‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’

Posted: 13 সেপ্টেম্বর, 2026

একতা প্রতিবেদক : ‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশন। ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত এই কনভেনশনে যুক্ত হয়েছেন ৪৫ জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রায় ৫৫০জন প্রতিনিধি। এর পাশাপাশি আরও ছিলেন শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিককর্মীসহ নানান শ্রেণি পেশার মানুষ। সকালে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় কনভেনশন উদ্বোধন করেন লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর। এরপর সংস্কৃতিকর্মীদের একটি শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্ব এবং সদস্য সচিব মফিজুর রহমান লালটুর সঞ্চালনায় গণসঙ্গীত, কবিতা আবৃত্তি ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের পাহাড়ি নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে জাতীয় কনভেনশনের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম অধিবেশনে বক্তা ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ৬৯ গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও কমিউনিস্ট নেত্রী দীপা দত্ত, বাউলশিল্পী আবুল সরকার, লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কবি মোহন রায়হান এবং নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাজু আহমেদ। প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই জামশেদ আনোয়ার তপন সংস্কৃতিকর্মীদের গণঅভ্যুত্থানে কারফিউ ভেঙ্গে গানের মিছিল, দ্রোহযাত্রা সংঘটিত করার বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও তার শাসনব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অবসান হয়নি; সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অশুভ ছায়া আজও আমাদের সমাজকে বিপন্ন করছে। এই সংকটকালে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠকে সংগঠিত করে মানুষের মনে প্রত্যয় জাগাতে এবং একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজের পথ নির্মাণের লক্ষ্যে এই জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ভেতরে থেকেও, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক রুপান্তর দেখতে চেয়েছিলেন আপনারা, তা আমাদের সবার কাছে হাতছাড়া। ৬৯, ৯০ এর পর ২৪- এই একই ঘটনা ঘটেছে। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখলে এতে আশ্চর্যের কিছু না। তিনি বলেন, যদি আমরা ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ চাই, তবে আমাদের কর্তব্য সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রুপান্তর ঘটানো। পৃথিবীর তখনই বড় কোনো পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে শাণিত হয়, যখন ওই রাজনীতিটা জনস্বার্থপরায়ণ, গণতন্ত্রপরায়ন সাংস্কৃতিক পাটাতনে দাঁড়ায়। আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মানুষের গণতন্ত্র চাই, প্রতিনিধিত্ব চাই, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার চাই তবে আমাদের সেই পাটাতন তৈরির কাজ আরও গভীরভাবে করতে হবে। তিনি আরও বলেন, “সারাদেশ থেকে যারা এই কনভেনশনে এসেছেন যার যার এলাকায় আপনাদের কাজকে আরও সংহত করতে হবে। আমি আপনাদের পাশে আছি। কারণ আপনাদের আকাঙ্ক্ষা এবং আমার আকাঙ্ক্ষা অভিন্ন।” অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের লড়াইয়ের তাগিদে এই কনভেনশন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করে। সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি। খেয়াল করি আর না করি, এই লড়াই চলছে। এই লড়াই শুধু মাঠে-ময়দানে হয়, তা নয়। এই লড়াই চায়ের দোকানে, পত্রিকায়, ফেসবুকে হয়। এই লড়াই চিন্তার লড়াই, চৈতন্যের লড়াই। তিনি বলেন, “অনেক উচ্চশিক্ষিত লোক পাবেন, যারা বলবেন—‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ভালো, বন্দর বিদেশিদের দেওয়া উচিত, ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লা তোলা উচিত— এই বলা একটি দাসত্বের সংস্কৃতি। যারা জনগণের পক্ষে, আধিপত্যে ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তারাও তো একটা সাংস্কৃতিক অংশ।” তিনি আরও বলেন, ‘নারীর জীবন কেমন হওয়া উচিত, নারী ঘরে থাকা উচিত, নাচ ভালো না, অন্য ধর্মের মানুষ খারাপ, অন্য জাতির মানুষ নিম্নমানের, বাংলা জাতি শ্রেষ্ঠ—এই চিন্তাগুলো সাম্প্রদায়িক চিন্তা। এর একটি মতাদর্শিক ভিত্তি আছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই প্রতিদিনের লড়াই। শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েও এই লড়াই হয়। তিনি বলেন, গ্রাফিতি কিংবা গানের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সমাবেশিত হয়েছিল সৃজনশীল তৎপরতা, সংস্কৃতি এর শক্তি ছিল। অথচ এরপর একটি অংশ দাঁড়াল—তারা এই সৃষ্টির বিরুদ্ধে, শিল্পের বিরুদ্ধে, নারী ও যেকোন জাতির বিরুদ্ধে। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে। একটা গোষ্ঠী ফোন করলে পুলিশ এসে যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়। তিনি আরও বলেন, জনগণের ভেতর ক্ষমতা, আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীকে প্রত্যাখ্যানের যে শক্তি—সেই শক্তি সংস্কৃতিচর্চা থেকে আসবে। ১৯৯৪ সালে লেখক-শিল্পীদের একটি কনভেনশন হয়েছিলো ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে কনভেনশন। জামাত এই ব্লাসফেমি নিয়ে ফতোয়া দিয়েছিলো তখন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ-জামাতের ঐক্য তৈরি হলো। গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ লেখক-শিল্পীদের দমন করেছে, তাঁদের সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করেছে—গণঅভ্যুত্থানে দেখেছি সেই সাংস্কৃতিক সংগঠনকে শক্তিশালী হতে। তাই লড়াইয়ের শক্তি আকাশ থেকে আসে না, জমিন থেকেই আসে। তবে আমি মনে করি এই লড়াইয়ে যত বৈচিত্র্য এর ঐক্যকে শক্তিশালী করা হবে, ততই লিঙ্গ, শেণি জাতিগত শোষণ দূর হবে। সংগ্রাম শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের মানুষ লড়াই করতে ও জীবন দিতে কার্পণ্য করে না। আমাদের ইতিহাস প্রতিরোধের ইতিহাস, আমাদের ইতিহাস প্রত্যাশাভঙ্গেরও ইতিহাস। প্রতিরোধের ইতিহাসকে বিনির্মাণ করতে সাংস্কৃতিকর্মীদের আরও সংগঠিত ও সক্রিয় হওয়া দরকার। রাজনৈতিকউদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে গান গাওয়ার কারণে কারাবরণ করা বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ বলেন, “আমি গান করতে পারি। এইটাই আমার অস্ত্র। আমি মনে করি সংস্কৃতির সাথে জড়িত আমরা প্রত্যেকেই একটা পরিবার। আমরা যদি একপথে একসাথে চলতে পারি তাহলে চলার পথ সহজ হয়।” তিনি বলেন, “আমি ৫ মাস জেল খেটেছি, সেখানে আমার কতটুকু দোষ ছিলো সেই ব্যাখ্যা আমি না দেই। কিন্ত আমি যে জেলমুক্ত, আমি আসলে বন্দীই আছি। আমি ওইদিন জেল থেকে মুক্তি পাবো, যেদিন আমি গাইতে, নাচতে, বুক ফুলে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারব। আপনাদের যে সাহসিকতা, আমরা যদি সবার বেলায় একটু করে আগায় আসি তাহলে পথচলা সহজ পাবো।” তিনি জেলখানায় বসে তাঁর লেখা “তুমি জানো কি বন্ধু, মানো কি বন্ধু, এই মানুষ তো মানুষের জন্য” গানটি অতিথিদের গেয়ে শোনান। লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “দুই ধরণের শিল্প সাহিত্যিক বিরাজমান। প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীল। জনগণের অমূল্য সম্পদ, জনগণ এর রক্ষক, জনগণের কথা বলে প্রগতিশীল সংস্কৃতি। প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি জনগণকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে গিয়ে চিন্তা চেতনা ভোঁতা করে দেয়। তারা এইটি করে জনগণের উপর শোষণ ও নিপীড়ন টিকিয়ে রেখে নিজেদের ভোগ বিলাস অব্যাহত রাখতে। আমাদের প্রগতিশীল সংস্কৃতিকে আরও জনগণের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে, তাদের জীবনসংগ্রাম থেকে সাহিত্যের রস সংগ্রহ করে তাদের কাছে পৌছে দিতে হবে।” জাতীয় ঐক্য কবিতার পরিষদের কবি মোহন রায়হান রায়হান বলেন, “১৭ বছর ধরে চলে আসা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমরা কলম ধরেছি। আজ বর্তমান সরকার যদি বিশেষ গোষ্ঠীকে দলদাস বানাতে চায়, ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে হাতিয়ার পরিণত করতে চায় তবে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য রুখে দাড়াবে। আজকে কনভেনশনে এসে আশ্বস্ত হয়েছি আমরা সেই শক্তি হয়ে উঠতে পারবো। এই কনভেনশন আমাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখায় যেখানে সাংস্কৃতিক শক্তি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে, এখান থেকে সেই আশা বুক ভরে নিলাম’। এরপর তিনি তার কবিতা থেকে পাঠ করেন, ‘যুক্তির বড় হাতিয়ার, বুকের সাহস জানো। কার্ল মার্ক্সের ভাষায় বলতে চাই, চাই সাহস, আরো সাহস, স্পর্ধিত সাহস!’ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাজু আহমেদ বলেন, “মাসখানেক আগে আমাদের বাসায় একটি ছোট শিশু যে মাদ্রাসায় পড়ে, সে আমার মেয়েকে এসে বলে তাঁর শিক্ষকরা বলেছে নাচ ভালো না। আমার কাছে যে মেয়েটা নাচ শিখতো তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর শ্বশুড়বাড়ি নাচ সমর্থন করলো না। কবি বলেছেন, ‘মসজিদ হতে আজান হাঁকিতেছে, আমার জীবনে রোজ কেয়ামত আসিতেছে কতদূর’। কি অদ্ভুত একটা ব্যাপার! সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীতে আমাদের পাঠিয়েছেন, অথচই আমরাই সাথে আমার মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “মাওলানা রুমী বলেছেন, তোমরা কখনোই খালি হাতে মাজারে আসবে না। গান গাইতে গাইতে বাজাতে বাজাতে আসবে। কারণ পরম করুণাময় নিরানন্দময়ীকে পছন্দ করে না। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সবার জন্যই বাংলাদেশ। সবাই স্বাধীনভাবে কথা বলা, নাচ গানের অধিকার পাবো। অনেক গুণি মানুষ একসাথে হলে সমাজে একটা না একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটবে।” দীপা দত্ত বলেন, “নির্বাচিত সরকারকে পেয়ে আমি ভেবেছি ভালো হয়েছে। কিন্তু যেভাবে চলছে সেখানে গণমানুষের কথাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। নির্বাচনের তিনদিন আগে যে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি করলেন তাতে বাংলাদেশে মার্কিন অধীনস্ত হলে। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে তরুণদের দলের নামকরণ করা হয়েছিলো অবিভক্ত বাংলা ভারতের কবি সাহিত্যিকদের নামে। সেই আন্তর্জাতিক সম্মেলন ঘটেছিলো ছোট এক গ্রামে, আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিকে স্থানীয় মানুষের সাথে পরিচয় করাতে। বিভিন্ন লোকগান, লাঠিখেলার আয়োজন হয়েছিলো। ওই সম্মেলনেই পশ্চিম পাকিস্তানিকে আসসালামু আলাইকুম জানিয়েছিলো মাওলানা ভাসানী।” এছাড়া গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের নেতৃবৃন্দদের পক্ষ থেকে কনভেনশনে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জাকির হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘের দীনবন্ধু দাশ, যাত্রা শিল্পী উন্নয়ন পরিষদ এস এম লাভলু, সমাজ চিন্তা ফোরামের পক্ষ থেকে কামাল হোসেন বাদল, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের বিমল কান্তিসহ আরও অনেকে।