৯/১১ ধ্বংসস্তূপের বিষাক্ত বর্জ্য
পরিষ্কার করেছিলেন অভিবাসীরা
Posted: 27 সেপ্টেম্বর, 2026
১. ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ফাইন্যানসিয়াল ডিস্ট্রিক্ট বলে পরিচিত এলাকার টুইন টাওয়ার “সন্ত্রাসীদের” আক্রমণে ভেঙে পড়ে। প্রায় ২৯৭৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি আলোচনা গবেষণা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এই সন্ত্রাসী আক্রমণ ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে” যুদ্ধ (ওয়ার ওন টেরর), পররাজ্য আক্রমণ দখল, মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল-কংগ্রেসনাল-মিডিয়া কমপ্লেক্সের বিস্তার, ইসলামো ফোবিয়া, সংখ্যালঘু টার্গেট করে ব্যাপক প্রচারণা চলে। এই ওয়ার ওন টেরর বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে। শুরু হয় চিরস্থায়ী যুদ্ধ “ফর এভার ওয়ার”। সেই যুদ্ধ এখনো চলছে। কিন্তু ৯/১১ নিয়ে আলোচনায় প্রায়শই একটা বিষয় অনালোচিতই থেকে যায়। তাহলো টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়ার পর সেই বিষাক্ত দূষিত বর্জ্য কারা পরিষ্কার করেছিলেন? আজ কোথায় কেমন আছেন তারা? সেই সব শ্রমজীবী মানুষেরা, পোল্যান্ড এবং ইস্ট ইউরোপের সস্তা শ্রমিক থেকে ল্যাটিন আমেরিকার মেক্সিকো, কলোম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, গুয়েতামালার “বৈধ এবং অবৈধ” শ্রমিকরা, যারা দিনের পর দিন দূষিত বিষাক্ত পরিবেশে পরিষ্কার করেছেন টুইন টাওয়ার এলাকা। যাদের অধিংকাশই ক্যান্সার বা শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বা ধুকে ধুকে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছেন। সেই সময় তাদের “বৈধতা” নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি কেউ। শুনতে আশ্চর্যজনক বা বেদনাদায়ক মনে হলেও এদের অনেকেই এখন “বৈধতার প্রশ্নে” বা ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ হলো মার্কিন দেশে বৈধ বা অবৈধ অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষদের ওপর এক নির্মম শ্রেণি শোষণ।
টুইন টাওয়ার বা গ্রাউন্ড জিরো পরিচ্ছনতায় কতজন শ্রমিক নিয়োজিত ছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওযা যায় না। ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর (এনপিআর) মতো হাতে গোনা অল্প কয়েকটি পাবলিক, বিকল্প, জনগণের অনুদানে পরিচালিত গণমাধ্যম কিছু কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে।
২. এনপিআরের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ২০০০ থেকে ৬০০০ অভিবাসী শ্রমিক টুইন টাওয়ার পরিষ্কারে যুক্ত হয়েছিলেন। নিউইয়র্কের কুইন্সে ৯/১১ পরিষ্কারকর্মীদের জন্য একটি সহায়তা গোষ্ঠী পরিচালিত হয়েছিলো। তাদের একজন বলেন, “সবকিছু দ্রুত পরিষ্কার করার জন্য তখন ভীষণ তাড়াহুড়ো চলছিল। নিউইয়র্ক স্টেট পরিষ্কার কাজের জন্য একাধিক ঠিকাদার নিয়োগ করেছিল। সেই ঠিকাদারেরা আবার উপঠিকাদার নিয়োগ করে।] এভাবে শুরু থেকেই আসল পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকের মজুরি কমে আসে। এই সাব-কন্ট্রাক্টররা কাজের জন্য মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাটিন আমেরিকানদের মাইক্রোবাসে তুেল নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “মনে রাখতে হবে, এসব কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার পেয়েছিল। অনেক গৃহকর্মীকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে তারা বুঝতে পারেন, তারা আসলে গ্রাউন্ড জিরোতে এসেছেন। আর অনেক সময় তাদের বলাই হয়নি যে তারা কোথায় যাচ্ছেন।”
৩. নথিবিহীন গ্রাউন্ড জিরোর শ্রমিকদের নাগরিকত্বের পথ করে দেওয়ার জন্য প্রায় এক দশক ধরে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে। ৯/১১ ইমিগ্র্যান্ট ওয়ার্কার ফ্রিডম অ্যাক্ট প্রথম উত্থাপন করা হয় ২০১৭ সালে, পরে ২০২১ সালে আবারও আনা হয়। ২০২৫ সালে ডেমোক্র্যাট সোসালিস্ট (ডিএসএ) প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ আইনটি পুনরায় উত্থাপন করেন। কোনো রিপাবলিকান এই বিলে সমর্থন জানাননি। প্রতিবারই বিলটি হাউস জুডিসিয়ারি কমিটিতে আটকে থেকেছে।
৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে ওকাসিও-কর্টেজ এনপিআরকে বলেন, “এই আইনটি সত্যিই দ্বিদলীয় ও বিতর্কমুক্ত হওয়া উচিত। এসব মানুষ—যাদের অনেকেই নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন—নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য।”
তবে অভিবাসন সংস্কার নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন থাকায় বিলটি এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
এনপিআর হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু কোনো জবাব পায়নি।
৪. গুয়াতেমালার এক নারী উনার ভয়াবহ বেদনাদায়ক এবং মানসিক কষ্টের কথা বলেন। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ, কিন্তু পরিচয় গোপন রাখেন, কারণ এখন উনার এলাকায় অভিবাসন বিরোধী অভিযান চলছে। ঘটনাস্থলে উনাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, “সেখানে বেশিরভাগই ছিলেন ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পেরু ও মেক্সিকো থেকে আসা মানুষ। আমার মতো একই কাজ করছিলেন এমন অসংখ্য মানুষকে দেখেছি, কিন্তু তাদের মুখে ছিল ছোট কাগজের মাস্ক।” এত বিষাক্ত পরিবেশে যা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং নিম্নমান সম্পন্ন ব্যবস্থাপনা।
রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শের এই নারী শ্রমিকের অ্যাসিড রিফ্লাক্স হয়েছিল। এজন্য তিনি শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এই দলের খুব অল্প কয়েকজনের একজন হিসেবে তিনি গুরুতর কোনো রোগে আক্রান্ত হননি। তবে মানসিকভাবে গভীর ক্ষতির শিকার হন। কাজ শুরুর পরপরই তিনি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন।
“একটি ছিন্ন হাত। আমি সেটা কোনো দিন ভুলতে পারবো না। কোনো দিনই এই ঘটনা কাটিয়ে উঠতে পারবো না। আমি সেটি স্পর্শ করেছিলাম। আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল—কোনো দেহাংশ পাওয়া গেলে একটি ছোট হলুদ পতাকা তুলতে হবে। আমি তা-ই করেছিলাম। পুলিশ এসেছিল। আমরা দেহাংশটি একটি বাক্সে রাখি, ঢেকে দিই এবং ট্রিনিটি চার্চে নিয়ে যাই।
৫. কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক দিন পর তার সুপারভাইজারেরা তাকে একটি ঘুমানোর মাস্ক দিয়ে চোখ বেঁধে অন্য একটি এলাকায় নিয়ে যান। তিনি বলেন, “সেখানে গিয়ে দেখি, তারা মাটির ভেতর ছেঁকে ছেঁকে খুঁজছেন। দেহাংশের সন্ধান করছিলেন। আমাকে পাওয়া জিনিসপত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—গয়না, মানিব্যাগ, পরিচয়পত্র, অফিসে লাগানো ছোট নামফলক। আমি সেগুলো আলাদা আলাদা ব্যাগে রাখতাম।”
তিনি মনে করেন, ব্যাপক লুটপাট ও চুরি যেন এই শ্রমিকরা দেখে না ফেলে সেই কারণেই তাঁদের চোখ বেঁধে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওই কাজে মোট পাঁচজন ছিলেন—তিনি ছাড়াও ছিলেন মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে ও পোল্যান্ডের অভিবাসী শ্রমিকেরা।
তারা নীরবে কাজ করতেন এবং তাদের ওপর কঠোর নজরদারি ছিল। পরে তাকে ভূগর্ভস্থ একটি ভল্ট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেন।
উনার ধারণা, সেটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নিচে থাকা বিশাল ভল্টগুলোর একটি ছিল, যেখান থেকে কয়েক লাখ টন মূল্যবান ধাতু উদ্ধার করা হয়েছিল।
সেই সময় তিনি রেড ক্রসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করেন। আহত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও তিনি সাহায্য করেছেন।
তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, “তারা আমাকে কর্তব্য, দায়িত্বশীলতা ও সততার একটি সম্মাননাপত্র দিয়েছিল। এতে আমি গর্বিত। দেশের বাড়িতে কয়েকজনকে বলেছি, কিন্তু প্রায় কখনোই এ নিয়ে কথা বলি না। কারণ, এটাকে আমি ব্যক্তিগত স্মৃতি মনে করি। এটি আমার নিজের।”
৫. বৈধ অবৈধ সকল অভিবাসীর জন্য ৯/১১ এক বেদনাদয়ক ভীতিকর অভিজ্ঞতা। বর্তমানে সকলের জন্যই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ চলমান অভিবাসন বিরোধী অভিযান। নথিবিহীন শ্রমিকদের শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ৯/১১-এর কাজে যুক্ত অনেকেই শ্রমিক ক্ষতিপূরণ এবং সহায়তা পেয়েছেন। তবে এখনো এমন অনেকেই আছেন, যারা ভয়ে এসব সুবিধার জন্য আবেদন করেন না। যারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, তাদের অনেকেই মনে করেন এই অর্থ বেশিদিন থাকে না। কারণ, তাঁরা নথিবিহীন এবং তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে তারা আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তারা যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, সেটাও একসময় শেষ হয়ে যায়।
৬. দেশজুড়ে অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগ—আইসের (ওঈঊ-ইমিগ্রেশন ও কাস্টম সার্ভিস) অভিযান বেড়ে যাওয়ায়—এই দলের অধিকাংশ সদস্যের ভয় ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস আরও তীব্র হয়েছে।
তাদের একজন বলেন, “আমি ভয় পাচ্ছি। আমরা সবাই ভয় পাচ্ছি।” গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একজন নারী দুপুরের খাবার খেতেন। তিনি বলেন, “আমার মেয়ে নিউ জার্সিতে থাকে। কিন্তু আমি তাকে দেখতে যাই না, কারণ আমার অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে ভয় লাগে। এটি পুরোনো যন্ত্রণার ওপর নতুন একটি যন্ত্রণা।”
নিজ দেশে ফিরে যাওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেখানে তার স্বাস্থ্যগত সমস্যার জন্য একই মানের চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে উনারা উদ্বিগ্ন। এই অনিশ্চয়তার অবস্থাই অনেকের বাস্তবতা। নিজ নিজ শহর ও গ্রামে ফিরে গেলে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া না-ও যেতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে সব সময় গ্রেপ্তার বা আটক হওয়ার ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়—যদিও এখানে তারা চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পান।
৯/১১ হামলার বার্ষিকী যত এগিয়ে আসে, এঁদের তিক্ততা তত বাড়ে। পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকদের একজন বলেন, “আমরা সবকিছু দিয়ে দিয়েছিলাম। গ্রাউন্ড জিরোতে পৌঁছে আমরা ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। কী ভয়ই না পেয়েছিলাম! কিন্তু তখন কেউ কখনোই আমাদের অভিবাসন-সংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করতে চায়নি। না, তখন তারা আমাদের এমনভাবে আচরণ করেছিল যেন আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।” একজন অভিবাসী শ্রমিকের জীবন ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, সমাজ পরিবার জীবন বিপন্ন করে যতটা সস্তা শ্রম সে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে যেতে পারে। এই হলো মার্কিন দেশে “বৈধ অবৈধ” অভিবাসী শ্রম শোষণের নির্মম কাহিনী!
লেখক : জর্জিয়া প্রবাসী ও সাবেক ছাত্রনেতা