কর্পোরেট অফিসের শ্রমিক ও
আধুনিক শোষণের বাস্তবতা
Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026
বিভিন্ন সেক্টরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের শ্রম থেকে কীভাবে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হয় এবং সেই উদ্বৃত্ত কীভাবে মালিকানা ও পুঁজির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়—এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শ্রম ও শোষণের সম্পর্ক বোঝার জন্য এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কর্পোরেট অফিস, ব্যাংক, বিমা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ, সেলস, মার্কেটিং কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদের শ্রমিক হিসেবে ভাবেন না। তারা নিজেদের মধ্যবিত্ত পেশাজীবী, কর্মকর্তা কিংবা কর্পোরেট কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। ফলে শ্রমের যে শোষণমূলক সম্পর্ক তাদের প্রতিদিনের কর্মজীবনের মধ্যেই কাজ করে, সেটি অনেক সময় তাদের নিজেদের কাছেই অদৃশ্য থেকে যায়।
মার্কসের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো উদ্বৃত্ত মূল্য (ঝঁৎঢ়ষঁং ঠধষঁব)। সহজভাবে বললে, একজন শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে নতুন মূল্য সৃষ্টি করেন, তার পুরোটা তিনি মজুরি হিসেবে ফিরে পান না। শ্রমিককে যে মজুরি দেওয়া হয়, তা তাঁর শ্রমের মাধ্যমে সৃষ্ট মোট নতুন মূল্যের একটি অংশমাত্র। শ্রমিকের প্রয়োজনীয় শ্রমের বাইরে যে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি হয় এবং যা মালিক বা পুঁজির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, সেটিই উদ্বৃত্ত মূল্য। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় এই উদ্বৃত্ত মূল্যই মুনাফা, সঞ্চয়, পুনঃবিনিয়োগ এবং পুঁজি সম্প্রসারণের অন্যতম ভিত্তি।
ঐতিহাসিকভাবে কারখানা কিংবা বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান ছিল। একজন শ্রমিক কারখানায় নির্দিষ্ট সময় শ্রম দিচ্ছেন, পণ্য উৎপাদন করছেন এবং তার বিনিময়ে মজুরি পাচ্ছেন—এই সম্পর্কটি সরাসরি চোখে দেখা যায়। কিন্তু আজকের অর্থনীতিতে শ্রমের ধরন অনেক বেশি পরিবর্তিত হয়েছে। উৎপাদন কেবল কারখানার মেশিনের সামনে ঘটে না; একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা, সফটওয়্যার প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, নির্মাণ প্রকৌশলী, কর্পোরেট সেলস কর্মী, কিংবা ডিজিটাল মার্কেটিং কর্মীও প্রতিদিন এমন শ্রম দিচ্ছেন, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আয়, বাজারমূল্য ও মুনাফা তৈরি হচ্ছে।
এই জায়গাতেই আধুনিক শ্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে আসে। একজন প্রকৌশলী হয়তো নির্মাণ সাইটে নিজের শ্রম ও জ্ঞান প্রয়োগ করে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। একজন ব্যাংকার প্রতিদিন আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করছেন এবং প্রতিষ্ঠানের আয় তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। একজন সেলস কর্মী নতুন গ্রাহক তৈরি করছেন, বিক্রি বাড়াচ্ছেন এবং কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখছেন। একজন সফটওয়্যার কর্মী এমন একটি পণ্য বা সেবা তৈরি করছেন যার বাজারমূল্য তার ব্যক্তিগত বেতনের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাদের শ্রমের ফলাফল ব্যক্তিগত উৎপাদনের সীমা অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মূল্য ও মুনাফার অংশ হয়ে যায়। কিন্তু সেই মূল্য বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্যটি কোথায়?
একজন কর্মী মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন পান। তাঁর শ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের যে অতিরিক্ত আয় ও মূল্য সৃষ্টি হয়, তার ক্ষুদ্র অংশ তাঁর কাছে বেতন হিসেবে ফিরে আসে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের মালিক, শেয়ারহোল্ডার সেই মূল্য থেকে অনেক বেশি অংশ অধিকার করতে পারেন। অর্থাৎ, কর্মীর শ্রম শুধু তাঁর বেতনের সমান মূল্য তৈরি করে থেমে থাকে না; তাঁর শ্রমের একটি অংশ এমন মূল্য সৃষ্টি করে, যা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন সম্পদ, মুনাফা ও পুঁজির সম্প্রসারণে যুক্ত হয়। আধুনিক বেসরকারি চাকরির শ্রমসম্পর্ককে বুঝতে হলে এই সম্পর্কটি দৃশ্যমান করা জরুরি।
এখানে বেতন কাঠামোর বৈষম্যও দৃশ্যমান। একই প্রতিষ্ঠানে একজন সাধারণ কর্মী যে পরিমাণ শ্রম দিচ্ছেন এবং একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পাচ্ছেন—তার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বিশাল ব্যবধান থাকে। একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য যখন কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য কর্মীর সম্মিলিত শ্রম, সময়, দক্ষতা ও সৃজনশীল অবদান আড়ালে পড়ে যায়।
বাস্তবে কোনো কোম্পানির সাফল্য একজন বা দুজন মানুষের একক কৃতিত্ব নয়। একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ওপর—প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, কর্মকর্তা, শ্রমিক, বিক্রয়কর্মী, ড্রাইভার, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রশাসনিক কর্মী এবং আরও অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদানের ওপর। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে রাষ্ট্রের অবকাঠামো, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, শিক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রযুক্তি, পূর্ববর্তী প্রজন্মের জ্ঞান এবং সামগ্রিক সামাজিক বিনিয়োগ। তাই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে কেবল কোনো ব্যক্তির মেধা বা নেতৃত্বের ফল হিসেবে দেখলে সেই সাফল্যের সামাজিক চরিত্রটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
আধুনিক কর্পোরেট ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—শোষণ সবসময় সরাসরি জবরদস্তির মাধ্যমে ঘটে না। বরং অনেক সময় শোষণকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। ঝকঝকে অফিস, কর্পোরেট পোশাক, উন্নত কর্মপরিবেশ, পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি, পুরস্কার, কর্মী-স্বীকৃতি, পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা সামাজিক মর্যাদার নানান প্রতীক কর্মীর সামনে এমন এক জীবনধারার স্বপ্ন তৈরি করে, যেখানে কর্মক্ষেত্রকে কেবল জীবিকা অর্জনের জায়গা মনে হয় না; এটি হয়ে ওঠে আত্মপরিচয় ও সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্র।
এখানেই তৈরি হয় এক ধরনের ছদ্মস্বাধীনতা। শ্রমিককে হয়তো কারখানার মতো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। কিন্তু তার ওপর থাকে টার্গেট, ডেডলাইন, পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর, রেটিং, বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা, পদোন্নতির প্রতিযোগিতা এবং চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা। তাকে বলা হয়—তুমি স্বাধীন; তুমি চাইলে ভালো করবে, দ্রুত পদোন্নতি পাবে, আরও বেশি আয় করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বাধীনতার ভেতরেই একটি বাধ্যবাধকতা কাজ করে—নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে হবে, আরও বেশি কাজ করতে হবে, নিজেকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতার মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
ফলে শ্রমিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বাইরের কোনো দৃশ্যমান শক্তি দিয়ে নয়, তার নিজের ভেতরের আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কিংবা ভোগের সামর্থ্য বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা তাকে আরও বেশি শ্রম দিতে উদ্বুদ্ধ করে। শ্রমের এই প্রক্রিয়াটি তখন আর কেবল বাধ্যতামূলক কাজ বলে মনে হয় না; বরং ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের পথ হিসেবে হাজির হয়।
কিন্তু এই ব্যবস্থার মানসিক মূল্যও রয়েছে। নিরন্তর টার্গেট, কর্মক্ষমতার চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা মানুষের শ্রমকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ক্লান্ত করে। একজন কর্মী অফিস থেকে বাড়িতে আসলেও কাজের চাপ তার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত যায়। কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত শ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি বা অর্থনৈতিক প্রতিদান সবসময় তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এই শ্রমিকেরা নিজেদের শ্রমিক হিসেবে চিনতে পারেন না। কারণ, শ্রমিক বলতে আমাদের কল্পনায় এখনও কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর কিংবা শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত মানুষই বেশি উপস্থিত। ফলে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা একজন ব্যাংকার, প্রকৌশলী, সফটওয়্যার কর্মী কিংবা কর্পোরেট সেলস কর্মী নিজেকে শ্রমিক ভাবতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু মার্কসবাদী অর্থে প্রশ্নটি কেবল কাজটি শারীরিক না মানসিক—তা নয়। প্রশ্ন হলো, উৎপাদনের উপায় ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কার হাতে এবং নিজের শ্রমশক্তি বিক্রি করে কে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক কর্মীর শ্রমিক চরিত্রকে নতুন করে চিনতে হবে। তাঁদের শ্রমের ধরন কারখানার শ্রমিকের শ্রম থেকে আলাদা হতে পারে, তাঁদের পোশাক আলাদা হতে পারে, অফিস আলাদা হতে পারে, কাজের পরিবেশ আলাদা হতে পারে—কিন্তু শ্রমশক্তি বিক্রি করে জীবিকা অর্জনের মৌলিক সম্পর্কটি অদৃশ্য হয়ে যায় না।
তাই আজকের সময়ে মার্কসবাদী রাজনীতি ও শ্রেণিচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত এই অদৃশ্য শ্রমসম্পর্ককে দৃশ্যমান করা। মানুষকে শুধু বলতে হবে না যে সে শোষিত; বরং তাকে বুঝতে সাহায্য করতে হবে কীভাবে তার শ্রম থেকে মূল্য তৈরি হচ্ছে, সেই মূল্যের বণ্টন কীভাবে হচ্ছে এবং তার নিজের শ্রম ও প্রতিষ্ঠানের মুনাফার মধ্যে সম্পর্কটি কোথায়।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বুর্জোয়া অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরে শোষণের বাস্তব প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি করা তাই জরুরি। একজন ব্যাংকারের শ্রমে শোষণ কীভাবে কাজ করে, একজন প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করে, একজন সেলস কর্মীর ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করে, একজন সফটওয়্যার কর্মী কিংবা কর্পোরেট কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করে—এই প্রশ্নগুলোর বাস্তব উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। শ্রেণি-শোষণকে কেবল অতীতের কারখানার দৃশ্যের মধ্যে আটকে রাখলে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির বড় একটি অংশ আমাদের বিশ্লেষণের বাইরে থেকে যাবে। এই বোঝাপড়া থেকেই ব্যক্তিগত অসন্তোষ ধীরে ধীরে শ্রেণিচেতনায় রূপ নিতে পারে।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা