বিদ্যুতের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও প্রান্তিক মানুষ

Posted: 13 সেপ্টেম্বর, 2026

লোডশেডিং, বিদ্যুতের দাম বাড়া, আর হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গল্প-এই তিনটা জিনিস মিলে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে যেন এক অন্তহীন চক্রে আটকে ফেলেছে। আর এই চক্রের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা? প্রান্তিক মানুষ। বিশেষ করে যারা ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালান-এমন লক্ষ লক্ষ পরিবার। মজার ব্যাপার হলো, সংকটের আসল কারণ নিয়ে যতটা কথা হওয়া উচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি কথা হচ্ছে গরিব রিকশাচালকদের ‘বিদ্যুৎ চুরি’ নিয়ে। তাহলে প্রশ্ন হলো-আসল সংকটটা তৈরি হলো কীভাবে? আর সেই বোঝা কেন বারবার গিয়ে পড়ছে সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর কাঁধে? আসল কথা হলো, বিদ্যুৎ সংকট কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়-এটা তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের ফলে। গত দেড় দশকে দেশে যে হারে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বহু প্রশ্ন থেকে গেছে। এখন দেশে ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, যাদের মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৩২ হাজার মেগাওয়াট। অথচ সর্বোচ্চ চাহিদা মেরেকেটে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে। তাহলে এই বিশাল বাড়তি সক্ষমতার খরচ কে দিচ্ছে? দিচ্ছে সাধারণ মানুষ-‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের এক ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও শুধু ‘প্রস্তুত’ থাকার কথা বলে টাকা নিয়ে যায়। আর এই ব্যবস্থার অপব্যবহার একেবারে চোখ কপালে তোলার মতো। খুলনার খালিশপুরে একটি ২৩০ মেগাওয়াটের ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র দুই বছর ধরে এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি, অথচ প্রতি মাসে সাড়ে ১৬ কোটি টাকার বেশি নিয়ে যাচ্ছে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ। ঘোড়াশালের একটি কেন্দ্র মাত্র তিন শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করেও মাসে সাড়ে নয় কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে। ভাবুন তো গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জেই গেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই বোঝা মেটাতেই গত দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম ১৩ গুণ বেড়েছে। খোদ অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত সংসদে স্বীকার করেছেন, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাট ও অর্থপাচার হয়েছে, আর তার পেছনে আছে অপরিকল্পিত নীতি আর সীমাহীন দুর্নীতি। সোজা কথায়, আজকের বিদ্যুৎ সংকট কোনো দুর্ভাগ্য না-এটা একটা রাজনৈতিক অর্থনীতির খেলা, যেখানে গুটিকয়েক কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে কোটি মানুষকে দাম বৃদ্ধি আর লোডশেডিংয়ের ঘানি টানতে হচ্ছে। এই কাঠামোগত সংকটের মধ্যেই হঠাৎ একটা নতুন গল্প সামনে আনা হচ্ছে-রাতের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ার জন্য নাকি দায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশা আর ইজিবাইক। বিদ্যুৎ মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, রাত ১২টার পরও চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে, আর তার বড় কারণ নাকি এই বাহনগুলো। এমনকি বিদ্রƒপ করে এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘গরিবের টেসলা’। একটা প্রতিবেদনে তো দাবিও করা হয়েছে, দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় পাঁচ শতাংশ এই বাহনগুলো খেয়ে ফেলছে, রাজস্ব ক্ষতি বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একটু থামুন, এই গল্পে একটা বড় ফাঁক আছে। যে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা অলস বসে থাকা কেন্দ্রকে ঢালা হচ্ছে, তার তুলনায় রিকশার বিদ্যুৎ খরচ তো একেবারে নগণ্য। অথচ বারবার আঙুল তোলা হচ্ছে এই ক্ষুদ্র পরিবহনটার দিকেই-যেটা আসলে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষগুলোর রুটি-রুজির একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার নতুন রিকশা তৈরি হচ্ছে সারা দেশে-এই সংখ্যাটাই বলে দেয়, কৃষি আর প্রথাগত কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে এই খাতটাই এখন শেষ ভরসা। তাহলে রিকশাচালকদের দোষ দেওয়ার আগে প্রশ্ন করা উচিত, এত মানুষকে পরিকল্পিত অবকাঠামোর বাইরে রেখে দেওয়া হলো কেন? অবৈধ সংযোগের সমস্যা (যদিও অধিকাংশ রিকশা বৈধ মিটারের মাধ্যমে চার্জ হয়) থাকলেও তার দায় তো আসলে রাষ্ট্রের পরিকল্পনাহীনতার, একজন গরিব চালকের নয়। এর মধ্যেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এক নতুন নির্দেশনার কথা এসেছে-রিকশা নিবন্ধন পেতে হলে ব্যাটারি নাকি সৌরবিদ্যুতেই চার্জ করতে হবে, না হলে জরিমানা। শুনতে সুন্দর লাগে, পরিবেশবান্ধব মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে দাঁড়ালে বোঝা যায়, এটা প্রান্তিক মানুষের ঘাড়ে একেবারে অবাস্তব একটা বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার মতো। প্রথম কথা হলো, রিকশার ব্যাটারি চার্জ করার মতো সৌর প্যানেল আর স্টোরেজ বসাতে যে টাকা লাগবে, সেটা একজন সাধারণ মানুষের সাধ্যের ধারেকাছেও নেই। আবার সমস্যাটা আরও গভীর-ব্যাটারি সাধারণত চার্জ হয় রাতে, কারণ সারাদিন তো রিকশা যাত্রী নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অথচ সৌরবিদ্যুৎ তৈরি হয় দিনের বেলা, ঠিক যখন রিকশা রাস্তায়! তাহলে হয় দিনের একটা বড় অংশ রিকশা বসিয়ে রাখতে হবে-যা সরাসরি আয়ে আঘাত করবে, নাহয় দামি ব্যাটারি স্টোরেজ কিনতে হবে, যার খরচ প্রায় একটা রিকশার দামের সমান। তার ওপর শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় প্যানেল বসানোর মতো ছাদ বা জায়গাও অনেকের নেই। আর সৌরবিদ্যুতের ওপর ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর বসিয়ে সরকার নিজেই তো বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে-একদিকে বাধ্যতামূলক করছে, অন্যদিকে সহজলভ্য করার কোনো ব্যবস্থাই নেই। আসলে এই সিদ্ধান্তটা অনেকটা দায় এড়ানোর কৌশলের মতো-রাষ্ট্র নিজে বিনিয়োগ না করে সেই দায় চাপিয়ে দিচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর ওপর, যা শেষমেশ হাজার হাজার পরিবারকে জীবিকা থেকেই ছিটকে ফেলতে পারে। আরেকটা উদ্বেগজনক দিক হলো বেসরকারিকরণের হাওয়া। সংকট মোকাবিলার নাম করে সরকার এখন বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, তিনি সব বিতরণ কোম্পানি বেসরকারিকরণ করতে চান, মুম্বাই-দিল্লির মডেল অনুসরণ করতে চান। ডেসকো, ডিপিডিসিসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও হয়ে গেছে। কিন্তু একটু ভাবুন-বিদ্যুৎ তো কোনো সাধারণ পণ্য না, এটা একটা মৌলিক জনসেবা, যার ওপর নির্ভর করে কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা-সবকিছু। বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছাড়া বেসরকারিকরণ উল্টো গ্রাহকের খরচ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এলপিজি খাতের কথাই ধরুন-পুরোপুরি বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা এই খাতে দাম কখনো নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি, বরং বেসরকারিকরণের চাপে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণেও একই আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে-কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি আবার ফিরে এলে পুরো খাতটাই জিম্মি হয়ে পড়তে পারে। আর ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জের নামে টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের জবাবদিহি করানোর বদলে সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে পুরো ব্যবস্থাটাই বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া। এটা সংকট সমাধানের চেয়ে বরং সংকটকে সুযোগ বানিয়ে নতুন এক মুনাফা-কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা বলেই মনে হয়। তাহলে সমাধানটা কী? বিদ্যুৎ খাতের সংকট সারাতে দরকার আসল কাঠামোগত সংস্কার, প্রান্তিক মানুষের ওপর বোঝা চাপানো নয়। প্রথমত, ক্যাপাসিটি চার্জের অস্বচ্ছ চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করে অলস কেন্দ্রকে টাকা দেওয়া বন্ধ করতে হবে, দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, রিকশা-ইজিবাইকের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরচার্জিং চাপিয়ে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় বা স্থানীয় সরকারের বিনিয়োগে কমিউনিটি-ভিত্তিক চার্জিং ও ব্যাটারি-সোয়াপিং স্টেশন গড়ে তোলা দরকার-বড় পরিসরে সৌর আর গ্রিড বিদ্যুৎ মিলিয়ে সুলভ দামে চার্জের ব্যবস্থা। এতে অবৈধ সংযোগের সমস্যাও কমবে, চালকদের আয়েও আঘাত লাগবে না। তৃতীয়ত, রাতের পিক আওয়ারের চাপ সামলাতে সময়ভিত্তিক ট্যারিফ আর পরিকল্পিত চার্জিং সময়সূচি করা যায়-যা জরিমানার হুমকির চেয়ে অনেক বেশি মানবিক আর কার্যকর। চতুর্থত, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর ওপর যে কর-শুল্কের জটিলতা তৈরি করা হয়েছে, তা তুলে দিয়ে নেট মিটারিংকে সহজলভ্য করতে হবে। আর পঞ্চমত, বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি হাতে তুলে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখেই তার স্বচ্ছতা আর দক্ষতা বাড়ানোর পথ খুঁজতে হবে-দরকার হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সত্যিকারের ক্ষমতা দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। শেষ কথা হলো, বিদ্যুৎ সংকটের আসল জন্মদাতা গুটিকয়েক কোম্পানির মুনাফালোভী চুক্তি আর রাষ্ট্রের পরিকল্পনাহীনতা, রিকশাচালকের ব্যাটারি নয়। অথচ সমাধানের নামে যা করা হচ্ছে, তার বোঝা বারবার গিয়ে পড়ছে সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষগুলোর কাঁধে-কখনো বিদ্রুপ করে ‘গরিবের টেসলা’ বলে, কখনো অবাস্তব সৌরচার্জিং শর্ত দিয়ে, আবার কখনো জনগণের সম্পদই বেসরকারি হাতে তুলে দিয়ে। একটা ন্যায্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চাইলে দায়ের হিসাবটা উল্টে দিতে হবে-লুটপাটকারীদের জবাবদিহি করাতে হবে, আর প্রান্তিক মানুষের জীবিকা রক্ষায় রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। লেখক : সংগঠক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি