ট্রেড ইউনিয়ন কী এবং কেন
Posted: 13 সেপ্টেম্বর, 2026
পূর্ব প্রকাশের পর
শ্রমিকদের শ্রম বিক্রি করা ছাড়া বাঁচার অন্য কোনো উপায় নেই। শ্রমিক তার চোখের সামনে দেখে যা উৎপাদন করে তার বৃহৎ অংশই মালিক নিয়ে নেয়। চোখের সামনেই দেখে যে, সে কিভাবে শোষিত হচ্ছে। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা যে শ্রমিকের জন্য অভিশাপ এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই যে মুক্তির পথ সেটাই তাদের বোঝাতে হবে। কৃষকেরা সংখ্যায় হয়তো অনেক বেশি। সমাজে শ্রমিকের চেয়েও বেশি অনেক গরিবও আছে। ক্ষুদ্র দোকানি আছে, বস্তিবাসী আছে। সকলে কোনো না কোনোভাবে বাঁচতে চায়, ক্ষেত্রবিশেষে বাঁচার উপায়ও খুঁজে পায়। শ্রমিক শ্রেণি যেভাবে পেশার কারণে বিভিন্ন প্রযুক্তির সাথে জড়িত সে হিসেবে অন্যরা অনেকটা ভাগ্যে বিশ্বাসী। ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎখাতের জন্য তারা তেমন আগ্রহী নয়। শ্রমিক শ্রেণি ছাড়া অন্য সকলে ধনতন্ত্রমুখি। একজন গরিব কৃষক রোদ, বৃষ্টি, তিথি নক্ষত্র বিবেচনা করে চাষের কাজে নামে। একজন শ্রমিকের কাজ কারখানার নিয়মণিতির ওপর নির্ভরশীল। একজন কৃষক নিজের জমিনে পানি না থাকলে উপরের জমিনের পানি চুরি করতেও দ্বিধা করে না। একজন ছোট দোকানিও তার দোকানদারিতে লাভ কিভাবে হবে সে চেষ্টা করে। কারণ, সে ব্যবসা বাড়াতে চায়। কিন্তু একজন শ্রমিকের পক্ষে কারখানার নিয়মণিতির বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উৎপাদন যন্ত্রের ক্ষতি করে তার বাঁচার কোনো উপায় নেই। বর্তমান প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাথে সাথে অনেক কম শ্রমে অনেক বেশি উৎপাদন হয়। ফলে অনেকে বেকার হয়ে পড়েছে। গরিবেরা, কেরানিরা, মধ্যবিত্তরা সাধারণত: উপরে উঠার সম্ভাবনা দেখে। প্রমাণ হয়েছে যে, এধরনের চিন্তাধারা ভুল। শ্রমিক শ্রেণি এমন একটি শ্রেণি তারা একদিন কাজ না করলে সমাজ অচল হয়ে যায়। তাই সমাজ বদলের জন্য প্রথমে শ্রমিক শ্রেণিকেই সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তারপর অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার লোকজনদের টানতে হবে। শ্রমিক শ্রেণির ঘনিষ্ট বন্ধু যেহেতু কৃষক ও ক্ষেতমজুর সেহেতু সমাজতন্ত্র গড়ার জন্য তাদের ওপরই জোর দিতে হবে।
রাজনৈতিক দল থাকার পরেও কেন ট্রেড ইউনিয়ন নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে বিকাশ লাভ করল? রাজনৈতিক দলগুলো রাজণিতি করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। ট্রেড ইউনিয়ন বিকাশ লাভ করল, কারণ তারা দেখেছে ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সে কৃষিকাজ থেকে উচ্ছেদ হয়ে শ্রমিক হওয়ার পরও কোনো রাজনৈতিক দল তাদের কথা বলে না। তাদের স্বার্থ দেখে না। রাজনৈতিক নেতা যারা তারা হলো রাজা, লর্ড বা সামন্ত প্রভু।
“বাবুক” ছিলেন ত্যাগী পুরুষ। ছিলেন মিলের মালিক। মিলের মালিক চাকরদের সাথে থাকতেন এবং খেতেন। বড় লোকদের কাছে গরিবদের জন্য টাকা সাহায্য চাইতেন। তিনি পরিবর্তন চাইতেন। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের মূল শক্তি কোথায় তা বুঝতে পারেন নাই। শ্রমিকদের নিজেদের ভাগ্য যে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে তা তিনি বোঝেন নাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানেরা যখন লেনিনগ্রাদ শহর ঘিরে ফেলল সেখানে ৩২ লাখ লোকের মধ্যে ৮ লাখ শীতে কাবু হয়ে, না খেয়ে মারা পড়ল। তারা আত্মসমর্পণ করে নাই। এমন কি শ্রমিকেরা যে মজুরি পেত তার দ্বিগুণ মজুরি দিলেও তারা আত্মসমর্পণ করতো না। কারণ, তারা বুঝেছিল যে মজুরি বাড়লেও মজুরি দাসত্ব ঘুচবে না।
কমিউনিস্টরা মনে করে ট্রেড ইউনিয়ন হলো সোস্যালিজম শিক্ষার পাঠশালা। শ্রমিকেরা অভিজ্ঞতা থেকে বোঝে যে মালিকেরা তাদের শোষণ করে, অত্যাচার করে। শ্রমিকদের বোঝাতে হবে যে মজুরি দাসত্ব ঘোচানোই হলো শ্রমিক শ্রেণির মূল কাজ। ইউটোপিয়ানদের সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান ছিল না। তারা কাল্পনিকভাবে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তাদের অবদানও কম নয়। কাল মার্কস শ্রমিক না হয়েও বুঝেছিলেন যে মজুরি দাসত্ব ঘোচানো ছাড়া শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি আসবে না। শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি শ্রমিক শ্রেণিকেই আনতে হবে। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি যেহেতু আসবে না সেহেতু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্ছেদের দায়িত্বও শ্রমিক শ্রেণিকে নিতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানের নিয়ম হলো সমাজ বিকাশের অগ্রগতি। আদিম সাম্যবাদের পর দাস প্রথা, দাস প্রথার পরে সামন্তবাদ। সামন্তবাদের পরবর্তী স্তর হলো পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদও স্থায়ী নয়। পুঁজিবাদের পরে সমাজতন্ত্র আসতে বাধ্য। এটা ঐতিহাসিক সত্য। ট্রেড ইউনিয়নের কাজ হলো শ্রমিকদের শিক্ষা দেওয়া কার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে, কেন করতে হবে, কে তার শত্রু, কে তার মিত্র সেটা বোঝানো। ট্রেড ইউনিয়নের কাজ হলো বিভিন্ন শ্রেণি সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং সম্ভব হলে পক্ষে টেনে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণি রাশিয়ার বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছিল। শ্রমিকেরা অনুভব করেছিল যে পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্রকে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। এটাই শ্রমিক শেণির সচেতনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশের সাথে রাশিয়ার মিত্ররা ছিল। সে হিসেবে কমিউনিস্টরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের গতি পথের পরিবর্তন আনল। তখনকার অবস্থায় ব্রিটিশেরা পরাজিত হলে জার্মানির নাৎসি বাহিনী সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানবে। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া যদি জিতে যায় তা হলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। সে সময়ে ভারতবর্ষের টাটা, ঢাকেশ্বরী মিল মালিকেরা একদিনের স্থলে তিন দিনের বেতন দিয়ে শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল। জার্মানের চর বড়লোকেরা চেয়েছিল তিন মাস কারখানা বন্ধ রাখলে ব্রিটিশের পতন অবশ্যম্ভাবী। কমিউনিস্টরা সচেতন ও সংগঠিতভাবে বড় লোকদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল। এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৭৩ সালে চিলিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন সমাজতান্ত্রিক নেতা আলেন্দো। চিলির প্রধান উৎপাদিত পণ্য তামা। তামা শিল্পের একচেটিয়া মালিক ছিল মার্কিনী তাবেদাররা। আমেরিকাতেও তামার যথেষ্ট মজুত রয়েছে। চিলির অর্থনীতির ধস নামানোর জন্য আমেরিকা বিশ্ববাজারে তামার দাম কমিয়ে দেয়। চিলি রাষ্ট্রটা দৈর্ঘ্যে ২৮শ মাইল ও প্রস্থে ক্ষেত্রবিশেষে মাত্র ১২ মাইল। ট্রাক ও লড়ি শ্রমিকেরা ধর্মঘট করলে সমস্ত রাষ্ট্রটাই অচল হয়ে যায়। আলেন্দে সরকার জাতীয় স্বার্থে তামা শিল্প জাতীয়করণ করেছিল। জাতীয়করণকৃত শিল্পকে ব্যর্থ করার জন্য মার্কিনী দালালেরা পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ঘোষণা করল কাজ করলে যদি ১০ ডলার পাও কাজ না করলে পাবে ২০ ডলার। অব্যাহত ষড়যন্ত্রের একপর্যায়ে জেনারেল পিনোসেটের নেতৃত্বে সামরিক ক্যু-এর মাধ্যমে আলেন্দে সরকারের পতন ঘটে। শ্রমিকেরা যদি বুঝতো জাতীয়করণ করলে তাদের মজুরি দাসত্বের অবসান হবে তা হলে তারা রাষ্ট্রবিরোধী ধর্মঘটে অংশ নিতো না। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। দেশ স্বাধীনের পরে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন শ্রমিক কর্মচারীদের ৯ মাসের বেতন দেওয়া হবে। ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমরা বিরোধিতা করলাম। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগ ৯ মাসের বেতনের পক্ষে অবস্থান নিল। আমাদের বিরোধিতার কারণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র জাতি অনেকে অনেকভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে। অনেকে জীবন দিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়েছে। অনেকে সহায় সম্পদ সব হারিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র মনে করেছিল নয় মাসের বেতন দিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে যদি ১০/২০টা কারখানা করা যায় তাহলে একদিকে দেশের সম্পদ যেমন বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে ২০/৩০ হাজার সব হারানো মানুষেরা চাকরি পাবে। সেটাই হবে শ্রমিক শ্রেণির জন্য বড় পাওনা।
কমিউনিস্টরা শ্রমিকের সাথে সাথে জাতীয় স্বার্থেরও প্রতিনিধিত্ব করে। আমেরিকার সাথে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি, জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়া, আরাকান সীমান্তে বিপদজনক করিডোর প্রদান ইত্যাদি বিষয়েও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। আমরা কেবল অর্থনীতিবাদী আন্দোলন করি না। একই সাথে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও শ্রমিক শ্রেণিকে সচেতন করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা কেবল সৎ ট্রেড ইউনিয়নিস্ট না। একই সাথে আমরা সচেতন সমাজতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট। আমরা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিই শ্রমিকের মুক্তি কীভাবে আসবে।
রুশ বিপ্লবের সময়ে ২২ দিক দিয়ে একসাথে রাশিয়াকে আক্রমণ করেছিল। ধনী দেশের শ্রমিকদের একটা সচেতন অংশ আওয়াজ তুলেছিল রাশিয়া থেকে হাত গুটাও। ভিয়েতনামের বীর জনতা যখন লড়াই করছিল “আমরা আজি তোমার সাথে” শ্লোগান দিয়ে আমেরিকার জনগণের একটি অংশও আমেরিকার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। আজকের দিনেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামানোর জন্য খোদ আমেরিকাতেই লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল হচ্ছে। কতটুকু সাহস ও শক্তি থাকলে ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি ফিলিস্তিন, গাজায় ইসরাইলের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারে? ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের আগ্রাসন, অন্যায় যুদ্ধ থামানোর জন্য ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি ও ইরানের কমিউনিস্ট পার্টি (তুদেহ পার্টি) যৌথ বিবৃতি প্রদান করতে পারে? এটাই শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতা। ভিয়েতনামের জয় কেবল ভিয়েতনামের জনগণের জয় নয়- এটা বিশ্বের মেহনতি ও মুক্তিকামী জনতারও জয়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল ঢাকা, দিল্লি, মস্কো। বিপক্ষে ছিল পিন্ডি, পিকিং, ওয়াশিংটন। মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর হঠাৎ পত্রিকায় দেখলাম রাশিয়া পাকিস্তানে একটি ভারী ইস্পাত কারখানা গড়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম শ্রদ্ধেয় অনিল মুখার্জীকে। অনিল দা স্মীত হেসে বলেছিলেন কমরেড, পাকিস্তানেও কমিউনিস্ট পার্টি আছে। পাকিস্তানের ইস্পাত কারখানায় ৫/৭ হাজার শ্রমিক কাজ করবে। সোভিয়েত রাশিয়া পুঁজিবাদী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শক্তিকেও সংগঠিত করে দিচ্ছে।
আমরা চুরি করি না- এটা অন্যদের সাথে আমাদের প্রধান পার্থক্য নয়। আমাদের সাথে অন্যদের বড় পার্থক্য হলো আমরা শ্রমিকদের রাজনীতি শিক্ষা দিই। সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের আন্দোলনের লক্ষ্য কী? কর্মসূচি কী? শেষ বিচারে এই আন্দোলন জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে কি না তা বিচার করতে শিখাই। এমনকি শ্রমিক কলোনিতে আড্ডার স্থলেও আমরা সাহিত্য, গল্প, সিনেমা নিয়ে ও সমাজ চিত্র সম্পর্কে ভাবতে শিখাই। যেন ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’।
“দুনিয়ার মজদুর এক হও”। ১৯৪৮ সালে মহামতি কাল মার্কস ও এঙ্গেল্স কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে শ্লোগানটি দিয়েছিলেন। সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম দুনিয়াব্যাপী। সমস্ত দুনিয়ার শ্রমিকের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। রুশ বিপ্লবের সময়ে রুশ দেশের পক্ষে যদি অন্য দেশের শ্রমিকরা সংগ্রাম ও সমর্থন না দিত তাহলে দুনিয়ার বুকে প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্রও কায়েম হতো না। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদী যুগে দুনিয়ার “মজদুর এক হও” শ্লোগানের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনেক বেশি।
বেতন বাড়ানো, শ্রমিকের জন্য নানা ধরনের সুবিধা আদায় ইত্যাদি আমাদের মূল লক্ষ্য নয়। টাকা, আনা, পাই শ্রমিকের জন্য বাড়তি মজুরি চাই। এগুলো অর্থনীতিবাদী আন্দোলন। কিছু অর্থনীতিবাদী বা সংস্কারমূলক দাবি নিয়ে আমরা প্রথমে শ্রমিকদের সংগঠিত করি। অন্যরা দলীয় রাজনীতি করলেও কমিউনিস্টদের গড়া ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন দলীয় রাজণিতির ঊর্ধ্বে। আমরা শ্রমিকের স্বার্থে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সংগঠন করি। এমন শ্লোগান তুলি যেন শ্রমিকের এবং দেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়। বন্দরে শ্রমিক লীগ, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল যারাই থাকুক দেশি, বিদেশিদের হাতে বন্দর ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে শ্লোগান তুললে এবং আন্দোলনকে যদি একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় তখন দলীয় বৃত্ত ভেঙে নিজের স্বার্থেই শ্রমিক কর্মচারীরা আন্দোলনে যুক্ত হবে। আমাদের শক্তি কম, শ্লোগান যদি ঠিক থাকে, মনোবল যদি দৃঢ় থাকে তাহলে অনেক কম শক্তি নিয়েও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।
একজন বেকার যুবক। শ্রমিক হিসাবে কোথাও কাজ পাওয়াটাই তার জন্য বড় প্রাপ্তি। প্রথম প্রথম তার চেনা-জানা জগতের বাহিরে, সে কিছু চিন্তা করতে পারবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রমিক শ্রেণিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে হবে- এটা সে চিন্তাও করতে পারে না। সে ভাগ্যবাদী। ছোট ছোট সংগ্রাম, ছোট ছোট বিজয় তাকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে। তার দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তার মনোজগতে হয় পরিবর্তন। সে বড় সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়। কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে এসে সে সচেতন হয়। মজুরী বাড়ানো ও মজুরি দাসত্ব ঘোচানোর মধ্যে যে পার্থক্য সে বুঝতে পারে। এক সময়ে হয়ে উঠে সমাজ বিপ্লবের সৈনিক। কমিউনিস্টরা একটি শিল্পে, প্রতিষ্ঠানে প্রথমে কাজ শুরু করে। ধীরে ধীরে সেখানে শক্তি বৃদ্ধি হয়। নতুন নতুন কর্মীরা আসে। একসময়ে দায়িত্ব নেওয়ার মতো নেতাও দাঁড়িয়ে যায়। কাজ করতে গিয়ে যার জন্য খাটা, যাদের জন্য শ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করা তারাও কখনো কখনো ভুল বোঝে, মাথা ফাটায়। মান, অপমান, আঘাত, জখম যা-ই হোক, একজন কমিউনিস্ট কখনো শ্রমিক শ্রেণিকে ত্যাগ করতে পারে না। মালিকের অত্যাচার, নির্যাতন, আঘাত, জখম যা-ই হোক না কেন, একজন শ্রমিক যেমন শ্রমিকের চাকরি ছাড়তে পারে না, তেমনই একজন কমিউনিস্টও শ্রমিক শ্রেণিকে ছাড়তে পারে না। কারণ, সে জানে শ্রমিক শ্রেণিকে সংগঠিত ও সচেতন করা ছাড়া অন্য কোনোভাবে বিপ্লব সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিকল্প হলো সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। পুঁজিপতিরা অন্য সকলকে সহ্য করলেও কমিউনিস্টদের সহ্য করে না। প্রকাশ্যে এমনও বলে বেতন বাড়িয়ে দেবো তবে কমিউনিস্টটিকে চলে যেতে হবে। তারা মোটা অংকের টাকা দিয়ে হলেও কমিউনিস্ট বিদায় করতে চায়।
সুন্দর সমাজ গড়তে হলে মানুষগুলোকেও সুন্দর হতে হবে। এটা শারীরিক সৌন্দর্য নয়, এটা চারিত্রিক সৌন্দর্য। এমন অনেককে দেখা যায় যারা বাইরে শ্রম দাসত্ব ঘোচানোর জন্য গলা ফাটায়, বাড়ি গিয়ে চাকরকে পেটায়, নারীকে নির্যাতন করে। গ্রামের কৃষক, সাধারণ মানুষ যারা নতুন সমাজ গড়ার জন্য শ্রমিক শ্রেণির সহযাত্রী হবে তারা যেন মনে করে শ্রমিক শ্রেণি তাদের চেয়ে উন্নত। তাহলেই তারা বিশ্বাস করবে রাষ্ট্রক্ষমতা নিলেও শ্রমিকশ্রেণি তা চালাতে পারবে। রুশ দেশে এক চরম অত্যাচারী বিলাসী সম্রাট ছিলেন। যাকে বলা হয় “জার সম্রাট”। জারের সুরম্য প্রাসাদে হাজার রকমের বিলাসী দ্রব্যাদি ছিল। ১৯১৭ সালে বিপ্লবের সময়ে শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের যৌথ বাহিনী যখন লেনিন গ্রাদে জার-এর প্রাসাদ দখল করছিল সেখানে লোভ সামলানো ছিল দায়। লোভে পড়ে একজন সৈনিক একটি সুন্দর কম্বল নিয়ে যাচ্ছিল। একজন কৃশকায় শ্রমিক অনেক কষ্টে সৈনিকটিকে বোঝাল যে এটা বিপ্লবের সম্পদ। শ্রমিকটিকে বোঝাতে সক্ষম হলো যে এটা নিলে বিপ্লবের ক্ষতি হবে। আশ্চর্যের বিষয় প্রাসাদের হাজার হাজার লোভনীয় জিনিসের মধ্যে একটিও নড়ে নাই। কারণ তারা ছিল বিপ্লবের সচেতন বাহিনী। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর মুজিববাদীরা যা করেছে তাতে তারা গণমানুষের আস্থা হারিয়েছিল। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিমাণ লুটপাট হয়েছে তা-ও বর্ণনার অতীত।
বিপ্লব কঠিন কাজ। প্রয়োজন শক্তিমান পুরুষ। বিপ্লবীেেদর হতে হবে চারিত্রিকভাবে বলীয়ান। আমাদের রক্ত লাল। শ্রমিক শ্রেণির পতাকাও লাল। রক্ত দেবো, জীবন দেবো, তারপরও শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে আমরা অগ্রসর করে নেবো—এটাই হোক বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের শপথ।
লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি