ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও বিপুল প্রাণহানির দায় সরকারের

Posted: 27 সেপ্টেম্বর, 2026

একতা প্রতিবেদক : ডেঙ্গু ও হামে বিপুল সংখ্যক শিশুসহ মানুষের মৃত্যু নিবারণে সরকারের নির্লিপ্ততা এবং সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানিয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতারা। তারা বলছেন, দায়িত্ব গ্রহণের ৭ মাস পরেও হাম-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থতার দায় বর্তমান সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে এ কথা বলেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলে বাধা দিয়েছে দাঙ্গা পুলিশ। পরে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। স্মারকলিপিতে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ৬ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এর আগে প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ও হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে মানুষের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এর ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু ও সাধারণ মানুষকে অকাল মৃত্যু এবং দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। সমাবেশে বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জয়দীপ ভট্টাচার্যের পরিচালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ’র সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, সিপিবির কন্ট্রোল কমিশন সদস্য অধ্যাপক ডা. আবু সাঈদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মাহবুব)’র কেন্দ্রীয় নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী লিটন, জাতীয় গণফ্রন্টের সমন্বয়ক রজত হুদা, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ প্রমুখ। তারা বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতিবছরই নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টি করছে। সরকার মশক নিধন কার্যক্রমে দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল থেকে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এই নজিরবিহীন শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করতে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। পরে প্রধানমন্ত্রী বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়- “আমরা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি যে, হাম এবং ডেঙ্গু উভয় রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ উভয় রোগই পুরাতন এবং এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা অজানা নয়। হামের টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তালবাহানা ও গুরুত্ব না দেয়া হামের মহামারি শুরুর জন্য দায়ী। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য উপদেষ্টাসহ এই ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তদুপরি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ৭ মাস পরেও হাম-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থতার দায় বর্তমান সরকার কোনভাবেই এড়াতে পাওে না। মুখে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বর্তমান সরকার একে জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি পরিস্থিতি ও মহামারি বলে স্বীকার করছে না। টিকার লক্ষ্যমাত্রা ভুল নির্ধারণ করে শতভাগের বেশি টিকা দেয়া হয়েছে বলে সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। অনেক দেরিতে এ ভুল স্বীকার করলেও তা শোধরাতে এখনো অবশিষ্ট শিশুদের টিকা দেয়া শুরু হয়নি। ১৫ বছর পর্যন্ত বয়সের সবাইকে টিকা দেয়ার সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি।” স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়- “চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে অতিকেন্দ্রীকরণের কারণে হামের গুরুতর রোগীদের একটা বিরাট অংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক চিকিৎসা না পেয়ে সরাসরি ঢাকামুখী হচ্ছে। ফলে জরুরি ও নিবিড় চিকিৎসা সেবা সীমিত থাকার কারণে সবাইকে বাঁচানো যাচ্ছে না। মৃতদের মধ্যে অপুষ্টির শিকার শিশুরাই বেশি। অথচ অপুষ্ট শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ে ও মাধ্যমিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার আওতায় আনলেই এদের অধিকাংশ সুস্থ হয়ে উঠতে পারতো। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। “বিশেষজ্ঞ ও সরকারের মন্ত্রীদের তরফ থেকে পূর্বাভাস থাকা স্বত্ত্বেও ডেঙ্গু অপ্রতিহত গতিতে আবার হাজার হাজার মানুষকে আক্রান্ত করছে এবং ইতিমধ্যে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মানুষের বাড়ির কাছে বিশেষ করে বস্তি এলাকা, নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাসের ঘনবসতি এলাকায় বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ভ্রাম্যমাণ ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলে অনেক মানুষ আগেভাগেই ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত হয়ে তারা সতর্কতা অবলম্বন করতে পারতো এবং জটিল অবস্থায় যেত না, মুত্যুর সংখ্যাও কমে যেত। এ ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর (শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, অতিরিক্ত ওজনের স্থুল ব্যক্তি, ডায়াবেটিস-উচ্চ রক্তচাপ-ক্যান্সার-কিডনী ডায়ালাইসিসের রোগী প্রভৃতি) কেউ ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাকে মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতালে ভর্তি করে পর্যবেক্ষণে রাখলে এদের অধিকাংশ প্রাণে বেঁচে যেতেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সহায়তা দিলে তাদের মধ্যে হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা যথাযথ ও সময়মত চিকিৎসা পেয়ে বেঁচে যেতে পারতেন। সর্বোপরি ডেঙ্গুকে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ।” স্মারকলিপিতে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘটা করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হলেও তার বিশেষ কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। গতানুগতিক প্রচারসর্বস্ব অভিযান না চালিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েক বছর ধরে এ অভিযান সারাদেশে পরিচালনা করলে অবশ্যই সফলতা আসবে বলে আমরা মনে করি। হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্মারকলিপিতে ৬টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সেগুলো হচ্ছে- (১) হামের মহামারি মোকাবিলা ও ডেঙ্গুর মহামারি ঠেকাতে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় স্বাস্থ্য দুর্যোগ মোকাবিলা কমিটি গঠন করে সরকার ও জনগণকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। (২) ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত সকল মানুষকে জরুরিভাবে পরিকল্পনামাফিক হামের টিকা দিতে হবে। (৩) কমিউনিটি পর্যায়ে বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে। (৪) মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে। (৫) দেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে জরুরি ও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধ হয়রানিমুক্তভাবে বিনামূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সারাদেশে সকল ব্যবস্থা সমানভাবে থাকতে হবে। (৬) এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সম্পৃক্ত করে বছরব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে।