মনজুরুল আহসান খান : আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি এবং
শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির দিশারি জাতীয় নেতা
Posted: 27 সেপ্টেম্বর, 2026
কমরেড মনজুরুল আহসান খান। এ দেশের কমিউনিস্ট, বামপন্থি, শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দু’দিন পর তার ৮১তম জন্মবার্ষিকী।
কমরেড মনজুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও তার রোগমুক্ত, সচল ও প্রশান্তিময় সুদীর্ঘ জীবন কামনা করে এবং তার প্রতি অন্তহীন ভালবাসা ও ‘রেড স্যালুট’ জানিয়ে আমার বর্তমান ক্যানসার আক্রান্ত শরীর নিয়েই, তার জীবন সম্পর্কে দু-চারটি কথা লিখতে বসেছি। নানাবিধ কারণে আজ তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেন কাজটিকে এতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সূচনাতেই দু’টি কথা বলে নিতে চাই।
এর একটি প্রধান কারণ হলো- নবীন প্রজন্মকে কমরেড মনজুর ও তার মতো মানুষদের জীবন ও জীবনী, এমনকি তাদের নামটুকুও জানতে দেয়া হয়নি। তাছাড়া, প্রবীণরাও যেন তার অবদানের কথা ভুলে যায় তার চেষ্টা করা হয়েছে ও হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে একদিকে ‘ইতিহাস বিকৃতি’-র অপপ্রয়াস দ্বারা একক একজন ‘সুপার লিডারকে’ ইতিহাস নির্মাণের ‘পিতা’ রূপে প্রতিষ্ঠা করা। এবং সেজন্য ‘ব্যক্তি পূজার’ মোহজালের অন্ধকারে জনগণকে আবদ্ধ করে রাখার বুর্জোয়া রাজনীতির ভ্রষ্ট পন্থায় ‘সত্যকে’ নির্বাসিত করে রাখা হয়েছে। ‘সত্যকে’ মুক্ত করার জন্যই দেশবাসীকে কমরেড মনজুর এবং তার মতো নেতাদের চিনতে হবে, তাদের সম্পর্কে জানতে হবে।
এক্ষেত্রে দ্বিতীয় কারণটি হলো এর শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে মানব মুক্তি ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে মোকাবেলার জন্য পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ‘নিরবতা’ ও ‘তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকে’ তাদের পয়েলা নম্বরের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। প্রচার ব্যবস্থার উপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা আজকাল যে কথাটি বেশ চাউর করে প্রচার করছে তা হলো- কমিউনিস্ট-বামপন্থি-র্যাডিকাল শক্তিগুলো বর্তমানে একটা ‘ডেড ফোর্স’। যেটা এখন একটি ডেড ফোর্স তার সংগ্রামের অনিন্দ গুণাবলী সম্পন্ন নেতৃবৃন্দের নাম-পরিচয় আড়াল করার এবং পাশাপাশি তারা নেতৃত্বের চরিত্র হননের নোংরা পন্থারও আশ্রয় নিচ্ছে। তারা সংগ্রামের শক্তির ভেতরে অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে বিভেদ, বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে, সংগ্রামের ধারা বিপথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে তারা একদিকে আপোষকামিতা, সুবিধাবাদ, বিপ্লব বিমুখতা ইত্যাদি এবং অন্যদিকে বেহিসাবী উগ্র বিপ্লবীপনার বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এসব হলো কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সুপরিকল্পিত চক্রান্তের ব্লু-প্রিন্টের অংশ। সে কারণে কমরেড মনজুরুল আহসান খানের অনন্য ভূমিকা-অবদান-গুণাবলীর কথা নবীনদের কাছে তুলে ধরা, প্রবীণদেরকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, তা নিয়ে আলোচনা করা এবং কমরেড মনজুরের সংগ্রামী জীবন ও বিশাল ও বহুমাত্রিক কর্মময় জীবন থেকে প্রয়োজনীয় তালিম গ্রহণ করা একটি জরুরী কর্তব্য। সে প্রয়োজনের কথা মনে রেখে কমরেড মনজুর সম্পর্কে শুধু সামান্য দু’চারটি কথা লিপিবদ্ধ করবো।
মনজুরুল আহসান খান আমার খালাতো ভাই। কিন্তু এই আত্মীয়তার পরিচয়ের চেয়ে অনেক অনেক বড় পরিচয় হলো- তিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আমার ‘কমরেড’। যে কমরেডশিপ ক্রমাগত দৃঢ়তর হয়েছে।
আমরা দুজনই তরুণ বয়সে মার্কসবাদী মতবাদকে গ্রহণ করে সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের তথা ‘মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার’ বিপ্লবী সংগ্রামের সক্রিয় কর্মী উঠেছিলাম। এই উত্তরণ হঠাৎ করে বা একদিনে হয়নি।
আমাদের শৈশবকাল থেকেই, বাস্তব জীবনের ঘটনাবলির মধ্য দিয়েই আমাদের মাঝে কমিউনিস্ট আদর্শ ও মতবাদ গ্রহণের পথ রচিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট হয়ে ওঠাটা কোনো ‘নেতার’ মুখ দেখে হয়নি, হয়েছে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জীবন চর্চা এবং যুক্তিসংগত বিচার বিবেচনাকে ভিত্তি করে। কমরেড মনজুরের মাঝে কমিউনিস্ট সভ্যতা গড়ার সংগ্রামে নিজের জীবনকে পরিপূর্ণভাবে নিবেদন করার ক্ষেত্রে কোনো ভেজাল ছিল না।
কমরেড মনজুরের সংগঠিত রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকের শুরুর দিকে- কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মী হিসাবে। তিনি তখন রংপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করে ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। গোপনে পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সেসময় তার সংযোগ হয়। তখন সাধারণ প্রক্রিয়া এরকম ছিল যে কোনো ছাত্র পার্টির সংযোগে আসলে সে ছাত্রদের প্রগতিশীল গণসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের কাজে যুক্ত হবে। তবে কমরেড মনজুর এই গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে শ্রমিক ফ্রন্টে কাজ করতে আগ্রহী হন। কমরেড নাসিম আলীর সাথে যুক্ত হয়ে এবং আরও পরে কমরেড অনীল মুখার্জির সাথে সংযুক্ত থেকে তিনি শ্রমিকদের মাঝে পূর্ণ মাত্রায় কাজ শুরু করে দেন। এদিকে আইউবী শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে নটরডেম কলেজে আন্দোলন শুরু হলে সাধারণ ছাত্ররাই নেতার দায়িত্ব পালনের জন্য কমরেড মনজুরকে মঞ্চে টেনে আনেন। সেই আন্দোলনে তিনি সুদক্ষভাবে নেতৃত্ব দেন। তবে, এই দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ছাত্র ফ্রন্টে না ঢুকে আবার শ্রমিকদের মাঝে কাজ শুরু করে দেন।
ছোটবেলা থেকেই কমরেড মনজুর একজন ‘স্বাভাবিক নেতা’, তা বেশ দৃশ্যমানভাবে সবাই টের পেতো। তার ‘নেতৃত্ব’ চরিত্র তার কথোপকথনে, ভাব-ভঙ্গিতে, চলনে-বলনে, কণ্ঠস্বরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান হতো। বক্তৃতার ক্ষেত্রে অথবা রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক দলিল রচনা শব্দ চয়নে ও সবচেয়ে সঠিক শব্দ ব্যবহারে তার অসাধারণ দক্ষতা-পারদর্শীতা সবাইকে মোহিত করতো। উল্লেখ্য যে, কিশোর বয়স থেকেই কমরেড মনজুর গান গাইতেন। কোরাসে হোক বা একক কণ্ঠে হোক কিম্বা প্যারোডিতে হোক তার কণ্ঠ ছেড়ে গাওয়া গান আসর মাত করে দিতো।
জনগণের মনস্তত্ত্ব বুঝে কথা বলতে পারার কারণে, যে বার্তাটি তিনি জনগণকে দিতে চান তা তাদের কাছে নির্ভুল ভাষায় ও ভঙ্গিতে পৌঁছে দিতে পারতেন। এ কারণে মানুষকে তিনি জাগিয়ে তুলতে পারতেন। আগাগোড়াই তিনি সাহস, দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার সাথে মানুষের সামনের কাতারে থেকে এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে নির্ভীক ও দক্ষ সেনাপতির মতো তাদের মাঠে ময়দানের সংগ্রামগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এ রকম সময়ে, কমরেড মনজুরের বয়স যখন ২০-এর কোঠা পেরোয়নি তখন তিনি গবেষণা লব্ধ একটি অসাধারণ শিক্ষনীয় বই ‘রুশ বিপ্লবের ইতিহাস’ রচনা করেন। পার্টির উদ্যোগেই এই বই ছাপা ও প্রকাশ করা হয়েছিল। তত্ত্বগত বিষয়ে ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানা বোঝার ক্ষেত্রে কমরেড মনজুরের পারদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছিল।
ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের শ্রমিকদের সাথে ‘এক মন এক প্রাণ’ হয়ে একেবারে তৃণমূলের কর্মীর মতো তিনি কাজ করতেন। পাকিস্তানের আমলেই ঢাকার বিখ্যাত উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, গোটা পোস্তগোলা এলাকার যতগুলো শিল্প আছে— সেখানকার প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
ঐ সময় ‘প্রগতি পাঠাগার’ নামে কমরেড মনজুর ও আমিসহ তিন-চারজন উদ্যোগী হয়ে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। এখন যেটা ওসমানী উদ্যান, সেখানে বাঁশের তৈরি ব্যারাকের একটি রুম ছিল ‘সবুজ’ নামের আমাদের এক তরুণ রাজনৈতিক বন্ধুর। সেখান থেকে লাইব্রেরির কার্ডে সই করে প্রগতিশীল বইপত্র বই বিলি বণ্টন করা হতো। কমরেড মনজুর এ ধরনের বহুবিধ কাজে উদ্যোগী ছিলেন।
ঊনসত্তরের ১১ দফার গণঅভ্যুত্থানের পরে পরে কমরেড মনজুর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের একজন শীর্ষ দুর্ধর্ষ নেতা রুপে পরিচিতি লাভ করেছিল। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে তার বিপ্লবী ধারায় শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার কাজের গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছিলেন এবং সেই প্রচেষ্টায় তার শক্তি পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছিলেন। এবং কেন্দ্রীয়ভাবে শ্রমিকদের একটি সঠিক বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়নের একটি ন্যাশনাল ফেডারেশন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ‘ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হলে, এই সংগঠনটির প্রাথমিক ভিত্তিগুলো তৈরি করার কাজে হাত দেয়া হয়। কমরেড মনজুর সে কাজে অনন্য অবদান রাখেন। চৌধুরী হারুনুর রশীদ, সাইফুদ্দীন মানিক সহ আরও অনেকেই সেই কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শ্রমিক-কর্মচারীরা মিলে একটি ইউনিয়ন গঠন করেছিল, সেই ইউনিয়ন গঠনে এবং তার কার্যকলাপে কমরেড মনজুরের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল।
রাজনীতিতে কতগুলো জটিল প্রশ্ন তখন সামনে চলে এসেছিল। আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি অনুযায়ী পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে যে ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, সেই ভোটে আমরা অংশগ্রহণ করা বা না করা নিয়ে মতভিন্নতা সৃষ্টি হয়। পার্টি সেই ইলেকশনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেও মনজুরুল আহসান খান তাকে সঠিক বলে মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার আপত্তিটা কিছুটা প্রকাশ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে এই মত পোষণ করতেন যে, দেশ একটি বিপ্লবী পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই অবস্থায় বেসিক ডেমোক্রেসির ভুয়া ইলেকশন বর্জন করে আমাদেরকে সেই সম্ভাব্য বিপ্লবী পথ গ্রহণ করাটাই এখন প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক কমরেড মনজুরের একটি র্যাডিক্যাল এবং নির্ভীক ফাইটারের ইমেজ সৃষ্টি হয়।
সে সময় থেকেই কমরেড মনজুর আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যুক্ত হয়ে কিছুটা পরিমাণ কাজের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। মমিন মটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। তার নেতৃত্বে একটা বিপ্লবী পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন নামে রেজিস্টার্ড ইউনিয়ন সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে যখন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য এজেন্ডাকে যখন সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, তখন এই পরিবহন শ্রমিকরা বিশাল ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীনতার পরে যেহেতু রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যায় লুটেরা ধনিক শ্রেণির হাতে, ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও সেটার প্রতিফলন ঘটে। সুবিধাবাদী ট্রেড ইউনিয়ন লিডারশিপ ‘ট্রেড ইউনিয়ন মাফিয়া’ একটি ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট দাঁড়িয়ে যায়। বুর্জোয়া দলগুলো তা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক তারা এই ট্রেড ইউনিয়ন মাফিয়া লিডারশিপকে হাত করে সবসময়ই তারা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করে চলেছে।
কমরেড মনজুর আগাগোড়াই শ্রমিক আন্দোলনকে এ ধরনের প্রবঞ্চনা থেকে মুক্ত করে একটা বিপ্লবী লাইনে পরিচালনা করার জন্য বিশেষভাবে আগ্রহী ও উদ্যোগী ছিলো।
কমরেড মনজুর অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা একজন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি গেরিলা বাহিনীর অন্যতম একজন কমান্ডার ছিলেন। আমি ছিলাম প্রথম ব্যাচে, কমরেড মনজুর ছিলেন দ্বিতীয় ব্যাচে।
১৯৭১ সালের ১১ই নভেম্বর বেতিয়ারার সম্মুখযুদ্ধে আমাদের ৭ জন যোদ্ধা শহীদ হন। মিত্রবাহিনীর কমান্ডাররা বলেছিলেন, “অসাধারণ! এরকম একটা অ্যামবুসে পরে কয়েক ডজন যোদ্ধার মৃত্যু ঘটছে— সেটিই ধারণা করা যায়। তোমাদেরতো মাত্র সাতজন মৃত্যুবরণ করেছে। কত সাহসী যোদ্ধা তোমরা! তোমাদের রিট্রিট করতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই সাহসী রিট্রিটের জন্য তোমরা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে”।
ঘটনার সময় কমরেড মনজুর বেইস ক্যাম্পে ছিলেন। খবর পৌঁছা মাত্র তিনি রাত পার হওয়ার আগেই অকুস্থলে পৌঁছে যান। যুদ্ধে বিধ্বস্ত গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের মনোবলকে শক্ত করার জন্য দাঁড়িয়ে তিনি উপস্থিত থেকে পাঁচ সারিতে ফল ইন করিয়ে যোদ্ধাদের মাঝে শহীদদের স্মরণে জায়গা খালি রেখে ইন্টারন্যাশনাল গেয়ে শপথ নেওয়া হয় যে, “আজ অথবা কাল আমরা এর প্রতিশোধ নেব।”
১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে পার্টি নেতৃত্বে ৩ জন তরুণ নেতাকে কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে কমরেড মনজুর অন্যতম একজন ছিলেন।
তখন থেকে মনজুরুল আহসান খান জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা শুরু করেন। জাতীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ সঠিকভাবে করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান একজন কমিউনিস্ট হিসেবে—কমরেড মনজুর তার বিচক্ষণতার প্রমাণ করেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নেতৃত্বের একাংশ কথা তুলেছিল যে, যেহেতু এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নাই, তাই ‘সমাজতন্ত্রের আন্দোলনও’ শেষ হয়ে গেছে। এই সময় মনজুরুল আহসান খান নেতৃত্বে ছিলেন না। পার্টি থেকে সাময়িকভাবে তার সদস্যপদ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের এই পরিণতি এবং সেটার পেছনের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের চেয়ে বড় কথা, এইটা যে বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আন্দোলনকে বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেটা উপলব্ধি করে তিনি রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘোষণা দিয়ে ‘সমাজতন্ত্র ফোরাম’ নামে একটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আলোচনা সভা করা হয়েছিল। এবং ‘সমাজতন্ত্র যে হারিয়ে যায় নাই’— এই সত্যটাকে সামনে আনা হয়েছিল। ‘সমাজতন্ত্র ফোরাম’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং তার সপক্ষে প্রচার-প্রচারণার জন্য নানারকম বুকলেট ছাপিয়ে, নানারকম সাময়িকী, পত্রিকার প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের মাধ্যমে কমরেড মনজুর উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন।
ওই সময়ই পার্টির ভেতরে নেতৃত্বের একটা বড় অংশ বিলোপবাদী চিন্তায় চলে আসে। বিলোপবাদীরা বলেন, “পার্টি আমাদের করতে হবে, তবে ওই পার্টির কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকবে না। তার কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভিত্তি থাকবে না এবং তার কোনো বিশেষ একটা শ্রেণির শ্রেণিগত ভিত্তি বলে কোনো কথা থাকবে না। যেটা তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের প্রয়োজন, আমরা সেটার পক্ষে থাকব”।
আমরা বললাম, “এসব বক্তব্য লিখিতভাবে দেন।” মনজুরুল আহসান খান তখন লিডারশিপে নাই, আমি সম্পাদকমণ্ডলীতে আছি। কিন্তু আমার কিছুটা সীমাবদ্ধতা, যেহেতু পার্টি ডিসিপ্লিনের ভেতরে থেকে আমাকে কাজ করতে হয়। তাই সব বিষয়ে আমি উদ্যোগ নিতে পারিনি। কিন্তু মনজুরুল আহসান খান সামনে এগিয়ে আসেন।
এবং তার বাসায় এক ধরণের অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপিত হয়। সেখান থেকে যোগাযোগ, কাজকর্ম সমস্ত কিছু চলতে থাকে। আমরা যুক্তি দিয়ে বলি, ‘সিপিএসইউ’(ঈচঝট)-এর সঙ্গে ‘সিপিবি’ একটা অ্যাগ্রিমেন্ট করেছিল যে, “তোমাদের বিপদে আমরা থাকব, আমাদের বিপদে তোমরা আমাদের পাশে থাকবে।” আমাদের প্রত্যেকটি বিপদের সময় সিপিএসইউ আমাদের পাশে ছিল।
পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিতে পরামর্শ করেই যুক্তিগ্রাহ্যভাবে বিলোপবাদীদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানটা পরিষ্কার করি। তারা বলেন (বিলোপবাদীরা), চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি না থাকে, শ্রেণিভিত্তি যদি না থাকে, মতাদর্শগত ভিত্তি যদি না থাকে, তাহলে—এবং নামটাও পরিবর্তন করে দিতে হবে, কারণ এই কমিউনিস্ট পার্টির নামটা এখন পরাজয়ের সঙ্গে নাকি একাকার হয়ে গেছে। সুতরাং একটা নতুনভাবে জন্ম নিতে হবে নতুন পরিচয়ে। আমরা বললাম, “এইটা আপনাদের প্রস্তাব হলো পার্টিকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব। আমরা জীবন দিয়ে হলেও এটা প্রতিরোধ করব। সমস্ত কমরেডদের মতামত নেব।”
আমরা ওদেরকে বললাম, “আপনারা লিখিতভাবে দলিল দেন, আমরাও পাল্টা দলিল দেব। দুই দলিল নিয়ে আলোচনা হবে।” মনজুরুল আহসান খান আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বে না থাকলেও এই সমস্ত প্রক্রিয়ার সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। আমার নামটা হয়তো বেশি প্রচারিত হয়েছে, কারণ আমি তখন সেক্রেটারিয়েট মেম্বার এবং জনপ্রিয় পার্টি নেতা। সুতরাং সেই অবস্থায় এইটা প্রচলিত আছে যে, কমরেড সেলিমই তো পার্টিটাকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন, তার নেতৃত্বে সবকিছু হয়েছে। কিন্তু এটা আমার কোনো একক কৃতিত্ব না, সবাই মিলে এটা করেছে।
এই ভিত্তিতে বিলোপবাদীদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটা বিশেষ কংগ্রেস ডেকে কমরেডদের মতামত নিতে হবে। বিশেষ কংগ্রেস ডাকা হলো। কিন্তু একই জায়গায় বিশেষ কংগ্রেসের অধিবেশন করতে বিলোপবাদীরা অস্বীকার করল। যুক্তি দেখাল যে মারামারি হবে, সংঘাত হবে। এর আগে তারা বলেন, আসেন আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভাগ হয়ে যাই। সম্পত্তি দুই ভাগ করে নেই। আমরা আপত্তি জানালাম। তারা বলল যে, “আপত্তি করেন, তাহলে পরে আমরা এটা মামলা করে পুরাটাই নিয়ে নেব। কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রতিষ্ঠা করাটাই তখন বড় কাজ। কারণ মামলা-মোকদ্দমায় ঢুকে গিয়ে সমস্ত কমরেডদের মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে না যাওয়ার বদলে আমাদের মূল কাজটার দিকে নজর দেওয়া উচিত। অর্ধেক সম্পত্তি উদ্ধার করতে পেরেছি, বাকি সম্পদ এটা ইতিহাস, সেই সম্পদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এবং যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি যে সমাজতন্ত্র ছাড়া কোনো মুক্তির পথ নাই, অবধারিতভাবেই ইতিহাসের ধারায় সমাজতন্ত্র একদিন না একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই এবং কমিউনিস্ট পার্টি তার একটা প্রধান শক্তি হবে। মনজুরুল আহসান খান বিলোপবাদীদের বিরুদ্ধে এই সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিলেন।
কমরেড মনজুরুল আহসান খান একজন জাতীয় নেতা। শুধু এই কারণে না যে তিনি একজন সবচেয়ে অগ্রসর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ফেডারেশনের নেতা। এই কারণেও বটে যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আলাপ-আলোচনা, ‘মুভ’—এই সবকিছুর ভেতরে তিনি ছিলেন একটা অগ্রণীয় অবস্থান এবং দায়িত্ব পালনকারী। তাঁর চিন্তাশক্তি, সৃজন ক্ষমতা সব সময়ই অসাধারণ একটা মাত্রা এবং বৈশিষ্ট্য নিয়ে পার্টিতে কাজ-সেবা করে গেছেন তিনি।
বিলোপবাদীরা পার্টি থেকে বিদায় নেওয়ার পর আমরা ঘোষণা করি যে, আমরা আর ‘মন্দের ভালো’র পেছনে ঘুরব না। কমিউনিস্ট পার্টি আগে নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি আর কোনোদিন অন্যের মার্কা নিয়ে নির্বাচন করবে না। নিজের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার রাজনীতিতে পৌঁছাবে। এবং সেই সময়ই আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি—এই ধরনের বুর্জোয়া দল, লুটেরা, ধনিকের দল, তার বাইরে বিকল্প শক্তির সরকার প্রতিষ্ঠা করার চিন্তাধারাটা সামনের দিকে আসে। এবং একটা বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার প্রয়াসে আমরা তখন থেকেই নিয়োজিত হই।
সেই সময় ‘বামফ্রন্ট’ গঠন করা হয়। এবং খুবই উৎসাহজনকভাবে বামফ্রন্টের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। এই জোটের ভেতরেও সবাই তো এই লাইন নিয়ে খুব কনভিন্সড ছিল এরকম না। এই সময় আমরা আমাদের শক্তিকে আরও প্রসারিত করার জন্য বামফ্রন্টের বাইরেও ১১ দলীয় জোট— ‘গণফোরাম’ এটার বাইরে ছিল, আরও দুই-একটা দল, ‘গণআজাদী লীগ’—বাম ফ্রন্টের দলগুলো সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিই আমরা ১১ দলীয় জোট গঠন করি।
১১ দলীয় জোটের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ধরনের লুটেরা-বুর্জোয়া দলগুলোর বাইরে একটা বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলা।
সম্ভবত সপ্তম কংগ্রেসে মনজুরুল আহসান খান সিপিবির সভাপতি নির্বাচিত হন। সপ্তম, অষ্টম, নবম— এই তিনটা কংগ্রেস তাকে সভাপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত করে। দশম কংগ্রেসে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন। সেটাও তো অনেক দিন হয়ে গেছে, এরপরে তাঁর শরীরের অবস্থা খারাপ হয়েছে। কিন্তু এখনো সব সময় আগ্রহী হয়ে ছুটে চলে যান কর্মসূচিতে।
একটা দৃষ্টান্ত বলি, ১১ই নভেম্বর বেতিয়ারা শহীদ দিবস— হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে তাঁর শরীরে স্যালাইন লাগানো আছে। গুরুতর অসুস্থ, সে ঘোষণা করল ‘আমাকে বেতিয়ারা যেতে দিতে হবে, না দিলে আমি অনশন করব।’
কিছুতেই কারও কথা শোনে না! তখন আমি বললাম যে, ‘এখন শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বে তুমি যেমন বিশ্বাস করো, এই রকম অবস্থায় ডাক্তারদের একনায়কত্ব তোমাকে মেনে নিতে হবে। সুতরাং দেখি ডাক্তাররা কী বলে।’ তিনি বলছিলেন যে, ‘অ্যাম্বুলেন্সে হলেও আমি যাব।’ আমি বলছি যে, ‘অ্যাম্বুলেন্সে যাবে, কিন্তু ফিরে আসতে হবে লাশবাহী গাড়িতে করে। এটা চিন্তা করে দেখছ?’ এই রকম জেদি মনোভাব নিয়ে তিনি কিন্তু রাজনৈতিক তৎপরতায় নিজেকে নিবেদিত রাখার চেষ্টা করছে।
তবে এখন বার্ধক্যজনিত কারণে, শারীরিক অন্যান্য অসুবিধা সত্ত্বেও হয়তো ভাবনা-চিন্তার জায়গাটা একটু বিক্ষিপ্ততা এসেছে। সেই দুর্বলতাটাও তিনি উপলব্ধি করেন না— এই কথা বলা যাবে না।
কিন্তু তারপরেও হয়তো এই যে রক্তে-মাংসে তিনি যে কমিউনিজমের আদর্শ গ্রহণ করেছেন, সেটা বারবার এইখানে প্রতিফলিত হয়।
এই রকম একজন কমরেড আমাদের পার্টির জন্য একটা বিরাট গৌরব শুধু নয়, আমাদের দেশে—এই ধরণের দেশের রাজনীতি যে প্রগতির ধারায় অগ্রসর হবেই একদিন না একদিন, তার প্রামাণ্য নিদর্শন হিসেবে কমরেড মনজুরুল আহসান খান এখনো জীবিত আছে। প্রমিথিউস বা জীবন সে... অন্য ক্ষেত্রে যতই কিছু হোক না কেন, এই মূল আদর্শের যে ঝাণ্ডা তিনি তুলে ধরেছেন, সেইটাকে নিয়ে তিনি অগ্রসর হবেন।