শ্রমিকের জীবিকার সংকট সৃষ্টি করে সরকার ক্ষমতায় টিকতে পারবে না

Posted: 27 সেপ্টেম্বর, 2026

একতা প্রতিবেদক : সংকট নিরসনে যৌক্তিক উদ্যোগ না নিয়ে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষায় শ্রমিকের জীবিকার সংকট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে কোনো সরকারই ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। গত ২২ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার নামে সরকার প্রকৃতপক্ষে জনতুষ্টিবাদী ও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষার নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করছে, যা এই খাতের প্রকৃত সমস্যা সমাধান না করে উল্টো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সংকট ও জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলবে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার ওপরও। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংকট নিরসনে প্রয়োজন— বর্তমানে নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও তাঁদের বিনিয়োগকৃত ক্ষুদ্র পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত, সুশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক বিবেচনায় সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা। রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা জলি তালুকদার, সহ-সভাপতি সুমন মৃধা ও মো. নুরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম মাইজভান্ডারি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম, দপ্তর সম্পাদক রিপন হোসেন, ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. হাসান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কামাল হোসেন, সংগঠক ফয়সাল হায়দার এবং থানা কমিটির নেতা আব্দুর রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন, বিপুল হোসেন, নূর আলম, আরিফুল ইসলাম প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, সরকারের ভুলনীতি ও দুর্নীতির কারণে দেশ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত। দেশে বিদ্যুৎ এখন নিয়মিত মেলে না, মাঝেমধ্যে আসে। অথচ এর দায় প্রকৃত দোষীদের ওপর না চাপিয়ে দেশের শ্রমজীবী, মেহনতি ও প্রান্তিক মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। বিগত সরকারের দেখানো পথেই বর্তমান সরকারও হাঁটছে, ফলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়ে উল্টো নতুন নতুন বেকারত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। বক্তারা বলেন, কথায় কথায় সড়কে ব্যাটারিচালিত যানবাহন বৃদ্ধির কথা বলা হয়, অথচ এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ যে কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত উপার্জনের সংকট— তা নিরসনে সরকারের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখি না। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বন্ধ করে তা ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করাই যেন সরকারের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বক্তারা কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান, সকল সরকারি কল-কারখানা আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সংকট নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একইসঙ্গে নেতৃবৃন্দ বলেন, কোথাও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে তা চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিভাগের, আর এই কাজের জন্যই জনগণের করের টাকায় লাইনম্যান-মিটারম্যানসহ বিভাগের জনবলকে বেতন দেওয়া হয়। মনে রাখতে হবে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনে ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য চালক প্রতিদিন তাঁর গ্যারেজ মালিককে অর্থ পরিশোধ করেন। কিন্তু সেই অর্থ সরকারের কাছে না পৌঁছানোর জন্য দায়ী অবৈধ সংযোগগুলোর পেছনে রয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ সড়কের পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপদ জীবিকা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে দেশের সড়ক-উপযোগী নকশায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের আধুনিকায়ন, বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রদান এবং সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। তারা বলেন, সরকার স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষকে লাইসেন্স প্রদানের এখতিয়ার দেওয়ার যে পাঁয়তারা করছে, তার পেছনে মূল উদ্দেশ্য লুটপাট ও ধনিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষা— সংকট নিরসন নয়। একইসঙ্গে সরকার ফিটনেস সার্টিফিকেট ও সোলার প্যানেল স্থাপনের যে প্রস্তাব দিচ্ছে, তা প্রকারান্তরে সবাইকে বৃহৎ পুঁজির মালিকদের কারখানায় তৈরি ব্যাটারিচালিত বাহন কিনতে বাধ্য করারই কৌশল। এসব প্রস্তাব সংকট নিরসন করবে না, বরং সংকট আরও বাড়াবে। প্রকৃত সংকট নিরসনে বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রদানসহ রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ১২ দফা বাস্তবায়ন করতে হবে। ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ১২ দফা : (১) দেশের সড়ক-উপযোগী নকশায় আধুনিকায়নসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দিতে হবে; (২) চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে; (৩) ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলে সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে; (৪) শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নামে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বন্ধ কর; (৫) শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে; (৬) সড়কের লেন পদ্ধতি সচল করে সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে; (৭) ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংক্রান্ত সব রিট দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে; (৮) জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে; (৯) ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং বর্তমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে; (১০) অসাধু বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে; (১১) শ্রমিকদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে; (১২) দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে মানুষকে প্যাডেলচালিত বাহনের অমানবিক শ্রম থেকে মুক্ত করতে হবে। সমাবেশ শেষে শ্রমিকরা লাল পতাকার মিছিল নিয়ে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।