আমাদের শিশুরা কেমন আছে
Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026
জীবনচক্রে সময়ের হাত ধরে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চলে বিরতিহীন। দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মাধ্যমে মানুষ পদচিহ্ন রেখে যায় পরিবার, সমাজ, দেশ, পৃথিবী ও প্রকৃতিতে। বাবা-মা, শিক্ষক ও গুরুজন আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক। তাঁদের শেখানো আদর্শ, ভালোবাসা, সততা, শিষ্টাচার ও নৈতিক শিক্ষা আমাদের চরিত্র গঠন করে এবং সমাজে একজন ভালো মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখায়। দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে শিখি একে অপরের। সেকেন্ডেই অতীত হয়ে যায় বর্তমান, ভবিষ্যৎ হলো বর্তমানের ঠিক পরের সময় বা আগামী, যা এখনো ঘটেনি। এটি মানবজীবন, বিজ্ঞান এবং দর্শনের একটি অনিবার্য ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। “শিশু” আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আগামী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী এবং বাংলাদেশের শিশুনীতি ২০১১ এবং শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি মানবসন্তানকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বয়স ও শারীরিক বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে বয়সের বিভিন্ন পর্যায় যেমন- জন্ম থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে সাধারণত শৈশব এবং ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে কৈশোরকাল বলা হয়ে থাকে।
আমাদের দেশের শিশুদের নিয়ে আলোচনা ও জরুরিভিত্তিতে শিশু সুরক্ষার ব্যপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা কেন জরুরি সে বিষয়গুলির সূত্রপাত ঘটাতে চাই প্রাপ্ত কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে।
প্রথমত: ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) বাংলাদেশে শিশু অধিকার রক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন জোট ও মানবাধিকার সংগঠনের মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে কমপক্ষে ৮৬ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং ৩৩৬ জন শিশু ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছে। ছয় মাসে ৮৬ জন শিশু নির্মমভাবে খুন হয়েছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি। মোট ৩১২টি পৃথক ঘটনায় ৩৩৬ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মে মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয় এবং ধর্ষণের পর ১৪ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুদের মধ্যে ১৭৫ জনের বয়সই ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৫২.০৮ শতাংশ। অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রায় ৫০.৫৯ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে শিশুদের অতি পরিচিত বা পারিবারিক পরিবেশে। বাকি ৪১.১৮ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, বাজার কিংবা বিভিন্ন জলাশয়ের মতো উন্মুক্ত স্থানে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে কালপ্রিট আক্রান্ত শিশুর প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয় কিংবা শিক্ষক।
দ্বিতীয়ত: এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও আক্রান্তে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তৃতীয়ত: পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে।
এছাড়াও চরম দারিদ্র্যের কারণে প্রায় ৪৭ লাখ শিশু (৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী) কোনো না কোনো শ্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। ১৮ বছরের অনেক আগে কন্যাশিশুর বিয়ে হয়ে যায়। শহরে বাস করা পথ শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এবং বিভিন্ন ঝুঁকিতে থাকে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এতিমখানায় শিশুরা নানান ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও অপ্রকাশিত বহু দুর্ঘটনা তো আছেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশু নির্যাতন বা শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণকে প্রধান চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১. শারীরিক নির্যাতন: শিশুকে প্রহার করা বা আঘাত করার মাধ্যমে শারীরিক ক্ষতি করা।
২. যৌন নির্যাতন: শিশুর সাথে যেকোনো ধরনের যৌন আচরণ বা অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন।
৩. মানসিক নির্যাতন: শিশুকে অপমান করা, ভয় দেখানো বা মানসিক আঘাত দেওয়া।
৪. অবহেলা: শিশুর খাবার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে উদাসীনতা ও অবহেলা করা।
সমাজে শিশু নির্যাতন ও অবহেলার শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত এবং সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রভাব মারাত্মক। আমাদের দেশে যে হারে শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নিপীড়ন হচ্ছে সে কারণে হতে পারে—
১. গুরুতর শারীরিক আঘাত, ক্ষত ও স্থায়ী অক্ষমতা। রোগ প্রতিরোধ ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি। প্রাপ্ত বয়সে হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধিসহ এইচআইভি বা অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের সংক্রমণ।
২. তীব্র মানসিক চাপ ও ট্রমা। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা। ধূমপান, মাদক ও অ্যালকোহলে আসক্ত। নিজের ক্ষতি করা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা।
৩. বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। পড়াশোনায় খারাপ ফলাফল ও স্কুল থেকে ঝরে পড়া। কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে নিতে সমস্যা ও বেকারত্ব। ভবিষ্যতে নিজে সহিংস আচরণ বা অপরাধে জড়িয়ে পড়া।
একটি দেশের বড় সম্পদ মানুষ। অসভ্য এক পাল হাতে-পায়ে দেখতে মানুষ হয়ে লাভ নেই। দরকার প্রকৃত মানবসম্পদ তৈরি।
কী করা প্রয়োজন?
বর্তমান সময়ের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে শিশু সুরক্ষার জন্য নারী ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে শিশু অধিদপ্তর আলাদা করে শিশু সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হতে পারে এমন কিছু মন্ত্রণালয়ের (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ, সংস্কৃতি, তথ্য ও সম্প্রচার, শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রতিরক্ষা, আইন, বিচার ও সংসদ ইত্যাদি) সাথে দপ্তরটিকে ক্রস-কাটিং বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে শিশু সুরক্ষার জন্য জরুরি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করা।
অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (ঈজঈ)-এর মূল ভিত্তি বা নির্দেশিকা হলো চারটি মৌলিক নীতি। এই নীতিগুলো সকল শিশুর সুরক্ষা, বিকাশ এবং অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।
১. বৈষম্যহীনতা : ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর জন্য সমান অধিকার প্রযোজ্য। কোনো শিশুর সঙ্গেই বৈষম্য করা যাবে না।
২. শিশুর সর্বোচ্চ কল্যাণ : আদালত, সরকার বা পারিবারিক যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শিশুর কল্যাণ বা স্বার্থকে সবার আগে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩. বেঁচে থাকা ও বিকাশলাভের অধিকার : প্রতিটি শিশুর জন্মগতভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. শিশুর মতামতের মূল্যায়ন : শিশুর বয়স ও প্রজ্ঞার পরিপক্বতা অনুযায়ী তাদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। তাদের প্রভাবিত করে এমন যেকোনো বিষয়ে তাদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে।
এটি স্পষ্ট যে, নিরাপদ বাংলাদেশ পেতে হলে- পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে প্রতিটি নাগরিককে শিশুর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শোষণ, অবহেলা, বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম রোধে সক্রিয় অবস্থান নিতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা শিশুর সুস্থ বিকাশ ঘটাতে পারি। ঘরে ও বাইরে শিশুর জন্য ভীতিহীন ও স্নেহময় পরিবেশ তৈরি করা, শারীরিক শাস্তি বা কঠোর আচরণ বাদ দিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো, বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমের মতো ক্ষতিকর সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে পরিবার ও সমাজে কথা বলা, আশপাশে কোনো শিশু অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হলে তা প্রতিহত করা। কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটলে স্থানীয় প্রশাসন বা সহায়তাকারী সংস্থাকে জানানো। শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অধিকার রক্ষায় সাধ্যমতো সহযোগিতা করাসহ সহিংসতা, শোষণ, নির্যাতন ও অবহেলা থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা।
শিশুর বিচরণ কেন্দ্রে সুরক্ষা, ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হোক দেশে।
লেখক : সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি