সরকারের অগ্রাধিকারে স্থান পায়নি খেটে খাওয়া মানুষ

Posted: 13 সেপ্টেম্বর, 2026

একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেছেন, বিগত ছয় মাসের শাসন দেখে এটা স্পষ্ট, সরকারের অগ্রাধিকারে খেটে খাওয়া মানুষের স্থান হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, খেটে খাওয়া মানুষের জীবন ও জীবিকার বিষয়ে সরকার কোনো ধরনের দায়-দায়িত্ব বোধ করছে না। একদিকে তীব্র জ্বালানি সংকটে অর্থনীতির মন্দা অবস্থা এবং অন্যদিকে শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। সিপিবি ঘোষিত শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা দিবস উপলক্ষে গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায়, রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড়ে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সিপিবি সভাপতি। সমাবেশে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষ হলেও তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, কম মজুরি, শ্রমিক ছাঁটাই, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাবে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। শ্রমিকের শ্রমে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও সেই উন্নয়নের সুফল শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তিনি অবিলম্বে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও সর্বত্র বাস্তবায়নের দাবি জানান। একইসঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মরত চার লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারীকে স্থায়ী করার দাবি জানান তিনি। সমাবেশে সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, সরকারি মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় তুলে দেওয়ার নীতি জনস্বার্থবিরোধী। সরকারি মালিকানাধীন ৪৪টি শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে সেগুলো অবিলম্বে চালু করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার অজুহাতে ধ্বংস না করে আধুনিকায়ন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদনশীল করে তুলতে হবে। জাতীয় সম্পদকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মুনাফার উৎসে পরিণত করার অপচেষ্টা বন্ধ করারও দাবি জানান তিনি। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের টিইউসির সহ-সভাপতি মাহাবুবুল আলম বলেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শ্রমিক-কৃষকসহ মেহনতি মানুষের স্বার্থবিরোধী অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করে উৎপাদন ও সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাদেকুর রহমান শামীমের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএ রশীদ, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাড মন্টু ঘোষ, সহ-সভাপতি জিয়াউল কবির খোকন, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সহ-সভাপতি আক্তার হোসেন, চাতাল ও বয়লার শ্রমিকনেতা আলিমুল রেজা রানা, চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অন্যতম সমন্বয়ক মনীষা ওয়াহিদ প্রমুখ। সমাবেশ থেকে মজুরি কমিশন গঠন করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে চা-শ্রমিকদের চলমান দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের আন্দোলনের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া; ক্ষেতমজুর, গৃহশ্রমিক, চাতাল শ্রমিকসহ মজুরিভিত্তিক শ্রমজীবী মানুষের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত এবং শ্রমিকের জন্য রেশন ও আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। সমাবেশ থেকে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স ও যান্ত্রিক নীতিমালা প্রণয়ন, বন্ধ পাটশিল্প শ্রমিকদের পুনর্বাসনসহ কারখানা চালুর উদ্যোগ এবং পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানানো হয়। শ্রমিক ছাঁটাই, বঞ্চনা ও বৈষম্য বন্ধ করে শ্রম আইন ও শ্রমিকের সাংবিধানিক অধিকার কার্যকর করার দাবি জানানো হয়। সমাবেশের আগে একটি বিশাল মিছিল পল্টন মোড় থেকে শুরু হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব, কদমফুল ফোয়ারা ঘুরে জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান এলাকা প্রদক্ষিণ করে। শ্রমজীবী মানুষের ওপর চলমান নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে সিপিবি দেশব্যাপী শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা দিবস পালন করেছে। এ উপলক্ষে সারাদেশে জেলা পর্যায়েও বিক্ষোভ ও সমাবেশ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।