ইতিহাস ও তা যেভাবে পড়ানো হয়
সেটি কতটা যৌক্তিক
Posted: 06 সেপ্টেম্বর, 2026
অতীতে ঘটে যাওয়া মানবসমাজের বিভিন্ন ঘটনা, কার্যকলাপ ও পরিবর্তনের কালানুক্রমিক ও প্রামাণ্য বিশ্লেষণই হলো ইতিহাস। আবার এভাবেও বলা যায় যে, ইতিহাস হলো অতীত বৃত্তান্ত বা কালানুক্রমিক অতীত কাহিনি ও কার্যাবলির লিখন, বিশ্লেষণ ও অধ্যয়ন। এটি কেবল অতীতের ঘটনার তালিকা নয়, বরং মানবসভ্যতার বিকাশ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির ধারাবাহিক বিবর্তনের বৈজ্ঞানিক পাঠ। ‘ইতিহাস’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘ইতিহ’ থেকে, যার অর্থ ‘এমনটিই ছিল’ বা ‘ঐতিহ্য’, অন্যদিকে, ইংরেজিতে যাকে History বলা হয়, তার উৎপত্তি গ্রিক শব্দ Historia থেকে, যার অর্থ ‘অনুসন্ধান’ বা ‘জ্ঞান’, গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসকে (Herodotus) ইতিহাসের জনক বলা হয়। ইতিহাসে এটাও বলা হয় যে, অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে মানুষ পূর্বপুরুষদের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। ইতিহাস আমাদের নিজস্ব শেকড় ও সংস্কৃতির সন্ধান দেয়, যা বর্তমানকে বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। তাই অতীতের ঘটনাবলির সত্যনিষ্ঠ বিবরণ ও ধারাবাহিক পর্যালোচনাই হলো ইতিহাস। “ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে মানুষ অতীতকে জেনে বর্তমানের উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের অগ্রগতির পথ নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়”।
কেন ইতিহাস পাঠ করা দরকার , তার প্রধান প্রয়োজনীয়তাগুলো আলোচনা করা হলো: ১, ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে আমরা পূর্ববর্তী মানবসমাজ, তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং উত্থান-পতনের বিবরণ জানতে পারি। এটি আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।২. বিখ্যাত দার্শনিক জর্জ সান্তায়না বলেছিলেন, “যারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা তার পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য।” ইতিহাস আমাদের পূর্বসূরিদের ভুল ও সাফল্য সম্পর্কে ধারণা দেয়, যা বর্তমানের সমস্যা সমাধানে এবং ভবিষ্যতের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ৩. স্বদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার ফলে মানুষের মনে গভীর দেশপ্রেম ও আত্মপরিচয়ের চেতনা জাগ্রত হয়। এটি জাতীয় দায়িত্ববোধ বাড়াতে সাহায্য করে। ৪. ইতিহাস শুধুমাত্র তারিখ বা ঘটনার মুখস্থ বিদ্যা নয়; এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করতে শেখায়, যা মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ৫. বিশ্ব ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে পারি। এটি আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং বৈশ্বিক ঐক্য বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আবার এভাবে বলা যায় যে, ইতিহাস পাঠ মানুষকে আত্মসচেতন, দূরদর্শী ও বিবেকবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।এই ঐতিহ্যকে এক প্রজন্ম। থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় ইতিহাস। ঐতিহাসিক ই.এইচ.কার-এর ভাষায়, ইতিহাস হলো বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক অন্তহীন সংলাপ। ইতিহাসের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ ইতিহাস পাঠ ক’রে অতীত ঘটনাবলির দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা বর্তমানের প্রয়োজনে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইতিহাস দৃষ্টান্তের মাধ্যমে শিক্ষা দেয় বলে ইতিহাসকে বলা হয় শিক্ষণীয় দর্শন। মানুষ কৌতুহলপ্রিয়। মানুষ তার অতীত ঘটনা জানতে চায়। ইতিহাস পাঠ করার মাধ্যমেই অতীতকে জানা সম্ভব।
সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস পাঠ করে যে জ্ঞান লাভ হয়, তা বাস্তব জীবনে চলার জন্য উৎকৃষ্টতম শিক্ষা। ইতিহাস পাঠ করলে বিচার বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ে, যা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করে। ফলে জ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহ জন্মে।
তবে ইতিহাসে যা বর্ণিত হয়েছে, তার পুরোটাই হুবহু অপরিবর্তিত সত্য—এমনটা দাবি করা কঠিন। ইতিহাস হলো অতীত ঘটনার বিশ্লেষণাত্মক বিবরণ বা কালানুক্রমিক ঘটনা। এটি কতটা সঠিক, তা নির্ভর করে ঘটনার উৎস, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং যিনি লিখছেন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।ইতিহাসের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নের কয়েকটি দিক হলো—১. ঐতিহাসিকরা মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, শিলালিপি, মুদ্রা, এবং লিখিত দলিলের ওপর নির্ভর করে ইতিহাস লেখেন। কোনো ঘটনার সমসাময়িক বা প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ যত বেশি থাকে, সেই ইতিহাসের সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে। ২. অতীত ঘটনাসমূহ যখন কোনো ব্যক্তি বা ঐতিহাসিক লিপিবদ্ধ করেন, তখন তাতে তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব থাকতে পারে। ফলে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। ৩. সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন তথ্য, দলিল ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক পুরনো ঐতিহাসিক ধারণাকে পরিমার্জন বা ভুল প্রমাণিত করা হয়। ইতিহাস চর্চা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ৪. অনেক প্রাচীন ইতিহাস লোকমুখে বা বংশপরম্পরায় টিকে থাকে। এগুলোর ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত হওয়ার বা তথ্য বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। সুতরাং, ইতিহাসে যা লেখা আছে তার মধ্যে মূল সত্যতা (grain of truth) বিদ্যমান থাকে। তবে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন এবং নিখুঁত ইতিহাস পাওয়া প্রায় অসম্ভব। একে সর্বদা যুক্তিবোধ এবং প্রমাণের সাহায্যে গ্রহণ করতে হয়।
তবে ইতিহাসে অনেক রাজাধিরাজকে যে বিশেষণে আখ্যা দেয়া হয়েছে তা কতটা যৌক্তিক তা বিচারের সময় এসেছে। ম্যাসিডোনের রাজ আলেকজাণ্ডার সম্পর্কে বর্ণনা যা আছে তা সংক্ষেপে বলা হয় এমন , ম্যাসিডোনের রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (মহামতি আলেকজান্ডার) মূলত তাঁর অজেয় সামরিক মেধা, অসীম সাহস এবং বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্যই ইতিহাসে ‘মহান’ বা গ্রেট হিসেবে পরিচিত। তিনি মাত্র ১৫ বছরের শাসনামলে প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন এবং কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি। তাঁর বিখ্যাত হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—১. তিনি কখনো কোনো যুদ্ধে হারেননি। ব্যক্তিগতভাবে সৈন্যদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন এবং প্রতিপক্ষের রণকৌশল বুঝতে পারতেন। ২. ম্যাসেডোনিয়া থেকে শুরু করে গ্রিস, পারস্য, মিশর এবং বর্তমান পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। তিনি প্রায় ২০ লাখ বর্গমাইল এলাকা জয় করেছিলেন।৩. তিনি নতুন নতুন শহর (যেমন মিশরে আলেকজান্দ্রিয়া) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বিজিত অঞ্চলে গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে, যা ইতিহাসে হেলেনিস্টিক যুগ নামে পরিচিত।৪. তরুণ বয়স থেকেই তিনি অসাধারণ সামরিক ও কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দেন। ২৫ বছর বয়সে তিনি একাধারে গ্রিসের রাজা ও মিশরের ফারাও হয়েছিলেন। তার যুদ্ধ করে অন্যের রাজ্য দখল করাটা কি অনাধিকার চর্চার মদ্যে পড়ে না। অহেতুক মানুষ হত্যা করা কতটা যৌক্তিক।
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণে ঠিক কত মানুষ মারা গিয়েছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ঝিলম নদীর তীরে রাজা পুরুর বিরুদ্ধে হওয়া বিখ্যাত ‘হাইডাসপিসের যুদ্ধ’ ও অন্যান্য প্রতিরোধ যুদ্ধে ধারণা করা হয়, সব মিলিয়ে উভয় পক্ষের হাজার হাজার থেকে লক্ষাধিক সৈন্য ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছিল। এই অভিযানের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি বিবরণ হলো—১. হাইডাসপিসের যুদ্ধ (ঝিলমের যুদ্ধ) ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের প্রায় ৪৫,০০০ সৈন্যের সাথে রাজা পুরুর (পুরু) ৩০,০০০ সৈন্য ও যুদ্ধহস্তীর এই রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। যুদ্ধে রাজা পুরুর পক্ষের প্রায় ২০,০০০ যোদ্ধা নিহত হয় এবং আলেকজান্ডারের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা ছিল ৪,০০০ এর মতো। ২. আলেকজাণ্ডার মালয় (মালি) উপজাতিদের নিধন করে। বর্তমান ভারতের মুলতান অঞ্চলের মালিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আলেকজান্ডার নিজেই গুরুতর আহত হন। ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর সৈন্যরা মালিদের গ্রামে ব্যাপক গণহত্যা চালায় এবং শিশু ও নারীসহ সকলকে হত্যা করে। ৩. ভারত অভিযান শেষে ব্যাবিলনে ফেরার পথে বেলুচিস্তানের দুর্গম মরুভূমি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনাহার এবং তৃষ্ণায় আলেকজান্ডারের হাজার হাজার গ্রিক ও মেসিডোনীয় সৈন্য মারা যায়। এত হত্যাযজ্ঞ, সম্পদ বিনষ্টকারীকে কেন গ্রেন বলা হয়। এটা কি যৌক্তিক ইতিহাস পড়ানো হয়। আলেকজাণ্ডারকে কি গ্রেট বলা যায়। কোন মানবতাবাদী মানুষ এই হত্যাকারীকে গ্রেট বলতে পারে না। সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক দশমাংশ নিহত হয়।
মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার, অসামান্য শাসনদক্ষতা, এবং সব ধর্মের মানুষের প্রতি সহনশীলতার কারণে ইতিহাসে ‘মহামতি’ (Akbar the great) হিসেবে পরিচিত। তাঁর গৃহীত প্রগতিশীল নীতি ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
মুঘল সম্রাট আকবরের বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ঠিক কত মানুষ নিহত হয়েছিল তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা নিখুঁত পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিক তথ্য ও বিভিন্ন যুদ্ধের বিবরণে দেখা যায়, আকবরের উত্তর ভারত বিজয়কালে ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ সালের মধ্যে আনুমানিক ১ থেকে ২০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ঐ সময় উপমহাদেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ১ শতাংশ মানুষ মারা যায় ঐ যুদ্ধের কারণে। তার যুদ্ধাভিযান গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনাগুলোর হলো, ১. ১৫৬৮ সালে আকবর চিতোরগড় অবরোধ করেন। আকবরের সবচেয়ে বিতর্কিত অভিযানের মধ্যে এটি অন্যতম। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, দুর্গ জয়ের পর আকবরের বাহিনী প্রায় ৩০,০০০ রাজপুত সৈন্য এবং সাধারণ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছিল। ২. আকবর ১৫৫৬ সালে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ করেন। আকবরের বাহিনী ও হিমুর (হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য) মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়। ৩. আকবর হলদিঘাটির যদ্ধে লিপ্ত হন ১৫৭৬। এই যুদ্ধটি ছিল মেবারের রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে মুঘল সেনাপতি মান সিং জয়লাভ করেন। দুই পক্ষের তীব্র লড়াইয়ে কয়েক হাজার সৈন্য প্রাণ হারায়।এ ছাড়াও গুজরাট, বাংলা ও দাক্ষিণাত্য বিজয়ের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী লড়াইগুলোতে আরও বহু সৈন্য এবং বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আকবর কি এই যুদ্ধ গুলো মানব কল্যানে করেছিলেন। তিনি তার লিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য যুদ্ধ করেছেন। আকবরের যুদ্ধের পেছনে মুল কাহিনী হল তার সাম্রাজ্য বিস্তার এই যুদ্ধ গুলো মানুষের কল্যানে হয়নি। তাই কেন আকবরকে মহামতি বা অশনধৎ ঃযব মৎবধঃ হিসাবে ইতিহাসে আখ্যা দেয়া হয়। এটা কি যৌক্তিক ।
বাংলার সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল ভারতের দক্ষিণাত্যের কর্ণাট অঞ্চলে। আধুনিক মহীশূর, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কানাড়ী ভাষাভাষি অঞ্চলকে তাঁদের আদি নিবাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেন বংশের তাম্রশাসন ও শিলালিপি থেকে জানা যায়, এই বংশের আদি পুরুষরা কর্ণাট থেকে বাংলায় এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে এখানে স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা জাতিতে “ব্রহ্মক্ষত্রিয়” ছিলেন, অর্থাৎ তাঁরা মূলত ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হলেও পরে ক্ষত্রিয় বৃত্তি বা রাজকার্য গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন বংশের শ্রেষ্ঠ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন বিজয় সেন। তিনি সেন রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর দীর্ঘ শাসনামলেই সেন সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক ও শিলালিপি (যেমন: দেওপাড়া প্রশস্তি) থেকে সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের যুদ্ধের কিছু বিবরণ পাওয়া যায়, তাহলো, ১. তিনি তাঁর দীর্ঘ ৬২ বছরের রাজত্বকালের বড় একটি সময় রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধে ব্যয় করেছিলেন।২. তিনি গৌড় (পাল রাজাদের), কলিঙ্গ (উড়িষ্যা), কামরূপ (আসাম) এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বহু স্থানীয় শাসককে পরাজিত করেছিলেন। ৩. এই সামরিক অভিযানগুলোতে তৎকালীন যুদ্ধের রীতি অনুযায়ী হাজার হাজার সৈনিক ও যোদ্ধা হতাহত হয়ে হয়েছে, তবে কোনো সুনির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য নিহতের সংখ্যা ইতিহাসে উল্লেখ নেই।
উপরের তিনটি বিষয় থেকে যা জানা গেল , এতে বুঝা যায় এই তিন শাসক যুদ্ধ বিগ্রহ করেছে। মানুষের মাঝে প্রতিহিংসা সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ছিল ব্যাস্ত। ব্যাক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থে ছিল তাদের উদ্দেশ্য। সুতরাং তাদের মহান বা মহামতি বা শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি বিশেষণে পড়ানোটা ঠিক না। মানব কল্যাণে যারা নিবেদিত ছিলেন, যুদ্ধবিগ্রহ পরিহার করে মানবিক সৌর্হাদ্যের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করতে চেয়েছিল, তাদের মহান মহামতি বিশেষণে আখ্যায়িত করা দরকার। যেমন গৌতম বুদ্ধ, ফকির লালন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’সহ এধরনের মানবিক মানুষের ইতিহাস পড়ানো হোক মহান হিসেবে। কারণ, প্রাচীনকালের প্রায় সকল যুদ্ধের পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ বিদ্যমান ছিল।
লেখক: কলামিস্ট