’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026

১৯৬২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলনের দিন। দিবসটি সরকারিভাবে পালিত না হলেও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ঐদিন ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্থান সামরিক শাসকের পুলিশ বাহিনীর বুলেটে জীবন দিতে হয়েছিল মোস্তফা ওয়াজিল্লাহ, বাবুল প্রমুখ ছাত্র নেতাদের। সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের শাসনামলে শরীফ কমিশনের নেতৃত্বে একটি শিক্ষানীতি প্রদান করা হয়েছিল। শিক্ষানীতির বেশ কিছু বক্তব্য তৎকালীন পাকিস্থানের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বেমানানই ছিল না, অপ্রাসঙ্গিকও ছিল। এগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষা সংকোচন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বছর শেষে পরীক্ষা ব্যবস্থা, ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি পাস কোর্স চালু এবং ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা অন্যতম। এগুলি বাতিলের দাবিতে ৬২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। সেই ধর্মঘট পালনকালেই পুলিশি এই হত্যাকাণ্ড। পরে আয়ুব খান শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। শিক্ষা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে পৃথিবীর দেশে দেশে গৃহিত হলেও বাংলাদেশে এখনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৬ ধারায় নাগরিকের জন্য শিক্ষালাভের অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণভাবে সহজলভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণের পর জাতিসংঘ সব সদস্য রাষ্ট্রকে সেটি বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পাকিস্থানে সেটা কার্যকর হয়নি। বরং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্থান প্রথমেই পূর্ব পাকিস্থানের বাঙালিদের বাংলা ভাষা ধ্বংসের চক্রান্ত করে ১৯৪৮ সালেই পাকিস্থানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে উর্দুর কথা ঘোষণা করে। ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশি হামলায় ৭ জন বামপন্থি রাজনীতিককে হত্যা ও ৩২ জনকে আহত করে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে হত্যা করা হয় সালাম, বরকত, রফিক, সফিক ও জব্বারকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ৯২-এর ‘ক’ ধারা জারির মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্থানে ১৯৫৬ সালের আগে কোনো সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হয়নি, বরং পূর্ব পাকিস্থানের জনগণের স্বার্থবিরোধী নানা কালাকানুন জারি করতে থাকে পাকিস্থানের শাসকেরা। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিচর্চার পরিবর্তে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এসমস্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্থানের সচেতন জনগণ এবং রাজনৈতিক মহলে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়ে স্বাধীন ভারত ও পাকিস্থানের জন্ম হলেও পাকিস্থান ব্রিটিশদের মতই পুঁজিবাদী তথা ধনিক বণিক নির্ভর লুটেরা অর্থনীতির পথ অনুসরণ করে। ১৯৫৬ সালের গৃহিত সংবিধানে সম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। প্রগতিশীলতা অবরুদ্ধ হয়। সব মিলে বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সামরিক শাসন বলবৎ থাকায় সভা সমাবেশ মিছিল মিটিং বন্ধ হয়ে যায়। ২১শে ফেব্রুয়ারি সীমিত পরিসরে প্রভাতফেরী অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৬২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ছাত্র-ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৭ই সেপ্টেম্বর ছাত্র নেতাদের জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে। শিক্ষা কী? কেন এবং কীভাবে এটা প্রদান করা যায়—সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোগবাদী সমাজে মুনাফাভিত্তিক এবং পুঁজিবাদী সমাজে যেভাবে সবকিছুকে পণ্য ভাবা হচ্ছে এবং টাকা দিলে পণ্যের মতো সবই পাওয়া যায়, এমন প্রবণতা সৃষ্টির চেষ্টা চললেও এখনও অনেক দেশেই শিক্ষা সাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি আছে। সেই বিবেচনায় শিক্ষার দর্শন নির্ধারিত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য হওয়ার কথা নয়। এজন্য ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের বিষয়েও ভাবনার উন্নতি হওয়া দরকার। ব্যক্তির দেহ ও মনের সকল ক্ষমতা বিকশিত, বিবর্তিত মার্জিত করে, তাকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান নৈপুণ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করে তোলার ব্যবস্থাদির নাম যদি শিক্ষা হয়, তাহলে মানবতাবাদী এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হলে শিক্ষার দর্শন, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা এমন হবে, যেখানে সবার জন্য একই ধরনের অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা হওয়া দরকার। পৃথিবীর যেসব দেশ শিক্ষা, সংস্কৃতি আর অর্থনীতিতে এগিয়েছে, তাদের শিক্ষার ইতিহাস এমনটাই। শিক্ষার দর্শন হিসেবে ভাববাদ, যুক্তি, দর্শন সর্বশেষে বিজ্ঞানই অন্যতম মাধ্যম। এই ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যুগের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে কি? ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে লর্ড মেকলেকে দিয়ে সেই শিক্ষানীতি দেওয়া হয়েছিল, যা অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন ও হিসাব নিকাশ করার মত একটি জাতি সৃষ্টি ছাড়া সৃজনশীল ও সত্যের পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী বা অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ানোর মত চেতনাবোধ ঐ শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়নি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আলোকে এবং সংবিধানের ১৭-এর খ-ধারার আলোকে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় বাজেটে জিজিপির প্রাথমিকভাবে ৫% এবং পর্যায়ক্রমে ইউনেস্কোকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৭% করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু একবারে ৩৫১৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেছিলেন, পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের আমলে ২৬০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ হয়েছে। তবে এখনও ৪ হাজারের মতো বেসরকারি রয়ে গেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি, কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিবর্তে শিক্ষাব্যবস্থাকেও সম্প্রাদায়িক করা হয়েছিল, এখনও সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন সরকার বিষয়টি নিয়ে কতটা ভাববেন সেটাই শিক্ষাবিদদের ভাবনা। সংবিধানে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের (তিন ধারার) শিক্ষা বহাল রয়েছে। শিক্ষায় অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়েনি, শিক্ষা প্রশাসনে দলীয়করণের ভুত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে দলীয়করণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪টি বাদে সবগুলোতে দলীয়করণের ভুত চেপে বসেছে। ফলে দলীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলায় তুলনামূলক কম যোগ্যতার লোক শিক্ষা প্রশাসনে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দেলনের বিজয় হওয়ার পর এ অবস্থার ইতিবাবক পরিবর্তন হবে, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। সৃজনশীল আর এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতিতে গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকরা শিক্ষা ব্যবসা শুরু করে শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। শিক্ষা আজ সুপার মার্কেটের পণ্যের মতো, যার টাকা আছে সে-ই সেটা কিনতে পারবে। এটি জীবন দিয়ে স্বাধীন করা একটি দেশের জন্য খুবই দুঃখজনক, তবে এটাই এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে, শিক্ষার দর্শনে মুক্তিযদ্ধের চেতনা ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিধান যেমন উপেক্ষিত হয়েছে, সাথে সাথে ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেই কোন ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি, বরং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলটির ক্ষমতাশীল আমলে শিক্ষা কারিকুলামে সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয় পেয়েছে। আগে-পিছের শিক্ষার একাডেমিক ও কারিকুলামগত স্বীকৃতি না থাকা, এ+ আর গোল্ডেনের সংখ্যা বাড়লেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারছে না। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হলো এইচএসি পরীক্ষার অনেক বিষয়ে পরীক্ষা না দিয়ে অটোপাসের সিদ্ধান্ত, যা জাতিকে আরেক ধাপ পিছিয়ে দেবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে অনেক নিচে অবস্থান করছে। অনুমোদনহীন কওমি মাদ্রাসার শেষ পর্যায়ের শিক্ষাকে মাস্টার্সের মর্যাদা দেওয়া শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি করেছে। কওমি মাদ্রাসায় এখন বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই শিক্ষাকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। বিজ্ঞান যুক্তির আধুনিক সমাজে শিক্ষার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত মানবিকতা, সৃজনশীলতা, যৌক্তিকতা ও উৎপাদনশীলতা। ছাত্র সংগঠনগুলোর মূলধারা ছাত্র আন্দেলনের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলিকে ব্যস্ত, শিক্ষার আন্দোলন করার লোক সমাজে বড়-বেশি নেই। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিজয় হওয়ার মধ্য দিয়ে সংস্কার ও পরিবর্তনের যে কথা শোনা গিয়েছিলো, সেটা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিলে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হবে, শহীদদের প্রতি প্রকৃত অর্থে শ্রদ্ধা জানানো হবে। অন্যথায়, আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এটা সুখকর হবে না এবং বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের টিকে থাকা কঠিন হবে। জাপান ১৮৬০ সালে তার শিক্ষা নিয়ে ভাবনা শুরু করে ১৮৬৩ সালে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জাতীয় বাজেটের ৪৩ ভাগ শিক্ষায় বরাদ্দ করেছিল। এর মাত্র চার দশক পরে জাপান পৃথিবীতে উন্নত দেশের মডেল হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। আর আমরা সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করে ফেলি। সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়ার পরও রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ঐক্যমত হয় না, এটা জাতির জন্য লজ্জাজনক। দেশ ও জাতির উন্নয়নে সবাই মিলে একটা ঐকমত্যে আসার এখনই সময়। এর বাইরে বিকল্প কোনো পথ থাকতে পারে না। লেখক : অধ্যক্ষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি