার, প্রদীপ রায় স্যার, কচি ভাইসহ অনেকের সাথে বন্ধুত্ব ও ধীরে ধীরে ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর এসবের সাথে জড়িয়ে যাওয়া। সেই সময় আমরা যেন এক বিশাল পরিবার ছিলাম।
এইচএসসি পাশ করে মানিকগঞ্জের পাট চুকিয়ে ঢাকায় আসা। বুয়েটে ভর্তি হবার পর আহসান উল্লাহ হলের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সাথে আলাপ। তবে ১৯৮৩ সালে সিপিবির বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়ার জন্য এলে দেশীয় রাজনীতির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। দেশে থাকাকালীন পার্টি গ্রুপের সাথে জড়িত ছিলাম; সিএম কার্ড ছিল। আসার আগে আজাহার ভাই যখন কার্ড জমা রেখে দিলেন খুবই মন খারাপ হয়েছিল।
ঐ সময় পার্টির স্কলারশিপ নিয়ে যারা আসতো তাদের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও এখানে আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দিতেন সিপিবির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক নূরুল ইসলাম নাহিদ। এখনও মনে আছে সবাইকে বিদায় দিয়ে উনি আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। সেই সময় আমি যেহেতু ঢাকা-মানিকগঞ্জ যাতায়াত করতাম আর নিয়মিত পার্টি অফিসে যেতাম উনি আর আজাহার ভাই আমার মাধ্যমে চিঠিপত্র পাঠাতেন। তবে সেদিন এমন কিছু ছিল না।
নাহিদ ভাই বললেন, ‘বিজন আমরা বিভিন্ন লোকদের বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে সমাজতান্ত্রিক দেশে পাঠাই।
আমি জানি আপনি পড়াশোনা করতে ভালোবাসেন। মস্কোয় আপনার একটাই দায়িত্ব, ভালোভাবে পড়াশোনা করা।’
মস্কো এসে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই জানতে পারি যে এখানেও পার্টি স্ট্রাকচার আছে। এসব নিয়ে পরে কোনো এক সময় বলা যাবে যদি মানুষের শোনার আগ্রহ থাকে। আমার ধারণা কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন ইত্যাদি সংগঠনের বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়া করতে আসা ছেলেমেয়েদের নিয়ে পার্টির সাধারণ কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন ও আগ্রহ দুটোই আছে। তাই অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে এসব নিয়েও লিখব। তবে আজ একতায় ফিরে যাই।
একতা শুধু পার্টির মুখপত্র ছিল না, ছিল এক পশলা মুক্ত বাতাস। দেশে থাকতেই একতা পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম। মস্কোয় আসার পর আর কোনো বাংলা পত্রিকা আমাদের কাছে আসত না। দেশের খবর পাওয়ার মাধ্যম ছিল দেশ থেকে আসা ডেলিগেশন, নতুন ছাত্রছাত্রী আর বাড়ির চিঠিপত্র। নতুন ছাত্রছাত্রীরা আসত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, বাড়ির চিঠিপত্র হাতে আসতে আসতে পৃথিবী কক্ষপথের এক বিরাট অংশ পেরিয়ে যেত। ডেলিগেটরা এলেও সেটা ছিল অনিয়মিত। আর একতা আসত প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মঙ্গলবার। বুধবার সকালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজের দোকানে সে গণদর্শন দিত। পত্রিকা নিজ নিজ সংগ্রহে রাখতে সবাই ছুটত একতার পেছনে।
তবে সোভিয়েত ইউনিয়নে বাংলাদেশি ছেলেদের তুলনায় যেমন খুব অল্প সংখ্যক মেয়ে পড়তে আসত, একইভাবে একতা প্রেমীদের তুলনায় অনেক কম একতা পাঠানো হত। সেসবের একটা অংশ চলে যেত বিভিন্ন শহরে। যেখানে একতা বিক্রি হত সেটা যেহেতু আমার হোস্টেলের পাশে ছিল তাই অনেকেই আমাকে ওদের জন্য একতা কিনতে বলত।
আশির দশকে সিপিবি, ক্ষেতমজুর সমিতি, কৃষক সমিতি, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন - সমস্ত গণসংগঠনের রমরমা অবস্থা। ফলে বিপ্লব আসন্ন না হলেও আমরা যারা সুদূর সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলাম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম একতায় আমাদের সাফল্যের কাহিনী শুনতে। শুধু তাই নয়, আমাদের পার্টি গ্রুপে একতা পড়লাম কিনা, পড়ে কি বুঝলাম এসব বিষয়ে প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা হত। বুধবারের বৈকালিক আড্ডায় একতার বিভিন্ন খবর নিয়ে আলোচনা অনেকটা রুটিন মাফিক হয়ে গেছিল।
