সুকান্ত সাহিত্যে জীবনদর্শন ও আজকের বাংলাদেশ
Posted: 13 সেপ্টেম্বর, 2026
সুকান্ত বাংলা সাহিত্যের অনন্য সাধারণ প্রতিভা। তিনি এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছিলেন, যখন উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক শাসন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কৈশোরেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যচর্চার বিষয় নয়; মানুষের জীবন, ক্ষুধা, বঞ্চনা, শোষণ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও সাহিত্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সুকান্তের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁর কৈশোর ও যৌবন কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ এবং শ্রমিক-কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের উত্তাল সময়ে। সেই সময়ের বাস্তবতা তাঁর কবিতা ও সাহিত্যে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি দেখেছেন—একদিকে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের স্বার্থ, শোষণ ও মানুষের ওপর নেমে আসা নির্মমতা।
আজ প্রায় আট দশক পর আমরা যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখন সময় বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ধরন বদলেছে; কিন্তু মানুষের কিছু মৌলিক সংকট এখনো আমাদের সামনে রয়ে গেছে। বৈষম্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সামাজিক অবিচার এবং পরিবেশগত সংকট—এসব প্রশ্ন আজও আমাদের সমাজকে নাড়া দেয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানুষ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানও ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক করে, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমায়। অন্যথায় কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন মানুষের কাঙ্ক্ষিত সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না।
এই জায়গাতেই সুকান্ত আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের জীবনের পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র কিংবা উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তার ঘরে খাবার থাকে, তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকে, তার সন্তান নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে এবং সে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।
‘বিবৃতি’র ক্ষুধার্ত মানুষ আজও আমাদের চারপাশে। ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ সুকান্তকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন খাদ্যসংকটের সুযোগ নিয়ে মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের দৌরাত্ম্য, আর অন্যদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের অসহায়ত্ব। তাঁর ‘বিবৃতি’ কবিতায় সেই যন্ত্রণা ও প্রতিবাদ একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। আজকের বাংলাদেশে পরিস্থিতি ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষের মতো নয়; কিন্তু খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাজারব্যবস্থার অস্বচ্ছতা, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি এবং বাজারে অস্বাভাবিক দামের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। নিম্নআয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবার পর্যন্ত সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় সুকান্তের সেই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে—উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু মানুষের নাগালের মধ্যে খাদ্য কেন নেই? কৃষক উৎপাদন করছে, কিন্তু কেন সে সবসময় ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না? ভোক্তা বেশি দাম দিচ্ছে, কিন্তু উৎপাদক তার ন্যায্য অংশ পাচ্ছে না কেন? অর্থাৎ সুকান্তের সময়ের ‘ক্ষুধা’ আজ নতুন রূপে আমাদের সামনে উপস্থিত। তাই তাঁর ক্ষুধার বিরুদ্ধে অবস্থান আজও সমান অর্থবহ।
সুকান্ত তাঁর ‘ব্ল্যাক-মার্কেট’ কবিতায় মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও শোষকদের চরিত্র তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সময়ের কালোবাজারি ও মজুতদারদের সঙ্গে আজকের বাজারব্যবস্থার নানা অনিয়মের সরাসরি ঐতিহাসিক সমীকরণ করা ঠিক হবে না। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার যে মানসিকতা, তার সঙ্গে আজকের বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। আজ আমরা বাজার সিন্ডিকেট, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, মধ্যস্বত্বভোগী এবং বাজার কারসাজির অভিযোগ শুনি। কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পেলেও ভোক্তাকে অনেক বেশি দামে সেই পণ্য কিনতে হয়। এই ব্যবধান শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও। সুকান্তের সাহিত্য আমাদের তাই মনে করিয়ে দেয়—অর্থনীতি মানুষের জন্য, মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়।
সুকান্তের ‘রানার’ কবিতায় একজন শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম ফুটে উঠেছে। নিজের জীবন ও শ্রম দিয়ে অন্যের প্রয়োজন পূরণ করেও সে নিজেই বঞ্চিত। তার ঘামে অন্যের জীবন সচল থাকে, কিন্তু তার নিজের জীবনে থাকে অনিশ্চয়তা। আজকের বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের চেহারা বদলেছে। তৈরি পোশাকশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, রিকশাচালক, অটোরিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক, গৃহকর্মী, ডেলিভারি কর্মী কিংবা নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক—অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনের শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেরই কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নেই, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত, আয় অনিশ্চিত এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতিও নতুন ধরনের শ্রমজীবী তৈরি করেছে, কিন্তু শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সুকান্তের ‘রানার’ তাই কেবল অতীতের একজন ডাকবাহক নয়; আজকের বাংলাদেশের প্রতিটি অদৃশ্য শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক হিসেবেও তাকে দেখা যায়।
সুকান্ত তাঁর ‘প্রার্থী’ কবিতায় রাস্তার ধারের অসহায় শিশুর জন্য যে উষ্ণতা ও আলোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন, তা আজকের বাংলাদেশেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আজও আমাদের শহরের ফুটপাতে, রেলস্টেশনে, বাজারে ও বিভিন্ন জনবহুল স্থানে শিশুশ্রম, পথশিশু, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুকে দেখা যায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন সমাজের সবচেয়ে অসহায় শিশুটিও তার অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, পুষ্টি ও মর্যাদা পাবে। সুকান্তের স্বপ্ন ছিল এমন একটি সমাজ, যেখানে শিশুকে দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হতে হবে না। আজকের বাংলাদেশে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদেরই।
‘ছাড়পত্র’-এর সেই নতুন শিশুটি শুধু একটি কবিতার শিশু নয়; সে ভবিষ্যতের প্রতীক। সুকান্তের অঙ্গীকার ছিল পৃথিবীকে সেই শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়া। কিন্তু আজ জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের বাস্তবতায় ‘বাসযোগ্য পৃথিবী’র প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিদিন অনুভব করছে। কৃষি, জীবিকা, পানি, স্বাস্থ্য ও বসতভিটা—সবকিছুই জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সুকান্তের সেই অঙ্গীকার আজ নতুন অর্থ বহন করে। আমাদের কাজ শুধু আজকের সংকট সামলানো নয়; আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়া।
সুকান্ত যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে মানুষ ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। তাই আজকের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রশ্নও শুধু নির্বাচন বা ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়। গণতন্ত্রের অর্থ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার অধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের সমতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশার অন্যতম জায়গা ছিল একটি অধিক জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষেরই নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে।
সুকান্তের সাহিত্য আমাদের শেখায়, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা কোনো নিরপেক্ষতা নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।
সুকান্তের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন একটি সমাজের, যেখানে মানুষ তার পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত হবে না। আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বা সামাজিক বিভাজনকে ব্যবহার করে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলে গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ দুর্বল হয়।
সুকান্তের মানবমুক্তির চেতনা সেখানে আমাদেরকে আহ্বান জানায়—ধর্ম, শ্রেণি, লিঙ্গ, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে।
সুকান্তের সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ছিল সরাসরি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা। আজকের পৃথিবীতে সেই কাঠামো বদলেছে। কিন্তু বৈশ্বিক ক্ষমতার অসমতা, বহুজাতিক অর্থনৈতিক স্বার্থ, বাণিজ্যিক চাপ, ঋণনির্ভরতা, সম্পদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, বন্দর, করিডোর, জ্বালানি, কৃষি ও কৌশলগত অবকাঠামো-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, বিনিয়োগ থাকবে—কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
আজকের বাংলাদেশে সুকান্তের প্রয়োজন তাঁর কবিতাকে শুধু আবৃত্তি করার জন্য নয়; তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে বোঝার জন্য। যখন দ্রব্যমূল্যের চাপে মানুষ বিপর্যস্ত—তখন ‘বিবৃতি’ আমাদের মনে পড়ে। যখন শ্রমজীবী মানুষ অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে লড়াই করে—তখন ‘রানার’ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। যখন কোনো শিশু ফুটপাতে রাত কাটায়—তখন ‘প্রার্থী’র সূর্যের কাছে করা আবেদন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
যখন পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংসের মুখে—তখন ‘ছাড়পত্র’-এর নতুন শিশুর কাছে আমাদের অঙ্গীকারের কথা মনে পড়ে। যখন অন্যায়, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা দেয়—তখন সুকান্তের প্রতিবাদী কণ্ঠ আমাদের নীরবতা ভাঙতে শেখায়। সুকান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি হতাশাকে শেষ কথা হতে দেননি। দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, যুদ্ধ দেখেছেন, মৃত্যু দেখেছেন, শোষণ দেখেছেন; কিন্তু তারপরও মানুষের ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস হারাননি।
এই বিশ্বাসই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আজকের বাংলাদেশকে যদি সত্যিই বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে শুধু রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।
সুকান্তের ভাষায়, আমাদের সামনে নতুন পৃথিবী নির্মাণের দায়িত্ব। সেই পৃথিবী এমন হতে হবে, যেখানে ক্ষুধা মানুষের নিয়তি নয়, শ্রম বঞ্চনার কারণ নয়, শিশু দারিদ্র্যের শিকার নয়, কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পায়, নারী নিরাপদে বাঁচে, ভিন্নমত প্রকাশ অপরাধ নয় এবং রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকে মানুষ।
সুকান্ত আজ ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো ফিরে আসে বারবার। তাঁর ক্ষুধার্ত মানুষ, তাঁর রানার, তাঁর পথশিশু, তাঁর নতুন শিশু এবং তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ আজও আমাদের চারপাশে উপস্থিত। তাই আজ নিজেদের মাঝে সুকান্তের মানবিক সাহস, প্রতিবাদী চেতনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকারকে জাগিয়ে তুলতে হবে। বন্ধু, আজও দোদুল্যমান পৃথিবী—আমাদেরই গড়ে তুলতে হবে নতুন ভিত্তি। সেই নতুন ভিত্তির কেন্দ্রে থাকবে মানুষ, তার মর্যাদা, তার অধিকার এবং তার মুক্তির স্বপ্ন।