মস্কোয় বাংলা বইয়ের যে খুব অভাব ছিল তা নয়। মাঝে মধ্যেই প্রগতি প্রকাশনে যেতাম নতুন বইয়ের খোঁজে। কখনও কখনও বই মেলায় বাংলা বই আসত। গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে গেলে সবাই অন্যান্য কিছুর পাশাপাশি বাংলা বই নিয়ে আসত। এছাড়া দ্বিজেন কাকুর লাইব্রেরি তো ছিলই। তারপরেও সে সময় একতার গুরুত্ব ছিল ভিন্ন। নিজেদের বিপ্লবী ভাবনা, দেশের তাজা খবর আর বাংলা অক্ষর-সব মিলে একতা আমাদের কাছে ছিল অনন্যা।
এছাড়া আমরা যারা টুকিটাকি লেখালেখি করতাম, একতা ছিল তাদের জন্য একটা সুযোগ— বাংলা চর্চার একমাত্র মাধ্যম। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী ও অন্যান্য পত্রিকায় লেখা যেত। কেউ কেউ সেটা করেছেও। তবে তার পথ ছিল একতার চেয়ে বন্ধুর।
লেখালেখির কারণেই দেশে বেড়াতে গেলে একতা অফিসে যেতাম। সেসময় আমি মাঝে মাঝেই একতায় লিখতাম এ দেশের পরিস্থিতি নিয়ে, আমাদের জীবন নিয়ে। পেরেস্ত্রইকার হাওয়া আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যেত স্বপ্ন রাজ্যে। দেশে থাকতে সমাজতন্ত্র নিয়ে যে নির্মল স্বপ্ন ছিল, ভেতর থেকে সেটা দেখে মনে অনেক প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। তত্ত্ব নিয়ে ততটা নয়, যতটা তার প্রয়োগ নিয়ে।
এখনও মনে পড়ে, রাশিয়ায় আসার আগে জ্যাঠামশাইয়ের কাছে বিদায় নিতে গেলে উনি বলেন, “ভাল মানুষ, মন্দ মানুষ সব জায়গাতেই আছে। ভাল মানুষের সাথে মিশবে, মন্দদের এড়িয়ে চলবে।“ আমার চোখে তখন বিপ্লবের স্বপ্ন। গর্ব করে বলেছিলাম যে সোভিয়েত ইউনিয়নে কোনো খারাপ লোক নেই। তবে এদেশে আসার পর অচিরেই সেই ভুল ভাঙে। আসলে তখনও জীবন সম্পর্কে ততটা অভিজ্ঞতা ছিল না, ভাল মন্দ ব্যাপারটা যে ততটা সরল নয়, জীবন যে শুধু তত্ত্বকথায় চলে না, বাস্তব যে অনেক কঠিন— এসব উপলব্ধি আসতে অনেক বছর কেটে যাবে। তাই সব লেখা বিভিন্ন কারণে তখন ছাপানো হত না।
সেই সময় সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সব নেতারাই মস্কো আসতেন। একবার মঞ্জু ভাই বেড়াতে এসে বলেছিলেন যে, পার্টির সাহিত্য বিক্রয় কেন্দ্রে (এই মুহূর্তে নাম মনে করতে পারছি না, পার্টি অফিস থেকে খুব দূরে ছিল না) সোভিয়েত পত্রিকায় সমাজতন্ত্রের সমালোচনা দেখে প্রথমে তিনি সেটা লুকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন যে, সোভিয়েত লেখকরা নিজেরা যেখানে নিজেদের সমালোচনা করছে সেখানে দেশে এসব লুকানো অর্থহীন।
তবে এই বোধ একদিনে আসে না, সবার আসে না। ২০১১ সালে দেশে গিয়ে অজয়দার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। আশির দশকে তিনি একতার দায়িত্বে ছিলেন মতিউর রহমানের সাথে। কথায় কথায় জানালেন যে আমার কিছু অপ্রকাশিত লেখা অনেক দিন একতার অফিসে পড়েছিল। এখন আর একতা তেমন দেখা বা পড়া হয় না। তবে যারা পার্টি করেন, সাধারণ পার্টি কর্মীদের প্রতি আগের মতই ভালোবাসা রয়ে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে দেখেছি, এখন রাশিয়ায় দেখি, যারা পার্টির সাধারণ কর্মী ছিল, যারা মানুষের সেবা করার মনোভাব থেকে পার্টি করত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনে তাদের কোনো দায় ছিল না, দায় ছিল মূলত নেতাদের, যারা ক্ষমতা ও সম্পদের কাছে হার মেনে প্রায়ই আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়েছে বিভিন্ন অজুহাতে।
লেখক : গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ এবং শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো